সুবহে সাদিক তার মধ্যে অসাধারণ! সূর্যের প্রথম রশ্মি আসার ক্ষণ, তার সঙ্গে আকাশের রংবদল, পাখির কলতান, মাটির গন্ধ, থমকে থাকা গাছপালা আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখি!

সেই সকাল থেকে শুরু করে সারাটা দিন আকাশের যে রংবদল হয়, তা দেখার মতো মন আমার আছে বলে আমার পরম করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে যায়! হোক সে কুয়াশা ঢাকা দিন, মেঘমেদুর দিন, বাদলের দিন কি জ্যৈষ্ঠের খরতাপ! আমি দিন দেখে ঋতুর বদল বুঝি! বাদল দিনে মাটির সোঁদা গন্ধ মাতাল করে দেয় আমায়। আবার আশ্বিনের আকাশ রোদবৃষ্টির লুকোচুরি? মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে! দিনগুলো কি পরিষ্কার! সাদা মেঘের ভেলা!

শীতের দিন আমার পছন্দ নয়! তবুও, তবুও সে আদুরে রোদ! সে রোদ গায়ে মেখে রোদে পড়ে থাকার আনন্দই আলাদা! দিনগুলো না হয় ছোট।

সে ছোট দিনেও ভোরে রোদ ওঠে! সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্য! রক্তিম আকাশ! ভালো না বাসার কি আছে?

সন্ধ্যার অস্তগামী সূর্য!
সকালের সূর্যোদয়ের চেয়ে সূর্যাস্তই হয়তো বেশি দেখেছি আমি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে আকাশে রঙের অদলবদল দেখা যেন আমার অতি প্রিয় বিষয়! সন্ধ্যার একটা গন্ধ আছে! সে গন্ধ পাই আমি! সকালেরও একটা গন্ধ থাকে, রোদপোড়া দিন বা বাদল দিন...সবার গন্ধ আলাদা!

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় মসজিদের আজান আর সামনের বাড়িতে পূজার শাঁখ মোটামুটি একই সময় বাজত। আজানের আগে মসজিদে হারিকেন দেওয়া, বা হুটোপুটি দৌড়াদৌড়ি করে পিছ দুয়ারে বালতিতে রাখা পানিতে হাত–পা ধুয়ে ঘরে ওঠা, অথবা আগ দুয়ারে বসে সবার হাতে চুলের বিনুনি অথবা সামনের বাড়ির মাসির মুখে কৃষ্ণের গল্প, পূজার গান, অথবা রাস্তার পাশের তালগাছটির ওপর দিয়ে বাদুড়ের উড়ে যাওয়া! অথবা শুধুই বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখা, কিষানিদের ঘরে ফেরা, পুকুরে দিনশেষে গৃহস্থের গোসল করে ঘরে ফেরা...আমি দিনগুলোর গন্ধ পাই! প্রতিটি দিন যেন, দিন শেষে সবাই নিজের মতো করে বলে যায়, শেষ! আজকের মতো সব শেষ! আনন্দ লাগে দেখে।

শেষ কিন্তু হয় না! উনুনে ভাতের গন্ধ, বাতাসে লাকড়ি পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ, কখনো আতর, কখনো আগর, কখনো ধূপ! অথবা শুধু চা বা কফিরই গন্ধ!

জোনাকিরা বের হয়ে আসে! পিছ দুয়ার আলোকিত হয়! আমি কখনো কখনো সে আলোতে নিয়নের আলোকে চাঁদ ভেবে বসি! ভুল ভাঙলে দেখি চাঁদ আর...এই তো একটু ওপরে! চাঁদের আলো ম্লান হয় না কিন্তু তাতে!

কখনো তারাভরা রাত, কখনো অমাবস্যার নিকষ কালো! কখনো উথাল–পাথাল জোছনা! চারদিক কি ভীষণ সুন্দর ম্লান অথচ উজ্জ্বল আলো! জোছনা সব যেন ধুয়ে দিয়ে যায়! আলোকিত করে দেয়! কি ভীষণ কোমল, মায়াময় অথচ উজ্জ্বল! পোড়ায় না বরং পরিশ্রান্ত মনে কেমন এক ভীষন মায়াভরা আকুলতা, ঠিক আকুলতা নয়, যেন আনন্দ ভরে দেয় মনজুড়ে। আমার ভীষন হাঁটতে ইচ্ছে হয়। প্রিয় মানুষটির হাত ধরে হেঁটে যেতে পারি মাইলের পর মাইল!

ছায়াপথ ধরেও হেঁটে চলা যায় মাইলের পর মাইল! মন ও শরীর প্রশান্ত হয়, শ্রান্ত হয় না। সেই তারাভরা রাতে কপালে থাকলে দু–একটি তারা খসে পড়া দেখা যায়! কী সুন্দর তার ছুটে চলা! না দেখলে তার সৌন্দর্য বোঝানো আমার কর্ম নয়! সবার মনে দেখার সে সৌন্দর্যও থাকে না!

আমি আকাশের সৌন্দর্য দেখি।
মন খারাপের ক্ষণেও আমি আকাশ দেখি। আকাশে কিছু কি খুঁজি? ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন আমি আকাশ দেখি। হেঁটে যাই মাইলের পর মাইল! দিন শেষে ক্লান্ত আমি শ্রান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি! নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে! নতুন সূর্যোদয়ের নতুন বিচ্ছুরিত আলোয় নিজেকে স্নাত করে যেন নবজন্ম হয় আমার প্রতিদিন!

মন ভালোর ক্ষণে আকাশের রং আরও গাঢ়, আরও একটু ভীষণ গাঢ় লাগে! সেদিনগুলোর গন্ধ গায়ে লেগে থাকে, শীতের দিনের গোলাপের মতো! গন্ধটা বাতাসে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে বেড়ায়। মনমাতানো গন্ধে চনমনে একটা ভাব থাকে! সূর্যটাও একটু তেজি থাকে, তবে সে কিন্তু উত্তপ্ত থাকে না—আরামের একটা আমেজ থাকে!

আমি আকাশ দেখি, সূর্যোদয় দেখি, নতুন ভোর, নতুন দিন শেষে রক্তিম সূর্যাস্ত! অমাবস্যায়, পূর্ণিমায়, জোছনায় বা জোছনাহীনতায় চাঁদ দেখি, তারাগুনে ঘুমুতে যাই! নতুন দিনের প্রত্যাশায়! আকাশ আমায় বাঁচতে শেখায়!


*লেখক, শারমীন বানু আনাম, আমেরিকা

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন