default-image

সুন্দর করে কথা বলাও যে একটা প্রফেশন হতে পারে সেই প্রথম ধারণাটি পাই। চাকরিটা পায় শারমিন আক্তার। ছবির এই মেয়েটা। চাকরির ক্ষেত্রটা তৈরি করে দেন আম্মু। আম্মুর তখন নতুন চেম্বার। নতুন সব মানুষের আসা–যাওয়া। এদিকে চেম্বার নতুন হওয়াতে অল্প মানুষের আনাগোনা। তা–ও আবার মফস্বলের আরেক শহরে। তাই বিষয়টা হয় আম্মুকে সঙ্গ দেওয়াও।

হারমেন স্কুলের শেষে বিকেলের সময়টা আম্মুর সঙ্গে থাকে অ্যাসিসটেন্স হয়ে। শারমিনকে ওদের বাড়ি থেকে আম্মু নিয়ে যেতেন। আবার দিয়েও আসতেন। মানুষ এলে তাদের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলতে হবে। সুন্দর করে বসতে বলতে হবে। অপেক্ষা করতে হলে কেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে গুছিয়ে বলতে হবে। এই হলো তার কাজ। প্রতি শুক্রবার। এমন করেই শারমিন নামের মেয়েটার সঙ্গে আমাদের পরিচয়।

শারমিন যে বয়স থেকে চাকরিজীবন শুরু করেছে সেই সময়টাতে আমরা, মানে আমি আর রীপা গরমের দিনে চুপিচুপি পানিতে ডুব দিয়ে বসে থাকা পাবলিক। ১৯৯৪ সালে জন্ম নেওয়া শারমিন আমাদের চার বছরের ছোট। তবু কেমন করে যেন শারমিন আসার পরের সময়গুলো মিলে যেত খেলাধুলাতে। অতিরিক্ত হাইপার হলে নাচও করতাম আমরা। শারমিন গাইত। আম্মু একবার রাস্তা দিয়ে আসার সময় চলন্ত রিকশা থেকে ক্যাসেটের কী একটা গান শুনলেন ভাসা ভাসা করে। রিকশা থামিয়ে সেই ক্যাসেট নিয়ে এলেন বাসায়। শারমিনের সব গান মুখস্থ সেই ক্যাসেটের!

কিন্তু শারমিনের পথচলা সহজ ছিল না আমাদের মতো। শারমিন যেখানে থাকত, সেই জায়গায় পড়ালেখা করে নষ্ট হয় মানুষ। শারমিনের আত্মীয়স্বজনেরা অনেক কিছু, কিন্তু বাবার কর্মবিমুখতার কারণে শারমিনদের তেমন কিছুই নেই, সেটাই যেন শারমিনের অপরাধ। এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন স্কুল–কলেজে পড়বে। এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করে পুরস্কার জিতবে। এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন পোশাক–পরিচ্ছেদে শতভাগ কেয়ারফুল হবে। সর্বোপরি এমন অপরাধ নিয়ে শারমিন কেন ‘শারমিন’ হবে। যাকে তার নামেই সবাই চিনবে। এই ছিল শারমিনের বসবাস করা সেই ছোট্ট পৃথিবীর অবস্থান।

কিন্তু এটা তো শারমিন। আমাদের শারমিন! সন্দ্বীপ নামের ছোট্ট এক দ্বীপের ছোট্ট পরিসরে জন্মগ্রহণ করা পদ্মফুল। থাকার জায়গাটা হয়তো বা সুবিধার না বড়। কিন্তু তাই বলে কি সুবাস ছড়াবে না সে? দিন শেষে সে ফুলই তো। তাই বলে সব ফুল কি আর ফুলদানিতে আদর পায়? পায় না। আমার ধারণা পৃথিবীর আরও অনেক রকমের সুন্দর ফুলেরা এখনো অনাবিষ্কৃত।

আবিষ্কারক খুঁজে পাওয়ার তত দিনে আমরা একটু একটু করে ভ্রু প্লাক করার মতো বড়। শারমিনও বড় হয়েছে। প্রতিদিন দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে গিয়ে পড়ালেখাও শেষ করেছে। যোগাযোগ বলতে মাঝেমধ্যে ফোন করে বলে, ‘মণি আপু আপনাদের জন্য মাঝে মাঝে কইল্লা জ্বলে। সন্দ্বীপ আসবেন না?’

আমরাও তত দিনে আর সন্দ্বীপ থাকি না। তবু বছরে একবার তো সন্দ্বীপ যাই। তেমনই একবার। সন্দ্বীপ বিউটি পারলার হয়ে গেছে। কী কৌতূহল সবার! গ্রামের জন্য এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কারণ, তার আগে এই দ্বীপে কোনো পারলার ছিল না। ক্লাব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই।

default-image

দু-একজন থেকে তথ্য নিই। তারপর ব্যাপক আনন্দ নিয়ে আমি সেই পারলারে যাই। কাজ কী! ভ্রু প্লাক। সামনের একজন বলল, বসুন চেয়ারটাতে। বসলাম। চারদিকে একটু চোখও বুলিয়ে নিলাম। চারদিকে আয়না রাখা আছে। শহরের পারলারগুলোর আদলে সাজাবার চেষ্টা করা হয়েছে। হুবহু করতে গিয়ে আনাড়ি বিষয়টা স্পষ্ট হওয়াতে একটু হাসিও পেয়েছে। তবুও তো সন্দ্বীপের একমাত্র পারলার! আমাদের তো আর রহস্যের শেষ নাই। হঠাৎ দেখলাম কিছুই চোখে দেখছি না আমি। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। শুধুই অন্ধকার। পেছন থেকে কে যেন দুই হাত দিয়ে আমার দুই চোখ চেপে ধরে আছে জোরে। আর উচ্চ স্বরে বলছে; চোখ খুলব না। চোখ খুলব না। চোখ খুলব না! বলেন তো আমি কে? বিস্মিত আমি সেই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে। উত্তেজনায় কাঁপা হাতটা খপ করে ধরে বলেছি, চোখ খোল শারমিন!

শারমিন। আমাদের শারমিন। যে সাহস আমরা করতে পারিনি। সেই সাহস নিয়ে সে সন্দ্বীপের প্রথম পারলারে। তারপর? তারপর কেমন করে, কী করে করল সব, বলল শারমিন। বলল, ‘মণি আপু, মানুষে নানান কথা বলে।’ পারলার হওয়াতে নাকি সন্দ্বীপের মেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে! আমি সেই সব মানুষদের জন্য মুখ ভর্তি বদ কথা আর ভ্রু ভর্তি সৌন্দর্য সচেতনতা নিয়ে গল্প শেষ করি। ফেরার সময়ে বিল দেব। নাহ, তিনি তা নেবেন না। কোনোভাবেই না! সেই ছোট্টবেলার মতো একটু শাসন করে বললাম। ঢং কম কর। এটা বিজনেস। তোর সঙ্গে আরও মানুষও আছে। এখানে স্বজনপ্রীতি সুন্দর দেখায় না।

এই হলো শারমিন। আমাদের শারমিন। পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই শারমিন নাম উচ্চারিত হয়, আমরা বলি, কোন শারমিন? আমাদের শারমিন? মন ওর সব সময়ই এমন তুলতুলে। অনেক বড় মনের মেয়ে সে। তাই আমাদের সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ, তার কিছুই কিন্তু সুন্দর বলা যাবে না। সোজা দিয়ে দেবে সে! আর্থিক অসংগতি নিয়ে বড় মনের মানুষ হওয়াটা বিপদের কথা বড়। এই মেয়ে সে রকম। বড় বিপদের! আমরা বলি; শারমিন তোর মন এত নরম কেন? এমন বললেও অস্থির আর আবেগপ্রবণ হয়ে বলবে, কিছুই তো নাই মণি আপু। কলজেটা আছে। দোপেঁয়াজা করে দিই!

এই মেয়ে এমন। শারমিন। আমাদের সেই শারমিন। এক ক্যাসেটের সব গান ঠোঁটস্থ মুখস্থ করে ফেলা শারমিন। যে সমাজ পারলার হয়ে যাওয়াকে ‘শেষ শেষ সব শেষ’ রব তুলে ফেলে, সেখান থেকে উঠে এসে গায়িকা হয়েছে। হ্যাঁ! ঠিকই শুনছেন গান করে সে। চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত সব অনুষ্ঠানে গানের মানুষ হিসেবে বিশেষ সম্মান পায় সে। সম্মানী পায় সে। সুরের রানি সে। এই সুরের রানি মাঝেমধ্যে মধ্যরাতে আমাকে কল দেয়। কথা বলে না। শুধু ভিডিওটা অন করা থাকে। আমি দেখি। আমাদের শারমিন গান করছে। সামনে থাকা অসংখ্য মানুষ ওয়ান মোর, ওয়ান মোর বলে চিল্লাচ্ছে। আমি এই দৃশ্য দেখে শৈশবের সেই দৃশ্যের মতো টুপ করে ডুব দিই পানিতে। কী যে শান্তির সেই পানি! কী যে শান্তির এই গরমের দিনে গোসল। কী যে গর্বের। কী যে সংগ্রামের শারমিনের এ একার পথ চলা। ডুবুরি ছাড়া আর কেই–বা বুঝবে, আত্মবিশ্বাসী পদ্মফুলেরা কেমন করে এমন আত্মনির্ভরশীলতার স্বকীয় সৌন্দর্যে ফুটে থাকে?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0