চলতি জানুয়ারি মাসের এগারো তারিখে হয়ে গেল নটর ডেম কলেজের ৭০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠান। দীর্ঘ কুড়ি-একুশ বছর এই কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে প্রিয় ছাত্র ও কলেজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমার নানান স্মৃতি। ৭০ বছরপূর্তি উপলক্ষে প্রথম আলোর দূর পরবাস বিভাগে ‘আমার নটর ডেম কলেজ’ শিরোনামে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আমার ছাত্র কাউসার খানের একটি লেখা দেখে সেসব কথা আবারও মনে পড়ে গেল।

কলেজের ছাত্র হিসেবে ওর লেখাটি দারুণ এক স্মৃতির বিবরণ। কাকতালীয়ভাবে লেখার বিষয়বস্তু আমার জন্যও তেমনই এক স্মৃতি জাগানিয়াও বটে! ওরা তিন বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত সৈয়দ ফজলে রুমি, বাংলাদেশের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী সানী জুবায়ের ও কাউসার খান কলেজ শেষ করে ভারতের নৈনিতালে পড়তে যায়। নৈনিতালে গিয়েও ওরা ওদের প্রিয় কলেজ ও মানুষদের মন থেকে মুছতে পারেনি। কলেজে ওরা ভূগোল বিষয়ে পড়েছে। নৈনিতালে গিয়েও সেখানকার ভৌগোলিক নানা বিবরণ, বিশেষ করে সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিভিন্ন দিক জানিয়ে প্রায় প্রতি মাসেই চিঠি লিখত। সেগুলো ডাকযোগে নিয়মিত পেতাম। সেখানেও আরেক স্মৃতি! চিঠির সঙ্গে প্রতিবারই ওরা অনুরোধ করত, আমি যেন ওদের নৈনিতালে পিএইচডি করতে যাই।

default-image

ওদের বারবার অনুরোধে একবার একটা থিসিস প্রপোজাল পাঠিয়েই দিই। সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও বিশিষ্ট নগর ভূগোলবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যারের রেফারেন্স ও সুপারিশপত্র। খুশির কথা, মাসখানেক পর সেখানকার বিভাগীয় প্রধানসহ তিনজন অধ্যাপকের কাছ থেকে তাদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব পাই। তবে কলেজের দায়িত্ব আর সংসার রেখে যাওয়া হয়ে ওঠেনি তখন।

যা হোক, কাউসার তার লেখায় অনেক কিছু লিখলেও তাঁর নিজের কিছু বিষয় লেখেনি। কাউসার কলেজে ছাত্র থাকাকালে ভূগোল বিভাগ ও অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের (ওবেক) ৩০ জন সদস্য নিয়ে কুলিয়ারচর গিয়েছিলাম সেখানকার বিখ্যাত হাওর, হাওরের মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কিষান পনির তৈরিকরণ দেখতে। সকালে ঢাকা থেকে এগারো সিন্দু এক্সপ্রেস ট্রেনে রওনা দিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুইয়ে পৌঁছে যাই কুলিয়ারচরে। আজও মনে আছে, আমাদের না জানিয়েই সেদিন সকলের জন্য কাউসার ওদের বাড়িতে দুপুরে দারুণ এক ভূরিভোজের আয়োজন করেছিল। কলেজের অফিস স্টাফ সমর ডি কস্তাও আমাদের সঙ্গে ছিলেন।

default-image

কাউসারের ছোটভাই লিমনও ২০০০ সালে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়। লিমন এই কলেজে ভর্তি সময়ের একটা সততার ছোট গল্প আছে। এ কথা লেখেনি সে। আমার সঙ্গে তখনো প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও, নিজের ভাইয়ের ভর্তির আগে ঘুণাক্ষরেও সে কথা আমাকে জানায়নি কাউসার। লিমনের ভর্তির মৌখিক পরীক্ষা হয় পৌরবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের যোসেফ রোজারিও স্যারসহ আমাদের বোর্ডে। আমি ওর স্কুলের সার্টিফিকেটে কুলিয়ারচর দেখে বললাম, কাউসার নামে আমাদের এক ছাত্র ছিল কুলিয়ারচরের। লিমন জানায়, কাউসার ওর বড় ভাই। অথচ পরীক্ষার আগে একবারও আমাকে বলেনি, ওর ভাইয়ের ভর্তির কোনো প্রকারের সাহায্যের জন্য। কারণ, সে জানত যে কেউ নিজের মেধাতেই নটর ডেমে ভর্তি হতে পারে; কারও মাধ্যমে নয়।

কাউসার এর বিয়েতে যাওয়া নিয়ে বলতে চাই। একজন ছাত্র সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে নিজ হাতে চিঠি দিয়ে গেছে আমাকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে। সেই চাওয়াকে আমি ভালোবাসায় পরিণত করেছি। তাই সামান্য অসুবিধা হলেও কলেজে দুপুর ১২টা ৪০ পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে কমলাপুর থেকে এগারসিন্ধু ট্রেনে করে রওনা দিই কুলিয়ারচরে। বিকেল গড়িয়ে গেলে ওদের বাড়ি পৌঁছাই। আমাকে দেখে কাউসার যত না অবাক হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলেন ওর মা-বাবাসহ উপস্থিত অন্যরা। তাদের খুশি হওয়া মনোভাব আজও আমার স্মৃতিতে গাঁথা রয়েছে। এসব গুলো আমার কাছে মনে করার মতো আনন্দ স্মৃতি।

লেখক: ঢাকা নটর ডেম কলেজ সাবেক অধ্যাপক। সময়কাল ১৯৮৭-২০০৮।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0