default-image

আজকে  ঝকঝকে নীলাকাশ। বলা হয় তিন ডব্লিউর কোনো ভরসা নেই। ওয়ার্ক, ওয়েদার—আরেকটা ডব্লিউ দিয়ে যা হয়, সেটা না হয় উহ্যই রাখলাম।
গতকাল সারা দিনই ছিল বৃষ্টি। অবাক লাগে আমার, শীতকালের বৃষ্টি কিন্তু শীতের তীব্রতা নেই, আজ চমৎকার রোদ, সব ফেলে এই নরম রোদে শুধু রোদ পোহানই যায়, কিন্তু ঝকঝকে এই রোদের তাপ হার মেনে গেল তীব্র ঠান্ডার কাছে। ফারেনহাইটে ৪৫, সেলসিয়াসে ৭ ডিগ্রি। কিন্তু অনুভূত হবে ৩ ডিগ্রি।

আজ হালকা ঠান্ডা, কাল বেশি ঠান্ডা কেমন যেন সব এলোমেলো। মনে পড়লেও গা শিউরে উঠে এই আমি একসময় ক্যানসাস, নিউইয়র্কে সিঙ্গেল ডিজিটের ঠান্ডায় নিজেকে একদম প্যাকেট করে চলাফেরা করতাম। সেই কবে দেশ থেকে আসার সময় বঙ্গবাজার থেকে আমার রাঙা আপা ফিরোজা রঙের টুপিসহ ইয়া বড় একটা জ্যাকেট কিনে দিয়েছিল। কী যে মজবুত আর আরামদায়ক ছিল সেই জ্যাকেট। আর ছোট আপা নিজ হাতে উল দিয়ে বানিয়ে দিয়েছিল অসাধারণ একটা ছোট্ট একটা স্কার্ফ, যেটা সামনের দিকে ছিল বিনুনি করা। মাথায় বাঁধলে সেই বিনুনি করা ডিজাইনটা ঠিক আমার কপালের ওপরে থাকত। সেই অল্প বয়সে চুল ছিল ক্যারিক্যাচা করে কাটা। ফলে আমার ছোট আপার বানানো সেই স্কার্ফ আমার চুলের ফ্যাশনকে সমুন্নত রেখেছিল তো বটেই, আবার আর একরকম অনুভূতির ও উদ্রেক হতো। এই রকম স্কার্ফ পরা ছবি মনে গেঁথে ছিল ছোটবেলায় পড়া রাশিয়ান গল্পের বইয়ের মেয়ে শাশা, তাতিয়ানা, ইসাবেলাদের  মাথায়। আবার একেই  স্কার্ফ ছিল লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরির তিন বোন আর মায়ের মাথায়। সেই একই স্কার্ফ আমারও।

বিজ্ঞাপন
default-image

কালের বিবর্তনে আমার সেই পাগলা ঠান্ডার জীবন, জ্যাকেট, স্কার্ফ—সবই হারিয়ে গেছে। বর্তমানের এই জীবনে হালকা একটা সোয়েটার দিয়েই শীত পার করে ফেলছি। ভোরে বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে রাখি, গরম করি, সারা রাত কুয়াশায় মাখামাখি সেখান থেকে মুক্ত করা আর হালকা সোয়েটার বা র‍্যাপার নিয়েই যেন আরামেই গাড়িতে গিয়ে বসতে পারি।

কিন্তু আজ তো দেখি হাড্ডিগুড্ডিতে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা। কোনো রকমে গাড়ি পার্ক করে এক দৌড়ে অফিসে।

কাজ করছি, হঠাৎ শুকনা পাটকাঠির মতো এক চাইনিজ রোগী (আমাদের পুরোনো রোগী) আমাকে জিজ্ঞেস করেন খুবই মজা হয়েছে এমন ভঙ্গিমায়। তাঁর উচ্চারণও বোঝা দায়। অনেক চেষ্টা করে বুঝতে পারলাম আমার গাড়ি পার্কিং ঠিক হয়নি। তাড়াহুড়ো করে গাড়ি যে ত্রিভুজভাবে পার্ক করেছি, তা এই চাইনিজকে উচ্চ মাত্রায় হাসির জোগান দিয়েছে।

দিন শেষে এলেন ৫৮ বছরের এক শ্বেতাঙ্গ নারী। তিনিও আমাদের নির্দিষ্ট রোগী। থাইরয়েড চেক করাতে দেড় মাস পরপরই আসতে হয়। এবার তাঁর ভিজিট মিস হয়েছে। খুবেই বিষণ্ন তিনি। একপর্যায়ে আর ধরে রাখতে পারলেন না। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি শান্ত হলেন।

জানলাম, তাঁর ৭৮ বছরের মায়ের ৮২ বছরের ছেলে বন্ধুটি মারা গেছে। আমাদের রোগী তিনি ডিভোর্সড, তাঁর ছোট বোন সিঙ্গেল আর তাঁদের মা আর তাঁর ছেলে বন্ধু সবাই এক বাড়িতেই থাকতেন। এই দুজনের বন্ধুত্ত গত ১০ বছরের। মায়ের এই ছেলে বন্ধুর মৃত্যু তাঁদের সবাইকেই খুব শূন্য করে দিয়ে গেছে।

ঝকঝকে নীলাকাশ এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা, তেমনি মানব জীবনেও কত বিচিত্র আনন্দ–বেদনা।

*লেখক: তামান্না হোসেন, আটলান্টা, আমেরিকা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন