default-image

আমি ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত একই স্কুলে পড়েছি। ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত আমি আমার এক বান্ধবীর পাশে বসতাম। আমার ডাক নাম জয়া। আর আমার সেই বান্ধবীর নামও ছিল জয়া। দুজনের নামই জয়া কিন্তু আমাকেই স্কুলে সবাই জয়া ডাকত আর ওকে ডাকত জিয়া। ওর পুরো নাম ছিল জিয়া-উন-নাহার। আমাদের দুজনের ঠিক পেছনের ডেস্কে বসতো সেতু। আমরা ক্লাসের বিরতিতে তিন মাথা এক করে আড্ডা দিতাম। আমাদের স্কুলটা তেমন বিখ্যাত ছিল না। ওই স্কুলে যারা ভালো রেজাল্ট করত তারা সবাই ভিকারুননিসায় চলে যেত। আমি রয়ে গেলাম। কারণ টিচাররা খুব ভালোবাসতেন, বাড়তি মনোযোগ দিত আমার প্রতি। আর তার থেকে বড় কথা এখানে আমার বান্ধবীরা আছে।
স্কুলে আমাদের ক্লাস শোরগোল আর দুষ্টামিতে বিখ্যাত ছিল। অনেক সময় আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন কিন্তু আমি সব চেয়ে বকবক করি। কিন্তু আমার কথা কে শুনবে? আমাদের ভূগোল টিচারের এক নাদুসনুদুস বাচ্চা মেয়ে ছিল। একবার ভূগোল ক্লাস শুরু হওয়ার আগে এক মেয়ে বোর্ডে দাঁড়িয়ে ওই পিচ্চিকে আঁকছে, হাতে একটা মুরগির ঠ্যাং। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, টিচার এসে পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জিয়া, সেতু নাচতো আর আমি উপস্থাপনা করতাম। গানও গেয়েছি, মিলাদও পড়িয়েছি। একসঙ্গে বড় হয়েছি আমরা, একসঙ্গে বড়দের জগতের দুই-একটা কথা শিখেছি। একসঙ্গে আমাদের বাসার ছাদ থেকে পেয়ারা পেড়ে খেতাম, দোলনায় দুলতাম আর গল্পের বই পড়তাম। তখন ক্লাসের মাঝে ‘নাম দেশ ফুল ফল’ খেলতাম আর টিফিন পিরিয়ডে এক্কা-দোক্কা। স্কুলের বাইরে আট আনার আচার, এক টাকার আমসত্ত্ব আর ঝাল মুড়ি, সেটাও আমরা ভাগাভাগি করে খেতাম। ওরা দুজন খেলাধুলায় অনেক ভালো ছিল। রোগা পটকা আমি ওদের উৎসাহ দিতাম। একটা পরীক্ষার কথা মনে আছে। জিয়ার প্রশ্ন কমন পড়ে নাই। আমি আমার খাতাটা খুলে রেখেছি যেন ও দেখতে পায়। জিয়া খেয়াল করল আমি পরের পাতায় যেতে পারছি না। বলল, তুই থামিস না। আমার জন্য অপেক্ষা করিস না। আমার রেজাল্টে আমার থেকে ওকে বেশি খুশি মনে হতো। সব সময় দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরতো। আমি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না। হয়তো কোনো দিন বলিনি, তোকে অনেক ভালোবাসি।

স্কুল পাস করে যখন হলিক্রস কলেজে গেলাম, আমার স্কুলের কেউ নেই। একটু একা একা লাগত। কিন্তু আস্তে আস্তে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কিন্তু আমার স্কুলের দুই বান্ধবী আমার সব জন্মদিনে আসত। আমি মনে মনে অপেক্ষা করতাম। সেতুর অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে গেল। আমি বুয়েটে ঢুকলাম আর জিয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ঢুকল। বুয়েটে ঢুকেও নতুন বন্ধুদের পেলাম। এই একটি ব্যাপারে আমি বেশ ভাগ্যবতী। সংখ্যায় অনেক না হলেও আমার সব সময় কিছু ভালো বন্ধু ছিল। যারা আমাকে আগলে রেখেছে তাদের মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে। বিনিময়ে আমি কিছুই দিইনি মনে হয়। তখন সেল ফোন ছিল না, ফেসবুক ছিল না। তাই পুরোনো বন্ধুদের জায়গা নতুন বন্ধুরা নিয়ে নিল। আমার বিয়েতে সেতু, জিয়া এসেছিল। আমার মেয়েকে দেখতেও এসেছিল। সেই শেষ দেখা।
আমেরিকা এসে জীবনযুদ্ধে আর কোনো খবর ছিল না কারও। ফেসবুক হওয়ার পর আমি মনে মনে ওদের খুঁজতাম, পাইনি। এক স্কুলের বান্ধবীকে পেলাম। অনেক আনন্দ হলো। তত দিনে বুঝে গেছি নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব বড় দুর্লভ জিনিস, তাকে রক্ষা করতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়। আমি ওকে আমার বান্ধবীদের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল সেতুর তো বিয়ে হয়ে গেল আর যোগাযোগ নেই, কিন্তু তুমি জিয়ার কথা জান না?
ওর এই রিপ্লাই আমি যখন দেখলাম তখন অনেক রাত। আমি পুরোটা রাত অপেক্ষা করলাম। কিছু জানি না? কেন যেন খুব বুক ধুকধুক করছিল।
পরের দিন, বেশ ইতস্তত করে ও জানাল এই আমেরিকাতেই কয়েক মাস আগে জিয়া ক্যানসারে মারা গেছে। ফেসবুকে সেই প্রথম মনে হয় আমি কারও মৃত্যু সংবাদ পেলাম।
আমি অনেক কেঁদেছিলাম। কয়েক দিন অস্থির হয়েছিলাম। ওর হাসিমাখা প্রাণবন্ত মুখটা ভুলতে পারছিলাম না। একদিন স্বপ্ন দেখলাম সেই স্কুলের মতো আমি, সেতু আর জিয়া একটা মাঠে বসে খেলছি। চারদিক শূন্য, একটা গাছ পর্যন্ত নেই। ধু ধু মাঠ।
তার অনেক অনেক দিন পর হঠাৎ একজনের ফ্রেন্ড লিস্টে সেতুকে পেলাম। নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে। আমি রিকোয়েস্ট পাঠানোর দুই সেকেন্ডের মধ্যে সে গ্রহণ করল।
তখন দেশে রাত দুটো। আমি ওকে ফোন করলাম। সেতু বলল, জানিস তোর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেখে আমার বুক ধ্বক করে উঠেছিল। পুরোনো কত কথা। কিছুক্ষণ পর দুজনই চুপ। আমরা দুজনই জানি আমরা কার কথা ভাবছি। সেতু আর জিয়ার পরেও যোগাযোগ ছিল। জিয়ার মৃত্যু সেতুর জন্য আমার চেয়েও অনেক শকিং ছিল। সেতু বলল, জয়া আমি এখনো ওদের বাসায় কাঁদতে কাঁদতে ঢুকি।
অদ্ভুত যেই জিনিসটা আবিষ্কার করলাম, আমরা দুজনই একই স্বপ্ন দেখেছি। একটা মাঠে তিনজন খেলছি।
এখনো কানের মধ্যে ভাসে, ‘তুই থামিস না। আমার জন্য অপেক্ষা করিস না।’ বন্ধুরা কখনো কাউকে থামিয়ে দেয় না। সামনে এগিয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0