বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কিছু অদ্ভুত ব্যাপার সেই ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত। সত্যি কথা বলতে বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র এখন পর্যন্ত সেই মান্ধাতার আমলের আইন দিয়েই চলে। প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের বনিয়াদি প্রশিক্ষণ (ফাউন্ডেশন ট্রেনিং) দেওয়া হয়। বনিয়াদি প্রশিক্ষণ আসলে বিভাগীয় পরীক্ষার পূর্বপ্রস্তুতি। সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন প্রকার আইনকানুন শেখানোর পাশাপাশি শেখানো হয় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কোথায় কীরূপ আচরণ করতে হবে। আর সেই সব ক্লাস নিতে আসেন তখনকার সব ডাকসাইটে আমলা। তাঁরা এমন সব প্রটোকল নিয়ে আসেন যে নতুনেরা বুঝে যান তাঁরাও একদিন এমন সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হবেন। এরপর কর্মক্ষেত্রে শুরু হয়ে যায় সেগুলোর প্রয়োগ।

এবার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। আমলাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় কোনো কিছুতেই তাঁরা বিশ্বাস করেন না। তাই সব তথ্য সত্যায়িত করতে হয় এবং প্রথম শ্রেণির গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তাদের এ বিশেষ ক্ষমতা আছে। আমি সানন্দে এই কাজটা করি। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর আমার প্রথম পদায়ন দেওয়া হলো ঢাকার সাভার উপজেলায়। সাভার জায়গাটার সৌন্দর্য আমাকে এখনো টানে। গ্রাম ও শহরের একটা দারুণ মিশেল আছে সাভারের পরিবেশে। আবার পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়নের ফলে সাভারের প্রায় সব নদীই দূষিত হয়ে গেছে। যা-ই হোক, আমি বেশির ভাগ সময়ই বিভিন্ন সাইটে ঘুরে বেড়াই। বাকি যে সময়টা অফিসে বসি, সেটা চলে যায় সাইটের বিল চেক করতে আর মাসিক অগ্রগতির রিপোর্ট তৈরি করতে। এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সাধারণ লোকজন আসেন তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়িত করতে। সত্যায়ন করার নিয়ম হলো, আসল কপি দেখে ফটোকপিতে দস্তখত দেওয়া। আমাদের ব্যস্ততা এতই বেশি থাকে যে তাঁরা আসল কপি আনলেও আমি সেটাতে একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে সত্যায়ন করে দিই।

default-image

ধীরে ধীরে ব্যাপারটা কীভাবে যেন সারা উপজেলায় চাউর হয়ে গেল। সবাই সত্যায়নের জন্য অন্য কোথাও না গিয়ে অপেক্ষা করে কখন আমি সাইট থেকে ফিরব। বিভিন্ন দরকারে বিভিন্ন ধরনের লোক আসতে শুরু করল সত্যায়িত করতে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকের সঙ্গে তাই প্রতিদিনই দেখাসাক্ষাৎ হয়, হয় ভাবের বিনিময়। পাশাপাশি বিভিন্ন কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁদের কাছ থেকে সত্যায়িত করার বিষয়ে যেসব অভিজ্ঞতা শুনতাম, তা মোটেও আমাকে স্বস্তি দিত না। একদিন সকালে এক প্রবাসী এসেছিলেন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) বানানোর জন্য কাগজপত্র সত্যায়িত করতে। আমার কাছে আসার আগে ভদ্রলোক উপজেলার মধ্যে অবস্থিত অন্য সব কটি অফিসে গিয়েছিলেন। সেই সব কর্মকর্তা নাকি কেউ পেপার পড়ছিলেন, আবার কেউ চা পান করছিলেন কিন্তু বলে দিয়েছেন অন্য কোথাও যান। তিনি সৌদি আরবে থাকেন।

আবার তিন মাস পর যাবেন। তিনি আমার অফিসের দরজায় এসে জুতা খুলতে শুরু করেছিলেন দেখে আমি তাড়াতাড়ি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ভেতরে আসতে বললাম। তিনি ভেতরে আসার পর আমার ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারগুলোর দিকে নির্দেশ করে বসতে বললাম। মনে হলো তিনি যেন আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না। আমি আবারও চেয়ারের দিকে নির্দেশ করলে তিনি বসলেন এবং ওপরের কথাগুলো বললেন। তা দূতাবাসগুলোতে কেমন সাহায্য-সহযোগিতা পান আপনারা? বললেন সাহায্য করে কিন্তু অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর। আমি তখন বললাম, আপনারা, পোশাক কারখানার নারীরা আর চাষা মানুষগুলোই তো এই দেশটাকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন। এই কথাগুলো শোনার পর ভদ্রলোক হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। তিনি বয়সে প্রায় আমার বাবার সমান। আমি অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলাম আর অপেক্ষা করছিলাম কখন তিনি থামেন। একসময় তিনি কান্না থামিয়ে বেরিয়ে গেলেন এবং যাওয়ার আগে একটা চিরকুটে তাঁর নাম, ফোন নম্বর এবং ঠিকানা দিয়ে গেলেন এবং হাত নেড়ে নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে যেতে হবে। মানুষ এত কমে সন্তুষ্ট হয় এবং মানুষকে আপন করে নেয়। এটা তার সামান্য উদাহরণমাত্র।

default-image

এবার আরও একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। তখন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিতে চাকরি করি। বছরজুড়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দৌড়ে বেড়াই কিন্তু মাস শেষে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন আসার আগে সরকারের ঘরে ট্যাক্স চলে যায়। আবার বছর শেষে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য উকিলের কাছে দৌড়াতে হয় এবং ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বরের সার্টিফিকেট তোলার জন্য আলাদা আরও কিছু টাকা দিতে হয়। সে বছর কেন জানি ঘাড়ে ভূত চেপে গেল। বন্ধু জর্জিসের সাহায্যে নিজে নিজেই ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিলাম এবং টিন সার্টিফিকেট আনতে সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবনে হাজির হলাম। নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে আমার টিন সার্টিফিকেট চাইলাম। তখনো ঘুষের ব্যাপারটা সেভাবে জানি না বা জানলেও ঘুষ দেব না, এমনই একটা ভাবনা নিয়ে গিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে কোনো প্রকার সহযোগিতা করলেন না, বরং বিশাল একগাদা কাগজের পালা দেখিয়ে দিয়ে বললেন খুঁজে নিতে। আমি অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে আমার আগের এবং পরের টিন নম্বরের রিটার্ন খুঁজে পেলেও আমারটা আর খুঁজে পেলাম না। তখন বাধ্য হয়েই তাঁদের বললাম খুঁজে দিতে, সঙ্গে এ-ও বললাম যে যা খরচাপাতি লাগবে আমি দেব। তখন তাঁরা আমাকে বললেন, আপনি অমুক টেবিলে গিয়ে বসেন, আমরা সার্টিফিকেট নিয়ে আসছি।

আমি সেই টেবিলে বসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেই ভদ্রলোক আমার টিন সার্টিফিকেট নিয়ে হাজির হলেন। এখন সেই টেবিলের দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা আমাকে টাকা দিতে বললেন। আমি টাকা দিলেই শুধু তিনি টিন সার্টিফিকেটে দস্তখত দেবেন, না হলে দেবেন না। আমি তখন পকেট থেকে একটা ১০০ টাকার নোট বের করে দিলাম। তিনি মাত্র ১০০ টাকার একটা নোট দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বললেন, এটা কী দিচ্ছেন। সবাই তো দেড় হাজার করে দিচ্ছে। আমার তখন মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে একটু আগের অযথা ভোগান্তির জন্য। আমি বললাম, বছরজুড়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা আয় করি আর সরকারকে ট্যাক্স দিই। এখন আবার আপনাদের খুশি করতে হবে। উত্তরে তিনি বললেন, তাঁর দুই মেয়ে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের অনেক খরচ। আমি তখন আরও রেগে গিয়ে বললাম, দেখেন, আপনার মেয়ের বেতন দেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়। এবার তিনি একটু নরম হলেন। আমি শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকায় রফা করলাম। আমার পাশেই টেবিলটা ঘিরে আরও কয়েকজন বসে ছিলেন। তাঁরা আমার কর্মকাণ্ড দেখে এমন একটা হাসি মুখে ধরে রেখেছিলেন যে একজন শিশুর কর্মকাণ্ড দেখে খুবই মজা পাচ্ছেন।

এবার আসি অতিসাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায়। দেশ ছাড়ার সময় সরকারি চাকরির নিয়ম যথাযথ মেনে দুই বছরের অবৈতনিক ছুটি নিয়ে এসেছিলাম। এই সময়কালে আমি কোনো প্রকার বেতন বা সরকারি সুবিধাদি নিইনি, তবে অনেক মানুষকে দেখেছি দেশে সরকারি চাকরি করছে কিন্তু আবার অন্য দেশের পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা নাগরিক কিন্তু সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী অন্য কোনো দেশের নাগরিক হলে আপনি বাংলাদেশের সরকারি চাকরি করতে পারবেন না। যা-ই হোক গাছেরটা নেওয়া, তলারটা কুড়ানো অনেক সরকারি চাকরিজীবীই তথ্য গোপন করে চাকরি করে যাচ্ছেন। আমার ছুটি শেষ হওয়ার পর এ দেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে আমার ইস্তফাপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিলাম। আমি হলফ করে বলতে পারি, হাইকমিশন ঠিক সময়েই আমার ইস্তফাপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। কারণ, তারা আমাকে একটা কপিও দিয়েছিল ট্র্যাক করার জন্য। এরপর যতই সময় গড়িয়ে যায়, আমার ইস্তফাপত্র সেই মন্ত্রণালয়ে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি আবারও হাইকমিশনে যোগাযোগ করলে বলল, এবার ওই মন্ত্রণালয়ে ই-মেইল করব আর তোমাকেও একটা কপি দেব। যথারীতি হাইকমিশন আবারও ই-মেইল করল।

এবারও সেই একই দশা। তখন মনে পড়ে গেল ছুটি অনুমোদনের সময়ের কথা। সেই প্রথম সচিবালয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে যেখানে সরকারিভাবে পরিপত্র জারি করে অফিসগুলোকে কাগজহীন হতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে সচিবালয়ে পাশাপাশি কক্ষে বসা এক সচিবের কক্ষ থেকে অন্য সচিবের কক্ষে ফাইল যায় না মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর। আমি নিজে গিয়ে বিভিন্ন জনকে ‘স্পিড মানি’ দিয়ে ফাইলটাকে চালু রেখেছিলাম একটা ছুটি অনুমোদনের জন্য। একটা লুপ অনুসরণ করতে হয়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ওপর বরাবর নোট দেন। আবার সেই ওপরের কর্মকর্তা তাঁর ওপরের কর্মকর্তা বরাবর নোট দেন। এভাবে সর্বোচ্চ ওপরে যাওয়ার পর একই পথে আবার নিচে আসা শুরু করে। তখন সেই কর্মকর্তা অনুমোদন দেন। এভাবেই যেকোনো কিছু অনুমোদন পায় সচিবালয় থেকে। এবার আমি দেশে নেই, তাই আমার উপকারে এগিয়ে এলেন আমারই একজন সিনিয়র সহকর্মী। মাত্র দুই বছর চাকরি করে অফিসের সবার সঙ্গেই মোটামুটি একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি দায়িত্ব নিয়ে আমার ইস্তফাপত্র অনুমোদন করিয়ে দিলেন। তাতেও প্রায় তিন মাস সময় লেগে গেল। তাই সরকারি চাকরি নিয়ে আমি একটা কথা সব সময় বলি, সরকারি চাকরি পাওয়া কঠিন কিন্তু যাওয়া অসম্ভব।

default-image

উপজেলা বা থানা পর্যায়ের একজন ভূমি নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) পদোন্নতি পেয়ে একসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), তারপর এডিসি, ডিসি হয়ে ভাগ্য ভালো হলে একসময় সচিবালয়ে পদায়ন পান। যদি সঠিক সময়ে সঠিক ‘....’ করতে পারেন, তাহলে প্রক্রিয়াটা আরও দ্রুত হয়। এরপর ভাগ্য ভালো হলে কোনো একটা মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্বও পেয়ে যেতে পারেন।

আমলাতন্ত্র নিয়ে আমি আরেকটা কথা বলি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সব ক্ষমতার মালিক জনগণ কিন্তু সেটা মোটেও সত্যি নয়। আবার অনেকে মনে করেন রাজনীতিবিদেরা বা সরকার কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, বাংলাদেশের সব ক্ষমতার কেন্দ্র আমলারা। পাঁচ বছর পরপর সরকার বদল হলে আমলারা শুধু একটু বেশি সুবিধার স্থান থেকে কম সুবিধার স্থানে পদায়ন পান, এই যা।

এত এত দুর্নীতির পরও একটা সিস্টেম টিকে আছে। কারণ, এখনো আমলাতন্ত্রের প্রতিটা স্তরে একেবারেই হাতে গোনা কয়েকজন সৎ কর্মকর্তা আছেন, যাঁরাই আসলে পুরো ভঙ্গুর সিস্টেমটাকে নিজ দায়িত্বে ধরে রেখেছেন। আর একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, এসব সৎ কর্মকর্তাকে দলমত-নির্বিশেষে সবাই সমীহ করে চলেন এবং অকারণে ঘাঁটান না। কারণ, সবাই জানেন, এ মানুষগুলোকে টাকার লোভ বা ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে কেনা যাবে না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সেই মানুষগুলোর জীবনমান একেবারেই তথৈবচ কিন্তু এটা নিয়ে তাঁদের কোনো আক্ষেপ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের ছেলেমেয়েরাও কীভাবে কীভাবে জানি বুঝে গেছে, যেহেতু মা-বাবা দুর্নীতি করেন না, তাই তাদের বেশির ভাগ শখই অপূর্ণ থাকবে এবং তারা সেটা মেনেও নিয়েছে। তাঁরা আছেন বলেই এখনো আমরা মনে মনে স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখি।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন