বিজ্ঞাপন

ঝামেলা করে তাদের বাবা। ক্লজেটে তার পাঞ্জাবি অনেক—পরতে গেলে যা পরবে! খুশিমনেই পরে (আসলে পরতেই চায় না)—একদম প্লেইন, লং সৌদি আলখেল্লা। তার আবার ফ্যাশন সেন্স প্রখর! কারও চোখে পড়বে, ভাবলেই তার জ্বর আসে। আয়রন করার কথাও মাথায় থাকে না।

আর এরপর আমি যখন একখান শাড়ি পরে, একটু ভাবি লিপিস্টিক লাগাই, লাগিয়ে বেরও হই...মনে হয় এরা সব আমার বাসার কাজের লোক! আমার সেবা করতে করতে এদের এমন দুর্দশা! না চেহারার ছিরি, না পোশাকের! আমার নিজের কাছেই লজ্জা লাগে, নিজেকে নিয়ে! কী মনে করে লিপিস্টিক লাগালাম ভাবতে থাকি!

default-image

তখন মনে হয়, ড্রেস চেইঞ্জ করে করিমনের মায়ের পিন্দনের পুরানা ঝুলমাখা শাড়ি ধার নিয়ে আসি, নয়তো করিমনের ছেঁড়া জামাই সই! হেগো তন খানিকটা কালিঝুলি না মাখলেও একই পরিবার বলে মনে করা দুষ্কর! কী আর করা, করিমনের মারে কই পাব, নিজেই তো করিমনের মা! তাই পুরোনো জামাডা পিন্দা মুখ মুইচ্ছা বাইর হই।

এদের কিন্তু বিন্দুমাত্র ভাবান্তর নেই, বরং বিরক্ত আমার পোশাক চেইঞ্জে সময় নষ্ট হওয়ায়।

পোলাও কোরমা না দিয়ে, একটু ডাল–ভাত, আলুভাজি আর মাংসের পাতলা ঝোল দিলে কী যে খুশিমনে হা–ভাইত্যার মতো লালা ফেলতে ফেলতে খায়! দেইখ্যা মনে হয়...কত দিনের না খাওয়া!
কী যে আশান্তিতে থাকি!

মিষ্টিতো মিষ্টির জায়গায় পড়েই থাকে! মনের দুঃখে আমি খাই আর ওজন বাড়াই। শেষমেশ তা–ও শেষ না করতে পেরে ফেলে দিই!

থাক, এত দুঃখ না করে আমি কাজ করি। রান্না করব না! সাজুগুজুও করব না। না, আমি জানি এদের কাপড়চোপড় কোথায়, না তারা জানে! নিজের কাপড়েরও খোঁজ নেই। ঈদ হিসেবে কেনাই হয় না। সেই মান্ধাতা আমলের পুরোনা শাড়িও পরা হয়নি বলে ভাঁজ না ভাঙা—কোথায় কোনটা আছে, খুঁজতে গেলেও এটা পাই তো সেটা পাই না। দুঃখের কথা আর না বাড়াই!

আমার যে কেন সবার মতো ঈদ বলে এক্সাইটমেন্ট আসে না! মেহেদি নাইট, চানরাত খালি শুনি! কে আমার মেহেদিরাঙা হাত দেখবে? পেশেন্ট লাল রঙের হাত দেখলেই নাক সিটকাবে! মরার মেহেদি আবার লালও হয় না হাতে!
বুঝলেন তো, এখন পাগলের সংসার আমার—আমার সুখ মনে মনেই! সেই সুখেই ভাসতে থাকি, আর ভাবতে থাকি দিনটা কেমন যাবে?

তবে এর মধ্যে গত বছর যেমন সবাই বাসায় ঈদের নামাজ পড়েছে, টিকার কল্যাণে এবার মসজিদে, খোলা মাঠে ঈদের জামায়াত হয়েছে। উনি ভদ্রমতো একটা পাঞ্জাবি পড়ে ঈদ জামায়াতে গেছেন। নামাজ শেষে মায়ের বাসায় মেয়েসহ খিচুড়ি, মাংস, মিষ্টান্ন দিয়ে নাশতা করে, আমার জন্য নিয়ে এসেছেন, যা আমি লাঞ্চে পেয়েছি। বাবা–মা কাছে থাকার নেয়ামত।

কোভিড টিকা এখন ১২ বছরের ওপরে হলেই নেওয়া যাবে সিদ্ধান্ত এসেছে। আমার ছেলে এ ক্যাটাগরিতে পড়ে এবং আজকেই তার প্রথম টিকা দেওয়া হলো। কোনো সমস্যা হয় ন। আমি খুশি আমার পরিবারের সবাই এখন ভ্যাক্সিনেটেড বলে।
কাজ শেষে সবাই মিলে আরেক দফা মায়ের বাসায়। এ দফা বিরিয়ানি, রোস্ট, কাবাব—কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। ভাইদের মিস করি।

default-image

যেহেতু ঈদ সপ্তাহের মাঝখানে, বন্ধুবান্ধব সপ্তাহান্তে গেট টুগেদার করবে—সবাই ভ্যাক্সিনেটেড। দেশের মতো আমাদের ঈদগুলো কখনো কখনো এ বাড়ি–ও বাড়ি করে কাটে, তবে কোভিডের কারণে আমরা ভীষণ সতর্কতায় থাকি। এ বাড়ি–ও বাড়ি করাটা বিনয়ের সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করি। সেইফটি ফার্স্ট! আশা করি আপনারা সবাই সুস্থ আছেন এবং সতর্কতার সঙ্গে পরিবেশ–পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঈদ উদ্‌যাপন করেছেন।

ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, ‘ও মোর রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ!’ সবার জীবন আনন্দময় হোক।

একই সঙ্গে আরও শুনেছি, ‘ঘুরেফিরে বারেবারে ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়! ঈদ হাসতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। ত্যাগের মহিমা শেখায়!’ তাই আমরা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে, প্রিয়জনের অসুস্থতার বা মৃত্যুর কারণ যেন না হই! সবাই মাস্ক পরুন, উৎসব পালন যেন মৃত্যুর কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকি। সবাইকে ঈদ মোবারক এবং ঈদের শুভেচ্ছা। জানি, বানান ইদ হওয়া উচিত, তবে ঈদ না লিখলে মনে হয় ঈদের গুরুত্বই কমে যায়।

*লেখক: শারমীন বানু আনাম, চিকিৎসক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন