default-image

পৃথিবীতে যেসব বিখ্যাত নদী জীব ও উদ্ভিদ জগৎকে করেছে বৈচিত্র্যময়, দিয়েছে প্রাণের উচ্ছলতা, কোটি কোটি মানুষকে দিয়েছে জীবিকার সন্ধান, প্রসার ঘটিয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের, তেমনি একটি নদী মেকং। দৈর্ঘ্যের দিক বিবেচনায় মেকং পৃথিবীতে দ্বাদশ ও এশিয়ায় সপ্তম। এই নদীটির সঙ্গে আমার সখ্য ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি থেকে। বিগত ২২ বছরে লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড আর ভিয়েতনামের বিভিন্ন প্রবাহ অংশে এই নদীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে অনেকবার। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই মেকংকে নিয়ে কিছু লেখার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

ঐতিহাসিক এই নদীর সঙ্গে আমার প্রেমের উপাখ্যান মূলত শুরু হয় জীবনে প্রথম বিদেশে চাকরির সুযোগ যখন পাই, তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকে। লাওসেই আমার প্রথম বিদেশের কর্মস্থল। এ কারণে এখানেই মেকংয়ের দেখা। তবে মেকংয়ের আদি জন্মভূমি চীন। তাই এর পরিচিতিটা জানতে হলে সংগত কারণে আমাদের যেতে হবে সুদূর চীনের তিব্বতে। কারণ, সে দেশের তিব্বতের মাউন্ট গুয়োজংমুচার লাসাগোংমা মালভূমি অঞ্চল থেকে যে নদীর উৎপত্তি, সেটাই পরে মেকং নামে পরিচিতি লাভ করে।

default-image

শুরুতে বিন্দু বিন্দু বরফ গলা পানি আর অসমতল উপত্যকার অসংখ্য ছোট-বড় পর্বতমালা থেকে নিষ্কাশিত পানির প্রস্রবণকে সাথি করে মেকংয়ের পথচলা। এরপর তিব্বতের অদূরে কামডু উপত্যকায় দীর্ঘতম উপনদী জাকু ও নমকুর সঙ্গে মিলিত হয়ে নাম ধারণ করেছে ‘লানছাং জিয়াং’ বা মেকং নদী। উৎস থেকে বেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম চীনের কিংহাই ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চীন, লাওস ও মিয়ানমারের (বার্মা) ত্রিদেশীয় সীমানার দিকে এর প্রবাহ চলমান। এরপর লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমানা বিভাজন নদী হিসেবে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। যাত্রাপথের প্রথম ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ বেশ বন্ধুর। উঁচুনিচু গিরিপথ, অপ্রতুল প্রশস্ততা, অশান্ত চলার ভঙ্গি—সব মিলে এ অংশের প্রবাহপথকে করেছে খরস্রোতা আর কুহেলিকাময়।

১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করার পর উৎসস্থলের উচ্চতা থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মিটার নিচে আংশিক সমতলভূমির দেখা মেলে মেকংয়ের। তারপর আরও ৩৯৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চীন, লাওস ও মিয়ানমারের ত্রিদেশীয় সীমানা স্পর্শ করে অব্যাহতভাবে পথ চলে লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম পাড়ি দিয়ে হোচিমিন (সায়গন) শহরের দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগরে তার প্রণয় ঘটে।

উৎপত্তিস্থল তিব্বত থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে পাতনমুখ অবধি মেকংয়ের গতিপথের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯০৯ কিলোমিটারের মধ্যে ২ হাজার ১৯৮ কিলোমিটার চীনে এবং অবশিষ্ট ২ হাজার ৭১১ কিলোমিটার লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। মেকংয়ের উৎপত্তিস্থল গড় সমুদ্র তল (mean sea level) থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায়। এই নদীর অববাহিকায় ৭ লাখ ৯৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এলাকার জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য সরাসরিভাবে মেকংয়ের উত্থান-পতনের ওপর নির্ভরশীল।

default-image

মেকংয়ের জলপ্রবাহে উৎসস্থলের যেমন বিপুল অবদান রয়েছে, তেমনিভাবে অববাহিকায় অবস্থিত অন্য দেশগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। এর গতিপথে সারা বছর প্রবাহিত পানির ১৬ শতাংশ চীন, ২ শতাংশ মিয়ানমার, ৩৫ শতাংশ লাওস, ১৮ শতাংশ থাইল্যান্ড, ১৮ শতাংশ কম্বোডিয়া ও ১১ শতাংশ ভিয়েতনাম থেকে যুক্ত হয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে মিয়ানমার ও লাওসের কিছু অংশের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে আসা পানির প্রবাহ দ্বারা। অন্যদিকে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন ও পাকশি অঞ্চলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় লাওসের নামগুম, নামথুন, নামহিনবুন, নিবাংফাই, নি বাংহিয়াং ও সি ডন নদীগুলোর প্রবাহ দ্বারা।

এই এলাকায় মেকংয়ের ডান দিক থেকে আসা থাইল্যান্ডের মুনচি নদীও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সার্বিকভাবে বেগবান করে তোলে মেকংকে। তবে এই বিশাল পরিমাণ পানি ধরে রাখতে পারে না মেকং। সাগরের টানে প্রবাহের পানি থেকে গড়ে ১৬ হাজার ঘন মিটার পানি প্রতি সেকেন্ডে এবং সর্বোচ্চ ৩৯ হাজার ঘন মিটার প্রতি সেকেন্ডে দক্ষিণ চীন সাগরে নিষ্কাশিত হয়ে যায়। প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য এই নদীর যতটা যত্ন নেওয়া দরকার, তার অনেকটাই প্রতিকূল পরিবেশের জন্য হয়ে ওঠে না। খরা, বন্যা আর জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা নদীর সাবলীল পথ চলার ছন্দপতন ঘটিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এত কিছুর পরও দৈর্ঘ্যের মানদণ্ডে এবং প্রকৃতির কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সুবাদে পৃথিবীতে দ্বাদশ, এশিয়াতে সপ্তম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে মেকং।

default-image

প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য আশ্রয়ণ ও লালন-পালনের আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে আমাজান নদীর অববাহিকা প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। যার অবহিত দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এরপরই মেকংয়ের অবস্থান। তবে ১১টি দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নীল নদের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার হলেও এ নিয়ে দ্বিমত থাকায় এই নদীকে এখনো পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর আসনে বসানো হয়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাজানের দৈর্ঘ্য সঠিকভাবে পরিমাপ করলে তা নীল নদের চেয়ে বেশি হবে।

২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী মেকংয়ের অববাহিকায় ৭ কোটি লোকের বসবাস। এ সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ১২ কোটিতে পৌঁছাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এশিয়ায় বা এরও বাইরের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্যের জোগানদাতা বলেও মেকংয়ের সুনাম আছে। শুধু কি মানুষ? না, মানুষ ছাড়াও মেকংয়ের অববাহিকার ২০ হাজার প্রজাতির বৃক্ষ, ৪৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১ হাজার ২০০ প্রজাতির পাখি, ৮০০ প্রজাতির সরীসৃপ ও উভচর প্রাণী এবং ৮৫০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সুতরাং এ নদীকে যেনতেন ভাবার সুযোগ নেই। মেকংয়ের এই সুখ্যাতি নিঃসন্দেহে গোটা এশিয়াবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।

default-image

মেকং শুধু একটি নদীই নয়। অববাহিকাবাসীরা এ নদীকে দেবতাতুল্য মনে করেন। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে বা মনের অজান্তে মেকং এদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। এতটা ভালোবাসার কারণে মেকং যেসব দেশের আশ্রয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে পৌঁছাতে পেরেছে, সেসব দেশের মানুষ আদর করে তাদের ভাষায় এর নাম দিয়েছে এভাবে—চীনে এর নাম ‘লানছাং ঝিয়াং’, লাওসে ‘মে নাম খং’, থাইল্যান্ডে ‘ম্যা নাম খং’, মিয়ানমারে ‘মেগুয়ান মিত’, কম্বোডিয়ায় ‘তনলে মেকং’ ও ভিয়েতনামে ‘ছন তিয়েন জিয়েং’। নামগুলো কী সুন্দর?

১৯৯৬ সালে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে মেকংয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। এরপর আরও অনেকবার আমার সাক্ষাৎ হয়েছে লাওসের সাভানাখেত ও লুয়াংপ্রাবাং প্রাদেশিক শহর দুটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এ নদীর সঙ্গে। পরবর্তী সময় থাডুয়া ফেরিঘাটে, ছায়াবুরি প্রদেশের বান পাকলাইতে, থাইল্যান্ডের মুগ্ধাহান, কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন, কম্পংচাম, ক্রচেহ, প্রেইক তা মেয়াক এবং নেয়াকলুয়াং ফেরিঘাটে। এরপর ভিয়েতনামের হোচিমিন (সায়গন) শহরের দক্ষিণে কাই বে ফ্লোটিং মার্কেটে। যেখানেই গেছি মেকং আর আমার মাঝে সুখ-দুঃখের কথা বিনিময় হয়েছে অনেক হৃদয়ের মায়া নিয়ে। মেকংয়ের অশান্ত হৃদয়ে জমে থাকা হাজার বছরের না-বলা কথাগুলো শোনার লোকের বড়ই অভাব, তাই তার কথা শোনার ও ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছি।

default-image

চীনের মূল ভূখণ্ড পেরিয়ে মেকং যখন চীন, মিয়ানমার ও লাওস আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে, তখন তার গতিপথ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মোড় নেয়। লাওস ও মিয়ানমার সীমানা নির্দেশক নদী হিসেবে ১০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর মিয়ানমার-লাওস-থাইল্যান্ড এই ত্রিদেশীয় সীমারেখায় পৌঁছে রুয়াক নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। তিন দেশের এই মিলনস্থলকে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বা সোনালি ত্রিভুজ বলা হয়। উৎপত্তিস্থল থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত মেকং প্রবাহপথকে অনুসরণ করে মোট পাঁচটি ট্রায়াঙ্গেল বা ত্রিভুজ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে গ্রিন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, এমারেল্ড ট্রায়াঙ্গেল, সিএলভি ট্রায়াঙ্গেল ও সিএইচএলভি ট্রায়াঙ্গেল। এগুলোর মধ্যে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বিভিন্ন কারণে বিশ্বব্যাপী বহুল পরিচিত। নামের শুরুতে গোল্ডেন কথাটি চমকপ্রদ হলেও এর অতীত ইতিহাস মোটেও সোনার মতো খাঁটি নয়। মাদক উৎপাদন, পাচার ও বাজারজাতের তৎপরতায় মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের ৯ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই এলাকাটি মাফিয়া ও চোরাকারবারিদের স্বর্গরাজ্য বলে কুখ্যাতি আছে। তবে অধুনা যৌথ মেকং নদী কমিশনের প্রচেষ্টায় এলাকাটি আস্তে আস্তে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা বলে বিবেচিত হচ্ছে।

লাওসের বকিও প্রদেশ, মিয়ানমারের পূর্ব শানরাজ্য ও থাইল্যান্ডের চিয়াংরাই প্রদেশের ছোট-বড় অসংখ্য দুর্গম পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল গঠিত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক লৌকিক ও অলৌকিক চাঞ্চল্যকর ঘটনার যোগসূত্র। জলদস্যুতা, বাণিজ্য ও যাত্রীবাহী জাহাজ নিখোঁজ, উড়োজাহাজ নিখোঁজ, টহলদার সেনা অপহরণসহ সব রকম ঘটনা ও দুর্ঘটনার উদাহরণ আছে এই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলকে ঘিরে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল মেকংয়ের একটি বিরাট অংশ। তবে এর অতীত ইতিহাসের কারণে কলঙ্কিত হয়ে আছে মেকংয়ের এই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল। এর সঙ্গে মেকংয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে অনেকটাই।

default-image

১৯৯৭ সালের কথা। তখন আমি লাওসের সাভানাখেত শহরেই থাকতাম। মেকংয়ের পূর্ব পারে সাভানাখেত আর পশ্চিম তীরে থাইল্যান্ডের মুঘধাহান সিটি। বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট সেকেন্ড হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় জাতীয় মহাসড়ক থার্টিন সাউথের পুনর্নির্মাণ কাজের দায়িত্বে উপদেষ্টা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতাম। আমি তখন মেকংয়ের তীরে দেখেছি কতটা উদ্দীপনা নিয়ে সেখানকার মানুষ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে বাংফাই নামে একটি উৎসব পালন করে। এই উৎসবে বাঁশের ভেতর বারুদ ভর্তি করে রকেট তৈরি ও এই রকেটগুলো আকাশের দিকে ছোড়া হয়ে থাকে।

প্রতিবছর গ্রীষ্মের দাবদাহে ধরণি যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, চাতক যখন এক ফোঁটা পানির জন্য অহর্নিশ আকুল আবেদন জানায় প্রভুর দরবারে। অবারিত ফসলি জমি যখন ফেটে চৌচির হয়ে যায়, কৃষক পানির অভাবে হয়ে যায় দিশেহারা, তখন এই অঞ্চলের মানুষ তাঁদের পূর্বপুরুষদের অনুকরণে ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার সমীপে প্রার্থনা করে বৃষ্টির আশায়। পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও লাওসের জনসংখ্যার একটি বিপুল অংশ বিশ্বাস করে, আকাশে মেঘের দেবতা প্রাণিজগতের দুঃখ-কষ্টকে ভুলে ঘুমিয়ে থাকেন এ সময়। তাই তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দেবতাকে জাগিয়ে তোলার জন্য মেঘমণ্ডলীকে লক্ষ্য করে অগণিত বাঁশের তৈরি রকেট আকাশের দিকে নিক্ষেপ করা হয়। লোকজন বিশ্বাস করেন, এতে দেবতার ঘুম ভেঙে যাবে। তিনি মানুষ ও সৃষ্টির দুঃখ-কষ্ট দেখতে পাবেন এবং দয়া করে মেঘমণ্ডলীকে ভূপৃষ্ঠের দিকে পাঠিয়ে দেবেন। ফলে বর্ষণের সূচনা হবে। বর্ষণে ধরণিতল সিক্ত হয়ে শস্য শ্যামল করে তুলবে বিরান ভূমি, আনন্দের ফোয়ারা বইবে আপামর জনতার হৃদয়ে।

default-image

স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় জনগণ এ উৎসবের আয়োজন করে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশগ্রহণ করেন। গ্রাম-শহর ছাড়াও এ উপলক্ষে মেকংয়ের প্রবাহপথের দুই তীরে লাওস ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় রকেট ফেস্টিভ্যাল, স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় বাংফাই। এ উপলক্ষে দারুণ প্রতিযোগিতা হয় রকেট তৈরির শৈল্পিক দিক ও উড্ডয়নের সক্ষমতা নিয়ে। আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয় বিজয়ীদের মাঝে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

দেখেছি মেকংয়ের তীরের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের বড় শহরগুলোর পাশে নদীতে প্রতিবছর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয় পর্যায়ে নৌকাবাইচের জাঁকজমকপূর্ণ মহা উৎসব। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন নৌকাবাইচকে উপলক্ষ করে কীভাবে হাজার হাজার নারী-পুরুষ দর্শকের সমাগম হয়। এখানে নারীরা শুধু দর্শক নন, তাঁরা নিজেরাও নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকেন। নৌকাবাইচকে থাই ও লাও ভাষায় বলা হয় ‘রুয়া খ্যাং’ আর কম্বোডিয়ার ভাষায় ‘প্রনাং তুক’। এ উপলক্ষে কম্বোডিয়াতে তিন দিন সরকারি ছুটি থাকে। প্রথা অনুযায়ী রাজা স্বয়ং এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা বিনিময় ও বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

default-image

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে নারী স্বাধীনতার বা তাদের নিজ সত্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে বা লড়াই করতে হয়নি। এখানে নারী স্বাধীনতা অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারীরা এখানে স্বাধীনভাবে ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তায় চলাফেরা করতে পারেন। সেটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, গৃহকর্ম বা ফসলের জমিতে হোক, নারীরাই এখানে মূল চালিকাশক্তি। এই দেশগুলোতে বিয়ের পর বরকে মা-বাবার বাড়ি ত্যাগ করে কনের বাড়িতে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকতে হয়। এটাই এদের সমাজে সর্বজনস্বীকৃত প্রথা। আমাদের দেশে মেয়েরা যেমন জানেন, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে, এখানে কিন্তু ব্যাপারটা একেবারে বিপরীত। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী বা কৃষক, যে পেশারই বর হোন না কেন, সবার জন্য একই নিয়ম।

মেকংয়ের জলপথে চলাচলের সুবিধাকে হাতে পেয়ে এ এলাকার দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক স্বর্ণযুগের সুবিধা ভোগ করছে। মেকং নদীপথে গভীর সমুদ্রের ভারী মালবাহী জাহাজ চলাচলের সুবিধা না থাকলেও মাঝারি ও হালকা নৌযান চলাচলে রয়েছে সুবিধা। কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন কোনো সমুদ্রের তীরে নয়। তারপরও নমপেনকে পোর্ট বলা হয় শুধু মেকংয়ের কারণে। হালকা মালবাহী কিছু জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে ভিয়েতনাম পাড়ি দিয়ে নমপেন পর্যন্ত আসতে পারে। আর অভ্যন্তরীণ ছোট ও মাঝারি নৌযান তো সারা বছরই প্রায় মেকংয়ের অনেক এলাকায় চালু থাকে। আজ থেকে ১৫ বা ২০ বছর আগে লাওস ও কম্বোডিয়ার সড়কপথের অবস্থা একেবার বেহাল ছিল। তখন আমরাও নদীপথে হাইস্পিড বোটে প্রকল্পের কাজ দেখতে যেতাম। সময়ের সঙ্গে এ অবস্থার এখন আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সড়কপথের ব্যাপক উন্নয়নের কারণে বাহারি সাজসজ্জার হাইস্পিড বোটগুলো আজকাল অনেকটাই অলস সময় কাটাচ্ছে বা চলার পথ পরিবর্তন করেছে।

default-image

নমপেন শহরের সংলগ্ন পূর্ব-দক্ষিণে তিনটি নদী যথা তনলে ছাপ, তনলে মেকং ও তনলে বাছাকের সংগম বা মিলনস্থল। প্রকৃত অর্থে এখান থেকেই মেকং ডেলটার সূচনা, যার যবনিকাপাত ঘটেছে হোচিমিন বা সায়গন শহরের দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগরে। কম্বোডিয়ার সিয়েমরিপ প্রদেশ থেকে সৃষ্ট তনলে ছাব বা গ্রেট লেক মেকং নদীর প্রবাহে পানি সংযোগের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস। তনলে ছাবের একটি ব্যতিক্রমী চরিত্র রয়েছে, যা অনেকের কাছে অবাস্তব বলে মনে হলেও এর সত্যতার প্রমাণ লেখক নিজেই। প্রাকৃতিকভাবে সব বড় হ্রদ ও নদীপ্রবাহের গতিপথ একমুখী হয়ে থাকে। অর্থাৎ স্রোত সারা বছর উজান থেকে ভাটির দিকে বেগবান থাকে। কিন্তু তনলে ছাপ নদীর বেলায় তা আর সঠিক থাকেনি। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত এই নদীর প্রবাহের পানি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়ে নমপেন শরের অদূরে মেকংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু জুন থেকে কয়েক মাসের জন্য মেকংয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় তনলে ছাপ নদীর প্রবাহ বিপরীতমুখী হয়ে যায়। অনেক পর্যটক এই বাস্তবতা অবলোকনের জন্য দূর দূরান্ত থেকে এখানে মেকং ও তনলে ছাব নদীর এই পরিবর্তন দেখতে আসেন।

২০০০ সালের ২৫ ডিসেম্বর কম্বোডিয়ার জাতীয় মহাসড়ক ৭-এর পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ওই প্রকল্পের কনসালট্যান্টদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সড়কপথে সে সময় যাত্রা নিরাপদ না হওয়ায় টিম লিডার লি শ্যালেস, আবাসিক প্রকৌশলী ফ্লানাগান ফ্রাঙ্ক, ব্রিজ ডিজাইনার নিক ডাইকিন ও আমি হাইস্পিড বোটে মেকং নদী হয়ে ওই রাস্তার শেষ প্রান্তে অবস্থিত ক্রচেহ শহরে গিয়েছিলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস্থলের পাশের শহরে রাত যাপন করার জন্য। সময় একটু বেশি লাগলেও নদীপথে প্রায় সাত ঘণ্টার যাত্রাপথ পুরোটাই ছিল উপভোগ্য। ৬০ জন যাত্রী বহনকারী লাক্সারি হাইস্পিড বোটটি যাত্রাপথে চার জায়গায় বিরতি দিয়েছিল।

default-image

প্রতিটি বিরতিস্থলে নানা ধরনের স্থানীয় খাবারের সমাহার দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়েছিল। তবে অনেক কিছুই আমার খাওয়ার উপযোগী ছিল না। যেমন পিঁপড়া ও তার ডিম, সাপের স্যুপ, তেলাপোকা ফ্রাই, ইঁদুর গ্রিল, জলে বসবাস করে এ জাতীয় নানা পোকামাকড় ভাজি, গরুর মাংসের শুঁটকি ভাজা ইত্যাদি। তবে বাঁশের চোঙ্গে পাক করা স্টিকি রাইস, তকদহ কোহ (স্থানীয় একটি ফলের নাম) ও কিছু মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য বেশ মজার ছিল।

যাত্রাপথে নদীর দুই ধারের দৃশ্য ছিল মন কেড়ে নেওয়ার মতো। শিশুদের সাঁতার কাটার দৃশ্য মনে করে দিয়েছিল ছোটবেলায় ব্রহ্মপুত্র নদে সাঁতার কাটার কথা। শরীরে যৎসামান্য পোশাক রেখে স্নান করতে অভ্যস্ত এখানকার নারী-পুরুষেরা। সুতরাং গোসলে খোলামেলা দৃশ্য দেখে বেশি একটা অবাক হওয়ার কিছু নেই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের এক দিন পর আমরা গেলাম ক্রচেহ শহর থেকে মেকংকে অনুসরণ করে আরও ২০ কিলোমিটার উজানে। লাওসের আতাপু প্রদেশ পাড়ি দিয়ে যেদিক থেকে মেকং কম্বোডিয়ায় প্রবেশ করেছে, সে দিকে। সেখানে সুইট ওয়াটার ডলফিনের একটি সীমিত আবাসভূমি রয়েছে। দেখার ইচ্ছাটা অবদমিত করতে পারলাম না। অনেক সময় অপেক্ষার পর সোনার হরিণের দেখা মিলেছিল বৈকি। এখনো অনেক পর্যটক সেখানে ডলফিন দেখতে যান। রাজধানী নমপেন থেকে প্রায় ৩৭৫ কিলোমিটার দূরে ওই জায়গাটি।

default-image

২০০৪ সালে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন থেকে মেকং নদীপথে ঝিয়াংখোয়াং নামে একটি জায়গায় রাস্তার কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। সে অত্যন্ত ভয়ংকর এক নদীপথের যাত্রা ছিল। চার ঘণ্টার যাত্রাপথের দুই-তৃতীয়াংশ দূরত্বই ছিল দুই ধারে ও নদীর তলদেশে প্রকাণ্ড সব পাথরের সুচালো ভগ্নপিণ্ড। নদীতে সে সময় পানি কম থাকায় যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আতঙ্কের। কারণ খরস্রোতা সরু জলপথে যেকোনো সময় নৌকা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল। সড়ক পথে যাওয়ার সুবিধা না থাকায় তখন বিপদের ঝুঁকি নিয়েই লোকজন এভাবে নৌকায় ভ্রমণ করতে বাধ্য হতেন। আমাদের স্থানীয় নৌকাচালক অত্যন্ত দক্ষ থাকায় নিরাপদেই ভ্রমণ শেষ করা সম্ভব হয়েছিল।

২০০৫ সালে যেবার ভিয়েতনামের হোচিমিন বা সায়গন গিয়েছিলাম, তখন শহরের সঙ্গে সায়গন রিভার ক্রুজে মেকং ডেলটা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে কী বিরাট যন্ত্রচালিত বিলাসবহুল নৌকা। এগুলোকে ছোট জাহাজ বললেও বোধ করি ভুল হবে না। নিচতলা ও দোতলা মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় ১২০০ লোকের বসার ও খাওয়ার ব্যবস্থা সেখানে। এর আগে এমন আয়োজন দেখার সুযোগই হয়নি আমার জীবনে। হরেক রকমের খাবার, নাচগান কোনো কিছুরই কমতি নেই। শুধু চাই অর্থের জোগান। পরদিন আমি গিয়েছিলাম কাই বে ফ্লোটিং মার্কেট দেখতে। এখান থেকেই যত রকমের সামুদ্রিক খাবার সারা ভিয়েতনামে সরবরাহ ও দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়।

২০০৯ সালে লাওসের লুয়াং প্রাবাং প্রাদেশিক শহর হয়ে পাক্লাই, কেন্থাও থাই বর্ডার পর্যন্ত এডিবির সাহায্যপুষ্ট একটি প্রকল্পের রাস্তার কাজ দেখতে গিয়েছিলাম। পথে মেকং পাড়ি দিতে হলো থাডুয়া ফেরিঘাটে। তখন আগস্ট মাস। খরা মৌসুম পেরিয়ে সবে বর্ষার জলে যৌবন ফিরে পাওয়ার উন্মাদনা চলছে মেকংয়ের। ছোট ফেরি নৌকা, মাঝে মাঝে স্রোতের টানে ঘাট ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছিল। শেষমেশ কিছু বিলম্বে হলেও নিরাপদে তীরে পৌঁছা গেল। তখন দেখেছিলাম মেকংয়ের কী দুর্নিবার গতি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, একই ঘাটে সে বছরই ১৪ ডিসেম্বর যখন পার হলাম, তখন নদীর করুণ অবস্থা দেখে নিজের কাছেই খুব খারাপ লেগেছিল। কী জীর্ণ চেহারা মেকংয়ের! পানি একেবার তলানিতে চলে গেছে, সারা শরীরে কোনো উত্তাপ নেই। স্রোতের নেই কোনো তোলপাড়। দুই ধারেই অনেকটা পথ হেঁটে তবেই ফেরিতে ওঠা যায়।

পরের বছর ৮ জানুয়ারি (২০১০) লাওসের বান পাকলাইতে মেকংয়ের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে বড়ই কষ্ট পেয়েছি। এত সব দুর্ভোগের পেছনে কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, যে মানুষের জন্য মেকং জীবনভর নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে, সেই মানুষেরাই এর বুকের ওপর নানা জায়গায় বাঁধ তৈরি করে এর বিভিন্ন অংশের প্রবাহকে করেছে মৃতপ্রায়। মেকংকে এই দুর্দশায় পড়তে হয়েছে মূলত চীনের কারণে। সে দেশে ইতিমধ্যে মেকংয়ের ওপর পাঁচটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। যেমন নুওজাডু, ঝিয়াওওয়ান-২, মানোয়ান, ডাচেসান ও ঝিংহং। থাইল্যান্ডে উবোল রাথানা বাঁধ মেকংয়ের জন্য একটি বিপত্তি বটে। এ ছাড়া, চীন, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াতে আরও ১২টি বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, ওই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মেকং নদী তার অতীত গৌরব হারিয়ে একদিন হয়তো ছোট একটি জলবাহী নালার রূপ ধারণ করতে পারে।

তবে সুখবর হলো, ১৯৯২ সালে গ্রেটার মেকং সাব-রিজিয়ন (জিএমএস) অর্থনৈতিক সমন্বয় কর্মসূচি সৃষ্টি হওয়ার পর মেকং অনেকটা আশান্বিত তার ভবিষ্যৎকে নিয়ে। আমরা জানি বর্ষাকালে মেকং তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অধিক পানি আশপাশের এলাকা থেকে তার প্রবাহে মিশে যাওয়ায়। এর ফলে অনেক এলাকায় বন্যার সৃষ্টি করে মানুষ ও জানমালের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়। এ জন্য মেকংকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। মেকংকে স্বাভাবিক প্রবাহের সুযোগ দিলে এবং নিয়মিত তার তলদেশের পলি ও আবর্জনা মুক্ত রাখলে বন্যা সমস্যার অনেকাংশে লাঘব হবে, তা বলাই বাহুল্য।
...

প্রকৌশলী সরদার সায়িদ আহমেদ: ইন্টারন্যাশনাল ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ার, কেসিআই, রোড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট, মিনিস্ট্রি অব পাবলিক ওয়ার্কস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইডিএ ক্রেডিট, নমপেন, কম্বোডিয়া। ইমেইল: <sardarsahmed@hotmail.com>

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0