default-image

ডিসেম্বরের এক রোদেলা দিনে গবেষক তুহিন বসে আছে আমেরিকার ভার্জিনিয়া শহরের বাসায় জানালার পাশে। বসে বসে দেখছে ঝিরিঝিরি বরফের শ্বেত সৌন্দর্য। আজকে ওর ছুটি। মাত্রই তিন লেয়ার কফি বানিয়ে বসেছে, হাতের মাঝে আরামদায়ক উষ্ণতা। মাঝেমধ্যে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কুকুর নিয়ে বিদেশিনী অথবা গল্পে মশগুল কোনো জুটি। অসম্ভব সুন্দর একটা দিনের শুরু। কফি শেয়ার করে খেতে ইচ্ছা করছে ওর খুব কারও সঙ্গে, সব সময় করত। কিন্তু মাস কয়েক আগে আলাদা হওয়া সাবেক বউ অসম্ভব খুঁতখুঁতে ছিল এসব ব্যাপারে। একই কাপে চুমুক দিয়ে কফি খাওয়ার কথা সে চিন্তাই করতে পারত না। ওর অন্য সব ত্রুটি তো ছিলই। নাক ডাকে বলে একসঙ্গে ঘুমানো যাবে না, আরও কত কী।

ক্যারিয়ারের দিক থেকে সন্ধ্যাতারার মতো জ্বলজ্বল করছে তুহিন কিন্তু কত দুঃখে চলে এসেছে নতুন এ বাসায়। অবশেষে বুক ভরে নিশ্বাস তো নিতে পারবে। এক জীবনের অনেকটুকু কেটেছে তার একা থাকার শঙ্কায় অথচ কী নিশ্চিন্তে কাটাচ্ছে ও কতগুলো মাস। সব সময় মাইক্রোস্কোপের নিচে থাকা আর গঞ্জনা শোনা কঠিন কাজ। অবশেষে নীলাঞ্জনা, ওর ১০ বছরের পুরোনো সাথি জানিয়েছিল তার অন্য কাউকে পছন্দ।

সম্মানজনক বিচ্ছেদ চায় সে। কষ্ট হয়েছে অনেক, তবু এখন মনে হয় তুহিন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। এত দিন মনে হতো নিজের সবকিছু খারাপ, হয়তো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা নেই। এখন একটু একটু নিজেকে ভালোবাসতে শিখছে। শূন্যতা কমে আসছে।
একাকী জীবনে অনেক মজার ঘটনাও ঘটছে ওর মাঝেমধ্যেই। সহকর্মীরা এর-ওর প্রস্তাব নিয়ে আসছে। বিদেশিরা ‘ই হারমোনি’ নামক ওয়েব সাইট আর দেশিরা ‘শাদি ডটকম’-এ যোগাযোগ করতে বলছে। ও হাসে মনে মনে। এত সহজে নতুন কাউকে বিশ্বাস করে নতুন জীবন শুরু করা অসম্ভব। তদুপরি কোথায় যেন হারানো কোনো ভালো লাগা সুর বেজেছে মনে মনে, কেউ জানে না ও ছাড়া। সংসারজীবনে থেকে বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পরও গুরুত্ব দেয়নি ও সে সুর। কী লাভ? এক জীবনের কতটাই-বা নষ্ট হবে?

বিজ্ঞাপন
default-image

এর মাঝে ফেসবুকে কেয়া এবং আর ও কিছু বন্ধু মিলে বাংলাদেশের ব্যাচমেটদের নিয়ে একটা পেজ খুলেছে। ওকে কেয়া অ্যাড হতে বলেছে। ছোটবেলার বান্ধবী বলে কথা। তুহিন গেল দেখতে পেজটা। কত রংবেরঙের সহপাঠী। নিজের একটা ছবিসহ ছোট্ট পরিচয় দিল ও। অবশ্যই মেয়ে সহপাঠীদের তুলনায় ওর জনপ্রিয়তা কম। তবে ১০ বছর পর আনায়া যোগাযোগ করল ওর সঙ্গে তিন মাস আগে। আনায়া, ওর সহপাঠী, মনের কোণে বেজে ওঠা পাহাড়ি সুর। ওর মেসেজটা ছিল, ‘কিরে তুহিন, এত বছর পর উদয় হলি কোথা থেকে রে ফাজিল? কত মেয়ের মাথা খেয়ে এখন ভার্জিনিয়াতে পালিয়েছিস না রে অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর?’

একদিন নীল শাড়ি পরে, চুলে নীল গোলাপ গুঁজে ক্যাম্পাসে এসেছিল আনায়া। অনেকক্ষণ গল্পের পর একটা চিঠি দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল ও। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর, ওই স্বপ্নচোখে তাকিয়ে কাটাতে পারি আমি হাজার বছর, ওই বুকে মাথা রেখে হৃৎস্পন্দন শুনে আমি কাটাতে পারি হাজার বর্ষা রাত, ওই হাসিতে ভুলে যেতে পারি সব দুঃখ জীবনের। তুমি কি কখনোই বুঝবে না?’

আনায়ার পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করতে সাত সেকেন্ড লেগেছে ওর। মনে পড়ে গেল কলেজের সেই আনন্দের দিনগুলো। অতিরিক্ত স্পিডে গাড়ি চালানো, এক সিগারেট থেকে আরেক সিগারেট ধরিয়ে চেইন স্মোকার হয়ে বন্ধু মহলে প্রশংসা কুড়ানো, যারা প্রেম করে হাবুডুবু খাচ্ছে, তাদের প্রেমসাগর বলে হাসাহাসি আর মেয়েদের শুধু বন্ধু হিসেবে দেখা। কোনো সম্পর্কে না জড়ানো কারণ মা-বাবার চিরবাধ্য ছেলে তাদের মনে দুঃখ দিতে পারবে না। পড়াশোনা করেছে খুব মন দিয়ে। কারণ, একজন নামীদামি গবেষক সে হবেই হবে, এটা ছিল আজীবনের স্বপ্ন। তবে মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা আর পেঁয়াজু, মুড়ি, চানাচুর খাওয়া, অকারণ হাসাহাসি আর সবকিছুতেই কী মজার বয়স তখন। আনায়া গান গাইত কলেজে, সেই কারণে প্রথম খেয়াল করেছে ওকে তুহিন। ও কিন্নর কণ্ঠে যখন গাইত ‘মেঘলা মেঘলা এই দিনে তোমায় পড়েছে মনে, সারা দুপুর বসে থাকি, কখন যে চুপিসারে আসবে’, মেঘমেদুর কোনো দিনে বা ‘দেয়ালে দেয়ালে, খেয়ালে খেয়ালে, ফিরে তুমি আর আসবে না বুঝি, বলো না কেন তুমি বহুদূর’, তখন মনটা একটু উদাস হতো ওর কখনো-সখনো, তবে মনের খেয়ালকে গুরুত্ব দেওয়ার বয়স মনে হয় তখন ছিল না। তবে মাঝেমধ্যে আনায়া একা হাঁটতে চাইত ওর সঙ্গে, নতুন কিছু রেঁধে খাওয়াতে চাইত তুহিনকে। বন্ধুত্বের মধ্যে এতটুকু আবদার একটু বেশি বেশি মনে হতো তুহিনের। অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে একটু কি কালো ছায়া পড়ত সুন্দর মুখটাতে? তারুণ্যের আনন্দে ভাবার সময় হয়নি ওর। কলেজের শেষাশেষি স্কলারশিপ হয়ে গেল আমেরিকায় আসার তুহিনের।

default-image

একদিন নীল শাড়ি পরে, চুলে নীল গোলাপ গুঁজে ক্যাম্পাসে এসেছিল আনায়া। অনেকক্ষণ গল্পের পর একটা চিঠি দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল ও। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর, ওই স্বপ্নচোখে তাকিয়ে কাটাতে পারি আমি হাজার বছর, ওই বুকে মাথা রেখে হৃৎস্পন্দন শুনে আমি কাটাতে পারি হাজার বর্ষা রাত, ওই হাসিতে ভুলে যেতে পারি সব দুঃখ জীবনের। তুমি কি কখনোই বুঝবে না?’ এত দিনে মনে হয়েছিল হয়তো আনায়াই হয়তো তুহিনের আত্মার সাথি। ভালো লাগাটা ভালোবাসায় রূপ নেওয়ার আগেই সেবার বাসার গিয়ে দেখল তুহিন ওর বিয়ের কনে পছন্দ করা শেষ, বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আনায়ার চিঠিটা সযত্নে তুলে রেখে হৃদয়ে চিরবাধ্য তুহিন মা-বাবার পছন্দেই বিয়ে করে চলে এল ভার্জিনিয়ায়। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ কেউ দেখেনি।

default-image

বিয়ের পর অনেক চেষ্টা করেছে একটু ভালোবাসা পেতে যান্ত্রিক জীবনে, পায়নি। পরে বুঝেছে ও আসলে এত মেয়ের অতি আগ্রহ আর আদরের তুহিন নিজের বউয়ের মন ছুঁতে পারেনি।

পরের কয়েক মাস বেশ কয়েকবার আনায়ার সঙ্গে কথা হয়েছে ওর। আগের মতোই গান গায়, নিজেও গবেষক, আমেরিকাতে একটা কনফারেন্সে আসবে সহসাই। সে-ও ডিভোর্সি। দুটা বাচ্চা একা বড় করছে। কারণ, ওরা কেউই আনায়ার সাবেক স্বামীর মন ভরাতে পারেনি। সে চলে গেছে নতুন জীবন গোছাতে। তবে অনেক কথনে তুহিন টের পায় আনায়া এখনো অনেক কেয়ার করে ওকে। কিন্তু এক সাগর দুঃখ পেয়ে মানুষকে বিশ্বাস করার ক্ষমতা হারিয়েছে ও। আনায়া যখন তুহিনের ঠিকানা চাইল, দিল তুহিন কিন্তু জানতে চাইল না কবে এবং কোন স্টেটে আসবে ও। শুধু আনায়া যখন কাঁদে ফেসটাইমে, তুহিনের মাঝেমধ্যে মনে হয়, ওই চোখের পানি ও মোছাতে চায়। বলেনি ও, যা সম্ভব না, বলে কী লাভ সেটা।

বাসার সামনে এমন সময় একটা ট্যাক্সি এসে থামল। তারপরই ডোরবেল বাজল। দরজা খুলে তুহিন দেখল নীল শাড়ি পরা নীল গোলাপ চুলে গোঁজা ১০ বছর আগের আনায়া যেন ওর সামনে দাঁড়ানো, শীতে কাঁপছে। মাথায় সাদা বরফকুচি। বলে বসল, ‘গাধা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবি না ভেতরে আসতে দিবি? নাকি ঠান্ডায় মারা যাই চাস?’ তুহিন বসতে দিল আনায়াকে, ঘরের উষ্ণতা বাড়িয়ে নীল চাদর জড়িয়ে দিল আনায়ার গায়। সব অবিশ্বাস নিমেষে উড়ে গিয়ে কোথা থেকে গভীর ভালোবাসা ওর হৃদয় দখল করল। বলল সে, ‘আনায়া, তুই তো গান গাস অনেক। তোর চিঠির উত্তর গানে গানে দিলাম আজকে।’ স্টেরিও সিস্টেমে বেজে উঠল, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায় দেখতে আমি পাইনি’। ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া আনায়ার অনিন্দ্যসুন্দর মুখে তাকিয়ে তুহিন বলল, ‘বউ না হওয়া পর্যন্ত তোকে ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত দেখিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলা হলো জানো।’

default-image

দুই বছর পর আজকে তুহিন আর আনায়া বেড়াতে বের হয়েছে। আনায়ার চোখে মেঘ জমেছে, একটু পরই নামবে বর্ষা যেন। স্কাই ডাইভিং বা প্যারাস্যুটিং করবে তুহিন বলেছে। আনায়া কিছুতেই যেতে দেবে না, তবু তুহিন যাচ্ছে। প্লেন পর্যন্ত গিয়ে কী এক অমোঘ মায়ায় ফিরে এল সে বউয়ের কাছে। আজকে চোখের পানি মুছিয়ে বলল তুহিন, ‘বউ, তোকে কোনো দিন ছেড়ে যাব না। আমি পারব না।’ ফেরার পথে গোধূলির আলোয় চরম ভালো লাগার ক্ষণে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফেরার পথে তুহিন শুনছে আনায়ার গান, ‘ভালোবেসে যদি সুখ নাহি, তবে কেন, তবে কেন মিছে ভালোবাসা।’

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন