বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকদের ওপরে হামলা-মামলা-নির্যাতনের এ চিত্র আমাদের জনপদে নতুন নয়। অতীতেও সংবাদমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় কড়া নজরদারি সীমাহীন দুর্বৃত্তায়নে পৌঁছেছিল, বর্তমানে সেই চিত্র যে আরও ভয়াবহ একটি প্রতিবেদনের তথ্যে সেটি আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্টিকেল-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত) ২৯১ জনের বিরুদ্ধে মোট ১৪৫টি মামলা করা হয়। যার মধ্যে ৬০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৩৪টি মামলা হয় এবং ৩০ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিজিটাল আইনে হওয়া মামলাগুলোর তিন-চতুর্থাংশের বেশি সরকার, সরকারি দলের লোকজন এবং সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্যের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, এ নয় মাসে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়ে সমালোচনাধর্মী সংবাদ প্রকাশের কারণে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের ১০ জন সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। (টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদন-নভেম্বর, ২০২০)

পরিতৃপ্তি এটুকুই যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাকা প্রেস কনফারেন্স বর্জন করেছেন সাংবাদিকেরা, দাঁড়িয়েছেন সহকর্মীর পাশে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে। এ সমব্যথিতার ভাগীদার বাড়ুক এবং তা দীর্ঘসূত্রতা লাভ করুক, সে প্রত্যাশাই করি।
default-image

সুতরাং, রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে জনসাধারণের ওপর অদৃশ্য খড়্গ সব সময়েই ঝুলছে। এ কথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না যে রাষ্ট্র দুর্নীতি দমনে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তথা যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অপারগ বিধায় জনগণের টুঁটি টিপে ধরাটাই সহজ ও উত্তম পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর সে কারণেই সংবাদমাধ্যমকে তাঁরা টার্গেট করেছে, তাঁরা ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’–এর নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। সচিবালয়ের তত্ত্বাবধানে এ সাংবাদিক নির্যাতনের জঘন্য ঘটনাটি আরও একবার জনসমক্ষে সপাটে জানান দিল, আমলাতন্ত্রের কাছে আমজনতা কত অসহায়!

অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ কতটা শক্ত ভিতের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে আর কতখানি রাষ্ট্রীয় তথ্য গোপনীয়তার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে, সে বিষয়টি নিয়েও আলোচনার দাবি রাখে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’, যা লর্ড কার্জনের ভারতবর্ষের শাসনামলে প্রণীত হয়েছিল। কয়েক দফায় সংশোধিত হয়ে ১৯২৩ সালে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট জারি করা হয়। এ আইনের দুটি দিক রয়েছে—১. গুপ্তচরবৃত্তি এবং ২. সরকারের গোপন নথি ফাঁস। তবে এই আইনের কোথাও উল্লেখ নেই যে সরকারি ‘গোপন’ নথি জনগণের স্বার্থে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা যাবে না। এও প্রমাণ করাটা খুব যুক্তিসংগত হবে না যে রোজিনা সরকারের কোনো গোপন নথি ফাঁস করার হীন স্বার্থেই নথি চুরি করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯–এর বলে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে শুধু সাংবাদিক নয়, যেকোনো নাগরিক সেবাদানসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য চাইলে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান সে তথ্য দিতে বাধ্য থাকিবে।’ তথ্য অধিকার আইন-২০০৯, অধ্যায় দুই, ধারা-৬.৩ (গ)। একই আইনে তথ্য বলতে যেকোনো ধরনের দাপ্তরিক মেমো, পত্র, প্রজ্ঞাপন, বিধি, চুক্তিনামা, অধ্যাদেশ, হিসাবসংক্রান্ত দলিলাদি, ছবি, ভিডিও, প্রকল্প প্রস্তাবনা এবং প্রতিবেদনের ভৌত ও ইলেকট্রনিক ডকুমেন্টকে বোঝানো হয়েছে। তথ্য অধিকার আইনের প্রথম অধ্যায়ের তিন নম্বর ধারায়—‘Act of override’–এ বলা হয়েছে, ‘তথ্যপ্রবাহের অবাধ নিশ্চয়তা প্রদান তথা জনসাধারণের তথ্য প্রাপ্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব আইন খারিজ বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং এ আইনটিই ওভার রুল করিবে।’ আপনারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি এর আগে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিবিষয়ক সিরিজ প্রতিবেদন করেছিলেন রোজিনা ইসলাম, যা প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছিল।

default-image

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য না নিয়ে তিনি মনগড়া প্রতিবেদন করতে পারেন না। একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি এ তথ্য চাইতেই পারেন এবং তা বিধিসম্মত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কী এমন গোপনীয় নথি, যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশকে তাঁরা (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) আইনের পরিপন্থী মনে করছেন? নাকি সেখানে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার ভয় ছিল? তথ্য প্রদান সম্ভব না হলে তাঁকে আইনানুগ ভদ্র ভাষায় জানিয়ে বিদায় করা যেত।

ঠিক কী কারণে তাঁকে এত দীর্ঘ সময়ে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন অবধি যেতে হয়েছিল, বিষয়টি আশাতীতভাবেই সন্দেহের উদ্রেক করে। একজন নারী সাংবাদিক, দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সিনিয়র রিপোর্টার! এই পরিচয় ঊহ্য রেখেই বলছি, যেকোনো পেশায়ই দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে কোনো মানুষই লাঞ্ছনার শিকার হবেন একটি স্বাধীন দেশে, সভ্য সমাজে এমনটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়, যখন আমরা দাবি করি, ‘আমরা গণতন্ত্রের ধারক-বাহক’ এবং আমরা স্বীকার করি ‘আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’! এহেন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্রেক হলো সচিবালয়ের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ, পলিশড একটি দপ্তরে? যেখানে নেতৃত্ব দেন দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী সন্তানেরা! এ–জাতীয় আচরণ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের কোড অব কন্ডাক্টের অনুকূলে যায় বলে আমার জানা নেই। তবে এটি আমার বিশ্বাস যে এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে শারীরিক নির্যাতন ও মানহানির মামলা করা যেতে পারে। রোজিনা ইসলামের কৃত অপরাধের পরিণতি যদি কারাগারই হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে বাংলা সিনেমার মতো সব অঘটন ঘটে যাওয়ার পরে পুলিশের আগমন ঘটার হেতু কী? তবে কি পাঁচ ঘণ্টা সময় দরকার ছিল রোজিনাকে ফাঁসানোর কল্পনা-জল্পনা করতে? রোজিনার সঙ্গে আপস-রফা করার জন্য টোপ দেওয়া হয়েছিল কি তাঁকে?

কিংবা পূর্বশত্রুতার কারণে (সিরিজ প্রতিবেদনে দুর্নীতি ফাঁস করার অপরাধে) তাঁকে শাসানোর জন্য শূন্য কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়েছিল! এ–জাতীয় প্রশ্ন এখন জনমনে এবং তা খুবই যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক বোধ করি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, টিআইবি পরিচালিত এক গবেষণায় (২০২০ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত) উঠে এসেছে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং বাণিজ্যের কথা। যেখানে স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে করোনা মোকাবিলায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮ লঙ্ঘন করে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি ব্যবহার করেছে মন্ত্রণালয়। সেখানে সিন্ডিকেটের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি, বিভিন্ন হাসপাতালের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দুদকের কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ওই প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিপরীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮–এর ব্যবহার করোনাকালে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। অবশেষে মুখ খুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তাঁর বক্তব্যের নাজুক যুক্তি ঠেলে আবারও কিছু প্রশ্ন জনমনে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। বিশ্বাস করি, অচিরেই সেই ধোঁয়াশা কেটে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে দিনের আলোর মতো।

default-image

পরিতৃপ্তি এটুকুই যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাকা প্রেস কনফারেন্স বর্জন করেছেন সাংবাদিকেরা, দাঁড়িয়েছেন সহকর্মীর পাশে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে। এ সমব্যথিতার ভাগীদার বাড়ুক এবং তা দীর্ঘসূত্রতা লাভ করুক, সে প্রত্যাশাই করি। আদতে আমাদের ভয়ের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা যত দিন সয়ে যাব, যত আমরা নত হব, ততই ভয় আমাদের পেয়ে বসবে। কোনো কিছু বদলাবে না ভেবেই নীরব থাকা মানে অন্যায়কে মৌন সমর্থন জোগানো। অন্তত জানান দিতে হবে, এ অন্যায়! পরিশেষে বলছি, রোজিনা ইসলাম একজন দায়িত্বসম্পন্ন সচেতন মানুষ, একজন সাংবাদিক। সমাজ বিনির্মাণের একজন যোদ্ধা। তাঁর প্রতি কৃত এ আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করছি। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরে সরকারের নজরদারি তথা জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করছি। স্বপ্ন দেখি, এ আঁধার ঘুচবেই একদিন। সব বাধার ঝঞ্ঝা পেরিয়ে আলো ফুটবেই, ভোর আসবেই। একদিন দূর হবেই ভয়ের এই সংস্কৃতি!

*লেখক: সঙ্গীতা ইয়াসমিন, টরন্টো, কানাডা।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন