আলবেনিয়ার ডায়েরি-২

বিজ্ঞাপন
default-image

আলবেনিয়াতে বেশ কিছু জিনিস আমার চোখে পড়েছে যেটা সত্যি আশ্চর্যের এবং অনেকের কাছে হাসির খোরাক মনে হতে পারে। আলবেনিয়ার ভাষায় ‘পো’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘হ্যাঁ’ আর ‘ইয়ো’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘না’। আলবেনিয়াতে আসার পর এক মাস লেগেছে এ জিনিসটিকে আত্মস্থ করতে। সেখানকার মানুষের হ্যাঁ কিংবা না বলার ধরন সত্যি অদ্ভুত।

আলবেনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম হলেও জীবনে ধর্মের প্রভাব সেভাবে চোখে পড়ে না। অনেকে জানেন যে তিনি হয়তো বা মুসলিম বা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু কীভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই কারও। আলবেনিয়ানদের অনেকে কোনোও নির্দিষ্ট ধর্মের থেকে নিজেদের আলবেনিয়ান পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং বাস্তবিক অর্থে আলবেনিয়া বলতে গেলে অনেকটা ধর্মহীন একটি রাষ্ট্র। যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করি তাদের কাছে অ্যালকোহল কিংবা শূকরের মাংস ট্যাবুর মতো বিষয় অথচ আলবেনিয়াতে এ বিষয়ে কারও সেভাবে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ দেখিনি। যদিও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু করে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসনভার ছিল এনভার হোক্সার হাতে। এনভার হোক্সা ছিলেন একজন স্বৈরশাসক এবং কমিউনিস্ট ভাবধারার মানুষ। তিনি আলবেনিয়াতে সব ধরনের ধর্মচর্চা নিষিদ্ধ করেন এবং মসজিদ, গির্জাসহ ধর্মের স্বাক্ষর বহন করে এমন সকল প্রতিষ্ঠানকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে ফেলেন। ফলে দীর্ঘদিন মানুষ ধর্ম চর্চার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এর প্রভাবে দেশটির বেশির ভাগ মানুষের মাঝে সেভাবে ধর্ম সম্পর্কে ধারণা নেই বললে চলে। হোক্সার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯৯০ সালে দেশটি থেকে কমিউনিস্ট শাসন চলে যায়। বর্তমানে অবশ্য দেশটিতে ধীরে ধীরে ধর্মের প্রসার ঘটছে এবং অনেকেই নিজ নিজ ধর্মে ফিরে আসছেন। তুরস্ক এবং কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশ আলবেনিয়াতে বিনিয়োগ করছে, দেশটিতে আবার ইসলাম ধর্মমতের পুনর্জাগরণের জন্য। পাশাপাশি খ্রিষ্টান মিশনারি সংস্থাগুলোও বসে নেই। দেশটিতে বসবাসরত জনসাধারণকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য তারাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

default-image

তুরস্কের অর্থায়নে তিরানাতে দেশটির পার্লামেন্ট চত্বর নামাজগিয়া স্কয়ারে নির্মিত হচ্ছে বলকান অঞ্চলের সর্ববৃহৎ মসজিদ। আলবেনিয়ার স্থানীয় ভাষায় যার নাম ‘জামিয়া ই মাদে তিরানেস’। আলবেনিয়ার প্রায় সকল মসজিদ অটোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্যশৈলীকে অনুসরণ করে নির্মিত। তবে আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে নামাজ পড়তে গেলে যেটা লক্ষ্য করি যে মুসল্লির বেশির ভাগই বয়োবৃদ্ধ, আলবেনিয়াতে সে পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। বয়োবৃদ্ধ নাগরিকদের তুলনায় তরুণ কিংবা মাঝ-বয়সী মানুষের আনাগোনা বেশি মসজিদের নামাজে।

এনভার হোক্সার আলবেনিয়া ছিল আজকের দিনের উত্তর কোরিয়ার মতো। পুরো পৃথিবী থেকে তিনি আলবেনিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন, সর্বক্ষণ গুপ্তবাহিনী দিয়ে মানুষের ওপর নজর রাখতেন। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে সে সময় আলবেনিয়ার বাইরে অন্য কোনো দেশ ভ্রমণ করতে পারার বিষয়টি ছিল এক অবাস্তব কল্পনার মতো। বিদেশি নাগরিকদেরও সহজে আলবেনিয়া ভ্রমণে অনুমতি মিলতো না।

হোক্সা কমিউনিস্ট মতাদর্শের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর থেকে একটা পর্যায়ে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু পদক্ষেপ, যেমন- প্রতিবেশী যুগোস্লাভিয়ার ওপর থেকে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করা, শিল্পায়ন বাদ দিয়ে কৃষিকাজের প্রতি মস্কোর অতিরিক্ত উৎসাহ প্রদানকে হোক্সা ভালোভাবে নেননি। এ টানাপোড়েনের মধ্যে ১৯৬৮ সালে চেকোস্লাভিয়ার সংস্কারবাদী বামপন্থী নেতা আলেক্সান্ডার ডুবেক মানবিক সমাজতন্ত্র স্লোগানকে সামনে রেখে দেশটির শাসন ব্যবস্থায় উদারপন্থী সংস্কার শুরু করেন। ডুবেকের প্রস্তাবিত সংস্কারে জনগণের ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করাসহ এমন কিছু কার্যক্রম ছিল যা সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। সে বছরের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিত্রদেশগুলোর সম্মিলিত সেনাবাহিনী ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে।

default-image

এই আগ্রাসনে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ওয়ারশ প্যাক্টে সই করা সব দেশের অবশ্য সায় ছিল না, যদিও তারা কেউই সোভিয়েত বলয় ত্যাগ করেনি। কিন্তু এনভার হোক্সা ওয়ারশ প্যাক্ট থেকে আলবেনিয়ার নাম প্রত্যাহার করে নেন। আলবেনিয়া সোভিয়েত ব্লক থেকে বেরিয়ে যায়। চীনের সঙ্গে তার সরকারের সুসম্পর্ক থাকলেও একটা পর্যায়ে সে সম্পর্কে ভাটা পড়ে। অন্যদিকে আদর্শগত কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও তিনি সখ্য গড়ে তুলতে পারেননি। তাই তার মাঝে একটা আতঙ্ক কাজ করত যে কোনো সময় আলবেনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা চীন কিংবা ন্যাটোর সামরিক অভিযানের সম্মুখীন হতে পারে। এ জন্য তিনি আলবেনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বাংকার নির্মাণ করেন, মূলত বহিঃশক্তির আগ্রাসন বিশেষ করে পারমাণবিক ও রাসায়নিক হামলা থেকে আলবেনিয়াকে রক্ষা করতে। আলবেনিয়াকে এ কারণে বাংকারের দেশ হিসেবে পরিচিত এবং এক হিসেবে দেখা যায় দেশটিতে প্রত্যেক বর্গমাইলে গড়ে দুইটি করে বাংকার রয়েছে এবং প্রতি চারজন আলবেনিয় গড়ে একটি করে বাংকারের স্বত্বাধিকারী যদিও অনেকগুলো বাংকার ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কোনো কোনো বাঙ্কারকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। ১১ হাজার বর্গমাইলের ছোট দেশ আলবেনিয়াতে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ্যের মতো বাংকার রয়েছে বলে অনেকে দাবি করে থাকেন। সবচেয়ে বড় বাঙ্কারটি রাজধানী তিরানা থেকে সামান্য দূরে লিনজা নামক স্থানে। বাংকারটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ দশমিক ২ মাইল। আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল এ বাঙ্কারটি ঘোরার।

নাদিয়া, এলিফ এবং খাই লি—তিনজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছে গিয়েছিল। স্কুল শেষে কিংবা ছুটির দিনে প্রায় চলে যেতাম তিরানার হার্ট খ্যাত স্কান্দারবেগ স্কয়ারে। কফির পেয়ালার সঙ্গে আড্ডায় কেটে যেত অবসরের সময়। স্কান্দারবেগ আলবেনিয়ার জাতীয় বীর যিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে অটোমানদের বিরুদ্ধে আলবেনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যদিও তার এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে নি। স্কান্দারবেগ স্কয়ারে তার একটি ভাস্কর্য রয়েছে, পাশাপাশি আলবেনিয়ার ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারির অবস্থানও স্কান্দারবেগ স্কয়ারে।

default-image

আমরা চারজন এবং পরে সানিয়া আজিজোভা (আজারবাইজানের) আমাদের এ সার্কেলে সংযুক্ত হয়েছিলেন। ব্লু আই এবং জিরোক্যাস্টার ছাড়া পুরো আলবেনিয়া এক সঙ্গে চষে বেড়িয়েছি। আইজ্যাক থেকে আমাদের জন্য অ্যাকোমডেশন ও কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তিরানার পর আলবেনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর দুরেস। দুরেস মূলত দেশটির বন্দর নগরী এবং আড্রিয়াটিক সাগরের তীরে হওয়ায় শহরটির গঠন ভূ-মহাসাগরীয় শহরগুলোর মতো। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে গ্রিক সাম্রাজ্যের একটি উপনিবেশ হিসেবে এ শহরের গোড়াপত্তন হয়। সে সময় এ শহরের নাম ছিল এপিডামনোস। আনুমানিক ২২৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শহরটি রোমানদের অধীনে আসে এবং এ শহরের নাম রাখা হয় দিরাচিয়াম।

default-image

পরবর্তীতে শহরটি তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ১৯১২ সালে প্রথম বলকান যুদ্ধের পর আলবেনিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর স্বল্প সময়ের জন্য দুরেস দেশটির রাজধানী হিসেবে কাজ করেছে। তিরানা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে দুরেসের অবস্থান। দুরেস মূলত জনপ্রিয় রোমানদের তৈরি একটি থিয়েটারের জন্য, আনুমানিক দুইশো খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এ থিয়েটারটি নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়াও বাইজেনটাইন সম্রাট প্রথম আনাস্তাসিয়াসের সময়ে নির্মিত দুরেস ক্যাসেলটিও পর্যটকদের নিকট বেশ জনপ্রিয়।

*লেখক: শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন