বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মহাবিজ্ঞানী নিউটনের গতিবিদ্যার সূত্রের ব্যাখ্যার শেষের দিকে ঘণ্টা বেজে গিয়ে শেষ হলো আজকের পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস। চক, ডাস্টারসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন আশুতোষ বাবু। ক্লাসের প্রথম সারির দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে থাকা অমূল্যর মনে কয়েকটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। আশুতোষ বাবুর ছোট ছেলে অমূল্য। ক্লাসের ভেতর ‘স্যার’ বলেই সম্বোধন করে বাবাকে, কিন্তু ক্লাসের দরজার বাইরে গিয়ে ওটা হয়ে যায় ‘বাবা’।
এ বড় অদ্ভুত ব্যাপার। ক্লাসের বাকি ছেলেমেয়েরা বেশ মজা পায় এটা দেখে। আরেকটা ব্যাপার হলো, উনি ক্লাসে প্রশ্ন করা শুরু করলে নিজের ছেলেকে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন, তাঁর নিজস্ব নিয়ম ছিল। তাঁর দুরূহ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দেওয়া অসাধ্য সাধন করার মতো। যদিও পরীক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ঠিক বিপরীত মেরুতে। আশুতোষ বাবুর কাছে পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি উচ্চতর গণিতের ক্লাসেরও দায়িত্ব অর্পণ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

টিফিনের খাবার খেতে অমূল্য চলে যেত বাবার কেবিনে। বাকি ছেলেরা যখন টিফিনের লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কেনে, তখন অমূল্য দুপুরের খাবার সেরে কেবিনের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখে আর মনে মনে ভাবে, একটা সময় ছিল, যখন বাসা থেকে ওর জন্য খাবার আসত না। কোনো বন্ধু লাইনে দাঁড়িয়ে ওর জন্য খাবার কিনত। অমূল্যর বাসা থেকে টিফিন না এলে ওর জন্য খাবার কিনত অভি। ক্যানটিনের জায়গাটা আরও একটু বড় হলে ভালো হতো। মাত্র দুই লাইনে দাঁড়িয়ে ওরা বেশ কষ্ট করেই কিনছে। অবশ্য ওখানে একটা বাদামগাছ থাকায় রোদ-বৃষ্টির কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। পেছনের দিকে খুব কাছাকাছির মধ্যে ম্যাডামদের কমন রুম। সেটার ঠিক পেছনে কিছুটা এগিয়ে গিয়েই বাবার রুম বা অমূল্যর টিফিনের ঘর। বাবার রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালেই প্রধান শিক্ষকের রুমের পেছনের জানালা দেখা যায়। যতটুকু বোঝা যায়, হেডস্যার ওনার চেয়ারে বসে আছেন। স্বভাবতই জানালা বন্ধ, ভেতরে এসি চলছে। পুরো স্কুলে এই একটি রুমই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত! অমূল্যর বাবার রুমে এসি নেই কিন্তু রুমটা এমনিতেই ঠান্ডা থাকে। বাইরে হয়তো রোদে খা খা করছে, কিন্তু বাবার রুমে ঢুকতেই সব তাপ-ভাপ নিমেষেই উধাও!

আজকের দুপুরের খাবারে ছিল ভাত, ডাল, তিত করলাভাজি, কোরাল মাছের তরকারি আর লেবু। যাওয়ার সময়ই সঙ্গে করে পরের পিরিয়ডের বই নিয়ে যায় অমূল্য। আজ এনেছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের নোটখাতা। কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছিল মাথায়, সেগুলো বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

আশুতোষ বাবু দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা বা প্রাক–নির্বাচনী ( প্রি-টেস্ট) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রুটিন তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। পাশাপাশি দশম শ্রেণির উচ্চতর গণিতের প্রশ্ন করার দায়িত্বও তাঁর। এটা অবশ্য সব সময়ই তাঁর বাধা রুটিনের কাজ। এ ছাড়া মাধ্যমিক পরীক্ষার বহিঃপরিদর্শক হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান আর উচ্চতর গণিতের পরীক্ষাও তিনিই নিয়ে থাকেন। নিয়মিত সকালে উঠে ঘড়ি ধরে হাঁটতে যাওয়ার অভ্যাস থাকায় আজও তার অন্যথা হয়নি। তারপর বাসায় এসে খাওয়াদাওয়া সেরে গন্তব্যস্থলে রওনা হয়েছেন। দুপুরে পিয়ন যায় বাসা থেকে খাবার আনতে বাবা-ছেলের জন্য। মোবারক আলী বা সুবল চন্দ। মোবারক অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনা-নেওয়া, ঘণ্টা বাজানো, ক্লাসরুমের তদারক—এসব কাজ করে। সুবল ক্যানটিনের দায়িত্ব সামলাতে ব্যস্ত থাকে, ছোট ভাইও সাধনও তার সঙ্গে কাজ করে। বাথরুম আর ময়লা পরিষ্কার করা আরফান মিয়ার এখতিয়ারে পড়ে। তার ভাইয়ের ছেলে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি তাকে এসব কাজে সাহায্য করে।

বাসায় ফিরে সন্ধ্যার সময় চায়ে ডোবানো বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে অমূল্য ভাবে, আজ বাবার কাগজপত্রের মধ্যে প্রি–টেস্টের পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র দেখতে পেলাম! ওই সময় ওর বাবার সঙ্গে কথোপকথন চলছিল অফিসের পিয়ন মোবারকের। যদিও সে পান আর সিগারেট খাওয়ার জন্য টাকা চাইছিল। নানান দুঃখ–সুখের কথাও বলেছিল যা সে বাবার কাছে প্রায়ই বলে। বয়স ৩৫ থেকে ৪০–এর মধ্যে হবে। পরনে একটা কালো প্যান্ট আর নীল রঙের চেক শার্ট, যেটা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। চুনের দাগ লেগেছে কালো প্যান্টের অনেক জায়গায়! প্রায়সময়ই পান চিবোতে থাকলেও আজ আর সে কাজটা করছে না। ক্লাসের সময় হওয়ায় ক্লাসরুমে চলে গিয়েছিল অমূল্য। মোবারকের চোখের চাহনি কেমন যেন অস্বাভাবিক লেগেছিল।

ক্লাসের শেষে অভি এসে বলল, সে অমূল্যর খোঁজে গিয়েছিল তার বাবার রুমে কিন্তু ওখানে কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে এসেছে। নোটখাতাটা দরকার ছিল ওর। আর ফিরে আসার সময় অভি মজুমদার স্যারকে ওই রুমে ঢুকতে দেখেছিল। হয়তো কোনো দরকারে গিয়েছিলেন ওখানে। এমনটা প্রায়ই হয়—স্যার বা ম্যাডামরা ওর বাবার রুমে যান। তাহলে কি দরজা খোলা রেখেই কোথাও চলে গিয়েছিলেন আশুতোষ বাবু? না, এমন তো হওয়ার কথা নয়।

যাকগে, আজকে রাতে জিজ্ঞেস করে নেবে, এমনটাই ভেবে নিল অমূল্য।
সন্ধ্যায় পড়তে বসে পড়ার রুটিনে পরিবর্তন করার কথা ভাবছে পরীক্ষার আগে। ঢিমেতালে পড়ালেখা অনেক হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কপাল পুড়বে কোনো সন্দেহ নেই! কিছু বিষয়ের ওপর সময় বাড়াতে হবে। গণিত, দুটোই—সাধারণ গণিত আর উচ্চতর গণিত, রসায়ন আর বাংলা দ্বিতীয় পত্র। বাংলা ব্যাকরণের খুঁটিনাটি ব্যাপারটা কেমন জানি লাগে! সবকিছুই গুবলেট পাকিয়ে যায়। ওদিকে আবার সামাজিক বিজ্ঞানেও সমস্যা রয়েছে, যেটা গুছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। রুটিনের পেছনে পুরো সময়ই আবার দেওয়া যাবে না। পড়া শেষের দিকে বসতে হবে রুটিন নিয়ে।
যথারীতি আজকের পড়াও শুরু করল বাংলা দ্বিতীয় পত্র দিয়েই! ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধানের নিয়মাবলি পড়তে হবে। সন্ধি বিচ্ছেদেও সমস্যা রয়েই গেছে। এত পড়ালেখার মারপ্যাঁচে বাবার সঙ্গে আর কথা হলো কই?

পরদিন সকালে উঠে রেডি হয়ে স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে কলাবাগানের মোড় পার হওয়ার পর এক বনরুটিওয়ালা বিক্রেতাকে ভ্যান চালিয়ে যেতে দেখল। কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে নিজে নিজেই বলে উঠল, ‘আরে, এটা সাইফুল না? ও আবার কবে থেকে ভ্যান চালানো শুরু করেছে?’ ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ওর সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছিল। এরপর থেকে ওকে আর ওভাবে মনে পড়ে না।

আশুতোষ বাবুর আজ পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস আছে। ব্যবহারিক ক্লাসের ভবন আলাদা। দ্বিতল ভবনের নিচতলায় রসায়নের ব্যবহারিক। ওপরতলায় প্রথম ক্লাসে পদার্থবিজ্ঞান আর দ্বিতীয়টিতে জীববিজ্ঞানের ক্লাস হয়। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় লক্ষ করে দেখলেন, গতকাল আরফান মিয়াকে এদিকটায় ঝাড়ু দেওয়ার কথা বললেও পরিষ্কার করতে ভুলে গেছে। ক্লাসের জন্য যন্ত্রপাতি জোগাড় করে ফেরার পথে আবার ওকে বলতে হবে। ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষকের জন্য আলাদা একটা ডায়াস আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে ক্লাস নেওয়ার কথা!
চলবে...

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন