বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেখতে দেখতে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এল। এবারের পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষার পর বেশ শোরগোল পড়ে গেল। কী নিয়ে? হাসিব, চিন্ময়, রাজীব, রিপন, লিটন, অভি, জয়, মানস, অমিত—সবার মুখে মুখে পদার্থের অঘটন ঘটে যাওয়ার গল্প। তবে সব শুনে অমূল্যের মনে হলো ঘটনার মূল উৎস ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারছে। কে বা কারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। আর প্রশ্নপত্র বরাবরের মতো এবারও করেছিলেন আশুতোষ বাবু। কাজেই বিষয়টা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। অমূল্য বিষয়টা শুনেই আন্দাজ করে নিয়েছে এটা কার কূটকর্ম হতে পারে? মোবারক! ইচ্ছে হচ্ছে একেবারে যদি দল বেঁধে নিয়ে গিয়ে উত্তমমধ্যম দেওয়া যেত! তাহলে শয়তানের উচিত শিক্ষা হতো। আজকে সন্ধ্যায় বাবাকে বিষয়টা জানাতে হবে।

ওই দিন সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে বসেছে। আশুতোষ বাবু চা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছেন আর সঙ্গে মাঝেমধ্যে একটা করে টোস্ট বিস্কুটও চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছেন। অমূল্যের বিস্কুটটা মিষ্টি-সেভয়'স বিস্কুট! বেশ মজা। ইচ্ছে করে পুরো প্যাকেট এক বসাতেই সাবাড় করে নিতে।
অমূল্য,—বাপি, কথা ছিল।
আশুতোষ—হ্যাঁ, বলো বাবা...কিছু বলবে?
শুনলাম, এবার ফিজিকস নিয়ে বেশ গন্ডগোল হচ্ছে।
হ্যাঁ, যা এত বছরে কখনো হয়নি, তাই হয়েছে।
তুমি কিছু আঁচ করতে পারছ?
হ্যাঁ, আন্দাজ করতে পারলেই কি সব সময় সব বলা যায়?
মোবারক কি তাহলে পার পেয়ে যাবে? চুরি কিন্তু ও-ই করেছে!
এতটা জানলে কী করে?
ওর সব সময়ই দৃষ্টি থাকত কোনো কিছু হাতিয়ে নেওয়ায়! যতবারই দেখেছি মনে হতো এই বুঝি তোমার অগোচরে কিছু একটা সরিয়ে নিল।
ও তোমার মনের ভুল!
মানে? ও–ই তো চুরি করেছে!
হ্যাঁ, কিন্তু গরিবের পেটে এভাবে লাথি মারলে কী করে হবে? তা–ও আবার আন্দাজে, শুধু অন্ধ অনুমানে ভর করে!
তাহলে ওকে আজকে ছেড়ে দিলে কালকে আবার চুরি করবে।

শাস্তি দিতে হবে। তবে এমনভাবে যেন তা আশীর্বাদে রূপ নেয়! ঠিক শাসনের খড়্গের মতো যেন নির্মম না হয়। তুমি এসব বিষয় নিয়ে না ভেবে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হলেই ভালো হয়। সামনেই তো টেস্ট পরীক্ষা। সময় কিন্তু বেশি পাবে না।
না, ক্লাসে গেলে সবাই শুধু এসব নিয়েই কথা বলছে প্রতিদিন! আর ভালো লাগে না। ভাবছি, স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দেব।
তা কী করে হবে? প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে তো সমস্যা হবে। অন্তত ওটা ঠিক রেখো। ওখানে যা দেখানো বা পড়ানো হচ্ছে, ওটা পরে আবার হয়তো পরীক্ষার আগে দেখিয়ে দেবে।

ব্যবহারিক পরীক্ষায় থাকে ২৫ নম্বর। বাকি তো রচনামূলক।
বুঝলাম তো কিন্তু ওই নম্বর ছাড়া তো আশির বেশি নম্বর আসবে না। লেটার মার্কস হচ্ছে না! কাজেই যা বলছি মনে রেখো। ক্লাসে অনেকেই বহু কথা বলবে, ওদিকে মনোযোগ না দিয়ে পড়ায় মন রেখো।
‘যথা আজ্ঞা পিতা’ কথাটা মনে মনে বলেই পড়ার ঘরে চলে গেল ও।
অভির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। এক সাথে স্কুলে যাওয়া-আসা, টিফিন পিরিয়ডে মজা করে টিফিন করা। তখন প্রাণের কমিকস বইগুলো ভীষণ জনপ্রিয় ছিল—চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিঙ্কি, রমণ, শ্রীমতী, অগ্নিপুত্র-অভয়, অরণ্য দেব—এই বইগুলো বলতেই অমূল্য পাগলপ্রায় ছিল। একটা কাল রঙের ব্রিফকেস ছিল, খুব সম্ভবত ওর বাবার। ওটা বইভর্তি করা ওর উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল আর সেই কাজে ওকে সহযোগিতা করেছিল অভি। বাজারে এই বইগুলো যে সংখ্যায় পাওয়া যেত, সেভাবে ওর বাসার আশপাশে পাওয়া যেত না। ওদিক থেকে অভির এক ঢিলে দুই পাখি মারা হতো-বই কেনাও হতো আর পড়াও। ওরা দল বেঁধে স্কুল থেকে বাসায় ফিরত আর বেড়াতেও আসত মাঝেমধ্যে। অভি হাসাতে পারত বেশ। ওদের দুজনের বন্ধুত্ব সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণাই ছিল আশুতোষ বাবুর এবং তাঁর সহধর্মিণীর।

চার বছরের বন্ধুত্বে চিড় ধরেনি কখনো। একসঙ্গে স্কুলে যাতায়াত থেকে শুরু করে টিফিন বাক্সের খাবার লেনদেন, পড়াশোনার নোটপত্রেরও আদান-প্রদান, স্কুলের মাঠে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ভাঙা বেঞ্চের পায়া আর টেনিস বল মাঠে নিয়ে গিয়ে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা। আবার পূজার সময়ে অভির কলোনিতে অমূল্যের বেড়াতে যাওয়া—এসব লেগেই থাকত সব সময়।

এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ফলাফল তেমন একটা জানা গেল না শেষ পর্যন্ত! সব আগে যা ছিল তেমনই রয়ে গেল। নির্বাচনী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে সবাই ভীষণ ব্যস্ত। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে সবাই যেমন সপ্তাহ দু-এক বেশ ব্যস্ত ছিল। পরে সব কেমন যেন মিইয়ে গেল। কেরানিরাও বহাল তবিয়তে আগের মতো যার যার কাজ করে যাচ্ছে! মোবারক বা সুবল দুজনেই আগের মতো আশুতোষ বাবুর কাছ থেকে পান-বিড়ির টাকা পাচ্ছে। আরফান মিয়ার ভাইয়ের ছেলের জন্য ঈদে নতুন জামাও করিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারগুলো সবার কাছে স্বাভাবিক ঠেকলেও অমূল্যের অস্বস্তি হতে লাগল। একটা ব্যাপার ওকে বেশ হতবাক করল—এত বড় ঘটনায় আশুতোষ বাবুর নীরবতা! ও নিরন্তর ভেবে যেতে লাগল উনি নীরব কেন? চাইলেই পারতেন বেয়ারাগুলোর সাজার ব্যবস্থা করতে বা আরও খোঁজ নিতে কে করল এ দুরূহ কাজ। কিছুই করতে দেখা গেল না তাকে। এরপর ব্যবহারিক ক্লাসের দায়িত্ব থাকলেও পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ স্বাভাবিকভাবেই উনি অন্য শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করলেন। পিতার এত বড় অপমান পুত্রের কাছে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। অমূল্যের কাছে এটা অপমানের হলেও আশুতোষ বাবুর কাজকর্মে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি বরাবরের মতোই নির্বিকার, ব্যবহারে অমায়িক। অগত্যা অমূল্যও চুপ হয়ে গেল আর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চলবে...

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন