default-image

আলোর মূল্য অন্ধকারেই। এক আলোর মধ্যে আরেক আলোর কোনো মূল্য নেই৷ বিশেষ করে প্রথম আলোটা যদি সূর্যের মতো হয় আর দ্বিতীয় আলোটা যদি প্রদীপের মতো জ্বলে। কিন্তু অন্ধকারে ছোট্ট বাতি শিখাটিই সবার চোখে পড়ে৷ এমনকি জোনাকির আলোও জ্বলজ্বল করে জ্বলে। প্রবাসে ভিন্ন সংস্কৃতির দাপটের কাছে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা যারা করেন, তাঁরা সেই প্রদীপের কাজটিই করেন। অটোয়ায় আশ্রমের মতো কিছু সংগঠন সে রকমই এক একটি প্রদীপ শিখা। এ আলোর শক্তি আছে, আবেদন আছে আমাদের প্রাণের কাছে পূর্ণিমা রাতের মতো যা দেহের শক্তি জোগায় না বটে, কিন্তু পিপাসার্ত হৃদয়কে তৃপ্ত করে, আত্মাকে উচ্ছল করার রসদ জোগায়। এ যে প্রাণের টান, মনের গুপ্ত ভাবের সহজাত বহিঃপ্রকাশ। একে গোপন করে রাখা যায় না। দম বন্ধ হয়ে আসে। সে রুদ্ধশ্বাস থেকে মুক্ত হতেই সুযোগ পেলে বাঙালি মানুষগুলো হাজির হয় বাংলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাতে বাংলা অনুষ্ঠান উপভোগ করার মতো রথ দেখা হয়, আবার অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা হওয়ার পর প্রাণ খুলে কথা বলার মতো কলাও বেচা যায়।

তবে তাঁদের উত্তর প্রজন্মকে সঙ্গে করে সংস্কৃতিচর্চায় একসঙ্গে হতে পারেন না তাঁরা। কারণ, উত্তর প্রজন্ম স্বদেশি সংস্কৃতি দ্বারা সেভাবে পরিপুষ্ট হয়নি। তাই সংস্কৃতিচর্চার রস ও আনন্দটুকু তারা গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু তাদের মন ও মননেও যে তা গেঁথে দেওয়া যায় এবং তারা পূর্ব প্রজন্মের মতোই রস ও আনন্দ লাভ করতে পারে, তার প্রমাণ উত্তর প্রজন্মের কিছু কিছু ছেলেমেয়ে বহুবার রেখেছে বিচ্ছিন্নভাবে। তাদেরকে বিপুলসংখ্যায় আকৃষ্ট করতে না পারার ব্যর্থতা এবং দায়দায়িত্ব পূর্ব প্রজন্মেরই। তারাই বড় হয়ে একদিন হয়তো পূর্ব প্রজন্মকে প্রশ্ন করবে, এ ব্যাপারে যখন দেখবে তাদের ভেতরকার আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক শূন্যতা।
যাহোক, পূর্ব প্রজন্মের হাত ধরে উত্তর প্রজন্মের ছোট ছোট প্রাণোচ্ছল, মেধাবী ও গ্রহণোন্মুখ ছেলেমেয়ে অনেকে অটোয়ায় বিভিন্ন বাংলা স্কুলে ক্ষুদ্র পরিসরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করছে৷ তারা নিজেরাই এবার আশ্রমের ব্যানারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় ওভারব্রুক কমিউনিটি সেন্টারে পূর্ব প্রজন্মের বক্তৃতা এবং কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি গান, ছড়া, কবিতা, একাঙ্কিকা ইত্যাদি পরিবেশন করে উভয় প্রজন্মকে বিনোদিত ও একত্রিত করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টারিয়েল বাংলা স্কুলের ছাত্রী ফাতেমা ইকবাল কবিতা আবৃত্তি করে। এরপর ফেয়ারলি মাল্ট বাংলা স্কুলের একঝাঁক হাস্যোজ্জ্বল প্রাণ—আয়ান, জিসান, নবনীপা, সামারা, সুপ্রভা, শালীন, ফাবিয়া, নুজহাত, সারা, আফরা, আলিনা, ইরিনা, আরমান ও সুহৃদ দুটি কোরাস গান পরিবেশন করে। চার্লস হালস স্কুল থেকে ফাহিমা মাসুদ, মাহিয়া মাসুদ, এমি পল, নীরদেব পল কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি দেশের কিছু কথা পরিবেশন করে। বাংলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস সেন্টার থেকে নৃত্যে অংশ নেয় পিউ, আচল, তাহিয়া, তাম্মি ও প্রমি। এর বাইরে নিজেদের রচনায় একটি একাঙ্কিকা মঞ্চস্থ করে ফিদা আদিব, প্রমি চৌধুরী, অরনী ইকরা, তাম্মী চৌধুরী। আবার কবিতা আবৃত্তিতে থাকে আবিদুর রহমান, কাঞ্চি ও আদিব এবং এ প্রজন্মের শেষ পরিবেশনায় থাকে অরনী ইকরার দেশাত্মবোধক গান।
পূর্ব প্রজন্মের মধ্যে কবিতা আবৃত্তি করে শোনান সুলতানা শিরিন সাজি ও সৌরভ বড়ুয়া। একুশের আলোচনা করেন লেখক রাশেদ নবী, ওমর সেলিম, রাশেদা নেওয়াজ, ড. মনজুর চৌধুরী ও লেখক মহসীন বখত। আবদুল মান্নান মিঠুর সঞ্চালনায় ও গুলজাহান রুমীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং শাহ বাহাউদ্দিন শিশির ও বাংলা স্কুলের শিক্ষক মনিরা মুর্শেদ, আখতার সাঈদা, সেলিমা সিরাজ, ফেরদৌসি আরা বাসারের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত মহান একুশের অনুষ্ঠানটির শেষে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আশ্রমের সম্পাদক কবীর চৌধুরী।
এ রকম অনুষ্ঠান প্রবাসী বাঙালি হিসেবে সবার জন্য গর্বের ও অহংকারের বিষয়। কারণ ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে বাঙালিদের এক হওয়ার জায়গা নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া একেবারে কম। আর প্রবাসের উত্তর প্রজন্ম যেভাবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে শেকড়ের সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি, তাতে তাদেরই অনেকে যখন তাদের সাধ্যমতো এ চর্চা করে, তখন তা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক ও উৎসাহজনক হিসেবে ধরা দেয়। এ রকম প্রয়াসকে তাই সাধুবাদ জানাই হাজারবার।
দুই প্রজন্মের এ রকম বিনিময় অত্যন্ত প্রয়োজন আজ। প্রবাসের প্রেক্ষাপটে তা হতে পারে শুধু দেশীয় সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে। এ বিনিময়ের মধ্য দিয়েই পূর্ব প্রজন্ম তাদের ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার উত্তর প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করবে। আর উত্তর প্রজন্মও তা সাগ্রহচিত্তে গ্রহণ করবে, যতক্ষণ তারা এতে আনন্দের যথেষ্ট উপাদান খুঁজে পাবে।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন