default-image

তখনো সন্ধ্যা নামেনি। কিন্তু ইমার ভয় করছে। ঘুরঘুট্টি, জমে থাকা, নিথর অন্ধকারের মতো ভয়। অন্য দিন এ সময় ইমা ব্যালকনিতে কিংবা সিঁড়িকোঠায় থাকে, খেলায় ব্যস্ত। তির–ধনুক বানায়, ফুটবল খেলে, মার্বেল—অনেক কিছু। কিন্তু আজ ইমা সবার চোখের আড়ালে এসে খাট আর দেয়ালের মধ্যে ওর যে একফালি নিজস্ব জায়গা আছে, তারই আলো-আঁধারিতে বসে ভাবতে চেষ্টা করছে, কোথায় নিয়ে যাবে, কারা নিয়ে যাবে, কেন নিয়ে যাবে এসব। ভাবনার শেষটা কিংবা উত্তরগুলো কোনোভাবেই ধরতে পারছে না ইমা। অসহায়ের মতো শুধু বুঝতে পারছে, কেউ রাতে আসবে। ওর মাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসবে।

সেই দুপুরের পর থেকে কেউ কিন্তু ইমাকে কিছু বলেনি; বরং কাছে গেলেই চুপ করে গেছে সবাই। সবাই বলতে বাবা আর মা। শুধু বিকেলের দিকে একবার মাহবুব ভাই এসেছিল। তখনো তিনজনে মিলে ফিসফিস করে কথা। মা–বাবা দুজনেই মাহবুব ভাইকে পেছনের বারান্দার শেষ মাথায় নিয়ে গেল। মা, আঙুল দিয়ে রাস্তার দিকে দেখাল বারবার। তারপর তাড়াতাড়ি আবার ফিরে এল ঘরের ভেতর। মোটা চশমার ভেতর দিয়ে মাহবুব ভাইয়ের চোখ এমনিতেই বড় দেখায়, আজ যাওয়ার সময় আরও বড় দেখাচ্ছিল।

দুপুরের পর থেকে একই দৃশ্য বেশ কয়েকবার দেখেছে ইমা—মা, বাবাকে নিয়ে যাচ্ছে খোলা বারান্দার শেষ মাথায়, তারপর আঙুল দিয়ে পেছনের রাস্তার দিকে কী যেন দেখাচ্ছে, তারপর ফিরে এসে দুজনেই চাপা গলায় কথা বলছে নিজেদেরই মধ্যে। ওই পেছনের রাস্তার নাম, বাদশা মিঞা সড়ক। ওই রাস্তাটা, ইমার ছোট্ট পৃথিবীর, ছোট্ট জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর ছবি। হ্যাঁ, ইমার কাছে ওই রাস্তাটা একটা ছবিরই মতো, যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে সত্যি হয়ে গেছে। কলোনির পেছন দিয়ে রাস্তাটা বাঁয়ে ওয়ার সেমেট্রি, ডানে কাটা পাহাড় রেখে ক্রমেই ওপরে উঠে গেছে। তারপর আবার বাঁয়ে জেমস ফিনলে পাহাড় আর ডানে চারুকলা কলেজ রেখে মিশেছে সার্সন রোডে। সার্সন রোড ধরে একটু ডানে গেলেই, বাঁয়ে চট্টেশ্বরী মন্দির আর ডানে একটা বড় চারতলা হলুদ বিল্ডিং, ওই খানে পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্প। ইমা বাবার সঙ্গে একদিন চিকেন টিক্কা কিনতে গিয়ে দেখেছে, ওই বিল্ডিংয়ে শুধু জিপ ঢোকে আর বের হয়। মস্ত মস্ত মোচওয়ালা মিলিটারি বন্দুক নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে থাকে। ইমাকে আর বাবাকে ওরা কিছু বলেনি। ইমা অবশ্য জানে, বাবা সঙ্গে থাকলে ভয় নেই। বাবার পকেটে কার্ড থাকে, সব সময়। বাবা পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। খোকন মামা একদিন বাবাকে শিখিয়ে দিয়েছে, ‘আপনেরে ধরলে কইবেন, ম্যায় কিতাব বেচতা হুঁ।’ ইমা বুঝতে না পারলেও তাতে মজা পেয়েছিল খুব। ‘বেচতা হুঁ, বেচতা হুঁ’ বলে লাফিয়েছিল অনেকক্ষণ। এখনো মাঝেমধ্যে একা একা ‘বেচতা হুঁ’ বলে হুংকার দেয়...কেমন মিলিটারি মিলিটারি লাগে ওর।

default-image

মাহবুব ভাই অন্য দিন এলে ইমার সঙ্গে সিঁড়িকোঠায় একটু ফুটবল খেলবেই। কিন্তু আজকে কিছু না বলেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেল, যেন পালিয়ে গেল। ইমার মনে হলো যেন বাইরের জগৎটার সঙ্গে ক্ষীণতম সংযোগটুকুও নিয়ে গেল সঙ্গে করে। মেহেদীবাগ সরকারি কলোনিটা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ভুতুড়ে হয়ে গেছে। পাঁচ বিল্ডিংয়ে বাস করা ৬০টি পরিবারের প্রায় সবাই যার যার ঘর তালা বন্ধ করে চলে গেছে কোথাও। এখন সাকল্যে আছে পাঁচ-ছয়টি পরিবার। ইমার কিংবা আপার একা বাইরে যাওয়া বন্ধ, মাঠে খেলা বন্ধ।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েক মাসে অনেকবার উত্তেজনা দেখেছে ইমা। যুদ্ধ কী, এটা সে এখন ভালোভাবেই জানে, বলতে গেলে মজাই লাগে ওর। ব্ল্যাক-আউট কী, সেটা জানে, সাইরেন বাজলে যে মেঝেতে শুয়ে পড়তে হয়, তা জানে, কেমন করে জানালার কাচে কাগজের ফালি আঠা দিয়ে স্টার-এর মতো করে লাগাতে হয় তা জানে (কেন, তা অবশ্য জানে না)। আরও জানে, বাসার সামনের মাঠে ডব্লিউ-এর মতো যে বিরাট গর্ত করা হয়েছে তার নাম ট্রেঞ্চ, বাবা বলেছে। ইমা নিজের চোখে কলোনির পাশের পাহাড়ে যুদ্ধজাহাজ থেকে বোমা পড়তে দেখেছে। ইমা জানে, যুদ্ধজাহাজ চলে যাওয়ার পর আকাশে সাদা সাদা স্পট দেখা যায়। মাহবুব ভাই বলে, ‘কুকুর যুদ্ধ’। একদিন ইমা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছে, মা প্লাস্টিকের প্যাকেট সুতা দিয়ে বেঁধে চেয়ারে দাঁড়িয়ে দেয়ালের ভেন্টিলেটরে লুকিয়ে রাখছে। ইমা বুঝতে পারে, এগুলো সবই যুদ্ধের ব্যাপার-স্যাপার। নিজেকে বেশ বড় আর অভিজ্ঞ লাগে ওর, আপার চেয়েও।

কিন্তু আজকের বিকেলটায় একেবারেই অন্য রকম লাগছে ইমার। যুদ্ধ নিয়ে এত এত জানাশোনা তার, আজকের ভয়টাকে কিছুতেই দূর করতে পারছে না। কারণ, আজকের মতো ভয় সে কোনো দিন মা–বাবাকেও পেতে দেখেনি। ইমার ছোট্ট ভুবনটাতে এখন শুধু ভয়। ও কিছুতেই খেলনাগুলোতে মন বসাতে পারছে না। কেবলই মনে হচ্ছে, মা–কে নিয়ে যাবে, মা-কে নিয়ে যাবে। ইমার কান্না পাচ্ছে না, ভয় করছে। ভয়টা আবার গলার কাছে আটকে আছে। জোরে নিশ্বাস নিতে পারলে হয়তো ভালো লাগত, কিন্তু ইমার মনে হচ্ছে নিশ্বাস নিতে গেলেই ভয়টা বুকের ভেতরে আরও ঢুকে পড়বে, আর বের হবে না। ইমা, আরও কোনায়, আরও অন্ধকারের দিকে লুকিয়ে পড়তে চাইল, যেন ভয়টা ওকে খুঁজে না পায়।

অথচ আজকের সকালটা অন্য দিনের মতোই ছিল। প্রায় জনশূন্য কলোনিটা ছিল সকালের রোদে মাখামাখি। প্রতিদিনের মতো টমিকে ব্যালকনি দিয়ে ডেকে রুটি দিয়েছিল ইমা। এমনিতে বড়রা কেউ দিনের বেলা বের হয় না। তবে বাবা আজ সকালে ইমাকে নিয়ে বের হয়েছিল। বাদশা মিঞা সড়ক ধরে একটু ওপর দিকে এগোলেই কাটা পাহাড়ের নিচে লিচু গাছগুলোর কাছে একটা টিউবওয়েল আছে, ওখান থেকে পানি আনতে। বাবার এক হাতে বালতি, অন্য হাতে ইমার বাঁ হাত। ইমার ডান হাতে কাঠিতে লাগানো চাঁদ-তারা পতাকা। রাস্তা দিয়ে মিলিটারি ভর্তি দুইটা ট্রাক গেল, ওদের কিছু বলল না, ইমা জানে, হাতে চাঁদ-তারা পতাকা থাকলে ভয় নেই। ওরা পানি নিয়ে ফিরে এসেছে, তেলের পিঠা খেয়েছে, ছোট বোন নিনুর পুতুল পিনুর নাক কামড়ে খেয়ে ফেলায় মার বকা খেয়েছে, বাবা আপা আর ওকে ‘টিন্ডার বক্স’ পড়ে শুনিয়েছে। সব ঠিকঠাক ছিল, অন্য দিনগুলোর মতোই নিস্তরঙ্গ সকাল আলস্যে গড়িয়েছিল দুপুরে।

মা রান্নাবান্না সেরে গোসলে গেছে। একটু পর ওরা ভাত খাবে। আজকেও শুঁটকির তরকারি। ইমা গন্ধে বুঝতে পারে। অবশ্য ইমার জন্য দুধভাত থাকবে, কলা দিয়ে, ইমার প্রিয়। ঘিয়ে রঙের একটা প্লাস্টিকের বাটিতে দুধভাত খায় ইমা, অন্যদের মতো চ্যাপ্টা প্লেটে নয়। মা প্লেট সাজিয়েই গেছে। ইমা মার জন্য বসে আছে, ওর জায়গায়, একটা মোটা চটের নকশা করা আসন আছে ওর, সেটাতে।

হঠাৎই কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ করে, মা বারান্দার শেষ মাথা থেকে দৌড়ে এল, তোয়ালে হাতে। অথচ গোসলের পর সেটা মাথার চুলে প্যাঁচানো থাকার কথা। চুল থেকে পানি ঝরছে, এক হাত দিয়ে মুখ চেপে আছে, নিজের অজান্তেই, যেন কোনো জোরে শব্দ বের না হয়। আতঙ্কে যেন চোখগুলো বের হয়ে আসছিল মার। বলতে গিয়েও ওকে আর আপাকে দেখে কিছু না বলে হাতের ইশারায় বাবাকে বেডরুমে নিয়ে গেল। মার ভয়ার্ত মুখ দেখে ইমা আর আপা হিম হয়ে বসে থাকল। কিছুক্ষণ পরই মা বাবার হাত ধরে বারান্দার শেষ মাথায় নিয়ে গেল, আঙুল তুলে দেখাল রাস্তার দিকে, তারপর দ্রুত ফিরে এল ঘরে। চাপা গলায় বারবার কথা বলল দুজনে, বলতেই থাকল। ইমা আর আপা, ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। নিনু পারাম্বুলেটরে শুয়ে হাত খেতে থাকল, খেতেই থাকল, কেউ থামাল না।

অনেকক্ষণ পর খেতে ডাকল মা। মা কাঁদলে ইমা বুঝতে পারে, এখন যেমন বুঝতে পারছে। মার চোখ লাল হয়ে যায়, ছোট ছোট দেখায়। চুপ করে খেতে ভালো লাগে না ইমার, বাবার জন্য জমানো সব প্রশ্ন করার এটাই তার সময়। তবু অবস্থা দেখে চুপ করে থাকল আজ। রসুন খেতে পারে না ও, মাকে দিয়ে দেয়। আজকে চোখ বন্ধ করে গিলে ফেলল। আড় চোখে ও আর আপা, মা বাবার দিকে তাকাল, দুজনই গম্ভীর, চুপচাপ।
খাবার পর, বাবা বেরিয়ে গেল মাহবুব ভাইকে ডেকে আনতে। তারপর, দুপুর থেকে বিকেল অবধি, আড়েঠারে, এঘর–ওঘর ঘোরাঘুরি করে, দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা টুকরো টুকরো শব্দ জোড়া দিয়ে, ইমা ‘ভয়ের’ ছবিটা শেষ পর্যন্ত আঁকতে পারল। ঘটনা হচ্ছে, মা যখন গোসল করে মাত্র কাপড় নাড়তে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল, তখনই রাস্তা দিয়ে একটা মিলিটারির খোলা জিপ যাচ্ছিল। মার সঙ্গে মিলিটারির চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল আর জিপটি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। একটা মিলিটারি আরেকটা মিলিটারিকে হাত দিয়ে মাকে দেখিয়ে হেসেছিল। তারপর চলে গেছে।
বাবাকে রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুনেছে ইমা, ‘রাতে হয়তো আসবে’। মাকে ভাঙা গলায় বলতে শুনেছে, ‘কোথাও তো যাওয়ার জায়গা নাই।’ আবার দুজনকেই শুনেছে একজন আরেকজনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে, ‘না, এতটা হয়তো করবে না, এটা সরকারি কলোনি।’

সন্ধ্যা নামতেই সবার চোখের আড়াল করে ইমা চাঁদ-তারা পতাকাটা টুক করে দরজার বাইরে রেখে এল। সেই সন্ধ্যায় বারবার সাইরেন বাজল, বারবার ব্ল্যাক-আউট হলো। টমিটা নিচতলার সিঁড়িঘরে বারবার উঁচু গলায় কেঁদে উঠল। কিছুদিন আগে টমির পা ম্যানহোলের ঢাকনায় আটকে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে।

default-image

অসহায় ইমা, ভয়ের কষ্টে, অন্ধকারের কষ্টে, নিথর নীরবতার বিকট চিৎকারে, এ কোণ সে কোণ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল দ্রুত। এত ভার ছোট্ট ইমা আর সহ্য করতে পারছিল না। সন্ধ্যা পার হতেই ইমা প্রাণপণে চাইছিল ঘুমিয়ে পড়তে। অন্ধকার ব্যালকনিতে, পাটির ওপর শুয়ে, কাঠ হয়ে থাকা মার কোলে মাথা রেখে সেই রাতে ঈশ্বর তাকে একটু আগেভাগেই ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। অজানা, অধরা, অবয়বহীন কষ্ট থেকে একটা ছোট মানুষকে মুক্তি।

(এই কয়েক ঘণ্টার অমানুষিক ভয় ও কষ্টের সত্যি গল্পের শেষটা বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের মতো দুর্ভাগ্যের নয়। এই ছোট পরিবারটি দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে সেই রাতে ঘুমাতে গিয়েছিল। আসলে, বাতি নিভিয়ে ঘুমানোর ভান করেছিল। রাতের প্রতিটা মুহূর্ত তাদের কেটেছে অবচেতনে মিলিটারির বুটের উদ্ধত আগমনী শব্দ আর নিষ্ঠুর অট্টহাসি শুনে। সব কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মাঝরাতের কিছু পরে দরজায় ঠুক ঠুক শব্দ হয়েছিল। নিশ্বাস বন্ধ করে, ঘুমন্ত তিনটি বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরে বাবাটি ও মাটি অপেক্ষা করে রইলেন কখন ভারী পদাঘাতে দরজা ভেঙে পড়বে। কিন্তু দৈবক্রমে তা হয়নি। আরও কয়েকবার ঠুক ঠুক শব্দের পর শব্দ থেমে গিয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার পর দরজা খুলে বোঝা গিয়েছিল, হায়েনারা আসেনি, এসেছিল টমি-পাড়ার কুকুর। ওর ভাঙা পায়ের ব্যথার উপশম খুঁজতে বোধ হয়। একাত্তরের সেপ্টেম্বরের ওই সকালটার টলটলে সূর্যটাকে একটু বেশিই সোনালি লেগেছিল কি ইমার কাছে? হয়তোবা, কিন্তু ইমা এখন আর মনে করতে পারে না)।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন