বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সকাল সকাল ঘুমের মায়ায় বলেও ফেলেছি, আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে যেতে পারব, সমস্যা হবে না। তবু সে একা ছাড়বে না, অপরিচিত জায়গায়। কখনোই একা নতুন কোথাও ছাড়েনি আমাকে। আমার ভীষণ নির্ভরতার জায়গা। তারপরও যদি কখনো ভুল পথে উঠেই যাই, সবার আগে মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে হয় আমার, সহিসালামতে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর জন্য।

সক্কাল সক্কাল ঘুমের মায়া ত্যাগ করে যে আমাকে সাবধানে ক্লাসে পৌঁছে দেয়, প্রতিদানের বিন্দুমাত্র আশা না করে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার বাঁধনে বাঁধা আমি।
জানে, ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালিয়ে যেতে পারব আমি, তবু নতুন জায়গায়, কখনো একা ছাড়ে না, পথ ভুল করার ভয়ে। এই যে দায়িত্ববোধ, তা আমি কোথায় পাই?
ইদানীং আশপাশে যেতে হলে, মেয়ে নিয়ে যাবে, নয়তো ছেলে। তাদের ড্রাইভিংয়ে পরিবর্তন হবেই যখন আমি একা গাড়িতে। ছেলে নতুন গাড়ি চালানো শিখছে। মেয়ের ড্রাইভিংয়ে হিক্কাপ নেই, যখন আমাকে নিয়ে বের হয়। ছেলেও ভয়ানক সাবধানী হয়ে যায় আমাকে গাড়িতে তুলে। কয়েকবার দুর্ঘটনার পর আমার পিটিএসডি আছে, অল্পতেই নিজের অজান্তেই চিৎকার করি। এরা সেটা জানে বলেই রোধ করার চেষ্টা করে যতটা সম্ভব!

default-image

মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি একা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাঁচতে পারব না। এরা আমাকে এতটাই নির্ভরশীল বানিয়ে রাখে। আসলে আমার ইচ্ছাও নেই! আমি এদের সবার কাছে শিশু হয়েই থাকতে চাই!

সে যা–ই হোক; এক কাপ কফি হাতে আমি হোটেল ছাড়লাম। পরের শহরে আমার জন্য সকালের নাশতা অপেক্ষা করবে।

ভাগ্যিস সে নিয়ে গিয়েছিল! আমি মুগ্ধ হয়ে আশপাশের পাহাড়, উপত্যকা, নদী আর সূর্যোদয় দেখতে দেখতে কখন যে এই ছবির মতো সুন্দর শহর বিগ স্কাইতে পৌঁছে গেলাম, বুঝতেও পারিনি।

ক্লাস শেষে দুপুরে একই পথে ফিরে বাচ্চাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা আবার গেলাম ইয়েলোস্টোনের না দেখা প্রান্তে! বাচ্চারা খুব উত্তেজিত! ছেলে গাড়ি চালাবে শুনলেই প্রস্তুত হয়ে যায়।

default-image

এবার যাচ্ছি ইয়েলোস্টোনের না দেখা প্রান্তগুলোয়। প্রথমেই ফাউন্টেন পেইন্ট পট। এখানে অনেকগুলো পুল আর গাইজার আছে আধা মাইলজুড়ে।

গাড়ি পার্ক করে, সবার পিছু পিছু কাঠের পাটাতনে হাঁটা শুরু করতেই দেখি, এক বিশাল বাইসন চুপচাপ বসে আছে গাছের নিচে। পাশেই সালফারের নদী। সেটা পার হতেই কাদার গর্ত, বলে ফাউন্টেন পেইন্টিং পট! এখানে পরপর অনেকগুলো পুকুর। আরও হেঁটে গেলে দেখি, পানির ছিটা গায়ে এসে লাগছে। পরপর দুটো বেসিন থেকে সমানে প্রস্রবণ ছুটে চলছে আকাশপানে। আধা ঘণ্টা ধরে চলছে তাদের খেলা। আমার মনে হয়, ওল্ড গিজারের চেয়ে বেশি উপভোগ্য!
তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেই শুনি, বাইসন তার মতো কারও ক্ষতি না করেই সেখান থেকে চলে গেছে। এই আধা মাইল পথ আর তার আকর্ষণ দেখতে দেখতে ঘণ্টা পার হয়ে যায়।
সেখান থেকে গেলাম শেষ স্পটে।

default-image

সত্যি কথা বলতে, এটাই ইয়েলোস্টোনের সবচেয়ে ভালো দিক। এটাকে বলে মিডওয়ে গাইজার বেসিন। রাস্তা থেকেই দেখা যায়, নদীর পানিতে ধোঁয়া ওঠা পানি এসে মিশে যাচ্ছে।
আবারও সবার পিছু নিয়ে কাঠের পাটাতনে হেঁটে দেখি, বিশাল পুকুর, ধোঁয়ায় ভরা! সবচেয়ে বড় দুটো গাইজার এখানে। এক্সেলসর গাইজার পড়ে প্রথমে। এর এক পান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দেখা যায় না ধোঁয়া আর অবস্থানের কারণে। এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের পথ হাঁটা আর এই গাইজারের দৃশ্য; এককথায় অসাধারণ। অনেক গভীরও। তার পাশ দিয়ে আরও অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। পথের প্রান্তে যেতেই চোখ আটকে গেল, চোখসদৃশ সবচেয়ে বড় বেসিনে। গ্র্যান্ড প্রিজম্যাটিক স্প্রিং।

ইয়েলোস্টোনের সবচেয়ে বড় গরম পানির স্প্রিং। ২০০ ফুটের বিশাল নীল–সবুজ গরম পানির সুইমিংপুল যেন। চারপাশে লাল–কমলার খেলা। সুদর্শন চোখ যেন একটা। পানি ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যাঁরা সাঁতার জানেন, তাঁদের লোভ হবেই এখানে সাঁতার কাটার। বেশ! সে আশা মনেই রেখে দেওয়া উচিত। পা সরে না এই সুন্দরীর পাশে গেলে। চোখ আটকে যায় তার সৌন্দর্যে।

default-image

নীল পানি, পাশে লাল–হলুদের খেলা। লক্ষ করলেই অনেক বাইসনের পায়ের ছাপ চোখে পড়ে তার মধ্যে! পুরো দুই ঘণ্টা লেগে গেল দুটো বেসিন দেখতে। পাশে ছোট আরও কিছু বেসিন আছে। এই আগ্নেয় মাটিতেও দেখি ফুলের সমারোহ। বসেই পড়লাম কাঠের পাটাতনে। বসতেই সানগ্লাস পড়ে গেল পাশের মাটিতে, যেখানে হাঁটা মানা। সানগ্লাসের মায়া যখন ছেড়েই দিয়েছি, মেয়ে টুপ করে লাফ দিয়ে ফেলেছে কিছু না বলেই, সানগ্লাস বাঁচাতে। আমার দুশ্চিন্তা, মেয়ের কী হবে! সেকেন্ডের মধ্যে সে সানগ্লাস তুলে চলে এসেছে। আমি তাকে বকছি, যদি কিছু হয়ে যেত ভেবে। সে যাত্রায় সবাই সহিসালামতে আরও ঘণ্টাখানেক পর বের হলাম। ছোট আরও কিছু পুল আছে এর আশপাশে। চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা বৃষ্টি শুরুর আগেই বেরিয়ে পড়লাম। সেটাও আরও আধঘণ্টার আগে নয়।

default-image

এরপর ছোট স্টপ, মেডিসন নদীর তীর, সেখান থেকে বের হতে হতে রাতের খাবারের সময়। চাইনিজে খাওয়া শেষে আগামীকালকের জন্য তৈরি হচ্ছি মনে মনে। তারপরও খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমরা আমাদের প্রিয় নদীর পাড়ে চলে গেলাম। শেষ সন্ধ্যা উপভোগ করব বলে।

default-image

কাল সকালে ক্লাস শেষ হলে দুপুরে ফিরে রওনা দিতে হবে ইউটাহর দিকে। সেখানে পরদিন (পরশু) রিমোট ক্লাস করে নিতে হবে। আজ আর শরীর চলছে না।
(চলবে...)

*লেখক: শারমীন বানু আনাম, চিকিৎসক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন