বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ক্লাসে অ্যাটেন্ড করতেই আমাকে বলা হয়, নাশতা নিয়ে নাও, খুব শিগগির নাশতা সরানো হবে। নাশতা নিয়েই ক্লাসে ঢুকলাম। রোস্ট আলু, ডিম আর ফল; সঙ্গে চা ও কফি।
ক্লাস শেষ হওয়ার আগে বাচ্চাদের ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে বলে, সেই নান্দনিক রাস্তায় ফিরে এসে লাগেজ গাড়িতে তুলে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলাম। ইয়োলোস্টোনের ভেতর দিয়ে ফিরে গেলে আজ আর সল্টলেকে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তাই ভিন্ন রুটে যাত্রা। মন্টানার এই ছোট্ট টুরিস্ট শহর ম্যাডিসন, নদীর নামেই নাম। ম্যাডিসন নদী বয়ে চলেছে শহরজুড়ে। এই তিন দিনে আমাদের কাছে এটি প্রিয় নদী হয়ে গেছে। নদীর তীরে আমরা সূর্যাস্ত দেখি প্রতিদিন।

default-image

আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলো–আঁধারির খেলা দেখি নদীর পাড়ে অথবা পাহাড়ের চূড়ায় বসে। ভাগ্যিস, এরা শহরটি রক্ষা করতে হাঁটার রাস্তা এবং বসার জায়গা করে রাখে। লোকজন সেসব রাস্তা ছাড়া ভিন্ন রাস্তায় গিয়ে যাতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। এখানকার মানুষ নিয়ম মেনে চলে, তাদের বাধ্য করা হয় নীরবে! প্রশাসন জানে তাদের নিয়ম করতে হবে। জনগণও বোঝে নিয়ম মেনে নেওয়াই পরিবেশ ও তাদের জন্য মঙ্গল। তাই তারা সেটি মেনেও নেয়।
ম্যাডিসনের বাইরে বেরোলেই আইডাহো রাজ্য। মানে ওয়াওমিং দিয়ে এবার নয়, জা আইডাহো দিয়ে ইউটাহ পৌঁছাব।

default-image

সেই পাহাড় ও উপত্যকার হাজার হাজার মাইল ঘাস ও ফুলে ভরা, আছে নদী! মনে হয় সুইজারল্যান্ডের মধ্য দিয়ে যেন গাড়ি ছুটে চলেছে। ছয়-সাত ঘণ্টা সেখান দিয়ে যেতে হবে! প্রকৃতির রূপ দেখে আমার তৃষ্ণা মেটে না। এখানকার প্রকৃতির রূপ অসাধারণ! ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। জীববিদ্যা, ভূগোল, দর্শন ও পরিবেশবিদ্যা আমার শেখা হয় একসঙ্গে।
যেমন এই বিশাল উপত্যকার এক দিকে দেখা যায় নদী ও রোদ; আবার অন্য দিকে দেখা যায়, আকাশে মেঘ জমছে, বৃষ্টির দু-এক ফোঁটা পানি পড়ছে বা ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। একই সময়ে আরেক দিকে কোনো বৃষ্টি বা মেঘ নেই। গাছগুলোও বড় হতে থাকে এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে। কোথাও শুধু ঘাস, কোথাও শস্যখেত—পাইনের জঙ্গল, বিচ্ছিন্ন দু–একটি গাছ।

default-image

এসব জায়গার জীবনযাত্রা ধীরগতির হলেও স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের সুব্যবস্হা রয়েছে। অন্যের ব্যাপারে তারা মাথা ঘামায় না। নিজ নিজ জীবন নিয়ে তারা ব্যস্ত। তার মানে এই নয় যে তাদের বন্ধুবান্ধব নেই, পরিবার–পরিজন নেই, সোশ্যাল লাইফ নেই। সবই চলে একসঙ্গে, তারা জানে নিজেদের গণ্ডির মধ্যে থাকতে।
সবাই যার যার মতো ড্রাইভ করে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে খেয়েদেয়ে আমি একটা ঘুমও দিয়ে ফেলেছি। তখন পাচ্ছে চায়ের তেষ্টা, তবে হোটেলে পৌঁছানোর আগে আর থামব না।
এবার সেই পাহাড়ঘেরা শহর। ভিন্ন ল্যান্ডস্কেপ। মেয়ে আমাকে হোটেলে নিয়ে এল।
ফ্রেশ হতে হতে মনে হলো ডিনার করে নেওয়া উচিত। সামনে নেপালি দোকান। ফোন করে জেনে নিলাম ডাইন ইন করা যাবে কি না। হাঁটতে হাঁটতে সেখানে পৌঁছে গেলাম।
মোমো ছাড়া নেপালি খাবার? না, না।
যার যেটা খাওয়ার ইচ্ছা সেটি অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি। জানালা দিয়ে পাহাড়ের চূড়া দেখি। ব্যাকগ্রাউন্ডে নেপালি গান শুনতে পাই।
খাবার আসতে দেরি, তবে খেতে দেরি নয়। প্রতিটি খাবার খুবই সুস্বাদু। এরপরও শেষ করতে পারিনি সবাই মিলে। ভাবছিলাম এমন একটি রেস্টুরেন্ট বাসার কাছে হলে আমি রান্না করা বাদ দিয়ে দিতাম।

খেয়েদেয়ে ফিরে সবাই আগামীকালের প্ল্যানে ব্যস্ত।

default-image

এখানকার আর্চ পার্কে আমার যাওয়ার ইচ্ছা। কর্তা নিজে থেকেই বলছেন, সূর্যোদয় দেখতে যাবেন। সারাদিন লাগবে ঘুরতে। চার ঘণ্টার ড্রাইভ! মধ্যরাত নাকি খুব ভোরে রওনা দেবে, বাবা–ছেলে ডিবেট করছে।
করতে থাকুক। ছেলে একবার বলে, কেন যাচ্ছি?
বাবার উত্তর ‘নেচার’, মানে পরিবেশ দেখতে।

default-image

ছেলে প্রতিদিন ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে বলে, তাহলে এই কদিন যে ন্যাচার দেখলাম!
বুঝলাম, সব ধরনের পরিবেশ ভিন্ন!
তারপর যখন শুনল, কাল ওই পার্কে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকবে। তখন বলে, ‘আমি হোটেলেই না হয় থেকে যাই? ট্যান হয়ে যাব।’ যাক, আপাতত মত পাল্টেছে। এখন সবার ঘুমানো দরকার। রওনা হওয়ার জন্য।
দেখা যাক সকালে কেমন হয়!
কর্তা সূর্যোদয় দেখবেন বলেছেন, তাতেই অবাক আমি। এই লোক তাঁর ঘুম নষ্ট করতে রাজি নন সেহরি আর নামাজ বাদে। আমি খুবই উত্তেজিত। কালই আমাদের এ যাত্রার শেষ দিন।
মধ্যরাতে ঘুম ভাঙিয়ে কর্তা বলেন, চলো। ঘড়ি দিকে তাকাতেই দেখি দেড়টা বাজে, ছোটবেলায় বলতাম সাড়ে একটা। পাশ ফিরে ঘুমাতে গিয়ে বুঝলাম বাচ্চারা বিনা বাক্য ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে!
কী আর করা!
এমন গভীর রাতে এয়ারপোর্ট ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জন্য কখনো রেডি হইনি আগে।

কোনো রকমে ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। ড্রাইভ তো আর আমাকে করতে হবে না। ছেলে বাবার পাশে নির্ঘুম কো–পাইলট। আমার অতি আদরের মেয়ে দুটো শহরের আলো কমে যেতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঘুম ভাঙালো সাড়ে পাঁচটায়।
পুবের আকাশে সবে রং আসতে শুরু হয়েছে, ফোন তখনও বলছে ‘নাইট চলছে।’
চোখ খুলে লাল রঙের পাথুরে দেয়াল আর মাথার ওপর বাঁকা চাঁদ দেখি। আমরা চলে এসেছি, আর্চেস ন্যাশনাল পার্কে।
মুগ্ধ হয়ে দেখি এই মিলিয়ন বছরের পাহাড়ি স্থাপনা।
ভূমিকম্পে পাথুরে স্থাপনা আর তার ওপর বৃষ্টির পানিতে স্যান্ডস্টোন ক্ষয়ে গড়ে উঠেছে
এই সুবিশাল পাথুরে কারুকাজ!
দেখে মনে হলো, ভারতীয় রাজারা এর খবর পেলে ভেতরে নিশ্চয়ই নান্দনিক প্রাসাদ বানাতেন। সুবিশাল আর সুউচ্চ এই পাথুরে দেয়াল তাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিত। দেয়াল বানানোর খরচও কমত।

default-image

যা–ই হোক, আমরা পার্ক করলাম গার্ডেন অব অ্যাডেনের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখব বলে। আকাশ একটু একটু লাল হচ্ছে, আর সুযি৵ মামাও একটু একটু করে তার অবস্হান জানান দিচ্ছে। যেন লাজুক ছেলের অল্প অল্প করে তার লাজ ভেঙে অপরিচিতদের সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা! সেই রং প্রতিফলিত হচ্ছে পুবের পাথুরে দেয়ালে। আঁধার কেটে, চাঁদের আলো ছাপিয়ে এবার সূর্য সবাইকে রঙিন করে তুলছে।
এই ভোরের নির্জনতায় পাখির কলতান ছাড়াও আরও কিছু শব্দ কানে আসছে। এই বিরান জায়গায় কান পেতে বুঝতে পারলাম, কেউ সামনের পাহাড়ে আছে। আমরাও সাহস পেয়ে হাইক শুরু করলাম, সূর্যের আরও কাছে যেতে দেখি দুই জন ফিরে আসছে। মাইলের পর মাইল আর কাউকে চোখে পড়ল না। আমরা হেঁটে আরও কাছে গিয়ে একেবারে খাদের কিনারায়, পাহাড়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখলাম।
চারদিক পরিষ্কার হতেই আমরা পাথুরে জানালা দেখতে গেলাম।
রাস্তাগুলো ডেজিগনেটেড, মানে ট্রেইলের বাইরে ইচ্ছা হলেও হাঁটা যাবে না, যাতে পরিবেশের বিপর্যয় না ঘটে।
ট্রেইল ধরে উঠতে গিয়ে দেখি রেঞ্জারেরা একজনকে ঘিরে আছেন। তাঁর আর ওঠার অবস্হায় নেই। পাথর ক্লাইম্ব করতে গিয়ে পড়েছেন নিচে। বেচারা নিশ্চিত পা ভেঙেছেন, আধা ঘণ্টা পর স্ট্রেচার এসে নিয়ে গেল।

আমি আরও সতর্ক হয়ে হাঁটছি। পা আবারও ভাঙার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। জানি, আমি সুযোগ পেলেই রক ক্লাইম্ব করব।
ছেলে–মেয়ে দুজনেই রাত জাগার ক্লান্তিতে গাড়ি থেকে নামতে রাজি নয়। আমরা দুজন হাঁটা শুরু করলাম। ঘণ্টখানেক লাগবে এক পাশের পাহাড়ের ভগ্নাংশ দেখতে। তা–ই সই। একটার ওপরে উঠতে গিয়ে উচ্চতা বেশি হওয়ায় একজন ভারতীয় মেয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি নির্ভয়ে ওপরে উঠেলাম। ঘণ্টাখানেক তার ওপর হাঁটা শেষ করে দেখি, বাচ্চা হরিণের মতো তিড়িংবিড়িং করে আমার ছেলে আসছে। বাকিটা তাকে সঙ্গে নিয়েই হাঁটা শেষ করলাম। সামনের স্থাপনায় আর কেউ ঢুকতে রাজি নয় বড় ট্রেইল দেখে। নর্থ সাউথ উইন্ডো আর তার মধ৵ দিয়ে সূর্যালোক দেখা শেষ হয়।
এবার ভাবলাম তাহলে ডেলিগেট আর্চে যাই।

default-image

ডেভিলস গার্ডেনের পাশ দিয়ে ড্রাইভ করতে করতে গিয়ে দেখি সেখানে এই সাতসকালেই পার্কিলট ফুল, হাইক তিন মাইল। রেঞ্জার বলেন, সামনে মাইলখানেক পরে আরেকটি পার্কিং লট আছে, সেখান থেকে হাইক দুই মাইল। আমরা সেখানেও কোনো পার্কিং না পেয়ে আর দুই মাইল হাইকিংয়ের প্রতি কারও আগ্রহ না দেখে, বাচ্চাদের খিদে লাগায় ঠিক হলো খাবার তুলতে হবে আগে। এই বিশাল পার্কে খাবারের ব্যবস্থা নেই। আমরা সিনিক ড্রাইভে গেলাম পাশের শহর ‘মব’–এ। ছোট্ট টুরিস্ট শহর। খাবার নিয়ে ফিরতেই সবার বাইরের তাপমাত্রায় আগ্রহ। ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এখানে তাপমাত্রা সেলসিয়াস নয়, ফারেনহাইটে মাপা হয়।
রাত জাগায় বাবা-ছেলের হাইকিং করার নেশা নেই। আর গত কয়েক দিনের হাঁটাহাঁটির ধকলে আসলে আমরা সবাই ক্লান্ত। মধ্যরাতের ফ্লাইটে ঘরে ফিরতে হবে। কফি শেয়ার করে বললাম, চলো ফিরে যাই। আবার মাইলের পর মাইল এই নান্দনিক পার্কের ভেতর দিয়ে ফিরতে হবে। সৌন্দর্য দেখা মিস হবে না। সবুজ–লাল পাথরের দেয়াল, স্যান্ডস্টোন আর্চ আর এর অসাধারণ ভারসাম্য দেখতে দেখতে পার্ক পার হয়ে আসতেই কখন ফের ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল করিনি। ঘুম ভাঙতেই দেখি, সল্টলেক সিটির প্রান্তে, মানে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছি।
হোটেলে ফিরে সবাই যার যার মতো রেস্ট নিয়ে লেট লাঞ্চ ও আরলি ডিনার করতে আমরা আবার সেই নেপালি দোকানে ঢুঁ মারলাম। খাওয়া–দাওয়ার পাট চুকাতেই হোটেলে ফিরে গোছগাছ করে আবারও যাত্রা। এবার বিমানবন্দরে ভাড়ার গাড়ি ফেরত দিয়ে ঘরে ফেরার অপেক্ষায়।

বাচ্চারা ঘুরতে পছন্দ করে। তবে তাদের ঘোরাটা হোটেলে ঘুম, মন চাইলে সুইমিং আর তিন বেলা বাইরের খাবারেই সীমাবদ্ধ। তার পরও এসব যাত্রায় তাদের নতুন জায়গা চেনা, কিছু জানা ও শেখা হয়— এ কারণেই সঙ্গে নেওয়া। নয়তো এদের ঘর থেকে বের করা সহজ কাজ নয়।
যেমন ওরা দুজনে পাশের পার্কে হাঁটতে গিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, ওরা নেপালি কি না? ওদের ইন্টারঅ্যাকশন ওদের কনফিডেন্ট করে! পরিস্হিতি মোকাবিলা করতে শেখায়। আমার ও আমাদের উদ্দেশ্য—কনফিডেন্ট সুস্থ দুটি বাচ্চাকে পৃথিবীতে বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা।
পরে ইউটাহ এলে যেসব পার্ক মিস হয়েছে, সেগুলোতে ঢুঁ মারব, এই প্রত্যাশায় ঘরে ফেরা এবারের মতো। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
*লেখক: শারমীন বানু আনাম, চিকিৎসক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন