বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লেক ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে সুবিধাজনক হ্রদটি হলো এম-৬ পেনরিথ জংশন থেকে ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে অবস্থিত। পর্বতমালা ও ময়দানের চমৎকার দৃশ্যগুলো অপূর্ব। ছোট ছোট হ্রদের মধ্যে একটি বুটমেইর। দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা অঞ্চল। পাশেই রয়েছে ওয়েস্ট মোরিল্যান্ড গ্রিন স্লেট হসটিস্ট। স্লেটখনি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। অন্যদিকে আছে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের গ্রাম গ্রাসমেয়ার এবং গ্রাসমেয়ার ওয়াটার।

ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার মতোই তাঁর জন্মভূমি। নিঃসর্গের মধ্যে যেন রোমান্টিসিজমের আবহ। আঠারো শতকের শেষের দিকে রোমান্টিকতা সাহিত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে ইউরোপে উদ্ভূত হয়েছিল। উইলিয়াম এই ধারার সফল প্রবর্তক। এখানকার জীবনাচরণ আর আবেগ-অনুভূতির নিগূঢ় রহস্য তাঁর কবিতায় অসাধারণ মহিমা লাভ করেছে। আবেগ ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের পাশাপাশি প্রকৃতি ও আত্মার সঙ্গে গভীর অনুভূতির প্রকাশ। রোমান্টিকতা ইংরেজি কবিতা ও ছন্দোবদ্ধ রচনার ইতিহাসে বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার প্রেরণা এই লেক ডিস্ট্রিক্ট। দুনিয়ার লেখক-সাহিত্যিকদের কাছে তাই জায়গাটি বিখ্যাত। আধুনিক রোমান্টিসিজমের অনন্য কবি উইলিয়াম। তাঁর কবিতা ইংরেজি সাহিত্যকে বিপুলভাবে সম্পদশালী করেছে। প্রকৃতিকে অসাধারণ মহিমায় সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহিত্যে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ব্রিটিশ রাজসভার কবি উইলিয়াম তাঁর কাব্যে সাধারণ মানুষের জীবনাচরণ, মানবিক বৈশিষ্ট্য এবং আবেগ-অনুভূতির কথা অত্যন্ত নান্দনিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তবে প্রকৃতির কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত।

default-image

উত্তর ইংল্যান্ডের ককারমাউথ গ্রাসমেয়ারে ১৭৭০ সালের ৭ এপ্রিল উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের জন্ম। জন ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও অ্যান বুকসনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছেলেবেলায় বাবার কাছে মিলটন, শেক্‌সপিয়ার ও স্পেনসারের কবিতা শিখেছেন। তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৭৯১ সালে। এরও আগে ১৭৮৭ সালে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর প্রথম সনেট প্রকাশিত হয় দ্য ইউরোপিয়ান ম্যাগাজিনে। এরপর তিনি ওয়াচম্যান নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তখন ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। কোলরিজের অনুপ্রেরণায় ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁদের যৌথ কাব্য ‘Lyrical Ballads’। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে তাঁর কবিতা।

নিচের অসাধারণ পঙ্‌ক্তিমালা থেকে অনুধাবন করা যায় কবি কীভাবে প্রকৃতি অন্বেষণ করতেন। ‘Five years have passed; Five summers, with the length/ Of five long winters! and again I hear/ These waters, rolling form their mountain springs/ With a soft inland murmur. Once again/ Do I behold these steep and lofty cliffs,/ Which on a wild secluded scene impress/ Thoughts of more deep seclusion, and connect/ The landscape with the quiet of the sky.' (Lines Composed a Few Miles above Tintern Abbey, On Revisiting the Banks of the Wye during a Tour. July 13, 1798, By William Wordsworth)
তবে Tintern Abbey উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের সর্বাধিক বিখ্যাত কবিতা, এটি ১৭৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নাটকীয় উপাদানে সমৃদ্ধ। কবিতাটি ওয়াই নদীর ওয়েলশ তীরে মনমাউথশায়ারের টিনটার্ন গ্রামে অবস্থিত একটি ছোট জায়গার ওপর ভিত্তি করে। এই কবিতার মাধ্যমে কবি তাঁর পাঠকদের প্রকৃতি ও তার সৌন্দর্য সম্পর্কে নিজস্ব দর্শন বোঝাতে চেয়েছেন।

default-image

১৮০৭ সালে প্রকাশিত কবিতা ‘Solitary Reaper’ পড়লে অন্য রকম ওয়ার্ডসওয়ার্থের দেখা মেলে। একটি অল্পবয়সী মেয়েকে নিয়ে অপূর্ব গীতিনাট্য। গীতিকার এবং গানের সুর ও অভিব্যক্তি যেকোনো পাঠক মন্ত্রমুগ্ধ হন। অবশ্য উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের সবচেয়ে আলোচিত কবিতা হচ্ছে ‘The prelude or, growth of a poet's mind; an autobiographical poem’। এই কবিতার কেন্দ্রবিন্দু ও শৈলী থেকে বোঝা যায়, নব্য ক্ল্যাসিক্যাল ধারা থেকে কবিতাটি রোমান্টিক ধারার দিকে ঝুঁকেছে। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত একটি আত্মজীবনীমূলক কথোপকথন। ১৭৯৮ সালে ২৮ বছর বয়সে উইলিয়াম কবিতাটি রচনা শুরু করেন এবং সারা জীবন ধরে আপডেট করেছিলেন। তিনি এই কবিতার কোনো শিরোনাম দেননি। ১৮৫০ সালে তাঁর মৃত্যুর তিন মাস পর প্রথম প্রকাশিত হয় এবং শিরোনামটি দেন তাঁর স্ত্রী মেরি।

লেক ডিস্ট্রিক্টের গ্রাসমেয়ারে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়ির কাছে রয়েছে একটি ছোট দর্শনীয় লেক। সবাই একবার সেখানে যায়। তার উত্তর প্রান্তে ক্ষুদ্র গ্রাম উভয়। রোমান্টিক কবিদের কাছে সবচেয়ে বিখ্যাত। সেখানে রয়েছে ডোভ কুটির। যেখানে উইলিয়াম তাঁর বোন ডোরোথি এবং স্ত্রী মেরিকে নিয়ে বেশির ভাগ বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন। আর এখানেই কবি সস্ত্রীক চিরনিদ্রায় শায়িত। এখান থেকে অনতিদূরে রয়েছে ওয়ার্ডসওয়ার্থ জাদুঘর। একসময় অভিজাত ইংরেজ শিল্পপতিরা গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলো লেক ডিস্ট্রিক্টে কাটাতেন। ফলে তাঁরা খুবই আকর্ষণীয় ডিজাইনের বাড়িঘর বানিয়েছেন। কয়েক শ বছর আগের এই সুবিশাল বাড়িগুলো এখন কটেজ, গেস্টহাউস ও হোটেল হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে।

বাড়ির আমেজে ছুটি কাটাতে কটেজ বেশ উপযোগী। লোকেশনের ওপর ভাড়া নির্ভর করে। উঁচু টিলা বা পাহাড়ের ওপর বাড়িগুলো পর্যটকদের অধিক পছন্দ। আমাদের পারিবারিক ট্যুর ছিল। তাই হোটেলে না গিয়ে কটেজ নিয়েছিলাম। সে হিসেবে আগেই বুকিং দেওয়া ছিল। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ওঠানামা করতে হয়। বিশাল উঁচুতে মনভোলানো কাঠের বাড়ি।

এখানে পাহাড় ও আকাশের মধ্যে দূরত্বটা খুব কম মনে হয়। অভূতপূর্ব সৌন্দর্যদৃশ্য। কবির ভাষায়, ‘ওপরে পর্বতের ঢেউরাশি গোধূলির বাঁকে। নিচে ঝরনার হাসি রংধনু বনের ফাঁকে।’

বিস্তীর্ণ বনভূমিতে আশপাশের পাহাড় ও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে সবাই পুলকিত। কিন্তু বৃষ্টির সময় পাথর বাঁধানো আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু রাস্তা থেকে শিশুদের ছিটকে পড়ার ভয়ে মনটা শিহরিত হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের পাশে লেক বা নদী হলে মজাই আলাদা। আমরা যেখানে ছিলাম, তার পাশে লেক সাইডে ভিক্টোরিয়ান স্টিমার রাখা আছে। মন চাইলেই ঘুরে বেড়ানো যায়। এখানকার পাহাড় হলো একটি ভূমিরূপ, যা পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডে প্রসারিত। নানা উচ্চতা থেকে দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর।

জায়গাটা ন্যাশনাল পার্কের ফ্রন্ট সাইট হওয়ায় দেশি-বিদেশি মুভির শুটিংও হয়। এখানে প্রধান ঝরনার উৎপত্তিস্থল। পাথরের গায়ে ছুটে চলা ঝরনার তুমুল গর্জনে আমরা বারবার অভিভূত হয়েছি। পাহাড়ের ঢালে সবাই বাহারি ফুল আর মায়াবী গাছপালায় ছবি তুলেছে। গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় সেলফির ব্যবহার ছিল লক্ষণীয়।

লেক ক্রজিংয়ের দিন ছোটদের আনন্দের সীমা ছিল না। সকালবেলা বৃষ্টি দেখে মনটা খারাপ হয়েছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যঝলমল আকাশ দেখে তারা হেসে উঠল। সারা দিন ইঞ্জিনের নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি মনে রাখার মতো। বৃহদাকার লেক দেখে সমুদ্রের মতো মনে হয়। তবে এই সমুদ্র প্রায় সরোবরের মতো শান্ত। বিভিন্ন স্থানে নৌকা বাঁধার ঘাট ও খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আপডেট তো আছেই।

প্রাতরাশ সেরেই রোদচশমা চোখে সবুজ পাহাড়ের কোলে বেরিয়ে পড়তাম। নির্মল বাতাসে হালকা রঙের পোশাকে দৌড়াতে খুব ভালো লাগে। হাসি-আড্ডা, মজা-মাস্তি আর ঘোরাঘুরি। ফুর্তির মেজাজে গোটা এলাকা। স্যুভেনিয়র শপে টুকিটাকি উপহার কেনাকাটার প্রয়াস লক্ষণীয়। ক্যাফেতে জমিয়ে পানাহার চলছে। ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকানে সবচেয়ে দীর্ঘ সারি।

সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল ঘরের পাশে চমৎকার পাখির বাসা। যেন নানা প্রজাতির পাখির আশ্রয়কেন্দ্র। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে পাখির কোলাহলের কথা মনে পড়ে। এদের নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লিখেছি।

default-image

লেক ডিস্ট্রিক্টে ঘুরে বেড়ানোর সময় উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ড্যাফোডিলস ফুলের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আজও সমানভাবে দৃশ্যমান। ১৮০৭ সালে লেখা কবিতার বঙ্গানুবাদ হলো, ‘আমি মেঘের মতো একাকী ঘুরে বেড়াই/ মেঘ ভেসে যায় পাহাড় আর উপত্যকায়/ আমি তখন অবলোকন করি সমাবেশ/ স্বর্ণালী ড্যাফোডিল শাখায় শাখায় পল্লবিত/ লেকের পাশে, গাছের নিচে/ মৃদুমন্দ বাতাসে নেচে নেচে দোল খায়/ উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অবিরাম/ ছায়াপথে আলো জ্বলজ্বল করে/ সুবিন্যস্ত তারকারাজির সারি শেষ অবধি/ দশ হাজার আমি এক নজরে দেখেছি/ নৃত্যে মাথা নাড়ানোর স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্য/ কিন্তু তারা উল্লাসে ঝলমলে/ ঢেউগুলোও ছাড়িয়ে যাচ্ছে/ এমন আমুদের সঙ্গ পাওয়া কবি/ বিহ্বল না হয়ে পারে না/ আমি শুধু ভাবলাম এবং তাকালাম/ এই দৃশ্যের মাঝে কী সম্পদ রয়েছে, যা আমার জন্য ছিল/ প্রায়শ আমি যখন শূন্য মনে/ চিন্তিত মেজাজে/ সোফায় শুয়ে থাকি ফুলগুলো আমাকে ঝলকানি দেয়/ নির্জনতার আনন্দে/ আমার হৃদয় ভরে যায়/ নেচে ওঠে ড্যাফোডিলের সাথে।’ (I Wandered Lonely as a Cloud by William Wordsworth)

লেখক: লন্ডনপ্রবাসী। সময় সম্পাদক, কবি ও কথাশিল্পী

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন