default-image

কায়সার কিছুদিন হলো নিজেকে একটু গুটিয়ে নিয়েছেন। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, সেগুলোও ভালোমতো এগোচ্ছে না। বন্ধুদের কাছ থেকেও কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। সবাই জানতে চায়, এখন কী অবস্থা, যোগাযোগ আছে কি না। অনেকেই নতুন কাউকে নিয়ে ভাবার জন্যও বলেন।

রিশা কায়সারের জীবনে আশীর্বাদ ছিল একসময়, এখন তিনি গলার কাঁটা। পারিপার্শ্বিক চাপ, আর অন্যদিকে এত দিনের স্মৃতি, আবেগ। কাকে বোঝাবে, এটা সহজে ছিন্ন করার নয়! কোরবানির গরুর প্রতিও তো মালিকের আবেগ জড়িয়ে থাকে। শুধু তাঁরাই হয়তো অনুধাবন করবেন, যাঁরা এটার মধ্য দিয়ে গেছেন।

কয়েক দিন পর কায়সার জানতে পারেন, গত রাতে জুলিয়ানার ভাইকে ডাক্তাররা আর বাঁচাতে পারেননি। অভিভাবক শূন্য এখন জুলিয়ানার পরিবার। মায়ের সঙ্গে ছোট এক বোনও আছেন। জুলিয়ানা কানাডায়, আর এক বড় বোন যুক্তরাষ্ট্রে। কেউ দেশে যেতে পারবেন না কোভিড ভ্রমণ বিধিনিষেধের কারণে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়, সৎকারের পুরো অনুষ্ঠানটা লাইভে দেখবেন। পরিবারের এই সংকটকালে ভার্চ্যুয়ালি হলেও পরিবারের সদস্যরা কাছে থাকার চেষ্টা করবেন।

কায়সারের আজ সাপ্তাহিক ছুটি। কায়সারের যাওয়া দরকার, কাছে থাকা দরকার। অন্তত অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও। এমন সময়ে সামান্য সহানুভূতি তো অন্য সময়ের হাজার গুণের সমান।

default-image

জুলিয়ানা বাসায় একা। দেয়ালে ঝোলানো টিভির বড় স্ক্রিনের দিকে বিষণ্নতায় ভরা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কায়সারের বাসায় ঢুকতে তাঁকে আর ডাকতে হয়নি। দরজা খোলাই ছিল। হয়তো জুলিয়ানা জানতেন, কায়সার আসবেন, তখন যেন আর দরজা খুলতে না হয়। তাঁর যে নড়াচড়া করার ইচ্ছাশক্তিই হারিয়ে গেছে। শুধু তাঁর দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, কায়সার, তুমি আসছো? কায়সার মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে বললেন, সবই নিয়তি জুলিয়ানা। তারপর দুজনেই ভাইয়ের শেষ বিদায় দেখতে থাকেন। কোনো কথা যেন আর আসে না। দুজনেই জানেন এসব শুধুই বলার কথা, তার চেয়ে বরং এটাকে একান্তে অনুধাবন করাই শ্রেয়।

বিজ্ঞাপন

নীরবতা ভাঙে হঠাৎ রিশার কল পেয়ে। হকচকিয়ে কায়সার বাসার বাইরে বেরিয়ে আসেন। গায়ে একটি টি-শার্ট, প্রচণ্ড ঠান্ডা, মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আসলে তিনি মনের অজান্তেই বের হয়ে আসেন। তাঁর মন যে শীতের ভারী জ্যাকেট জড়ানোর মতো সময় দিতে চায়নি। কায়সার শিহরিত, কেমন আছো, রিশা? আমি ভালো, তুমি ভালো? আমি ভালো আছি, বেঁচে আছি শুধু তোমার জন্য। পাগলামি কোরো না।

তুমি যোগাযোগ বন্ধ করো কেন? আমি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করি না এখন, অনেক চাপে আছি। শুধু মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলি। আমি তোমাকে কল দেব না, আমায় ব্লকড কোরো না, টেক্সট করলে তুমি তোমার সময়মতো উত্তর দিয়ো। আচ্ছা ঠিক আছে। কায়সার ঠান্ডায় জমে যান, হাত, কান ফ্রোজেন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তারপরও কায়সার আর একটু কথা বলতে চান। কিন্তু রিশা আগ্রহ দেখান না।

default-image

কায়সার দ্রুত বাসার ভেতরে আসেন। জুলিয়ানা জানতে চান, কে কল দিয়েছিল, খুব দরকারি ছিল মনে হয়? হ্যাঁ, বাসার কল, একটু পারিবারিক ঝামেলা তাই। জুলিয়ানা কথা না বাড়িয়ে কম্বল এগিয়ে দেন, গা গরম করার জন্য। আবার একমনে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন দুজন। কায়সার তাকিয়ে থাকলেও মনে মনে এখনো রিশার রহস্যময় চরিত্র উঁকি মারে। এক ফাঁকে মোবাইলে স্ক্রলিং করে দেখতে চান, রিশা কি আবারও ব্লকড করেছেন। হ্যাঁ, সত্যি আবারও! কায়সার চেষ্টা করে রিশার আবেশ সরিয়ে ফেলতে, জুলিয়ানার ব্যথায় নিজেকেও ব্যথিত করতে। জুলিয়ানা ক্রিশ্চিয়ান, তাঁদের ধর্মীয় রীতি মেনে সৎকার করা হবে। কোভিড ভয় ও বিধিনিষেধের কারণে খুব বেশি আত্মীয়স্বজনও বাড়িতে আসেনি। তাই দ্রুততার সঙ্গেই শবযাত্রা প্রস্তুত হয়ে যায়। শবযাত্রার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জুলিয়ানা ও কায়সার। এটাই যে শেষ দেখা। একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। আজ জুলিয়ানাকে বেশ শক্ত মনে হচ্ছে। হয়তো কষ্টের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ততক্ষণে দিন গড়িয়ে, রাত হয়েছে, কায়সার জানতে চান, জুলিয়ানা কিছু খাবা? জুলিয়ানা গরম কিছু খেতে চান। ফুড ডেলিভারি সার্ভিস থেকে লেন্টিল সুপ ও ফিশ মান্ডি অর্ডার করেন কায়সার। কায়সার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে কাঁধে মাথা রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন জুলিয়ানা।

হয়তো, কায়সারের কাঁধে কষ্টের ভার কিঞ্চিৎ দিতে চান জুলিয়ানা। জুলিয়ানা বলেন, কাল আবার এসো, মনটা ভালো না, দেখা করে যেয়ো। কায়সার আজ অনেক ক্লান্ত। ঘুমাতে যাওয়া দরকার। শুয়ে রিশার কথা ভাবতে থাকেন, আবার কোন ধান্দা করছে কি রিশা? কোনো ভরসা পান না রিশার ওপর। কায়সারের মনে হয় এই পৃথিবীতে সে বুঝি একা। বেঁচে থাকার মানে হয় না। একরাশ নিঃসঙ্গতা ভর করে। বুকটা হাহাকার করে ওঠে। মনে হয় এই পৃথিবী যেন এক বিশাল মরুভূমি। জুলিয়ানার কথাও মনে আসে, তাঁর বয়স, প্রাচুর্য, বেঁচে থাকার অর্থ, পরিবার-পরিজন।

default-image

রিশা কায়সারকে আঘাত দিয়েছে, এটি অনেক বড় আঘাত, যেটি আগে কখনো পাননি। একটু টেক্সট, একটু কথা বলা, আবার ব্লকড হয়ে যাওয়া, তালগোল পাকিয়ে ফেলেন কায়সার। হিসাব মেলাতে পারেন না। কায়সারের মনে হয়, রিশা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। কোথায় থামবে, কখন থামবে, এটি জানা নেই তাঁর। কিন্তু তার একটা পরিণতি জানা প্রয়োজন। আশা-নিরাশার মাঝখানে বেশি দিন থাকতে চান না কায়সার।

কায়সার জানে, এই পৃথিবী সাময়িক। এখানে আসা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এখানে সবাই ভালো থাকতে চেষ্টা করে। তবে ভালো থাকা একেকজনের কাছে একেক রকম। কায়সারের ভালো থাকা মানে, মনকে ভালো রাখা। মনকে ভালো রাখতে হলে মনের পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুলোকে ভালো রাখা। একাই ভালো থাকা যায় না, কায়সার বিশ্বাস করে। সবাইকে নিয়েই থাকতে হয়। কায়সারের ঘুম এখনো আসে না। পৃথিবী নিয়ে, পৃথিবীর মানুষগুলো নিয়ে ভাবতে থাকে। রিশা একজন। শুধু একজনের কাছে তো কায়সারের ভালো থাকা বন্দী থাকতে পারে না। যদি একজনের কাছে এ জীবন বন্দী থাকে, তাহলে তো এটা একটি দেশের একনায়কতন্ত্রের সমান। জীবন একনায়ক নয়, এটা সবার, সবার সঙ্গে উপভোগ করাই জীবন, এটাকে গণতান্ত্রিক করা দরকার।

কায়সার গণতান্ত্রিক হতে চান। যেখানে প্রতিশ্রুতি থাকবে, বিশ্বাস থাকবে, যেখানে স্বার্থপরতা থাকবে না। স্বার্থপরতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, নিঃসঙ্গ করে তোলে। এটি ছোঁয়াচে রোগের মতো, একজন থেকে আরেকজনের কাছে যায়। কায়সার উদ্যমী হতে চান, এখান থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। কায়সার সবার সঙ্গে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে চান। জীবন একটি উপন্যাসের মতো। অনেকগুলো অধ্যায় থাকে, রিশা তার একটি অধ্যায় মাত্র। কায়সার নীতি–নৈতিকতাকে বিসর্জন দেবেন না। আগের মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়াতে চান, যেখানে রিশার মতো ক্ষুদ্র স্বার্থ থাকবে না। প্রকৃতির সঙ্গে যার ভালোবাসা অটুট, তাকে সহজে টলানো যায় না। কায়সারও তা–ই। সব বিপদে প্রকৃতিকে পাশে পেতে চান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো যেমন সাময়িক ধ্বংসলীলা চালায় প্রকৃতিতে, প্রকৃতি তার নতুন রূপে আবার ফিরে আসে। হয়তো আরও শক্তিশালী হয়ে। চলবে...।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউব্রান্সউইক, ফ্রেডেরিক্টন, কানাডা।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন