বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রিশা আমি তোমার শহরে এসেছি, কয়েক দিন থাকব, দেখা করবে?
কেন এসেছ, অফিসের কাজে?
না, অফিসের না। আমার ভাই ও ভাবি এখানে ঘুরতে এসেছেন, তাদের সঙ্গে দেখা করতে।

হ্যাঁ, করা যায় কোনো একসময়, আমার যেদিন ব্যস্ততা একটু কম থাকবে। আমার কাজের ‍শিডিউল পেলে জানাব।

কায়সার আশা নিয়ে থাকে, এবার হয়তো দেখা হবে। দেখা হলে যেভাবেই হোক তার যত অভিমান আছে ভাঙতে হবে।

কায়সারের সময় ভালোই কাটে ভাই-ভাবি ও ছোট একটা ভাতিজির সঙ্গে। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। শপিং মলে যান। বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় যায় দেশি খাবারের স্বাদে। সবার সময় খুব ভালো কাটলেও কায়সারের চোখ যেন রিশাকে খোঁজে চারদিকে, হয়তো রিশার দেখা পাবে কোনো শপিং মল বা রেস্তোরাঁয়। একসময় তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি এক ছাত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার নাম আশিক। সে মিশুক, সবার সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারে। কায়সার তার যোগাযোগের বিস্তারিত রেখে দেয়, পরে কথা বলবে বলে।

রাতে আশিকের সঙ্গে কথা বলে কায়সার, কথা হয় রিশাকে নিয়েও। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সব শোনে আশিক। আশিক ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের হলেও সে রিশাকে চেনে। যতটুকু জানে, রিশা এখানে আসার পর বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রাখলেও এখন তেমন রাখে না। মাঝেমধে৵ বড় অনুষ্ঠানগুলোতে যায়, তবে কারও সঙ্গে তেমন আন্তরিক না। শুনেছে, সে সাদা কানাডিয়ানদের সঙ্গে বেশ মেলামেশা করে।

কায়সারের অস্থিরতা বেড়ে যায়। রিশাকে ফোন করে, কিন্তু রিশা ধরে না। টেক্সট করে কায়সার।

রিশা, আমি তো চলে যাচ্ছি পরশু, তুমি কি দেখা করতে পারবে, কাল বা পরশু সকালে?
পরশু তোমার ফ্লাইট কখন?
বেলা ২টায়।
ঠিক আছে, আমরা তাহলে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে বিমানবন্দরের বাইরে দেখা করি?
সত্যি, আসবে?
হ্যাঁ, আসব, আমার ক্লাস আছে, দ্রুতই চলে যাব।
আচ্ছা। দারুণ হবে। ভালো থেকো।

কায়সার অনেক উত্তেজিত, কী বলবে রিশাকে? রিশাকে কি এখনই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দেবে। কায়সার তো এখন স্থায়ী বাসিন্দা। বিয়ে হলে রিশারও তা–ই হবে। রিশা কি রাজি হবে? হবে হয়তো। তার টিউশন ফি–ও কমে যাবে, আগের মতো এত কষ্ট আর করতে হবে না। কায়সার মন স্থির করে ফেলে, যদি রিশা রাজি হয় তো সেদিনই বিয়ে করবে।
সোমবার সকালবেলা ভাই-ভাবিকে বিদায় দেয় কায়সার। তারপর নানা পরিকল্পনা মনের মধ্যে আঁকতে থাকে। কায়সারের সময় যেন যেতে চায় ‍না। পায়চারি, কফি, অস্থিরতা, বার বার সময় দেখা। চারদিকে চোখের সীমানায় এখনো রিশা নেই। একটু পরে রিশার টেক্সট, ‘কায়সার, আমি দুঃখিত, আজ চারটার মধ্যে একটি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ সময়। আমি ভাবছিলাম, শেষ করতে পারব, কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। মনে কিছু করো না, এবার যাও, পরের ছুটিতে নিশ্চিত আমাদের দেখা হবে।’
একরাশ হতাশা নিয়ে কায়সার আশিককে ফোন দেয়। যাওয়ার আগে শেষের ঘটনাটা জানাতে চায়। যদি কোনো তথ্য থাকে তার কাছে। আশিক তখন বাসায়, একটু আগে ক্যাম্পাস থেকে এসেছে। রিশা ও তার বন্ধুদের সঙ্গে আশিকের তখন একটা ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্টে দেখা হয়েছিল। কায়সার বুঝতে পারে, রিশা এবারও তাকে ধোঁকা দিয়েছে। নিজের ওপর তার রাগ আরও বেড়ে যায়। এত কাছে এসে আর একটু দেখতে চায় কায়সার।

কাল পারবে সময় বের করতে? আমি আজ থেকে যেতে পারি।
তুমি এবার যাও, পরেরবার দেখা হবে। ক্রিসমাসের ছুটিতে, তখন লম্বা ছুটি থাকবে।
না, যেহেতু এলাম। আমার কোনো সমস্যা নেই থাকতে। তুমি যদি পারো। পরে আবার আসব।

হুম, হ্যাঁ, সকাল ১০টায়। যদি তোমার সমস্যা না হয়।
আমি পরে যাওয়ার টিকিট নিশ্চিত করতে চাই। তুমি কি সারা দিন অবসর আছ?
হ্যাঁ, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
খুবই ভালো হয়। আমি তাহলে থেকে যাচ্ছি তখন পর্যন্ত। তুমি অনেক ভালো। অনেক ধন্যবাদ, রিশা। কাল দেখা হবে।
হ্যাঁ, ভালো থেকো। তোমাকে অনেক দিন পরে দেখতে পাব! আর হ্যাঁ, আমরা কোথায় কোথায় যাব মাথায় রেখো।

কায়সার আশিককে ফোন দিলে সে তার বাসায় যেতে বলে। তাকে প্রথম দেখায় ভালো মানুষ মনে হয়েছে। তাই তাকে বিশ্বাস করে কায়সার। রিশা সম্পর্কেও বিস্তারিত বলা যাবে। আর যদি বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়, তখনো সহযোগিতা পাবে।

আশিকও অবিবাহিত। ভিন্ন ভিন্ন দেশের তিনজন ছাত্রের সঙ্গে একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। থাকতে সমস্যা হবে না, তবে বেড ভাগাভাগি করে থাকতে হবে। রাত পার করতে পারলেই হলো কায়সারের। তাছাড়া বড় কথা, রিশার খোঁজখবর জানে এমন কাউকে কায়সারের বড়ই দরকার।

রাতে তাদের কথা হয়, রিশার পুরো ঘটনা আশিক জানতে চায়। আশিক কায়সারকে আশ্বস্ত করে, সক প্রয়োজনে পাশে থাকবে। রিশা কানাডায় আসার পর থেকে আশিক যা জানে, তা কায়সারকে বলে। সে শুরুর দিকে অনেকের সহযোগিতা নিয়েছে। বাসা ভাড়া নেওয়া, রাইড নেওয়া, এখানকার সবকিছুর সঙ্গে পরিচিত হওয়াসহ অনেক কিছুতেই। বন্ধুদের বাসায় আড্ডা, কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠান সবখানেই তাকে পাওয়া যেত। তারপর এখন আর সে বাংলাদেশি কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখে না। তার কাছের বন্ধুবান্ধব বলতে এখন ভিনদেশি লোকজন। সে আগের বাসা পরিবর্তন করে নতুন করে বাসা নিয়েছে। কোথায় থাকে, রুমমেটরা কারা এসব সম্পর্কে আশিকের এখন ভালো ধারণা নেই।

আশিক নিশ্চিত না, রিশা কি কায়সারের সঙ্গে যাবে? কাল কি সে আসলেই আসবে! এই অল্প সময়ে আশিক কায়সারকে যতটুকু জেনেছে, আর রিশাকে যা জানে, তাতে তাদের পরিণতি নিয়ে একটি ধারণা হয়ে গেলেও তা কায়সারকে বলতে পারে না। ঘুমানোর আগে দুজনে ছোট একটি পরিকল্পনা করে কালকের জন্য। যাই হোক, আশিক চায় কায়সার বা কায়সারের মতো মানুষেরা ভালো থাকুক।

রিশা কথা রেখেছে। সকালে কফি শপে দেখা হয়। অনেক দিন পরে দেখা। প্রথম দেখা কানাডায়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা দায়। অনেক কিছু দেওয়ার ছিল কায়সারের। যা হয়ে গেল এতদিন, অবশ্য তাতে দেওয়ার কিছু নেই। আছে শুধু একরাশ বোঝার, বোঝানোর আর সত্য মিথ্যাকে যাচাই করার। কায়সার কিছু সময় ‍শুধু রিশার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে। এই চোখ কি সেই চোখ, যা শেষ বার দেখে এসেছিল! রিশা একটু পর মাথা নিচু করে ফেলে, নিজেকে যেন অপরাধী মনে করে। দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কায়সার জানতে চায়, ‘কেমন আছ?’, রিশা মাথা নিচু করেই জবাব দেয় ‘ভালো’। রিশা অনেকখানি শুকিয়েছে। নিশ্চিত অনেক কষ্ট হচ্ছে এখানে। এখন কথা বেশি না বাড়িয়ে সকালের নাশতা করে দুজনে ঘুরতে বের হয়। তারা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যায়। ধীরে ধীরে রিশা স্বাভাবিক হয়। কায়সারের মনে হয়, বাংলাদেশেরই কোনো এক জায়গায় তারা ঘোরাঘুরি করছে।

রিশার কাছে অনেক জানার আছে কায়সারের। রিশা কোনো ফান্ড নিয়ে আসেনি। টিউশন ফি, থাকা–খাওয়া সবকিছুই নিজে থেকে জোগাড় করতে হয়। তাই স্বভাবতই বেশি করে খণ্ডকালীন চাকরি করতে হয়। সব জোগাড় হয় না, কিছু টাকা দেশ থেকেও আনতে হয়। এখানকার পড়াশোনার ধরনও আলাদা, অনেক বেশি লেগে থাকতে হয়। প্রতি সপ্তাহে তিন-চারটি করে অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাস, তাই সে অনেক ব্যস্ত থাকে।

রিশাকে এখনো ঠিক আগের মতোই লাগে কায়সারের। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এখন কানাডায় ফল চলছে, চারদিকের সব গাছের পাতাগুলো যেমন নানা রঙে সেজেছে, তেমনি কায়সারের মনও যেন রঙিন। রিশাও কায়সারের চাকরি, স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সব জেনে অনেক খুশি। কায়সার জানতে চায়, রিশার কী হয়েছিল এতদিন, কেন–বা তার সঙ্গে এমন আচরণ করল। রিশা সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় যে, কায়সারকে বিস্মিত করে দেওয়া ও রিশার নতুন সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যস্ততাই এর কারণ। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে পরে বলবে বলে জানায়।

কায়সার বেশি জোর করতে চায় না। এখান থেকে আবার নতুন করে শুরু করতে চায়। বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতে রিশা আরও সময় চায়। তাতে কায়সারের আপত্তি নেই। শুধু একটাই চাওয়া, ‘যোগাযোগ নিয়মিত রাখবে?’

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউব্রান্সউইক, ফ্রেডেরিক্টন, কানাডা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন