default-image

আমি থাকি লন্ডনের একটু বাইরে। এশিয়ান, ইউরোপিয়ান, সাউথ আমেরিকান, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান—সব মহাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করি। তাদের জীবনকে কাছ থেকে দেখি।

মানুষের আচরণ আমার কাছে সব সময় ইন্টারেস্টিং লাগে। কে কোন পরিস্থিতিতে কী ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া করে তা লক্ষ করি।

ইভলভিং মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। তাই মানুষকে একজন নারী বা পুরুষের চোখ দিয়ে দেখি না, তাকে ব্যক্তি হিসেবেই দেখি।

আমার এক পাকিস্তানি বান্ধবীর ছোট ভাই জুবায়ের। তার সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়। সে জীবন নিয়ে বেশ বেহিসাবি। আমার ছোট ভাই বেঁচে থাকলে তার বয়সী হতো। আমরা বেহিসাবি কমবেশি অনেকেই।

একদিন জুবায়েরের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। আলাপের একপর্যায়ে প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য জুবায়ের আমার বাংলাদেশের শৈশবের গল্প শুনতে চাইল। আমি সানন্দেই রাজি হলাম। আমার ম্যাজিক্যাল শৈশব ছিল জাপানিজ শিশুতোষ গিগ্লি স্টুডিওর সহজ, নিষ্পাপ অ্যানিমেশন ফিল্মের গল্পের মতো। জুবায়েরের কাছে তার গল্প করতে লাগলাম।

পুরোনো বিমানবন্দরের পাশে আজকের শাহিনবাগ বলে কিছু ছিল না তখন। জায়গাটাকে তেজগাঁও বলা হতো। বাড়ির পেছনে বিশাল বিল, যা নাবিস্কো, মহাখালী, নাখালপাড়াকে আলাদা করে রেখেছিল। শীতের সময় সেই বিলে পানি থাকত না। নিচু জমিগুলোতে মৌসুমি সবজি, ধানের চাষ করা হতো।

দুপুরে মা ঘুমিয়ে গেলে হলুদ শর্ষে ফুলের মাঠে খালি পায়ে ঘোরাঘুরি রুটিন কাজ ছিল। বর্ষার সময় এটা মিনি চলনবিল আমার কল্পনায়। চিনি না জানি না ছোট জেলে নৌকায় উঠে যেতাম। বিল থেকে শাপলা ফুল উঠিয়ে ঝুম দুপুরে নৌকার পাটাতনে যে একা বসে থাকেনি, সে এর অনুভূতি বুঝবে না।

মাঝি আমার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে তার কাজ করে যেত। বিলে জাল ফেলা, মাছ বাছা, পাটাতনের নিচ থেকে থালা দিয়ে পানি সেচা ইত্যাদি। আমাকে একবার মাঝি পানি সেচতে দিয়েছিল। মাঝিকে আমি ধারণা দিতাম আমি সাঁতার জানি। নৌকা ডুবলে সমস্যা নেই।

default-image

তখন বয়স আমার আট-নয়। চাইল্ড অ্যাবিউজ নিয়ে চিন্তা ছিল না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল, আশপাশে দানব দেখিনি। মসজিদে আসরের আজান দিলে খেয়াল হতো, আম্মা ভাত ঘুম শেষ করে উঠবেন। জেলে বলতেন, তোমার মাকে বলো, অবেলার জালে ধরা এই ছোট মাছগুলো কিনে নিতে।

আম্মা আসর নামাজের আগে অথবা পরে আমাকে দেখতেন। ভাবতেন জেলেকে দেখে গেট খুলে দিয়েছি। আম্মা জেলের জালের ধরা খলিশা, তাজা পুঁটি, শিং, ছোট বাইন, রয়না মিক্সড মাছ কিনে নিতেন।

তখন ফ্রিজ ছিল না। বিকেলে মাছ কেটেকুটে রান্না হতো। বাসার কাজের সহকারী বলত, গোসল আর ভাত খাওয়ার পরে বিকেলে মাছ কাটতে কষ্ট হয়। তাকে মাছ কাটতে হবে ভেবে সেই জেলের নৌকায় আর উঠতাম না। বরং পাশের বাড়ির পুকুরে কলাগাছ নিয়ে দাপাদাপি হতো। বিকেলে কাদাভরা পা, ভেজা কাপড় নিয়ে বাসায় ফিরলে চড়থাপ্পড় জুটত। কিন্তু পরের দিন সেই একই কাজ! কেয়ার ফ্রি দিন।

ঢাকায় থেকেও গ্রামের একটা জীবনের হাতছানি ছিল। বিটিভিতে রোববারে বাংলা সিনেমা, রাতে মিউজিক ওয়ার্ল্ড, সলিড গোল্ড, ডালাস, দ্য সেন্ট, সিক্স মিলিয়ন ডলারম্যান, ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট দেখার জেনারেশন আমরা।

সন্ধ্যায় ইলেকট্রিসিটি চলে যেত। হারিকেন মজুত থাকত। হারিকেনের কেরোসিনের গন্ধ খুব ভালো লাগত। কাপড়ের ন্যাপথলিন, মাটিতে প্রথম বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ এখনো ফিরে ফিরে আসে। ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে পড়ার টেবিল থেকে মাথা ধরার অজুহাত দেখিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসতাম। খুব অল্পে খুশি হওয়ার দিন ছিল তখন।

default-image

আমার স্বভাবে পাগলা একটা ভাব ছিল। সম্ভবত, এই ক্রেজিনেস আমার চালিকা শক্তি এই পরিণত বয়সেও। গলার সোনার চেইন, আম্মার ভালো শাড়ি তাঁকে না বলে ফকিরদের দিয়ে দিতাম। এটাকে ঠিক দানশীলতা বলব না, মহল্লার স্কুলে ‘মীর কাশিম’ নামে এক নাটকে দেখেছিলাম, মহারাজা গলা থেকে মালা খুলে কাকে কাকে দিয়ে দিচ্ছেন। সেই মহারাজার অনুভূতি পেতে গলার চেইন, ভালো কিছু দেওয়ার প্রবণতা ছিল।

এখন নস্টালজিক হই জগজিৎ সিংয়ের সেই বিখ্যাত গজলটি শুনলে। এর কয়েকটি লাইনের আমি বাংলা অনুবাদ করেছি।

‘আমার ভাগ্য নিয়ে যাও

কিন্তু শৈশব ফিরিয়ে দাও।

আমার যৌবন নিয়ে যাও

শৈশব ফিরিয়ে দাও।

আহা! সেই কাগজের নৌকা আর বরষার পানি।’

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন