এক.
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। মাঝরাতে একবার ঘুম ভেঙে গেলে আর সহজে ঘুম আসতে চায় না। আজকের পরিকল্পনা ছিল এই ডাকবাংলোর সঙ্গে লাগোয়া শনির হাওরে একটা নৌকায় করে সারা দিন ঘুরে বেড়াব। গুগল ম্যাপে জায়গাটা ভালো করে দেখে নিয়েছিল সে। এখান থেকে সোজা কিছু দূর যাওয়ার পর শুরু হবে শনির হাওর। তারপর সাত থেকে আট কিলোমিটার যাওয়ার পর একটা জাদুকাটা নদীর শাখা নদী পার হলে শুরু হবে টাঙ্গুয়ার হাওর। কিন্তু গতকাল রাতের পর সব চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, এখনো বাচ্চাটিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী খুব সকালবেলায় স্থানীয় একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে ছুটে চললেন ফজলু মিয়ার বাড়িতে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা থেকে বাড়ি একটু দূরে, পলাশপুরে। মোটরসাইকেল চালক ছেলেটির নাম সাদ্দাম। স্থানীয় কলেজে পড়ে। নিজের নামটি বলতে বেশ লজ্জা পেল। তাই পুরু নামটি আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না। খুব সম্ভবত ছেলেটির নাম সাদ্দাম হোসেন। মানুষ কোনো ব্যর্থ মানুষের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চায় না। হয়তো ওর বাবা শখ করে ছেলের নাম রেখেছিলেন। ছেলেটিকে বেশ চালাক–চতুর মনে হলো আহসানের। ওর কাছ থেকে চেয়ারম্যান সাহেব সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে চেষ্টা করল। প্রথম দিকে একটু জড়তা থাকলেও শেষে নতুন কিছু তথ্য দিল। বেশ চমকে যাওয়ার মতো। এতে করে খুব সহজেই বুঝে গেল ফজলু মিয়াকে তাঁর বাড়িতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। হলোও তা–ই। গতকাল রাতে সে বাড়িতে আসেনি। কোথায় গেছে, এটা বলতে পারে না। ফজলু মিয়ার বউকে অনেক বুঝিয়ে সাদ্দাম কথা বলার জন্য রাজি করাল।

আহসান ভালো করে খেয়াল করে দেখল, বয়স খুব বেশি নয়। তবে রোগাক্রান্ত হয়ে বয়স্ক লাগছে। হয়তো ছেলের শোকে আরও অবস্থা খারাপ হয়েছে এই কদিনে।
‘আমি আপনার ছেলেকে খুজে বের করার চেষ্টা করছি। এখন আপনাদের সাহায্য আমার খুব দরকার। আমি যা জানতে চাই, দয়া করে সব সত্য বলতে হবে।’
ফজলু মিয়ার বউয়ের জবাব বোঝা গেল না। লম্বা গোমটা টানা। আর তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। তবে সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকানোটা পরিষ্কার বোঝা গেল।
‘আপনার স্বামীর সাথে দেখা করার খুব দরকার। না হলে আপনার ছেলেকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। হাতে সময় খুব কম।’

ছেলেকে আর ফেরত না–ও পাওয়া যেতে পারে শোনে ফজলুর বউ কাঁদতে শুরু করে দিল। কান্না জড়ানো কণ্ঠে অনেকগুলো কথা বলল। সাদ্দাম না থাকলে হয়তো এর মানে উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে যেত।

ফজলু মিয়ার খোঁজে এখন ওরা যাচ্ছে পলাশপুর থেকে উত্তর দিকে চিনাকান্দি বাজারে। আজকের আকাশ বেশ মেঘলা। যত সামনের দিকে যাচ্ছে, সামনের বিশাল হিমালয় আরও চোখের দৃষ্টিসীমায় চলে আসছে। সারি সারি মেঘ পাহাড়ের মাঝের অংশটা ঢেকে দিয়েছে। কোথাও আবার বিশাল সব পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝরনার পানি ঝরে পড়ছে। মনে হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা মেঘের ওপর থেকে সাদা শুভ্র জলরাশির আছড়ে পড়ছে মাটিতে। আচ্ছা, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ কি কখনো সুনামগঞ্জের এই রূপ দেখেছিলেন। হয়তো দেখেননি। আহসানের ভাবনায় ছেদ পড়ল সাদ্দামের কথায়।
‘স্যার, পেছনে একটা মোটরসাইকেল অনেকক্ষণ যাবৎ ফলো করছ।’
‘হুম, এটা বিশম্ভরপুর থেকেই শুরু হয়েছে। তুমি সোজা চালিয়ে যাও। আমরা বুঝতে পেরেছি, এটা ওদের বুঝতে দেয়া যাবে না।’
সাদ্দাম বুদ্ধিমান ছেলে। অল্পতেই বুঝে গিয়েছে তার পরবর্তী করণীয়।

আহসানের ধারণাই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হলো। ফজলু মিয়া চিনাকান্দি বাজারে আসেনি। চেয়ারম্যান সাহেবের বাজারের গুদামঘর দুদিন ধরেই তালাবদ্ধ। তার মানে হলো ফজলু লুকিয়েছে। আহসান বেশ অবাক হলো। ও ফজলুর খোঁজে আসবে, এটা হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত। কিন্তু ওকে একদিন আগেই সরিয়ে ফেলেছে!

চিনাকান্দি বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টির ফোঁটা পড়া শুরু হয়েছিল। এখন এটা বেশ ভারী বৃষ্টিতে রূপ নিয়েছে। আহসান একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিল। গ্রামের বাজারে চায়ের দোকানে অনেক মানুষের ভিড়। রাজ্যের আলাপ শুরু হয়েছে। এর মাঝে একটা কথা কানে এসে বাজল। তা হলো, চেয়ারম্যান সাহেবের দাদি।

তুমুল বৃষ্টির ভেতরেই আহসান সাদ্দামকে নিয়ে ছুটে চলছে ইসলামপুর হাইস্কুলের দিকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গনি মাস্টারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। সেখান থেকে যাবে বারিক টিলায় ইন্দো বিবির মাজারে। অনেক বছর পর গতকাল নাকি সেখানে নতুন করে লাল নিশান টানা হয়েছে। বাজারের লোকজন বলাবলি করছে, আবার পিশাচ ইন্দো বিবি জেগে উঠেছে।

দুই.
সারা দিন বিভিন্ন স্থানে দৌড়াদৌড়ি করে গতকালের মতো আজও বেশ রাত করে কাকভেজা হয়ে রুমে আসল। ক্লান্ত শরীর নিয়ে নোট করতে বসল সারা দিনের সব ঘটনা। একটা উপসংহারের খুব কাছে চলে এসেছে ও। আগামীকাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। নাহলে একটা আঁধার গ্রাস করে ফেলবে। আহসান আর ভাবতে পারছে না। ঘুমাতে চেষ্টা করল। সারা দেশ যখন তীব্র গরমে অস্থির। আর এখানে ঝুমঝুম আজোরে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। কাব্যচর্চার জন্য আদর্শ পরিবেশ। আহসানের অবশ্য এসব চিন্তা মাথায় আসছে না। সে একটা বড় রকমের বিপদে পড়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে মোবাইল ফোন আর কাজ করছে না। মাইনুলের সঙ্গে জরুরিভাবে কথা বলা দরকার ওর।

ভোর রাতের দিকে আহসানের ঘুম ভাঙল জানালায় ঢিলের শব্দে। প্রথমে মনে হয়েছিল জানালার কাচ ভেঙে গেছে। না, তেমন কিছু হয়নি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল। ভোর পাঁচটা ভেজে গেছে। বেলকনিতে এসে দাঁড়াল আহসান। আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়েছে। হঠাৎ দূরের একটা নৌকার দিকে চোখ গেল। সাদ্দাম আর সঙ্গে একজন অপরিচিত লোক। তবে সাদ্দামের হাসিমাখা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওর সঙ্গের লোকটিই ফজলু মিয়া। মুহূর্তেই আহসানের সব চিন্তা দূর হয়ে গেল। গতকাল বৃষ্টি হয়ে আজকের আকাশে মেঘের কোনো ছিটেফোঁটার অস্তিত্বও নেই। তার মানে আজ রাতে আকাশ ভেঙে জোছনা নামবে।

সকালবেলা যখন মাইনুল এল, ততক্ষণে আহসান বেরিয়ে পড়েছে। কোথায় গেছে, এটা কাউকে বলে যায়নি। তবে দারোয়ানের কাছে একটা চিরকুট রেখে গেছে। একটা জরুরি কাজে তাহিরপুর যাচ্ছে সে। কখন আসবে, কিছু বলেনি। তবে এটা বলেছে, আজ রাতে হাওরে জোছনাবিলাস হবে।

তিন.
আহসান যখন চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে এল, তখন প্রায় সন্ধ্যা নামে। চেয়ারম্যান সোবহান সাহেব অনেকটা ভূতের মতো চমকে গেল। এই সময় সে খুব একা থাকতে চায়। আহসান সোবহান সাহেবকে নিয়ে বৈঠকখানায় বসল। দুজন মুখোমুখি। কেউ কথা বলেছে না। তবে আহসানকে বেশ ফুরফুরে লাগছে। সারা দিনের ধকল ওর চোখেমুখে একেবারেই নেই।

‘চেয়ারম্যান সাহেব, ফজলু মিয়ার ছেলেকে পুলিশ উদ্ধার করা করেছে এটা আশা করি জেনে ফেলেছেন ইতিমধ্য। আপনি এটাও হয়তো বুঝতে পেরেছেন আমি কী বলতে চাই। তবে বলার আগে আপনাকে একটা সুযোগ দিতে চাই। কারণ আপনি একজন নিতান্তই ভালো মানুষ। আপনার এই মহাবিপদে আমাকে একজন উদ্ধারকারী ভাবতে পারেন।’

‘ঠিক আছে আমি বলব। একবারে শুরু থেকেই বলব। যা আমি শোনেছি, যা নিজে দেখেছি সব বলব। ফজলুর ছেলেকে বলি দেবার চিন্তায় আমার সায় ছিল না। এটা ইন্দো বিবির চাওয়া।’

সোবহান সাহেব অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রইল। মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠছে তার শরীর। একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে বাড়ির কাজের মেয়েটিকে ডাকল। তার পানের নেশা জেগে উঠেছে।

‘আপনি প্রথম থেকে সব বলে যান। আমি শোনব আপনার কথা। তারপর আমি প্রমাণ করে দেব আপনার মনে লালন করা প্রতিটা চিন্তা ভুল।’

‘স্যার, আমাদের আদি বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলি। আমার দাদার পেশা ছিল চুরি-ডাকাতি করা। ওই এলাকার মানুষের মুখে এখনো আমার দাদা কানু ডাকাইতের নাম শোনা যায়। একবার ডাকতি করতে গিয়ে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েকে ভালো লেগে যায়। ডাকাতির জিনিসপত্র নিয়া এলাকায় থাকা যায়, কিন্তু মেয়ে মানুষ নিয়া যায় না। আমার দাদা তার নতুন বউকে নিয়ে, হাওর পাড়ি দিয়ে এই বিশম্বরপুরে চলে আসল। তখন এদিকে খাবার পানির খুব সমস্যা। তাই দাদা বাড়ির পেছনে একটা কুয়া বানালেন। লোকমুখে শোনা যায়, ওই কুয়া খননের সময় একটা কলসি ভর্তি স্বর্ণের মোহর পান। আমার দাদা এই এলাকার সবচেয়ে ধনী মানুষ ছিল ওই সময়ের। সবাই জানত কলসির মোহরের কথা। আমার দাদি বেশির ভাগ সময় এই কুয়া পাড়ে কাটাতেন। এই বসে থাকাই তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। দাদাজান মারা যাওয়ার পর আমার দাদি খুব একা হয়ে পড়েন। তিনি সব সামলাতে পারছিলেন না। তাই আমার বাবাকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে করান। তারপর তিনি দিনের একটা লম্বা সময় কাটাতে শুরু করেন আরেফিন শাহের মাজারে। আমার দাদিজান ছিলেন খুব রূপবতী নারী। বেশি রূপবতী হলে যা হয়। একসময় তিনি ইন্দোবিবি নামের এক জীনের নজরে পড়ে যান। আমার বাবা অনেক চেষ্টা করেন তাঁকে মুক্ত করার। লাভ হয়নি। আমার মা দাদির এই জিন সাধনাকে ভালো চোখে দেখতেন না। এ জন্যই কিনা আমার জন্মের সময় আমার মা মারা যান। এরপর ধীরে ধীরে আমার বাবা দাদির সঙ্গে ইন্দোবিবির সাধনায় জড়িয়ে পড়েন।’

সোবহান সাহেব এই পর্যন্ত বলে থামল। আহসান খুব মনোযোগ দিয়ে সব শোনছে। তবে অবাক হচ্ছে না।
এর মধ্য একজন এসে চা দিয়ে গেল। সোবহান সাহেব চা নিল না। একটা সিগারেট ধরাল। খুব কটু গন্ধের সিগারেট। আহসান কিছু বলল না। বরং একটা স্মিত হাসি দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে লাগল।

সোবহান সাহেব আবার বলতে শুরু করল, ‘এলাকার মানুষ এটা ভালোভাবে নেয়নি। তারা এটাকে পিশাচ সাধনা হিসেবে নিল। এক ঝড়–বৃষ্টির রাতে কয়েক গ্রাম থেকে কিছু মানুষ এসে আমাদের বাড়িতে হামলা করে। আমার দাদির চোখের সামনে আমার বাবাকে খুন করে ওরা। আমার বয়স তখন চার কি পাঁচ বছর। একপর্যায়ে আমাকেও দা দিয়ে কোপ দেয়। তখন মুহূর্তের মধ্য আমার দাদি সামনে এসে দাঁড়ান। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে দায়ের কোপে তাঁর হাতের তিনটি আঙুল পড়ে যায়। এই মাঝেও আমাকে কোলে নিয়ে সবার সামনে পিশাচের মতো ইন্দোবিবির রূপ ধারণ করেন। হিন্দু দেবির মতো এক অগ্নিমূর্তি। দাদির এই ভয়ানক রূপ দেখে সেদিন সবাই পালিয়ে যায়।
‘এরপর আপনার দাদির সাথে আপনিও পিশাচ সাধনা শুরু করে দিলেন?’

‘না, আমি এসব থেকে দূরে ছিলাম। কারণ আমি আমার দাদিকে খুব ভয় পেতাম। ছোটবেলায় খুব কাছে যেতাম না। কয়েক বছর আগের কথা। আমার দাদি মারা গেছেন তখন। একদিন সন্ধ্যাবেলায় কুয়াপাড়ে বসলাম। তখন হঠাৎ এই গন্ধটা পেলাম। খুব ভয় পেয়ে যাই। প্রচণ্ড ভয় পেলেও আমি কী মনে করে কুয়ার ভেতর তাকাই।’
‘কুয়ার পানিতে আপনার দাদির সেই দেবী রূপের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তাই না?’

‘হ্যাঁ, আমি ছোটবেলায় নিজের চোখে দেখা আমার দাদির সেই ভয়ংকর রূপ আবার দেখতে পাই। আমি খুব বেশি একটা পড়াশোনা করি নাই। তবে মানুষ হিসেবে যুক্তিবাদী। হুট করে কোনো কিছু বিশ্বাস করার লোক আমি না। আমি নিজেকে অনেক বোঝালাম এটা আমার মনের কল্পনা, সত্যি না। আমি মনেপ্রাণে চেয়েছি এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ওই গন্ধটা থেকে মুক্তি পাচ্ছি না। এটা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আগে হঠাৎ কোনো একসময় আসত। এখন সব সময় আমাকে ঘিরে রেখেছে।’

‘সোবহান সাহেব, আপনি খুব সহজেই এর হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। আপনার যে রোগটা হয়েছে, এটাকে বলা হয় অলফেকটরি হেলোসিনেশন। এই সমস্যাটা আপনাদের বংশগত। আপনার দাদির দিক থেকে এটা পেয়েছেন। প্রথমেই বলি, আপনার দাদা কোনো মোহরের কলসি পাননি। তিনি যেহেতু ডাকাতি করে বেড়াতেন, তাই গোপনে ভালো পরিমাণ সম্পদ জমিয়েছিলেন। নতুন এলাকায় মানুষ সন্দেহের চোখে দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই ইচ্ছা করেই মোহরের কলসির কথা রটিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষদের আপনি খুব ভালো করেই চেনেন। সত্যি খবরের চেয়ে এই রকম ভৌতিক জিনিসে বেশি বিশ্বাস করে। আর আপনার দাদা ডাকাত হলেও তাঁর বউকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু আপনার দাদির মনে হয় না খুব পছন্দ হয়েছিল। যেহেতু তাঁকে জোর করে নিয়ে বিয়ে করেছেন। তা ছাড়া আপনার দাদা দেখতে তেমন সুন্দর ছিলেন না। তাই আপনার দাদির বেশির ভাগ সময় মন খারাপ করে কুয়াপাড়ে বসে থাকতেন। এই মন খারাপ থেকেই তাঁর হেলোসিনেশনের ব্যাপারটা ঘটে। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী। তাই এই ব্যাপারটা প্রথম গোপন করেছেন। এর হাত থেকে মুক্তির আশায় মাজারে মাজারে ঘুরেছেন। এখন যেমন আপনি করেছেন। আর আপনার দাদি যখন দেবী মূর্তি ধারণ করেন, অই রাতে তখন তাঁর হাতে ত্রিশূল ছিল তাই না?’

‘হ্যাঁ।’
‘শোনুন সোবহান সাহেব, আপনার দাদা যে বাড়িটা কিনেছিলেন, সেটা ছিল একটা পুরোনো হিন্দু বাড়ি। যখন আপনার দাদি দেখেছেন তাঁর ছেলেকে-নাতিকে একদল মানুষ কুপিয়ে মেরে ফেলছে। তখন তিনি কিছু না পেয়ে ত্রিশূল নিয়েই ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। ঝড়–বৃষ্টির রাত ছিল। এমন পরিবেশ এমনিতেই একটু ভয় ভয়ের। একজন রক্তাক্ত মহিলা, হাতের তিনটে আঙুল কেটে পড়ে গেছে। তারপরও একদল মানুষের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাতে ত্রিশূল নিয়ে। এমন ঝড়–বৃষ্টির রাতে এমন দৃশ্য যেকোনো মানুষকে ভড়কে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। হয়েছিলও তা–ই। এমনিতেই সবাই জানত তিনি পিশাচ সাধনা করেন। তাই ভয়টা দ্বিগুণ হয়েছিল। আর, আপনার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল খুব কম বয়সে। তাই ওই অল্প বয়সে আপনার মা আপনাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। আপনার মা মারা যাবার পর আপনার বাবাও এই অলফ্যাক্টরি হেলোসিনেশনে ভুগতে থাকেন। একপর্যায়ে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়। এখন আপনি যেদিকে যাচ্ছেন। ঠিক এই রকম। আপনার বাবা খুন হওয়ার পেছনের কারণ আমি খুঁজে বের করেছি। আপনাদের পাশের এলাকার ইসলামপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনার ছোটবেলার বন্ধু। আপনার বাবা একসময় ঘোষণা দেয় বারিক টিলায় ইন্দোবিবির মাজার রয়েছে। সবাই মেনেও নিয়েছিল। কারণ, আপনাদের অনেক টাকাপয়সা ছিল। আবার সেই সঙ্গে দাদির পিশাচ সাধনার ব্যাপারটাও ছিল। কিন্তু ঝামেলা বাধায় আপনার বাবা। এক পূর্ণিমা রাতে ইন্দোবিবির নামে একটা শিশু বলি দিয়ে বসে। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর লোকজন আপনাদের বাড়িতে এসে আপনার বাবাকে মেরে ফেলে। আপনি একজন বাস্তববাদী মানুষ। কখনো এই কারণগুলো নিয়ে ভেবেছেন?’

সোবহান সাহেবের মুখ খুব ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। লম্বা লম্বা নিশ্বাস নিতে শুরু করেছে কিছুক্ষণ ধরে। তার চোখের দৃষ্টি আহসানকে ছাড়িয়ে অন্য কোথাও। প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে সোবহান সাহেব পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘স্যার, কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?’
‘না, কোনো গন্ধ পাচ্ছি না।’

আহসান এবার একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলল। আসলে সে একটা তীব্র ঘ্রাণ পাচ্ছে। চারপাশে ঘিরে ফেলেছে এমন। কিন্তু কোনোভাবেই এই ঘ্রাণের অস্তিস্ত মেনে নেওয়া যাবে না। একবার মেনে নিলে হারিয়ে যেতে হবে অসীম অন্ধকারে। আহসান এটা জানে। স্বপ্নে দেখা মিলির কথা মনে হলো ওর। ইন্দোবিবির এই ঘ্রাণ যদি সত্যি হয়, তবে মিলিও সত্যি। মিলি আছে ওর আশপাশে।

‘স্যার, আপনি মিথ্যা বলছেন। ইন্দোবিবি এসেছে। আপনি তার গায়ের গন্ধ পাচ্ছেন। ইন্দোবিবি ঠিক আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বাস না হলে একবার পেছনে তাকিয়ে দেখেন।’

‘আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। শুধুই সাদা দেয়াল। আপনার মনের কল্পনার ছবি দেখতে পাচ্ছেন।’

আহসান এবার উঠে দাঁড়াল। একদম সোবহান সাহেবের মুখোমুখি। সে জানে কীভাবে এখন এই অবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে হবে। সে চোখে চোখ রেখে তাকাল সোজা সোবহান সাহেবের দিকে। গভীর তীব্র একটা দৃষ্টি। একটা হাত বাড়িয়ে দিল সামনে। তারপর আদেশের স্বরে বলল,

‘আপনি আমাকে দেখেন। হাত ধরে বেরিয়ে আসুন এখান থেকে। আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনি চলে আসুন। এবার যদি বেরিয়ে আসতে পারেন, তাহলে আর কোনো দিন এই ঘ্রাণের অস্তিত্ব থাকবে না। ইন্দোবিবি হারিয়ে যাবে চিরদিনের মতো।’

আহসানের বজ্র কণ্ঠের আদেশ শোনে চেয়ারম্যান সাহেব মৃগী রোগীর মতো আচরণ শুরু করে দিলেন। একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তবে পড়ে যাওয়ার আগে আহসানের হাতটা খুব শক্ত করে ধরে ফেললেন। তিনি বেরিয়ে আসতে চাচ্ছেন এই গহিন অন্ধকার থেকে।

চার.
আহসানদের নৌকা শনির হাওরের মাঝ–বরাবর ভেসে চলেছে। আজ জোছনাবিলাসের রাত। হাওরে জোছনাবিলাসের খবর শোনে সিলেট শহর থেকে কয়েকজন পরিচিত বন্ধু এসেছে। এমনকি রাশভারি ইসলামপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল গনি সাহেব পর্যন্ত চলে এসেছেন। তিনি এক কোনায় বসে চেয়ারম্যান সাহেবকে নিয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা করছেন। ওদিকে মাইনুলসহ বাকি সবাই নৌকার ভেতর বসে তাস খেলায় মত্ত। সবাই হইহল্লায় মেতে উঠেছে। আহসান একা একা ছাইয়ের ওপর শুয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। সারা শরীরের জোছনায় মাখামাখি। মৃদু বাতাসে ঢেউ হচ্ছে। তাতে চাঁদের আলো মিশে এক স্বর্গীয় অনুভূতির তৈরি হয়েছে। আজ যেন বাঁধভাঙা জোছনার সব আলো ছড়িয়ে পড়েছে হাওরের ওপর। দুরের এক নৌকা থেকে হাওরের বুক চিরে ভেসে আসছে সুকুমার বাউলের মাদকতা মেশানো গান—

‘বলব না গো আর কোনো দিন
ভালোবাসো তুমি মোরে’

এই প্রথম আহসান খুব মন থেকে চাচ্ছে এটা যেন স্বপ্নে দেখা কোনো রাতের ছবি না হয়। সে এখান থেকে আর হারাতে চায় না। চলবে...


*লেখক: পিএচডি স্টুডেন্ট ইন মলিকুলার মেডিসিন, ন্যাশন্যাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান। badruzzaman.sau@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন