default-image

কয়দিন পরই বিএ দ্বিতীয় বর্ষের টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে। সময়টা ১৯৯৩। প্রস্তুতি মোটামুটি। ছাত্র খুব যে ভালো, তা কিন্তু নই। সব সময় তৃতীয় বেঞ্চেই বসেছি। কিন্তু স্বপ্ন দেখি ইউরোপ আমেরিকা ঘুরে বেড়াবার। বড় তিন ভাই মিডল ইস্ট, আরেকজন ব্যাংকক থাকেন। আমি কেন ইউরোপের স্বপ্ন দেখব না!

তবে তাদের ওপর ভরসা করে দেখিনি। এমনিতেই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতাম বলেই দেখা। ছোটকালেই জেনে গেছি, কারও ওপর ভরসা করা বোকামি, কষ্ট পেতে হয়। বয়স কম হলেও অভিজ্ঞতা প্রচুর।

ইউরোপের কল্পনা করতে কখনো আলসেমি লাগত না আমার। প্রায় সব দেশের রাজধানী, বিখ্যাত সব শহরের নাম আমার মুখস্থ। সুযোগ পেলেই ভূগোল বইয়ের ম্যাপ নিয়ে বসে থাকতাম। আমার সমবয়সী অনেকে গল্পের বই নিয়ে মেতে থাকত তখন। আর আমি মানচিত্র নিয়ে!

ছোটকালে স্বপ্ন দেখতাম, বড় মাপের একজন ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার। হতেও পারতাম। খুব ভালো খেলতাম বলে বিভিন্ন জায়গায় খেলার জন্য আমাকে নিয়ে যেত সেই ছোটবেলা থেকেই। মাকে বলতাম, দেখো, কয়দিন পরই আমাকে এই টিভিতে বসে বসে দেখবে সবাই! আচ্ছা, গর্ব হবে না তখন তোমাদের সবার?

মা হেসে বলতেন, অবশ্যই গর্ব হবে। ইনশা আল্লাহ, আমার ছোট ছেলে টিভিতে খেলবে, আর আমরা তা দেখব।

কিন্তু খেলা হয়নি। পরিবারের কেউই আমার খেলাধুলা পছন্দ করেননি। এটাকে সময় নষ্ট করার হেতু ভেবেছেন। খেলা শেষে ঘরে এলে ভাইদের মারধোর আর বাবার রক্তচক্ষু। এরপরও গোপনে খেলে আসতাম। শুধুমাত্র খেলার জন্যই ঘরের পাশের স্কুল ছেড়ে অনেক দূরের বয়েজ স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছি। এত দূর স্কুলে যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া অবশ্য ভাগ্যে জোটেনি। মাঝেমধ্যে মা অবশ্য দুই-এক টাকা পকেটে গুঁজে দেননি, তা নয়। তবে তা কদাচিৎ।

ঘুম থেকে উঠে, হালকা কিছু খেয়ে প্রায় তিন মাইল দূরের স্কুলের উদ্দেশে তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়তাম। স্কুলে সব শিক্ষকদের দৃষ্টিতে পড়ে যাই সহজেই। আমি হয়ে পড়ি সবার পরিচিত মুখ। পড়া লেখার জন্য নয়, খেলার জন্য। কিন্তু একসময় খেলা ছাড়তে হলো। শেষ পর্যন্ত বড় খেলোয়াড় হয়ে টিভির বিখ্যাত মানুষ হয়ে ওঠা হয়নি।

তখন মুখে মুখে খুব শুনেছিলাম, কোরিয়া মানুষ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকক যে ভাই থাকেন, তার সঙ্গে আলোচনা করলাম। অথচ সামনেই আমার টেস্ট পরীক্ষা! দেশের বাইরে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না।

ভাইয়া বললেন, বিদেশ মানেই সুখ নয়, অনেক কষ্টের জীবন। বাকি তোর ইচ্ছা।

তারপর চেষ্টা করলাম, এক চান্সেই সফলও হলাম, সোজা দক্ষিণ কোরিয়া। ভাইয়ার এক বন্ধু ব্যবস্থা করে দিলেন। টাকা অবশ্য পরে পরিশোধ করেছি।

ভাইয়ার কথাই সত্যি। অনেক কষ্টের জীবন! সারা দিন ঠান্ডার ভেতর কঠোর পরিশ্রম। বাসায় এসে রাতে হাত দুটো অবশ হয়ে থাকত। নড়তে চাইত না। অনেক কষ্টে দেড় মাস সহ্য করলাম। তারপর কাঁদি আর কাঁদি। আবার ভাইকে কষ্টের কথা জানালাম। আর না, বিদেশের স্বাদ মিটে গেছে, দেশে চলে যাব।

: দেশে যাবি কেন? চাকরি বদলিয়ে ফেল।

আসলেই, এটা তো মাথায় আসেনি! চাকরি বদলালাম। ভালোই লাগছে এবার। অনেকটাই আরামের কাজ। ভালো পজিশনও পেয়ে গেলাম শিগগিরই। তিন বছর কাটিয়ে দিলাম কোরিয়ায়।

কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার পেট ব্যথা শুরু হলো। অসহ্য সে ব্যথা। তালতো ভাই (বড়ভাবির ছোট ভাই) থাকত সঙ্গে। সে আর কয়েকজন কোরিয়ান মিলে দ্রুত আমাকে হসপিটাল ভর্তি করে। ইমার্জেন্সি অপারেশন করতে হবে। যেখানে কাজ করতাম, সেই মালিক সব খরচ বহন করেন। পরে অবশ্য কাজ করে করে তা পরিশোধ করেছি।

ইতিমধ্যে আরেকটা ঘটনা রয়েছে। আমার ভাইপো (জ্যাঠাতো ভাইয়ের ছেলে), সে আমার দুই বছরের বড় হলেও প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিল। ভাইপো কোরিয়া আসতে আগ্রহী। আমি তার স্টুডেন্ট ভিসা ও স্পনসর সব ব্যবস্থা করি। যেদিন আমার পেট ব্যথা আর অপারেশন হয় সেদিনই তার আসার কথা। ওদিকে আমার বিমানবন্দরে গিয়ে তাকে রিসিভ করা কথা। ভাইপো ঠিকই আসে কিন্তু আমাকে না পেয়ে তাকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ভাইপো জানলও না, আমি তাকে আনতে না যাওয়ার কারণ কী!

বাড়িতে এসে সে নাকি দেখে, আমাদের ঘরে গরু জবেহ হচ্ছে। তা গরিব মিসকিনদের ভেতর ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। তুলকালাম কাণ্ড! ভাইপো তো অবাক, কেন কী হচ্ছে এসব! আর তাকে দেখে তো আমার মা, পরিবারের সবাই ঘিরে ধরে। কী হয়েছে মাসুদের? কেমন আছে সে? বেঁচে আছে?

ভাইপো কী জবাব দেবে। নিজেইতো জানে না। উল্টো তাদের কাছেই শুনল আমার কথা এবং বুঝতে পারল, আমি কেন বিমানবন্দরে উপস্থিত হতে পারিনি।

প্রায় দুই আড়াই মাস পর সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে আবার কাজে যোগ দিলাম। কাজ তো করতেই হবে। নইলে বিদেশ বিভুঁইয়ে খাব কী! আর দেশেও টাকা পাঠাতে হতো তখন। আমার অন্য ভাইয়েরা বিদেশে থাকলেও তত বেশি উপার্জন করতেন না। একজন উপার্জন করলে, আরেকজন বেকার বসে থাকতেন। এটাই নিয়ম হয়ে গিয়েছিল যেন। আর যখন যে ভাই উপার্জন করতেন, সেই বাড়ির খরচ দিতেন।

যদিও আমার জন্মের পর থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত দেখেছি একা মেজ ভাই-ই সংসারের সব খরচ বহন করছেন। দুই বোনের বিয়েও তিনি দিয়েছেন।। তখন তিনিই একমাত্র উপার্জন করতেন। তারপর তার নিজের সংসার বড় হয়েছে, তার নিজের সংসার খরচ বেড়েছে, তাই আলাদা হয়ে যান।

জীবন এভাবে চলছিল।

যা হোক, ভাইপো প্লাস বন্ধুকে তো তখন আমি রিসিভ করতে না পারায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। আবার চেষ্টা করতে লাগলাম তার জন্য। তারপর শুরু হলো, ভাইপোর জন্য কোরিয়াতে লোক ধরাধরি। তার মধ্যে ভাগ্যচক্রে আমিও পড়ে গেলাম। যেদিন ভাইপো কোরিয়া'র মাটিতে নামে, সেদিনই আমি ধরা খেয়ে যাই। আমাকে ফেরত আসতেই হলো। তবে এবার তাকে আর ফেরত পাঠানো হয়নি। এবারও আমার সঙ্গে তার দেখা হলো না।

দেশে ফিরে প্রায় একটা বছর ঘোরাঘুরি করে বেকার কাটিয়ে দিলাম। যারা বিদেশ ঘুরে আসে, তারা যেন দেশে এলে অন্ধ হয়ে যায়। কোনো কাজে মন বসে না তাদের। তাই হয়তো আমিও বেকারত্বের ভেতর চলতে লাগলাম। এই কয়মাসে তিন ও চার নম্বর ভাইও দেশে এলেন, বিয়ে করলেন।

এক বছর এভাবেই চলল। কিন্তু ইউরোপের ভূত মাথা থেকে যায় না। কয়েক বন্ধু মিলে এক আদম ব্যাপারী দালালের সঙ্গে কথা বলি। ওই দালাল আমাদের ইউরোপ নিয়ে যাবে। অনেক সহজ যাওয়া। এমন অনেক স্বপ্ন দেখায়। একসময় তার হাত ধরে আমরা রওনা দিই। কিন্তু সে দালাল ছিল একেবারে অনভিজ্ঞ। আমাদের মধ্যে অনেকের মতো সেও প্রথম বিদেশ পাড়ি দিচ্ছিল।

আমরা প্লেনে করে রাশিয়া পৌঁছাই। ওখানে গিয়ে সে আর কিছুই করতে পারছিল না আমাদের জন্য। শেষে দালাল আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বলে, আমিতো আর কিছুই চিনি না, কী করব, তোমরাই বলো। চলো, তোমাদের না হয় দেশে ফেরত নিয়ে যাই।

আমরা তো এক পায়ে খাঁড়া। বলি, যাব না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।

কিন্তু আমাকে তো ফিরতে হবে। দালাল জানায়।

তুমি গেলে যাও। আমরা জবাব দিই।

দালাল দেশে চলে গেল। রাশিয়ায় তখন কড়া নিয়ম ছিল। অন্য দেশের অবৈধ মানুষ, প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারত না। অবশ্য, কিছু নিয়ম কানুনের পর পারে। আমরা সেসব নিয়ম খুঁজতে লাগলাম। পুলিশ রেজিস্ট্রেশন করলাম, তার জন্য। তারপর ঘোরাফেরার অনুমতি পেয়ে খোঁজ করতে লাগলাম, কীভাবে কি করা যায়। মিলেও গেল দেশি আরেক দালাল!

তারপর...।

তার হাত ধরে আমরা সবাই যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেনে করে বেলারুশ এলাম। ওখান থেকে গাড়ি করে একটি জঙ্গলে নিয়ে গেল। ওখান থেকেই বিভিন্ন দেশে বর্ডার পার করা হতো। যারা বর্ডার পার করাতেন, তাদের বলা হতো ডাংকার।

জঙ্গলে কী নিদারুণ কষ্ট! বলে বোঝানো যাবে না। দিনরাত জঙ্গলে থাকি। কত বৃষ্টি, ঝড়, বাতাস মাথায় নিয়ে, না খেয়ে ঘুমিয়েছি...। ঝড়ের মধ্যেই ঘুমোচ্ছি, ঝড়ের মধ্যেই জেগেছি। তারাপর বেলারুশ থেকে লিথুনিয়া কিছু হেঁটে, কিছু গাড়ির (কার) পেছনের বনেটে নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে দুজন, তিনজন ছোট্ট ওই জায়গায় কষ্ট করে বসে যাচ্ছি। গাড়িতে জায়গা কম, চাপাচাপি করে বসলেও বেশি মানুষের জায়গা হতো না। তাই বনেটেও বসে যেতাম।

দিনে জঙ্গলে ঘুমাতাম, রাতে বেরোতাম। খাবার দাবারের ঠিক ঠিকানা নেই, একদিন খেয়েছি তো, দুই দিন উপোস। ভাত কবে খেয়েছি ভুলে গেছি তখন। লিথুনিয়া থেকে একইভাবে পোল্যান্ড এলাম। পোল্যান্ডে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে শ দুয়েক বিভিন্ন দেশি মানুষের সঙ্গে থাকলাম। কত রং বেরঙ ও ঢঙের মানুষ আমরা সেখানে। তারাও আমাদের মতো স্বপ্ন নিয়ে এসেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য। অনেক কষ্টের জীবন ছিল তা। বন্দী হয়ে, দরজা বন্ধ করে থাকতে হতো। যে যেখানে সামান্য খালি জায়গা পেয়েছি, তাতেই হাত পা গুটিয়ে বসে শুয়ে দিন পার করেছি। খাবারেরও কোনোই ঠিক ছিল না, অসহনীয় সে জীবন!

এরপরও ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ করতে চাইছি না। দেশে গিয়েই বা কী করব? একটা বছর বিরক্তিকর বেকার জীবন কাটিয়ে তো এলাম। প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি এভাবে চলল। হঠাৎ একদিন, আমাদের কয়েকজনকে মেইন বর্ডার নিয়ে যাওয়া হলো। ওখানে ছোট্ট আরেক পরিত্যক্ত ঘরে রাখা হলো। সঙ্গে কিছু নারীও ছিল। ওখানে কেউ এসে আমাদের নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তিন-চার দিন হয়ে গেল কেউ আসেনি। কোনো খাবার ছিল না সঙ্গে। এক নারী ছিলেন প্রেগন্যান্ট। কী যে ক্ষুধার্ত সবাই! ওই নারী তো রীতিমতো কান্নাকাটি করতেন।

তারপর আর না পেরে, দরজা ভেঙে বের হই সবাই মিলে। ক্ষুধার কষ্ট বড় কষ্টের, বড় যন্ত্রণার! জঙ্গলে বেড়ে ওঠা কাঁচা শাক সবজি খেতে লাগলাম বাধ্য হয়ে। বাঁধাকপি আর শাক পাতা ছিল তা। আমরা দুজন, বন্ধু আলম আর আমি, ওখান থেকে বেরিয়ে, আন্দাজে পথ চলা শুরু করে দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে চলতে লাগলাম। কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি কিচ্ছু জানি না। ভাষাও জানি না। অনেক দূর হাঁটার পর, কিছু দোকান দেখলাম। অনেক অনেক দিন পর, খাবার কিনে পেট ভরে খেলাম। আর কিছু কিনে নিলাম অন্য সাথিদের জন্য।

কিন্তু ওই সময় পুলিশ দেখল আমাদের, ধরে ফেলল। কে, পরিচয় কী, পাসপোর্ট কই, কোন দেশি, কীভাবে আসলাম?? হাজারো প্রশ্ন। ওরা ওদের ভাষায় প্রশ্ন করেন। আমরা আমাদের ভাষায় জবাব দিই। কেউ কারও কথা বুঝি না। শেষে, প্রায় দুই ঘণ্টা পর, পুলিশ বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিল। এদিকে ভুলে গেছি কীভাবে জঙ্গল থেকে এত দূর এলাম! অনেক দেখলাম, খুঁজলাম সেই পথ, কিছুতেই পাই না। সব রাস্তায় একই মনে হয়। প্রেগন্যান্ট মহিলার জন্য খুব মায়া হচ্ছিল। খাবারগুলো দিতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু আর খুঁজে না পেয়ে, আমরা দুজন ট্রেনে চড়ে বসলাম। পোল্যান্ডের রাজধানীতে এসে পৌঁছালাম।। যদিও জানি না, কোথায়, কেন যাচ্ছি। এমনিই, ট্রেন পেয়ে চড়ে বসা ছিল তা।

ওখানে গিয়েই দেশি দালালটার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, জানালাম কোথায় আছি। তিনি এসে নিয়ে গেলেন। আবার একই বড় পরিত্যক্ত বাড়িতে, শ দুয়েক মানুষের ভিড়ে। আসা মাত্রই, পুলিশ রেড করল। শত শত পুলিশ যেন ঘিরে ধরল আমাদের। অবৈধ মানুষ ধরার মিশন চলছে তাদের। আমি আর আলম তিন তলা থেকে লাফ দিলাম। শুধু আমরা দুজন নয়, আরও অনেকেই লাফিয়ে পড়ল। আমার পা ভাঙল, না খুব ব্যথা পেলাম নাকি রগ ছিঁড়ে গেল, তা দেখার সময় নেই তখন। দৌড়াতে লাগলাম যে যেদিকে পারি।

দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা দুজন এসে পড়লাম, বিরাট এক আপেল বাগানে। অনেক বিরাট সেই বাগান। কয়েক মাইলের। বিরাট সেই আপেল বাগানে ঘুরতে ঘুরতেই রাত হয়ে গেল। অসম্ভব ঠান্ডা সে রাতে! যতই রাত বাড়ে ততই ঠান্ডাও আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে যেন। কিন্তু কিছু করার নেই। গাছের নিচে কাঁপতে কাঁপতে, আধো ঘুম আধো জাগরণে রাত পার করলাম সবাই, যারা পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম। দিনের আলো চোখে লাগতেই বহু দূরে দেখতে পাই রাস্তা।

এদিকে বন্ধু আলম দৌড়ে যে কোথায় চলে গেল! তাকে আর আশপাশে, অনেকের ভিড়ে দেখলাম না কোথাও। আবার হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা ধরলাম। আসা যাওয়ার পথে এক গাড়ি আমাদের লিফট দেয়। আরাম করে গাড়িতে উঠে বসলাম। কিন্তু ভাগ্য এতই করুণ আমাদের, গাড়িটি ছিল, সাদা পোশাকধারী পুলিশের! এত লাফ ঝাঁপ হেঁটে দৌড়ে এত দূর এতটা পথ এলাম...পুরোটাই বেকার! তারা আমাদের সেই পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে যায় আবার। তারপর রিমান্ডে, জেলে। টানা তিন মাস জেলে থাকলাম। তবে সেই জেল, আমাদের দেশের মতো নয়। তখনো অত্যাধুনিক ছিল। ভালো খাবার দাবার, সুন্দর পরিপাটি বিছানা, টিভি, ফ্রিজ। খেলাধুলার জন্য মাঠ সবই আছে। শুধু একটাই কষ্ট, এর বাইরে কোথাও যেতে পারব না। খুব শিগগিরই ছেড়ে দেবে, চলে যেতে দেবে অনেক কিছু শুনছিলাম। কিন্তু এরপরও তিন মাস থাকতে হলো।

তারপর পোল্যান্ডে ছয় মাস থাকতে পারব, এমন একটি পারমিশন পেপার দিল আমাদের। এরপর, সবাইকে একটা গ্রামে থাকতে দিল। সেখানে কোনো সমস্যা হচ্ছিল না অবশ্য। সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিলাম। এক মাস কাটল সেই গ্রামে। আমি আবার সেই দেশি দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। দালাল আমাদের বর্ডার পার করিয়ে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একরাতে নিয়েও যায়, নদীর পাড়ে। কিন্তু পাহারারত পুলিশ থাকায় সে রাতে ফেরত আসতে হলো। আবার আরেকদিন যায়। ভীষণ ঠান্ডার সময় তখন। ঠান্ডায় নদীর পানি বরফ হয়ে গেছে। সেই বরফের ওপর হেঁটে পার হব আমরা।

হচ্ছিলামও। হঠাৎ, বরফ ভেঙে, আমার পা পিছলে আমি নদীতে পড়ে যাই! পানির স্রোত আমাকে এক টানে অনেকটা দূর নিয়ে যায়। কী ঠান্ডা সেই পানি! কয়েকজন মিলে আমাকে টেনে তুলে সেই বরফ পানি থেকে। আমি কাঁপতেও ভুলে যাই। আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল তখন। এরপরেও এই অবশ শরীর নিয়ে আরও দুই ঘণ্টার পথ হাঁটতে হয়েছে আমাকে। পথিমধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একজন তো হাঁটতে হাঁটতে, পথেই মারা যান। সম্ভবত তিনি নোয়াখালী অঞ্চলের বাংলাদেশি ভাই ছিলেন।

অবশ্য, সেদিকে তাকাবার মতো শক্তি আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। আমি কীভাবে, কোন শক্তিতে হাঁটছিলাম, আমি নিজেও জানি না। হয়তো, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, তাই মানসিক শক্তি দিয়েছিলেন। সেই শক্তিতেই হাঁটছিলাম।

এরপর একটা গাড়ির দেখা মেলে। শীতের সময় সব গাড়িতেই হিটার থাকে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য এতটাই মন্দ যে, ওই গাড়িতে হিটারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না বা নষ্ট ছিল, এমন কিছু হবে। গাড়ি করে আমরা জার্মানির এক শহর বার্লিনের পাশে যাই। তবে ভাগ্য এবার আমাদের সহায় হয়। সেখানে হেলিকপ্টারসহ কিছু পুলিশ ছিল। খুবই মুমূর্ষু অবস্থায় তারা আমাকেসহ আরও অনেককে হেলিকপ্টার করে হসপিটাল নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন।

তবে আমি নিশ্চিত, তখন কোনো পরিবার যদি আমাদের আশ্রয় দিত, তবে আমরা বাঁচতাম না কেউই। আমরা এতটাই মুমূর্ষু ছিলাম যে, আমাদের তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। যা হেলিকপ্টার থাকায় পুলিশ ব্যবস্থা করতে পেরেছে। টানা ছয় মাস হসপিটালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। আমার পা তখনো অবশ ছিল। কখনো কখনো শরীর ফুলে ঢোল হয়ে যেত। নানারকম শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত হতে লাগলাম। অসহ্য কষ্ট, অসহ্য সেই যন্ত্রণা! কিন্তু দুই পায়ে প্রাণ নেই, কোনোই অনুভূতি নেই। চিকিৎসার কয়দিনের মধ্যে ডাক্তার জানালেন, আমার দুটো পা কেটে ফেলতে হবে।

আমি তাদের বললাম, পা যদি কাটতেই হয়, তবে আমাকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। দয়া করে বেশি ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে আমাকে চিরদিনের মতো ঘুম পাড়িয়ে দিন। আমি পঙ্গু জীবন নিয়ে, মানুষের করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।

ডাক্তার অনেকজন মিলে আবার মিটিং বসলেন। তারা আমাকে বললেন, শোন, আমরা তোমার চিকিৎসা করতে পারব, কিন্তু তোমার পায়ের প্রাণ যে চলে গেছে তা কিন্তু ফিরিয়ে দিতে পারব না। যদি তা দেওয়া সম্ভব হতো, তবে তা এই জার্মানেই দিতে পারত। কারণ, এখানেই সবচেয়ে বেশি উন্নতমানের চিকিৎসা হয়।

তারপর, আল্লাহ যা চাইলেন, তাই হলো। দেশের কেউ আমার খবর পাচ্ছিল না। হয়তো ভেবেছেন, মরে গেছি। কারণ, পেপারে প্রতিদিন এইভাবে মরার হাজারো খবর পড়ছে তারা। সবাই উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছে, কোনো সংবাদের। তখনই বাংলাদেশি দুই-একটা পেপারে, আমার নামসহ, আরও অনেকের নাম আসে। যাতে লেখা ছিল, আমাদের পা কেটে ফেলে দিতে হবে। পেপারের খবর পড়ে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

এসব আমি কিছুই জানি না। এমনিতেই হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফোন করতে চাইলে, তারা ব্যবস্থা করে দেয়। তখনো কিন্তু আমি বিছানায়। উঠে বসতেও পারি না, কারও সাহায্য ছাড়া। বাড়িতে জানালাম, আমি সুস্থ আছি, চিন্তা করার কিছু নেই। এমনিতেই অসুস্থ মানুষের ভেতর নিজের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছি, যাতে পরবর্তীতে কেস করে থাকতে পারি। তারা আমার সঙ্গে কথা বলে শান্ত হন।

আর আমি এমন যদি না বলতাম, তারা শুধু শুধুই দুশ্চিন্তা করতেন, কান্নাকাটি করতেন। তা করে কী লাভ, যা হওয়ার তাতো হয়েছে, হবেই।

আমার চিকিৎসা, মেডিসিন চলতে লাগল। ডাক্তাররা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে রাজি হলেন। প্রায় দুই আড়াই মাস পর ধীরে ধীরে আমার পায়ে অনুভূতি ফিরে আসতে লাগল। আল্লাহর রহমতে প্রায় ফিরেই এল। এটা অবশ্যই একটা মিরাকল ছিল। নইলে দুই মাস আগেই আমার পা কাটা যেত, এখন পঙ্গু হয়ে থাকতাম। কিন্তু দুই পায়ের পাঁচটা আঙুল একেবারে নষ্ট, অকেজো হয়ে, মরে গেছে।

ডাক্তার জানালেন, তা না কাটলেই নয়। কেটে ফেলে দিলেন তারা। অনেক সময় লাগল তা শুকাতে। আমি হাঁটা ভুলে যাই! একেবারে বাচ্চাদের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। পা কীভাবে মাটিতে রেখে হাঁটতে হয়, তা আমি মনে করতে পারছিলাম না। বারবার পড়ে যাচ্ছিলাম। হসপিটালের ডাক্তার, বাইরে থেকে বড় স্পেশালিস্ট আনিয়ে, আবার আমাকে হাঁটা শেখার চিকিৎসা শুরু করেন।

সব চিকিৎসা মিলে ছয় মাস হসপিটাল থাকার পর আমাদের রিফুজি ক্যাম্প পাঠানো হয়। তখনো আমি স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছিলাম না। দুই বগলে স্ট্রেচার দিয়ে হাঁটতে হতো। রিফুজি ক্যাম্পে আরামেই দিন কেটেছে। প্রায় দুই বছর সেখানে ছিলাম। ধীরে ধীরে সুস্থ হই, স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছি। ১৯৯৯ সাল তখন। ইউরোপের স্বপ্ন জীবন থেকে তিনটি বছর কেড়ে নিল। উপহার দিল যন্ত্রণাদায়ক কিছু সময়।

ওই সময় ফ্রান্সে আমার সিনিয়র পরিচিত এক ভাই থাকতেন। বন্ধুও বটে। জিমি নাম তার। তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওনার কাছেই যাই। সেখান থেকে পর্তুগাল যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছিলাম। একদিন বেরও হয়ে যাই, ট্রেনে করে। কিন্তু পথিমধ্যে স্পেন বর্ডারে ধরা পড়ি। তারা আমাকে জার্মান পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য ট্রেনে তুলে দেয়। কিন্তু আমি মাঝখানে নেমে পড়ি, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। আবার চেষ্টা করি পর্তুগাল যাওয়ার জন্য। ট্রেনে উঠেও বসি, সফল হই এবার। সোজা বাল্যবন্ধু আসিফের কাছে চলে যাই। তখন সে পর্তুগাল ছিল।

default-image

ওখানে তখন কাজের অভাব নেই। অ্যাভেলেবল কাজ। কিন্তু প্রায় সব কাজই কন্সট্রাকশনের। যা আমার শরীরের জন্য দুসাধ্য। এরপরও সাহস করে কাজ করা শুরু করি। দশদিন পর অবশ্য তা ছাড়তে বাধ্য হই। পায়ের ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই দশদিনের বেতনও পাইনি। শেষে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ পাই।

পর্তুগালে প্রায় তিন বছর। দেশেও সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তার মধ্যে মাঝেমধ্যে স্পেনেও আসা যাওয়া করছিলাম। স্পেনে কাগজের জন্য আবেদন করে রাখলাম। পর্তুগালেও। এদিকে পর্তুগিজ এক মেয়েকেও ম্যানেজ করি, কন্ট্রাক্ট বিয়ে করার জন্য। সে টাকার বিনিময়ে বিয়ে করবে আমাকে আর আমার কাগজ হবে। কাগজ হওয়ার পর, যে যার পথে।

এমন অসংখ্য বিয়ে হচ্ছিল তখন। যা নামে মাত্র বিয়ে। কিন্তু তা আর আমাকে করতে হয়নি। কাগজ এমনিতেই পেয়ে যাই। দুই জায়গাতেই আমার কাগজ হয়, কার্ড পাই। ২০০১ এর মাঝামাঝি সময়ে দেশে যাই। মা, তো আমাকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। এবার বেঁধে রাখবেনই। কত বছর পর দেখা, প্রায় পাঁচ বছর...। কিন্তু মাঝে কত কী ঘটে গেল! তার সুস্থ ছেলে অনেক কষ্ট পেয়ে পাঁচটা আঙুল হারিয়ে তবেই ফিরে এল।

মা, বেঁধে রাখার হাতিয়ারও ভেবে রাখলেন। তা হলো, বিয়ে করিয়ে দেওয়া। কিন্তু আমি তো বিয়ে করব না। বয়স আটাশ, এখনো বেশির ভাগ বন্ধু বিয়ে করেনি। তা ছাড়া খুব বেশি টাকাও উপার্জন করিনি। পাকা ঘরও তৈরি করিনি। অর্থাৎ, বিয়ে করার জন্য যা যা দরকার, আমার কিছুই নেই। মেজ ভাই দেশের বাইরে থাকতেন, ফোন করে জানালেন, তুই ঘর তৈরি করিসনি, তাতে কী! আমার বড় ঘর রয়েছে, যত দিন খুশি ওখানে থাকবি।

এরপর বড় ভাই ও বোন সবাই মিলে মেয়ে দেখতে লাগলেন। মেয়ে দেখার তিন নম্বরে, একজনকে পছন্দ হয়েও যায়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের, হালকা পাতলা, চঞ্চল মেয়েটি। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়

বড় এক ভাই আর বোনের ছেলেমেয়ে নিয়ে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে আংটি পরিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু আমি আবার শর্ত দিই, পরিবারে। আমার দুর্ঘটনার কথা তাদের জানাতেই হবে, নইলে বিয়ে করব না। মেয়ে দেখাদেখির পর জানা যায়, মেয়ের দুলাভাই, আমার দুলাভাইয়ের গ্রাম সম্পর্কিত নাতি হন। আমার দুলাভাই, তাকে সবকিছু ভেঙে বলেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়।

ভাগ্যে ছিল তাই আঙুল কাটতে হয়েছে। কিন্তু এরপরেও পুরো অনুষ্ঠানে আমি কাটা আঙুল মোজা পরে, আড়াল করে রাখি। কেন জানি, খারাপ লাগছিল। দেখাতে আবার লুকাতেও।

বিয়ের রাতে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি, আমার জীবনে একটা অ্যাক্সিডেন্টে হয়েছে, তুমি কি তা জানো? তোমার দুলাভাইকে তা জানানো হয়েছে।

: নাতো, জানি না। কী দুর্ঘটনা? সে অবাক হয়েই জানতে চায়।

বুঝলাম, তার কাছে গোপন করা হয়েছে, যা উচিত হয়নি। তাকে ঘটনাটি বললাম। তার জবাব যা ছিল, তাতে বিয়ের ষোলো বছর পরেও আমি এখনো মুগ্ধ!

: আপনি এত ভাবছেন কেন? ওই ঘটনা যদি, আমাদের বিয়ের পর ঘটত, যদি তখন পুরো পা কেটে ফেলে দিত...তবে কি, আমি আপনাকে অস্বীকার করতাম? ভালো হয়, ওই স্মৃতি ভুলে যান।

আমিও ভুলে গেলাম। মনের ভেতর আর কোনো হীনমন্যতা রইল না।

তখন, রবীন্দ্রনাথের, হৈমন্তী গল্পের কয়েক লাইন কানে বাজতে লাগল—‘আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম।’

আমার পরিবারকে এই মেয়ে খুব সহজে আপন করে নিয়েছে। আর আমার পরিবারও তাকে। সে বউ হয়ে নয়, সারাক্ষণ পরিবারের মেয়ে হয়ে এদিক সেদিক পাখির মতো ঘুরতে লাগল। আমার প্রায়ই মনে হয়, সে আমার চেয়ে আমার পরিবারকে বেশি ভালোবাসে! তবে মেয়েটি আমার জন্য কতটা টক, কতটা ঝাল আর মিষ্টি ছিল, সে গল্প পরে আরেকসময় করব।

বিয়ের কয়েক মাস পর বউকে রেখে আবার স্পেন চলে আসি। তখন সে তিন মাসের প্রেগন্যান্ট। চলে আসার আগে, আমাদের পুরোনো, বেড়ার ঘরে রেখে আসি। কারণ, সব ভাই, ভাবিরাই আলাদা আলাদা থাকতেন। মা চাইছিলেন, তাকেও আলাদা রাখতে। দুইটা রুম তার জন্য ঠিকঠাক করি, তাকেও আলাদা রাখা হলো। ভেবেছি, সে হয়তো কষ্ট পাবে। কিন্তু দেখলাম, সে খুশি মনে আমার মাটির ভাঙা ঘর গোছাচ্ছে!

স্পেন আসি, আবার কাজ, চাকরি শুরু করি। পৃথিবীতে ছেলের আগমনের খবর শুনে খুশিতে আত্মহারাও হই। বিয়ের চার বছরের ভেতর তিনবার বাড়ি যাই, পাকা ঘরও তৈরি করি। চতুর্থ বছরে একমাত্র ছেলে আর বউকে স্পেন নিয়ে আসি। স্পেনে তখন প্রায় সবাই, কিছু নিজের টাকা, আর কিছু ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি কিনেছিল, আমিও কিনলাম। সবাই বাড়ি ভাড়া দিয়ে, ওই টাকায় লোন শোধ করত। কিন্তু আমার ভাগ্য এবারও খারাপ। আমার বাড়িটার নাকি মেরামত করতে হবে। মাসের পর মাস, সরকারি লোক কাজ করে চলেছে। এদিকে চাকরির টাকায়, সংসার খরচ, ভাড়া বাড়ি, ব্যাংক লোন...মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়।

বউকে বললাম, দেশে চলে যাও, বিদেশে কষ্ট করে থাকার কোনো দরকার নেই। আর ছেলেও স্কুল যাওয়ার সময় হচ্ছে, স্প্যানিশ শিখে কী হবে...ইংলিশ পড়ানো খুব ব্যয়বহুল, আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

বউ তখন আবার পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট। সবাই আবার দেশে যাই। বউ–ছেলেকে রেখে আবার স্পেন চলেও আসি। চাকরিও শুরু করি। ঘর মেরামত শেষ হলে, ভাড়া দিয়ে ব্যাংক লোন শোধ করি। একসময় ভালো দামে বিক্রিও করি। বাড়ি বিক্রি, বেতনের কিছু জমা টাকা, অনেক আগে দেশে কিছু জমি কিনেছিলাম, তা বিক্রির টাকা, সব মিলে প্রায় সত্তর হাজার ইউরো জমে আমার।

স্পেনে একজন বাড়ি কেনাবেচার ব্যবসা করত। রিপন নাম তার। সে টাকাটা চাইলে, দলিল, সাক্ষী রেখে তাকে দিয়ে দিই। সে বিনিময়ে আমাকে লাভ দেবে জানায়। লাভ তো দূরের কথা, প্রায় দশ বছর পার হলো, সে আমাকে আসলও দিতে পারেনি। নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে পালিয়ে থাকে, ঠিকানা কাউকে জানায় না, ফোন রিসিভ করে না।

বাড়ির ব্যবসায় অবশ্য তার ক্ষতি হয়েছিল ঠিক। কিন্তু এখন সে ভালো অবস্থায় আছে শুনি। প্রতিবছর সে আমাকে মেসেজ করে জানায়, চার মাস, ছয় মাস পর সব টাকা একসঙ্গে দিয়ে দেবে। সেই দিন মাস এখনো আসেনি। স্পেনে কেস করতে পারি, তবে সে যদি ক্ষতির প্রমাণ দেয় এবং জানায় তার কাছে সত্যিই টাকা নেই, তাহলে কোর্ট আদেশ দেবে, মাসিক ৫০–১০০ ইউরো করে আমাকে পরিশোধ করার।

কী দরকার, অত অল্প টাকার! সারা জীবন দিলেও শোধ হবে না। তাই আর তা নিয়ে ভাবিও না আর। ভাগ্যে থাকলে ঠিকই পাব, সব কষ্টের আয়, হালাল রোজগার ছিল।

এরপর স্পেনে একবার দোকান দিলাম, সব দোকান চলে, আমারটা চলে না, আবার অনেক টাকা নষ্ট...। এরপরও আমার মাথা থেকে ব্যবসার ভূত নামে না। ২০১৩ সালে আবার রেস্টুরেন্ট দিই, ভাগনে আর আমি। ও হ্যাঁ, বড়বোনের ছেলেকে স্পেন নিয়ে গিয়েছিলাম। দুজন মিলে থাই রেস্টুরেন্ট দিই। আবারও ধরা খাই। তখনই আমি স্প্যানিশ পাসপোর্ট হাতে পাই। মালিকের হাতে চাবি দিয়ে প্রায় শূন্য হাতে, শুধুমাত্র একটা লাল পাসপোর্ট নিয়ে স্পেন ত্যাগ করি। ইংল্যান্ড চলে আসি। আমি আসার পাঁচ মাস পর বউ বাচ্চাদেরও নিয়ে আসি। এখনো কাজ করছি, পরিশ্রম করছি দিনরাত।

কারণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সাজাতে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকতে অমানুষিক পরিশ্রম করতেই হবে। এখন ভাবছি, যে ইউরোপের স্বপ্ন আমাকে এত দূর এত পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আনল। সেই হিসেবে জীবনে কিছুই পাইনি। ইউরোপ আমাকে তেমন কিছুই দেয়নি, একটি লাল পাসপোর্ট ছাড়া। তাও অবশ্য অমূল্য আমার কাছে। এটার কারণেই আমি আমার সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে পারছি। আর শোকরও করি, বউ বাচ্চা নিয়ে সুখেই আছি।

তবে একটাই আফসোস, মায়ের কাছ থেকে এখনো অনেক দূরে। তিনি বুড়ো হয়ে যাওয়ায়, এত দূরে, এক পুত্রের কাছে আসতে রাজি নন। দেশে তার আরও আট সন্তান যে চোখের আড়াল হবে! তবে তার দোয়া, ভালোবাসা আমার সঙ্গে সব সময়।


ফারহানা বহ্নি শিখা: লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0