২ এপ্রিল ২০২১, শুক্রবার। কেপটাউনের এনওয়ান সিটিতে ঘোরাঘুরি করছিলাম। সঙ্গে ছিলেন কৌশিক ভাই। একটা পর্যায়ে একটা প্রজাপতির অত্যাচার শুরু হলো আমার ওপর। গায়ে এসে বসতে লাগল। কখনো মাথার ওপর, কখনো ঘাড়ের ওপর, কখনো পিঠে, কখনো মুখে, কখনো বুকে।

আঘাত না পায়, এমন সতর্কতা নিয়ে বারবার তাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। ফুড়ুত করে উড়ে যায় শরীর থেকে, তারপর আবার এসে বসে। প্রজাপতিটার ভাব দেখে মনে হলো, এটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেছে। আদতে কিন্তু তা নয়। যদি নিয়ন্ত্রণহীনই হবে, তাহলে মলে শত শত নারী–পুরুষ থাকতে শুধু আমার গায়ে আসে কোন আহ্লাদে।

মলের মধ্যে হাঁটছি আর প্রজাপতির অত্যাচারে অস্থির হচ্ছি। তাড়ানোর বিফল চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করছেন কৌশিক ভাই। আমার এদিনের শান্তির মৃত্যু হোক, তবু প্রাণীটির যেন মৃত্যু না হয়, সে জন্য সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করেছি দুজন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ঘণ্টারও বেশি সময়ের এই অত্যাচারে এক‌বারের জন্যও কৌশিক ভাইয়ের শরীরে বসেনি এই প্রাণী। তাড়া খেতে খেতে সে বেশ ক্লান্ত এখন।
প্রজাপতিটার জিদ দেখে এক আফ্রিকান আমার উদ্দেশে বলেন, হি ওয়ান্টস টু নো ইউর নেম। তার এই কথা শুনে পাশ থেকে এক মহিলা বলে উঠলেন, হি না, হি না, শি।
বাহ! মহিলা তো ভালোই বলেছেন। মনে হলো, মহিলার কথার মধ্যে কিছু একটা লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে কিছু থাক না থাক, আমার কিন্তু বারবার মনে পড়ছিল দাদি–নানিদের কথা। তাঁরা বলতেন, প্রজাপতি গায়ে বসলে বিয়ের খবর আসে।

বেচারা প্রজাপতি, মলে এত অবিবাহিত ছেলেমেয়ে থাকতে তুই কিনা আমার বিয়ের খবর নিয়ে এলি! আমি তো সে কাজ কবেই সমাপ্ত ঘটিয়েছি। প্রজাপতি নিশ্চয় ভুল করছে। আমি বিবাহ করেছি কি করিনি, সেটাও গুগলে সার্চ করে আসেনি অথবা ইউটিউব দেখেনি।

আবার কৌশিক ভাইয়ের গায়ের ওপর যখন একবারও বসেনি, তখন আমার বিয়ের খবর নিয়ে ভয় হচ্ছিল। সত্যি সত্যি দাদি–নানিদের কথামতো বিয়ের খবর এসে যায় কি না। কৌশিক ভাই সবে দেশ থেকে বিয়ে করে এসেছেন, যাঁর গায়ে হলুদের দাগ রয়েই গেছে। প্রজাপতি সেটা বুঝেই হয়তো তার গায়ে বসে না।

default-image

যা–ই হোক, অবশেষে প্রজাপতির একগুয়ে মাতাল জেদের কাছে নত হলাম। প্রাণীটি এতটাই ক্লান্ত হয়েছে যে আমি আর পারছিলাম না ওর বিপক্ষে যেতে। মাথার ওপর বসে আছে, শরীর মাঝেমধ্যে ঝিনঝিনিয়ে ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। গরম তাই গাড়ির সব জানালার গ্লাস একটু বেশিই খোলা ছিল।

বাতাস পেয়ে গাড়ির সিটের ওপর গিয়ে বসল প্রজাপতি। নড়াচড়া নেই, হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। ইচ্ছা হচ্ছিল, একটা বালিশ প্রজাপতির মাথার নিচেই গুঁজে দিই। খুব সতর্কতার সঙ্গে, পিনপতন শব্দ না করে গাড়ি থেকে নেমে বাসায় এলাম। উনি গাড়িতে ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই।

গাড়ির গ্লাসগুলো খোলা ছিল। ঘণ্টা তিনেক পরে এসে দেখি প্রজাপতিটা আর গাড়িতে নেই। কোথায় কোন দিকে উড়ে গেছে জানি না। হয়তো আমাকে খুঁজতে গেছে আবার সেই N1 এনওয়ান সিটি মলে।

বিজ্ঞাপন

প্রজাপতির অত্যাচার থেকে রেহাই পেলাম আজ। তবে রেহাই পেলাম না দাদি–নানির সেই বিয়ের সংবাদ থেকে। প্রজাপতি গায়ে বসেছে, হয়তো বিয়ের খবর আসবে। মন থেকে এই ভাবনা আর যায় না। মাথার মধ্যে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে, আসলেই কি বিয়ের খবর আসবে? এলে কোথা থেকে আসবে? কবে আসবে? কে আনবে খবর? যদি এসেই যায়, তবে কী উত্তর দিয়ে তা সামাল দেব? ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তা।

এক–দুই করে তিন দিন পার হয়ে যাচ্ছে। ৫ এপ্রিল রাতে। ঘুমিয়ে গেছি, কেউ এসে ডাক দিল। সত্যি সত্যি বিয়ের খবর এসে গেছে। দাদি–নানিদের কথা সত্যি হলো। বিয়েতে চটজলদি রাজি হয়ে গেলাম। আমি এখন ক্লাস টুতে। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরামাত্র সবাই আমাকে ধরে হলুদ দিয়ে স্নান করাচ্ছে। আর মাইকে গান বাজছে: মালকা বানুর দেশেরে বিয়ার বাদ্য বাজেরে...।

পাত্রীর পরিচয় নিয়ে জানতে পারলাম, পাশের জেলায় হাইস্কুলের এক ম্যাডাম। ক্লাস টেনে অঙ্ক পড়ান। অঙ্কের টিচারের কথা শুনে বিয়েতে ডবল রাজি হলাম। কানে খবর এল, ওদিকে ম্যাডামেরও হলুদের গোসল চলছে। তা শুনে আমি আনন্দে মুচকি মুচকি হাসছি।

পরদিন সকালে গাড়ি সাজিয়ে, পায়জামা–পাঞ্জাবি পরে মাথায় মুকুট লাগিয়ে দলবল নিয়ে রওনা দিলাম অঙ্কের ম্যাডামকে আনতে। কাচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে সবেমাত্র পাকা রাস্তায় গাড়ির বহর উঠেছে। ওসি সাহেব হাত উঠিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলেন। সবাই বাড়ি ফিরে যান। দেশে লকডাউন চলছে, বিয়ে বন্ধ।

বিয়ে বন্ধ! তাহ‌লে ম্যাডাম আমাকে আর কোলে করে ঘুরে বেড়াবে না? ওসি সাহেবের নিষেধাজ্ঞা পেয়ে আর মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জাগ্রত হওয়ার পর ক্লাস টুর ছাত্র হয়ে গেলাম ভার্সিটির দাঙ্গা–হাঙ্গামারত এক আস্ত যুবক। ডান হাত টেনে নিয়ে ওসি সাহেবের কান বরাবর দিলাম থাপ্পড়।

থাপ্পড়টি আসলে যেয়ে লাগল আমার পাশে থাকা দেয়ালে। ঘুম ভেঙে গেল। হাতে অনেক ব্যথা পেলাম। তখন বুঝতে পারলাম, আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখছিলাম। আর একটি প্রজাপতির অত্যাচার এভাবেই শেষ হলো।
*লেখক: মাহফুজার রহমান, কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন