অথবা শুধু ‘একটু জড়িয়ে ধরে রাখো, ঘুম পাড়িয়ে দাও’, কখনোই সে বলবে না। সুমনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। কখনোই সে বা নাহিয়ান এমন হালকা রোমান্টিকতায় মেতে ওঠার চিন্তাও করেনি। কেন যেন ওদের কারোরই সেটা আসে না। তার চেয়ে ঘুমোক নাহিয়ান। সকালে কাজ তার। কাজে মনোযোগ দিতে পারে না সে ঘুম না হলে। জীবনে এ দুজনের কর্তব্যের বাইরে কোনো কিছুতে মনোযোগ নেই। সংসার, বাচ্চাকাচ্চা না দরকার হলে যেন তা-ও করত না, যতটুকু দায়সারা, ততটুকুই সম্পর্ক! যদিও দায়িত্ব পালনে কেউ পিছপা হয়নি কখনো। ভালোও নিশ্চয়ই বেসেছে। তার কতটা প্রয়োজনে, কতটা দিন-রাতে একসঙ্গে থাকার অভ্যাসে, সেটা সুমনা ভাবতে চায় না আর। হিসাব করার কী দরকার? তার জীবনে হিসাব বলে তো কিছু নেই। উৎসব-পার্বণে একখানা শাড়ি লাগবে কি না, সেটা নাহিয়ান জানতেও চায়নি। জানে, সুমনার কোনো কিছুরই দরকার নেই। তাই সে-ও আগবাড়িয়ে আদিখ্যেতা দেখায় না। আর সুমনা যে চুজি আর রাশভারী, নাহিয়ানের মতে, মাঝে মাঝে ও ভাবে, সে কি নাহিয়ানকে সাফোকেট করে যাচ্ছে এ সম্পর্কে?

সুমনা চায় না যে আর সবার মতো তার স্বামীও তার সঙ্গে খুনসুটিতে মাতুক; তা নয়। তবে তার কারও সঙ্গে তেমন খুনসুটি করার অভ্যাস না থাকায় সে পারেও না। যে যার মতো নিজেদের জীবন কাটায় এক ছাদের নিচে। ভালো তারা বাসে একে অন্যকে, যত্নও নেয় একে অন্যের, যতটা নেওয়া সম্ভব। তবু কোথায় যেন সুমনা ছন্দ খুঁজে পায় না। আসলে খোঁজেও না আজকাল আর।

বারান্দায় বসে বসে জোছনার আলোয় ভাসা রাজপথ দেখছে সুমনা। ভাবছে, ঘুমের ওষুধ না খেলেই নয়। সারা রাত এসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্ট নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কেটে যাবে। সুমনার এসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টে গা ভাসানোর স্বভাব নেই।
তবু মনে পড়ে সেই ছোটবেলা, কী অল্পে খুশি হতো সে। একটা লিপস্টিক, এক পাতা টিপ বা মিলাদের একটা জিলাপি—সব, সবই তাকে কি ভীষণ সুখী করত। কোন প্রেমিকপ্রবর নয়, নিজের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কিনত সে। প্রেমিক হওয়ার সুযোগ ছিল কারও?

দূর থেকে দেখে হয়তো কাউকে ভালো লাগতেই পারত। সে তো কারও দিকে তাকাতেও ভয় পেত। বাবা-মা সবার কড়া শাসনে বড় হয়েছে। আসলে সে জন্যই হয়তো কাউকে ভালোবাসতে শেখেনি। জানেনি কম্প্রোমাইজ করতে। অথবা অতি কম্প্রোমাইজ করতে করতে নিজের শখ, আহ্লাদ সেই ছোটবেলা থেকেই বিসর্জন দিয়ে গেছে। নয়তো ওর মতো মেয়ের প্রেমিকের অভাব হওয়ার কথা নয়। চিরকুটের পর চিরকুট পেয়েছে, ভয়ে তা দিয়ে কী করবে ভেবেও পায়নি। ফিক করে হেসে ফেলে সুমনা। কী বোকা ছিল সে! কেমন হতো জীবন, যদি ওদের কারও সঙ্গে সত্যিই প্রেম-প্রণয় হতো? জানে না সে। হয়নি তো!

ওই যে সেদিন পাড়ার ছেলেরা তাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিল কার পক্ষ হয়ে যেন, সুমনা তাকিয়ে দেখার সাহস করেনি। বরং ভয়ে কাঁপছিল! এ খবর তার মায়ের কানে গেলে আর উপায় থাকবে না। বছরের পর বছর এরা সুমনাকে টহল দিয়ে গেছে, সুমনা আজও জানে না, কোন ছেলেটার জন্য ওরা প্রস্তাব করেছিল। ভাবছে আজকে, জানা উচিত ছিল। আর জানলেই-বা কী? ওর প্রেম করার উপায় বা সাহস ছিল?

থাকলে তো হতোই, এরও আগে একদিন আরও একজন এভাবেই প্রেম নিবেদন করেছিল! কী কেলেঙ্কারি! কেন এত মেয়ে থাকতে সুমনাকেই প্রেম নিবেদন করবে? সে তার মায়ের এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। প্রেম করার ইচ্ছে জাগেনি কখনো? আসলে ভয়টাই বেশি ছিল। যেদিন ওর মা বলেছিল, ‘এ ছেলে তোমার যোগ্য নয়। কেটে নদীতে ভাসাব তোমায়, যদি ফের এ কথা শুনি।’ জানের মায়া বড় মায়া! আসলে মাকে বিশ্বাস নেই, আসলেও ভাসাতে পারে। দেখা যাবে বুড়োধুরো ধরে এনে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে! ওই বয়সে এর বেশি ভাবার সুযোগ ছিল না। কী হতো ভালোবাসলে? আসলেই কী হতো?

দিনে দিনে কত জল গড়াল। সুমনা সাহসই করে উঠতে পারল না কারও হাত ধরে বলতে, ভালোবাসি। পারত তো। ক্লাসের সবচেয়ে সুদর্শন আর স্মার্ট ছেলেটা যেদিন বলেছিল ভালোবাসি, সুমনার বুকে হাতুড়ির বাড়ি পড়েছিল! ভেবে পায়নি সে কী করে বলবে, ‘ভাই, তুমি ভুল মানুষকে ভালোবাসার কথা বলছ। কষ্ট পাবা তুমি, ঝামেলায় পড়ব আমি।’ ছেলেটাকে এতটুকু বলার সুযোগটাও সুমনাকে কেউ দেয়নি। জানত কী পাগল ছিল সে। সুমনা বিরক্ত হয়ে যায় এসব ভাবতে ভাবতে। কী ছেলেমানুষি ভাবনা!
তবে পড়েছিল সে প্রেমে একবার কারও। তুমুল প্রেমে! প্রেম সম্পর্কে তার ধারণাই ছিল না, তবু সাহস করে প্রেমে পড়েই গেল সে একবার। ভয়, সাহস, উত্তেজনায় সে ভালো লাগার চেয়ে বেশি কষ্ট পেতে থাকে। বোকা বোকা প্রেমে পড়ে কদিন পরেই জেনেছিল, সে প্রেম করার যোগ্য না। আসলেই তো। প্রেম করার কী যোগ্যতা লাগে, ও কী করে জানবে? কী নিদারুণ কষ্ট পেয়েছিল সে দুদিন কাউকে ভালোবেসে। সে ভেবে আর কখনো কারও সঙ্গে প্রেম করার সাহসই করতে পারল না। আঙুর ফল ভীষণ টক! সুমনা শব্দ করে হেসে ওঠে। ন্যাকা ন্যাকা প্রেম সে করতে পারবে না। ওটা তার আসে না। সম্পর্কে গিভ অ্যান্ড টেক ৫০/৫০—না হলে, সেটাকে সম্পর্ক বলেই মানে না সে।

তাই তো সে এখনো জানে না তার আর নাহিয়ানের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা আছে কি না, না পুরোটাই শুধু নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। সুমনা জানে না কী আশা করা উচিত এ সম্পর্কে, আশাও করে না কিছু। যাচ্ছে তো দিন, মাস, বছর, বছরের পর বছর। খারাপ নেই সে। কমতি কী, তা-ই না জানার এ এক সুবিধা!
তুমুল বর্ষায় একসঙ্গে ভেজার আনন্দ আসলেই কী আছে? সর্দি-জ্বর বাধানো ছাড়া? নাহিয়ানও সায় দেয়, না কোনো প্রয়োজন নেই শখ করে অসুখ বাধানোর।

জ্যোৎস্না রাতে হাতে হাত রেখে রাতজাগা? পোষাবে না। দরকার হলে লাঞ্চে মিট করো।
আজ ওয়েদার ভালো, লং ড্রাইভে যাবা? কেন? কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে টায়ার্ড হয়ে থাকব, এসব উদ্ভট প্ল্যান না করাই ভালো। রেস্ট দরকার। সুমনাও ভেবে দেখেছে, আসলেই এভাবে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। বরং ঘরে ফিরে সে তার পছন্দের বই নিয়ে বসলে সব ভুলে যেতে পারে। দরকার হয় না কারও আলতো ছোঁয়ার। মিস সে করে না জীবন। তার কাছে এটাই জীবন। অন্য কোনো জীবন সে চেনে না।
বারান্দা ছাড়িয়ে সুমনা উঠে দাঁড়ায়। ঘুমের ওষুধ হাতে নিয়ে ভাবে, কতগুলো খেলে আর জাগার সম্ভাবনা নেই? ঘুম, ঘুম চাই তার।

তারপর নিজেকে নিবৃত্ত করে। একটা, একটা হলেই চলবে আপাতত। ওষুধ খেয়ে শোবার ঘরে ফিরে যায়। জোছনার আলোয় নাহিয়ানকে দেখে মুগ্ধতা ছড়ায় মনে। মুগ্ধতার চেয়েও বড় প্রশান্তি! ভাবে যে এই মানুষটি তাকে ভালোবাসে, আর সবার মতো মিষ্টি ভালোবাসার কথায় ভোলানোর চেষ্টা করেনি কখনো তাকে। বোকা বানানোর চেষ্টাও করে না। সুমনার দায়িত্ব নিতেও দুবার ভাবেনি। ভালোই আছে সে। এই জীবন ছাড়া অন্য কোনো জীবন সুমনা চেনে না। হয়তো নাহিয়ানের দায়িত্ববোধটাকেই সে ভালোবাসে। গুটিসুটি পায়ে বিছানার দিকে এগোয়। ঘুম, ঘুম—দুচোখ ভরা তার এখন।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন