default-image

মোর্শেদ খান চৌধুরী, সাবেক মুখ্য সচিব। বাংলাদেশের একজন নক্ষত্র। এ বছরের ২৭ মার্চ তিনি চলে গেলেন নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে।

তাঁকে আমি দেখেছি একপলক। কাছে গিয়ে বসে কথা বলার সুযোগটা হয়নি। তাঁর মেয়ে আমার বান্ধবী। নাতনির বিয়ে উপলক্ষে সান ডিয়েগোতে এসেছিলেন তিনি। তবে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময়ের মাঝে একটু পাশে বসে কথা বলার সুযোগ হয়নি তখন তাঁর সঙ্গে, চলেও গিয়েছিলেন অল্প কিছুদিন পরই।

প্রথম যখন জানতে পারলাম শারমিন কে (মোর্শেদ চৌধুরীর মেয়ে), তখন প্রচণ্ড খুশির একটা ঢেউ মনে জাগল। অসম্ভব সুন্দর দেখতে এবং মননে, শান্ত, ভদ্র এই বান্ধবী তাঁর মেয়ে? যার সঙ্গে আমার নিত্য আসা-যাওয়া? উচ্ছ্বাস চেপে তাঁর ‘মধুর ক্যান্টিন’ বইটি চেয়ে নিয়ে এসে পড়লাম। ইচ্ছা হতো খুব কখনো গিয়ে জানব তাঁর কথা। কারণ ছোট বেলার খুব আনন্দময় কিছু সময়ের সঙ্গে যুক্ত তিনি।

‘সুখের ছাড়পত্র’ নাটকে দেখেছিলাম বোধ হয় প্রথম তাঁকে। এত ছোটকালের কথা, তবু কঠিনভাবে দাগ কেটে আছে। নাটকে আছে এক তরুণের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ, আফজাল হোসেন অভিনীত নাটকে তিনি গ্রিনকার্ডধারী তরুণ অথচ অর্থবিত্তের প্রলোভন উপেক্ষা করে, পারিবারিক চাপ অগ্রাহ্য করে গৃহশিক্ষিকাকে বিয়ে করে স্বপ্নিল জীবনের সূচনা করেন তিনি।

সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক ‘একটি লাল শাড়ী’, যেখানে প্রাণবন্ত তরুণ ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে চলেছিলেন। তিনি তার প্রেয়সীকে একটি লাল শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। শাড়ি দিয়ে চোখ বেঁধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে নিয়ে গিয়েছিল এবং পরে তার লাশ পাওয়া যায়। কত সহস্র ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার সময়কার ঘটনার কী প্রাণবন্ত প্রকাশ। নতুন প্রজন্মের সম্পদ এ নাটকগুলো।

হাসির একটা নাটক মনে করতে পারছি ‘দক্ষিণের জানালা’ নামে। এ ছাড়া ‘ওহে পরবাসী’, ‘স্টপ গ্যাপ’, ‘অনুরাগের ছোঁয়া’সহ অনেক নাটক দেশের বরেণ্য পরিচালকদের পরিচালনায় এবং বিশিষ্ট শিল্পীদের অভিনয়ে মনে দাগ কেটে আছে।
হঠাৎ করেই জানতে পারলাম তিনি আর নেই। জানলাম হুট করে শারমিন কেন দেশে চলে গিয়েছিল, খুব ইচ্ছা করছিল প্রিয় বান্ধবীর পাশে বসে থাকি। চিরকাল সবার সুখে-দুঃখে থাকা মেয়েটা কী করছে এ সময়? বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম, ওকে চলে আসতে হয়েছে এ দেশে জীবনের জরুরি প্রয়োজনে ওর বাবা চলে যাওয়ার পরপরই।

বিজ্ঞাপন

চলে গেলাম দেখতে শারমিনকে। একটা কথা ওর খুব মনে লাগল আমার, ‘মা আইসিইউতে, মনে হয় না বেঁচে থাকবেন তিনি। ভালো হয়েছে, আমার আব্বার চলে যাওয়ার খবর তাঁকে আমার দিতে হয়নি, তিনি এ খবর নিতে পারতেন না।’
জানলাম শারমিনের বাচ্চা হওয়ার সময় ওর মা এসেছিলেন এ দেশে। ওর বাবা তখন অনেক মিস করেছিলেন তাঁকে। শারমিনের মেয়ের বিয়ের সময় ওর বাবা এসেছিলেন, মা অসুস্থ ছিলেন বলে আসতে পারেননি। তড়িঘড়ি করে ওনার দেশে চলে যাওয়ার কারণও ছিলেন শারমিনের মা, যাঁকে ওর বাবা খুব মিস করছিলেন।

১৫ এপ্রিল শারমিনের মা মিসেস আজিজা চৌধুরী চলে গেলেন আল্লাহর কাছে হাসপাতাল থেকেই। স্যার মোর্শেদ চৌধুরি নেই, এ কষ্টটুকু আল্লাহ তাঁকে সইতে দেননি। চিরকাল প্রচারবিমুখ এবং একজন যোগ্য পিতা, স্বামী, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং মেধাবী লেখক এবং একজন যোগ্য মা এবং স্ত্রী চলে গেছেন অনন্ত যাত্রায় প্রায় এক সঙ্গেই কিন্তু রেখে গেছেন অসম্ভব ভালো একজন কন্যা এবং এক ছেলে, তাঁদের পরিবার এবং আমার মতো অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠক, দর্শক।

আল্লাহ আপনাদের বেহেশত নসিব করুন, আমার বান্ধবীর কষ্ট কমিয়ে দিন দোয়া করি। এ রকম সুযোগ্য সন্তান আপনাদের মতো পৃথিবীতে আমরাও যেন রেখে যেতে পারি।

*লেখক: চিকিৎসক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন