default-image

ছুটির দিন, জয়িতার ঠুকঠুক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। মা–বাবা গ্রামের বাড়িতে গেছে এক সপ্তাহ হয়ে গেছে, আমি আর জয়িতা বাসায়। ছুটির দিনে একটু বেলা করেই উঠি, বাসার সবাই একটু চুপচাপ থাকে ছুটির সকালে, যদি আমার ঘুম ছুটে যায়, এই ভয়ে।
জয়িতার হঠাৎ কী হলো বুঝতে পারছি না! আমাদের দেয়ালে সাঁটানো ছবির ফ্রেমটা নামিয়ে পুরোনো জিনিসপত্র রাখার জায়গায় ফেলে রেখেছে। বলে কিনা এসব জীবজন্তুর ছবি না থাকাই ভালো!

অথচ বিয়ের পর আমার ঘরে এসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে এই ছবির প্রশংসা করেছিল। আমার মনে আছে সে এ–ও বলেছিল, ‘তোমার রুচি তো বেশ, ছবিটা সুন্দর!’
মন খারাপ করা কণ্ঠে জানতে চাইল সে, ‘আচ্ছা তোমাকে প্রায়ই দেখি সন্ধ্যায় বাসস্টপে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবতে! কী এত ভাব?’

—কী বলছ প্রায়ই দেখ!
—কালও তো দেখলাম, বাস থেকে নেমে আরেকটা বাস আসা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলে, ভুলে গেলে? আমাদের ব্যালকনি থেকে কিন্তু বাসস্টপ দেখা যায়।
—ও, হ্যাঁ, কাল নিলয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আসবে বলে আসেনি।
—নিলয় না নীলু?
—কী আবোল–তাবোল বকে যাচ্ছ!
—আমার কথা তো আবোল–তাবোল মনে হবেই। আচ্ছা আরেকটা কথা বলো তো, এ বাসায় তোমরা কত বছর?
—হয়ে গেছে অনেক বছর! কেন? আজ হঠাৎ এটা জানার ইচ্ছা হলো যে তোমার!
—না, আব্বার নাহয় আয়–রোজগার খরচের তুলনায় সীমিত ছিল, কিন্তু তুমি তো ভালোই আয় করছ, বাসা বদল করলেই তো পারতে!
—কেন, তোমার কি এ বাসায় সমস্যা হচ্ছে? কখনো তো বলনি! আসলে আমরা ভাড়াটিয়া হলেও বাড়িওয়ালা চাচা কখনো সেভাবে দেখেননি আমাদের।
ওনার মৃত্যুর পর ওনার ছেলেরাও একই রকম খেয়াল রাখছেন আমাদের। বাড়ি ভাড়াও তেমন বাড়াচ্ছেন কই! আমরা ছেড়ে দিলে নিশ্চিত তিন–চার হাজার বেশিতে ভাড়া দিতে পারবেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন
default-image

—বুঝতে পেরেছি, আর তা ছাড়া ঠিকানা বদলালে তো অনেক ঝামেলাও আছে।
অনেকটা টিপ্পনি কেটেই যেন কথাটা বলল জয়িতা!
আমিও জবাব দিলাম, ‘একদম ঠিক বলেছ। জানো, নিলয়ের এক মামা যখন সাত বছর পর দুবাই থেকে ফিরে ওদের বাসা খুঁজে পাচ্ছিলেন না, সোজা আমাদের বাসায় এসে হাজির, তিনি জানেন অন্তত আমাদের কাছে নিলয়দের বাসার ঠিকানা পাবেন।’

—আহারে, তোমরা তো যেন কলম্বাসের বংশধর! মানুষের ঠিকানা আবিষ্কার করে দিতে ঠিকাদারি নিয়ে রেখেছ।

জয়িতার কথার হাবভাব ভালো ঠেকছে না আজ! বড় কিছু ঘটেছে আন্দাজ করতে পারছি। তাই একটু নরম সুরেই জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা কী হয়েছে তোমার? এমন অদ্ভুতুড়ে কথা বের হচ্ছে কেন মুখ থেকে?’
—আচ্ছা মুহিন, একটা সত্যি কথা বলবে?
কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়েই যেন জানতে চাইল।

—তোমার সাথে আবার কবে মিথ্যা বলি? শুধু কিছু কিনে আনলে নাহয় একটু দাম কমিয়ে বলি আরকি, তা–ও তোমার টিটকারি থেকে বাঁচতে। বলো দেখি, কী জানতে চাও?

—প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় বারবার যে নিচ থেকে মাথা ঘুরিয়ে দেখো আমায়, তখন কি সত্যিই আমাকে দেখতেই তাকাও?
—তো, আর কাকে দেখব? এত আজব ভাবনা আসছে কোথা থেকে তোমার?
—না, হতেও তো পারে পুরোনো অভ্যাস, কাউকে এভাবেই দেখতে। সে মানা করত, বলত এভাবে পিছু দেখলে অমঙ্গল হবে, তুমি শুনতেই না। ইশারায় কিছু বলে দিতে, হতেই তো পারে, তাই না?

—ওহ, শিট! এই তাহলে কাহিনি? তুমি আমার নোটবুক দেখেছ!
দৌড়ে টেবিল থেকে নোটবুকটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতেই যাব, এমন সময় একমুঠো কাগজের টুকরা ছুড়ে মারল আমার দিকে জয়িতা। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘এই নাও, কাগজের টুকরা জোড়া লাগিয়ে মন ভরে স্মৃতিচারণা করো!’

default-image

আমি কীভাবে কী বলব, বুঝতে পারছি না। তার আগে আপনাদের দেখানো দরকার, কী লেখা ছিল নোটবুকে।
‘বদলায়নি ঠিকানা আজও,
যদি তুমি আসো খুঁজতে!
বদলাইনি নিজেকেও,
যদি না পারো বুঝতে!
বদলায়নি ঘরের দেয়ালে,
তোমার দেওয়া ছবির ফ্রেম!
বদলায়নি তোমার তরে,
আমার সেই গভীর প্রেম!
বদলায়নি ঠিকানা আজও,
যদি তুমি আসো খুঁজতে!
বদলাইনি নিজেকেও,
যদি না পারো বুঝতে!
এখনো সন্ধ্যা নামলে,
তোমার ফেরার গাড়ি থামলে,
দাঁড়িয়ে থাকি ঠায়।
জেনেও না জানার ভান করে যাই,
সে গাড়িতে তুমি নাই!
বদলায়নি ঠিকানা আজও,
যদি তুমি আসো খুঁজতে!
বদলাইনি নিজেকেও,
যদি না পারো বুঝতে!
তোমার মনে আছে কি না জানি না,
আমি এখনো ওসব মানি না!
ওই যে তুমি বলতে,
পথ, করলে শুরু চলতে,
পিছু দেখতে নেই!
আমি দেখতাম আরও বেশি,
রাগতে গিয়েও
চেপে রাখতে পারতে না তুমি হাসি,
ইশারায় শুধু বলে দিতে, তোমায় ভালবাসি।
বদলায়নি ঠিকানা আজও,
যদি তুমি আসো খুঁজতে!
বদলাইনি নিজেকেও,
যদি না পারো বুঝতে!’

আসল কাহিনিতে আসি এবার, আমার এক বন্ধু টুকটাক গান করে, আমিও ছন্দ–টন্দ লিখতাম একসময়। অনেক দিন ধরেই সে বলছিল, একটা লিরিকস গোছের কিছু লিখে দিতে। তাই কাল রাতে এটা লিখেছিলাম।

কিন্তু নোটবুকে যখন দেখতে পেলাম না, তখন ভাবলাম, লেখাটা যখন ছিঁড়েই ফেলল জয়িতা, আবার ছন্দ মেলানো হবেও না। তাই ভাবলাম শাস্তি হিসেবে পাগলিটাকে আরেকটু নাচাই।

বিজ্ঞাপন
default-image

একদম মিথ্যুকের মতো বলেই দিলাম, ‘কী যা–তা বলছ? এটা আমার লেখা হতে যাবে কেন? কার না কার হাতের লেখা!’

এবার ও হুঙ্কার দিয়ে বলল, ‘জানতাম, এমনই কিছু বলবে! তুমি কি ভেবেছ আমি প্রমাণ রাখিনি?’

হুট করে আমার মুঠোফোনে বেজে ওঠে সেই গায়ক বন্ধুর ফোন, লাউড স্পিকার দিলাম।

—হ্যালো, মুহিন লিরিকসটা লিখেছিস?
—লিখেছিলাম, কিন্তু তোর ভাবি তো ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলেছে দোস্ত। ভালোই মিলিয়েছিলাম। কিন্ত আবার মেলাতে পারব কি না সন্দেহ আছে।
—ওহ, কী বলিস! ভাবি এমন করল কেন? আচ্ছা, আরেকবার দেখিস।
—আচ্ছা, এখন রাখ, পরে কথা হবে।

কথা শেষ করে ফোন রাখতেই জয়িতা নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিল, যেখানে নোটবুকের ছিঁড়ে ফেলা পাতার ছবি!
জানতে চাইলাম, ‘ছিঁড়ে ফেলে আবার ছবি তুলে রাখলে কেন?’
—ঠিকই তো অস্বীকার করে ফেলেছিলে!
—সেটা তো মজা করে বলেছিলাম।
—হয়েছে, চা বসাচ্ছি চুলায়। লিরিকসটা তোমার বন্ধুকে পাঠিয়ে দাও এখন। আর গান তোলা হলে আমাকে শুনতে দিও। ভালোই লিখেছ।
ওকে শুনিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললাম, জীবন থেকে লিখলে সবকিছুই ভালোই হয়!
উচ্চস্বরে জবাব এল, ‘কী বললে?’
—না, বললাম চায়ে চিনি একটু বেশি করে দিও।

এগিয়ে এলেও শুধু বাথরুমের দরজায় ছিটকিনি লাগানোর শব্দটা শুনল সে। আর আমি শুনলাম, ‘বাথরুম থেকে বের হও, চিনি বেশি করে খেতে পারবে।’

*লেখক: জাহেদুল আলম, জুলেখা হাসপাতাল, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন