default-image

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী স্বনামধন্য শাকুর মজিদ বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে এসেছিলেন পরিবারসহ। স্থপতি, লেখক, নাট্যকার, আলোকচিত্রী, প্রামাণ্যচিত্র, টেলিফিল্ম ও চলচ্চিত্র নির্মাতা—বহুবিধ পরিচয়ের একটি নাম শাকুর মজিদ। তিনি একজন আলোকিত মানুষ। প্রতিভাধর ও আলোকিত এই মানুষটি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের অংশ হিসেবে ঘুরে গেলেন ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায়ও। এই এলাকায় তার ভ্রমণ পরিকল্পনা জানার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটনের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একতারা আয়োজন করেছিল শাকুর মজিদের সম্মানে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
একতারা নাট্য পরিবার শাকুর মজিদ রচিত মহাজনের নাও নাটকটি অত্যন্ত সফলভাবে ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার দর্শকদের জন্য একাধিকবার মঞ্চস্থ করেছে (২০১১, ২০১২ ও ২০১৩)। যার নাটক তারা মঞ্চায়ন করেছে, সেই নাট্যকার স্বয়ং যখন ওয়াশিংটনে আসছেন, তখন একতারা নাট্য পরিবার উচ্ছ্বসিত হয়ে অতিশয় আনন্দের সঙ্গে তার অভ্যর্থনার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একতারা নাট্য পরিবারের পক্ষে শেখ মাওলা মিলন তাকে আমন্ত্রণ জানান নাট্য পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় সহভাগিতা করার জন্য। শাকুর মজিদ তার স্নেহধন্য প্রবাসী এই সব অনুরাগীদের অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করেন। তাকে সংবর্ধনা জানানোর এই আনন্দঘন আয়োজনের দিনটি ছিল ১১ অক্টোবর রোববার শেখ মাওলা মিলনের ভার্জিনিয়ার লর্টনস্থ বাসভবনে।

default-image


মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজনে একতারা নাট্য পরিবারের সবাইকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল। দুপুর গড়াতেই একে একে এসে হাজির হতে থাকেন পরিবারের সকল সদস্য-সদস্যারা। ভরে গেল বাড়ির আঙিনা। সবার হাস্য কলরোল, আলাপচারিতায় নীরবতা ভেঙে সরব হয়ে উঠতে লাগল পুরো বাড়ি। যেন একতারা নাট্য পরিবারের মিলনমেলা! সবার চোখে মুখে মিলন ও সহভাগিতার এক আনন্দময় উজ্জ্বল দ্যুতি। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে, প্রাণবন্ত আলাপচারিতায় সে মুহূর্তগুলো বাঙ্‌ময় হয়ে উঠেছিল সবার অন্তরের ছোঁয়ায়।
অবশেষে এসে হাজির হলেন শাকুর মজিদ। উষ্ণ অভিনন্দন ও আন্তরিক আতিথেয়তার স্পর্শে অভিভূত হলেন তিনি! চারিদিকে ঘুরে সবার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন, সেলফিও তুললেন সবাইকে নিয়ে। সবার মনে লেগে গেল তার খোলামেলা প্রাণের স্পর্শ। অত্যন্ত স্বাভাবিক, সহজ-সরল, শান্ত, গম্ভীর অথচ প্রাণ প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ এক বুদ্ধিদীপ্ত আলোকিত ব্যক্তিত্ব শাকুর মজিদ!
অপরাহ্ন হয়ে গেছে, মধ্যাহ্নভোজন শুরু হওয়ার পথে। নানা মুখরোচক দেশীয় খাবারে ভরে গেছে খাবার টেবিল। মধ্যাহ্নভোজন শেষ করে শাকুর মজিদকে উষ্ণ অভিনন্দন জানানোর জন্য একতারা নাট্য পরিবারের সবাই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে তার সাহচর্যে এক অনন্য অভিজ্ঞতার জন্য। সময়ের স্বল্পতায় সুযোগটা হাত ছাড়া হওয়ার আগেই তার সঙ্গে কিছু কথোপকথনের লোভটা সামলাতে না পেরে মিলন দাকে জানালাম শাকুর মজিদের সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎকারের বিষয়ে। সময়ের সংক্ষিপ্ততা সত্যেও সানন্দে রাজি হয়ে শাকুর মজিদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে বিষয়টি বলে তৎক্ষণাৎ বসিয়ে দিলেন আমাদের দুজনকে তার লিভিং রুমে। সংক্ষিপ্ত সময়ের ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেলেন মিলন দা।

default-image

শাকুর মজিদের সঙ্গে এই একান্ত সাক্ষাৎকার অন্যসময়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছে নিয়ে এখানে শুধুমাত্র একতারা নাট্য পরিবারের পক্ষ থেকে শাকুর মজিদজকে সংবর্ধনা দেওয়ার ওপরই আলোকপাত করার প্রয়াস পাচ্ছি।
মধ্যাহ্নভোজনের পর পরই সবাই বসে যান সহভাগিতার অনুপম আয়োজনে। যে আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শাকুর মজিদকে একতারা নাট্য পরিবারের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো এবং তার অভিজ্ঞতা ও সহভাগিতার আলোয় নিজেদের সিক্ত করে নেওয়া। যে লেখকের নাটক একতারা নাট্য পরিবার ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার দর্শকদের উপহার দিয়েছে, সেই লেখকের সঙ্গে কাছ থেকে সহভাগিতার এই আয়োজন সবার জন্য ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতার সুযোগ।
প্রথমেই একতারা নাট্য পরিবারের শেখ মাওলা মিলন নাট্য পরিবারের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন শাকুর মজিদের সঙ্গে। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এ পর্বে শাকুর মজিদের ওপর সংগৃহীত কিছু তথ্যচিত্রের ভিডিও প্রদর্শনও করেন শেখ মাওলা মিলন। পরিচয়ের পালা শেষ করে শাকুর মজিদকে বক্তব্য রাখার জন্য এবং তার জীবনের ওপর সহভাগিতা করার জন্য তাকে অনুরোধ জানানো হয়।
নিজের পরিচয় ও সৃষ্টিশীল কর্মের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে শাকুর মজিদ তার শৈশব থেকে শুরু করে জীবনে পথচলার বিভিন্ন দিক ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতার ওপর সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোকপাত করেন। তিনি সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় সেখানেই মানুষ ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান দখল করে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে স্থাপত্য ও নির্মাণ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
শাকুর মজিদ ব্যক্তিগত জীবনে একজন স্থপতি, লেখক, নাট্যকার, আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি দুটি বেতারনাটক, নয়টি টিভি নাটক ও একটি মঞ্চনাটক রচনা করেছেন। একটি প্রামাণ্যচিত্র রচনা করেছেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ওপর। ভ্রমণকাহিনি, আত্মস্মৃতি, আলোকচিত্র, স্থাপত্য, গল্প ও স্মারক গ্রন্থসহ ২৭টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের জন্য প্রায় তিন শ তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। তার সৃজনশীল কাজের সম্মাননা ও স্বীকৃতি হিসেবে সর্বমোট ২২টি পুরস্কার পেয়েছেন বিভিন্ন সংস্থার পক্ষে থেকে।

default-image


তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সুদীপ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ২০১০ সালে সুবচন নাট্যগোষ্ঠী তার মহাজনের নাও নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করেছে। এ ছাড়া সিলেটের নৃত্যশৈলী নাট্যগোষ্ঠী তার এই নাটকটি গীতি নৃত্যনাটক হিসেবে উপস্থাপন করেছে বলে জানান।
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনধারার মাঝে একতারা নাট্য পরিবার যে তার মহাজনের নাও নাটকটি মঞ্চায়ন করেছে, এতে তিনি খুবই আনন্দিত ও অভিভূত। এ জন্য তিনি গর্বিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, প্রবাসের এই প্রেক্ষাপটে এমনভাবে সংস্কৃতির চর্চা ও মঞ্চনাটক উপস্থাপন করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। একতারার নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতি-অনুরাগী কর্মীরা তা সফলতার সঙ্গে সম্ভব করেছে দেখে তিনি সত্যিই অভিভূত ও মুগ্ধ। তিনি একতারা নাট্য পরিবারের উত্তরোত্তর সাফল্য ও উন্নতি কামনা করেন।
অতঃপর একতারা নাট্য পরিবারের নাট্যকর্মী, সংস্কৃতিসেবী, বিসিসিডিআই-এর সভাপতি শামীম চৌধুরী শাকুর মজিদকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। একতারা নাট্য পরিবারের সঙ্গে তাকে কাছে পেয়ে ও তার সাহচর্য লাভ করতে পেরে অনেক আনন্দিত ও অভিভূত হয়েছেন বলে তিনি ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়াও শাকুর মজিদ রচিত মহাজনের নাও নাটকটি থেকে কিছু কিছু নির্বাচিত সংলাপ তার সামনে পরিবেশন করে উপস্থিত নাট্যকর্মীরা।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে একতারা আয়োজিত ও পরিবেশিত মহাজনের নাও নাটকটি শাকুর মজিদের মূল রচনা ঈষৎ​ পরিমার্জনা করে শামীম চৌধুরীর নির্দেশনায় ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। নাটকটি ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার বাঙালি সুধীমহলে বহুল জনপ্রিয় হয়েছিল। আয়োজনের এই পর্যায়ে গান পরিবেশন করেন নাটকের সংগীত পরিচালক কালা চাদ সরকার। তিনি মহুয়া নাটকেও সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।
সব শেষে একতারা নাট্য পরিবারের পক্ষ থেকে শাকুর মজিদকে অভিনন্দন জানিয়ে তার হাতে একটি সম্মাননা পদক তুলে দেওয়া হয়। একতারা নাট্য পরিবারের এমন আন্তরিক স্পর্শে অভিভূত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। এমন আন্তরিকতা, উষ্ণতা, অভ্যর্থনা ও সম্মান প্রদান তিনি প্রবাসের জীবনধারার প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের আঙিনায় আশা করেননি। সবাইকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এ ছাড়া ভবিষ্যতে একতারা নাট্য পরিবারের সঙ্গে আরও কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

default-image

অনুষ্ঠানটিতে বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করেন ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার লেখক-সাংবাদিক শিব্বির আহমেদ। আরও সহযোগিতা করেন আরিফুর রহমান। আরিফুর রহমান তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শাকুর মজিদকে নিজেদের মাঝে একান্তভাবে পেয়ে খুশি হয়েছেন বলে জানান। অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় তবলা সংগত করেছেন আশিস বড়ুয়া।
একতারা নাট্য পরিবারের সদস্যদের জন্য দিনটি ছিল ব্যস্ত জীবনের প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততার মাঝে থমকে যাওয়া অন্যরকম একটি দিন। বিশেষ এই আয়োজন ছিল একজন বিশেষ প্রতিভাধর, সৃষ্টিশীল, আলোকিত ব্যক্তিত্বের অনুপম সাহচর্য পাওয়ার। সবার মিলন বন্ধনের আন্তরিক স্পর্শ, এক অনন্য অভিজ্ঞতার ছোঁয়ায় ভিজে যাওয়া মন, সবকিছু মিলিয়ে একতারা নাট্য পরিবারের আয়োজিত শাকুর মজিদের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ছিল তাদের অনেক আয়োজনের মাঝে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আয়োজন। যে আয়োজনের স্মৃতি সবার মনে ভেসে বেড়াবে বহুদিন। জীবনের আগামী দিনগুলোতে ব্যক্তিগত একান্ত সময়ের নীরবতা বা সাংস্কৃতিক পথচলায় আরও অনেক আয়োজনের মাঝে আবারও ফিরে আসবে এই দিনটির সোনালি মুহূর্তগুলো ভিন্ন রং নিয়ে ভিন্ন আবেশে। কখনো কখনো সাংস্কৃতিক আড্ডায় আবারও জীবন্ত হয়ে উঠবে গত হয়ে যাওয়া এই সুন্দর দিনটির কথা। শাকুর মজিদের মতো একজন আলোকিত মানুষের এই একান্ত সান্নিধ্যের অনন্য স্মৃতিতে আবার আলোকিত হবে স্মৃতিচারণার সেই মুহূর্তগুলো, নিঃশব্দ সময়ের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হবে স্মৃতিময় অনুভূতির আওয়াজ!

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন