default-image

দেশ থেকে ঘুরে এসেছি প্রায় সাত মাস হয়ে গেল। আমার ১০ বছরের প্রবাসজীবনের এটা পরম ভাগ্য বলতে হবে যে প্রতিবছর আমাদের দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়। শেষবার দেশে এক বছর কাটিয়ে এসেছি আপনজনদের সংস্পর্শে। বুকের ভেতরে নানান স্মৃতি  ধারণ করে প্রতিবার দেশ থেকে ফিরে আসি আবার যাওয়ার আশা নিয়ে।

দেশে লম্বা সময় থেকে আসার ফলে পরবর্তী সময়ে এখানকার জীবনে একটা শূন্যতা অনুভব হয়। আপনজন বা প্রিয়জনদের শূন্যতার পাশাপাশি যে শূন্যতাটা ফিরে আসার পরই প্রবলভাবে অনুভব করি, সেটা হলো শব্দশূন্যতা। দেশে মানুষের কোলাহল, রিকশার টুংটাং শব্দ, গাড়ির হর্ন, মসজিদের সুমধুর আজানের ধ্বনি, আপনজনের ডাক—এ সবকিছু  থেকে অনেক অনেক দূরে চলে আসি আমরা, সে অনুভূতি অনেক কষ্টের। দেশের কোলাহল মুখর আর বিশৃঙ্খল পরিবেশ ছেড়ে এসে এখানকার সুনসান নীরবতা আর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যন্ত্রণার উদ্রেক ঘটায়।
নাগরিকত্ব, শপথ, আধুনিক ও শৃঙ্খল জীবন—সবকিছু দেশের টানের কাছে বড়ই মলিন। বারবার মনে হয়, আমার মাতৃভূমি যেমন, আমি তাকে সেভাবেই ভালোবাসি।

বিজ্ঞাপন

যত সমস্যাই থাকুক, এই ভালোবাসা বড়ই একপেশে। এখানে এত সুবিধা পাওয়ার পরও কোনো কিছুই আমার নিজের মনে হয় না, বরং দেশে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের সময় মনে হয়, ওই দূরে দেখা বটগাছটা, ভাঙা ব্রিজটা, মেঠো পথটা, মলিন মুখের জীর্ণশীর্ণ মানুষগুলো আমার অতি আপন। একমাত্র প্রবাসীর কাছেই এই অদ্ভুত অনুভূতিগুলো বোধ‌গম্য। দেশে বসবাস করলে এই বোধ হয়তো কখনোই আসত না, সম্ভব না। তাই বলে এখানে আনন্দ করি না, তা বলা ভুল হবে। নিজের পরিবার, কিছু আত্মীয়, বন্ধু নিয়ে ভালো সময় কাটে। সেই সঙ্গে প্রচুর ঘুরাঘুরি করি, কিন্তু দিন শেষে একটা শূন্যস্থান থেকেই যায়, যা সব প্রবাসীই অনুভব করেন, কমবেশি। সে শূন্যস্থান একমাত্র নিজের দেশ পূরণ করতে পারে।
বাংলাদেশে ডিসেম্বর মাসটা আমার বছরের পছন্দের মাস। কারণ, এ সময় চারদিকে একটা উৎসবমুখর আবহ বিরাজ করে। শীতের আমেজ, ছুটির আমেজ, ঘোরাঘুরি, পিঠা-পুলির আয়োজন, বিজয়ের মাস—সব মিলিয়ে মহা আনন্দের মাস। ভালো লাগার আরেকটি কারণ না বললেই নয়, তা হচ্ছে আমার বিবাহবার্ষিকীও এই মাসে। এ সময়ে বাংলাদেশকে আরও বেশি মনে পড়ে।

ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। কয়েক দিন পরই পয়লা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও মহান অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হবে। ফেব্রুয়ারি মাসের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে একুশে বইমেলা। এসব লিখতেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফাল্গুনকে বরণ করে নেওয়ার জন্য বাসন্তী হলুদ বসনে বর্ণিল সাজসজ্জা, লাল টুকটুকে রঙে রাঙিয়ে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আর সাদা-কালোতে মাতৃভাষা দিবসের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদন। গত বছর এই সময়ে দেশে ছিলাম। প্রতিটি দিবস উদযাপন করেছি দেশীয় আমেজে, মন চাচ্ছে আবার ছুটে যাই আমার সংস্কৃতির কাছে।
আমার স্বামী মাঝেমধ্যেই বলে, ‘চলো, দেশে চলে যাই, একটাই জীবন।’ বিষয়টা স্বপ্নের মতো মনে হয়, কিন্তু অসম্ভব তো কিছু না, করাই যায়। দুই মেয়ে আমাদের দেশে বড় হবে, আমরাও তো দেশে বড় হয়েছি। দোদুল্যমান দোলায় দুলতে থাকে আমাদের প্রবাসজীবন।

*সুরাইয়া সিদ্দিকী, ডালাস, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন