ঘোলা আকাশ। গাড়ির কাচ দিয়ে দুই পাশে চোখ রাখলে মনে হয় ধূসর রঙের বিভিন্ন শেডের এক ক্যানভাসের মধ্য দিয়ে ট্যাক্সি ছুটে চলছে ফেলথাম পেরিয়ে হিথরো টার্মিনাল চারের রোড ধরে। ট্যাক্সির ভেতর আমরা চুপচাপ। মনে চিন্তা, এক ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট ডিলে হবে না তো? আমার মনের কথা কেড়ে নিয়ে ট্যাক্সিচালক মাথা ঘুরিয়ে বলল, তোমার ফ্লাইট অন টাইম? আমাকে এক ঘণ্টার মতোন ওয়েট করতে হবে এখানে, একজনকে পিক করতে হবে।

আমি বললাম, অনলাইনে দেখতে হবে। হলেও আর কতটুকু? আমি বেশি বদারড না।
শুধু দোয়া করছি, আকাশ যাতে স্বচ্ছ থাকে, আহ! রোদেলা আকাশের কড়কড়ে ঠান্ডার হাতছানি। পৃষ্ঠা উলটাই কিছুক্ষণ কথোপকথনের, মধ্যবয়সী পাকিস্তানি ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে।
তুমি কি ইন্ডিয়ান? ট্যাক্সিচালকের প্রশ্ন
না বাংলাদেশি। বলি আমি ৷ তারপর প্রশ্ন করি তুমি কি পাকিস্তান থেকে?
হুম। আমার মিসেস বাংলাদেশের। সিলেটের। বলে সে৷
ওকে। ভালো লাগল জেনে।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাকিস্তানি ট্যাক্সিচালক আনোয়ার সম্পর্কে জানলাম। লাহোর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। এখানে এসে আর পড়াশোনা করেনি, বিয়ে করে পেশা বেছে নিয়েছে ক্যাব চালনা।
গাড়িতে ক্যাপিটাল এফএম চলছিল, সেটা বন্ধ করে আগ্রহী হয়ে উঠল কথাবার্তায়।
একাত্তরে তোমাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে আমার নানাশ্বশুর মারা যায়। তারপর থেকে আমার শাশুড়ি পাকিস্তানিদের ঘৃণা করে। সেই জন্য আমাদের বিয়ের সাত বছর হয়ে গেল, তার পরও আমাকে মেনে নেয়নি।
ওহ সরি। বলি আমি৷
না ঠিক আছে। এতে আমাদের দোষ কী? আই মিন সাধারণ জনগণ। আমরা পলিটিক্স বা সৈনিক হয়ে ফাইট করিনি। আমার বাবা বলেন, পাকিস্তানের জনগণের বিরাট একটা অংশ জানত না তোমাদের সঙ্গে কী হচ্ছে।
না জানার কী আছে? বিবিসি-ভয়েস অব আমেরিকায় তো নিয়মিত খবর পাওয়া যেত। যদিও মেইন মিডিয়াতে খবর সেন্সর করা হতো। তোমাদের ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপও এই জেনোসাইডের কোনো প্রতিবাদ করেনি। আমি একটু স্বর উঁচু করি। নো এক্সকিউজ।
তার পরও। এত বছর? সেটা মনে রেখেছে আমার শ্বশুর বাড়ি।
অনেকেই মনে রাখে। কজন ক্ষমা করে? সেটা নির্ভর করে তার চিন্তা আর মনোবিশ্লেষণের ওপর।
তোমার কেউ মারা যায়নি?
গেছে। মামাতো বোন মিতু। ছোট্ট ছিল। পুকুরে তার মার সঙ্গে গোসল করছিল। ঢাকা থেকে পালিয়ে গ্রামে ছিল পুরো পরিবার। মার কাছে বহুবার শুনেছি।
ও সরি। গাড়ি সিগন্যালে থামে।
তোমার কোনো রাগ নেই?
ছিল। ঢাকায় যখন ছিলাম। এখন নেই। এখন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার প্র্যাকটিস করছি। তার জাত, ধর্ম আর অর্থনৈতিক বৈষম্য দিয়ে নয়। বলতে সোজা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত করে। কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পুরা পৃথিবীটাই নিজের দেশ মনে হয়।
কেন?
কারণ এখন জানি দেশ কেন ভাগ হয়, কারা যুদ্ধ লাগায় এবং কেন? ঘৃণা কীভাবে ছড়াতে হয়। সেই ঘৃণা আর আবেগকে পুঁজি করে কত কিছু করা যায়।
কীভাবে?
ওহ তুমি প্রশ্ন করছ বেশি। নিজে খুঁজে দেখ। হেসে বলি। উফফ।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন