default-image

জারার মনটা খুব বিষণ্ন। এ বছর পয়লা বৈশাখে ওর দেশে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়াতে যেতে পারেনি। কত দূরে ওর সব প্রিয়জন। দুটো টিকা নেওয়া জারা ঠিক করেছে ওয়াশিংটন ডিসি যাবে কনফারেন্সে। কনফারেন্সের চেয়েও বড় কথা, পোটোম্যাক নদীর তীরে চেরি ব্লসম উৎসব দেখা। অপূর্ব এ ফুলগাছগুলো শত বছরের বেশি সময় আগে জাপানি মেয়র মি ওজাকির দেওয়া বন্ধুত্বের উপহার আমেরিকানদের। ওর জাপানি কলিগের কাছে কত গল্প শুনেছে। ছবি দেখেছে।
কনফারেন্স হচ্ছে ভার্জিনিয়াতে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে আসতে আসতে সবুজ প্রকৃতি আর নীল মেঘ মুগ্ধ হয়ে দেখল জারা। হোটেলে পৌঁছে চেক ইন করল, চাবি নিয়ে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেমে গেল নিচে। হোটেলের সামনে বিশাল বাগান, কত রং বেরঙের মানুষের মেলা। সূর্যাস্ত দেখে, কাউন্টারে চেরি ব্লসম উৎসবের খোঁজ নিয়ে ডিনার খেয়ে নিল সে। পরের দিন জারার প্রেজেন্টেশন আছে। টিকা বিশেষজ্ঞ সে। পড়ায় নামীদামি এক কলেজে কিন্তু এসব কাঠখোট্টা বিষয়ের বাইরে ওর খুব উদাসী কবি কবি একটা মন আছে। সে মনের খবর কেউ জানে না।

পরদিন বেলা ১১টার দিকে জারার প্রেজেন্টেশন ছিল। তার পরপরই প্রশ্নের বর্ষা। ভালোই উতরে গেল সে। কোনো রকম লাঞ্চ খেয়ে কাউন্টারে চলে এল সে তারপর। চেরি ফুলের রাজ্য ওকে ডাকছে। উবার ডাকতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে ভারী গলায় ওর নাম শুনল মনে হয়, ‘ড. জারা, আমি চেরি ফুল দেখতেই চলেছি, যাবেন আমার সঙ্গে?’ জারা ঘুরে তাকিয়ে দেখল ভারী চশমা পরা ড. সিয়াম তাকে ডাকছে। কনফারেন্সে কঠিন সব প্রশ্ন করে নিজের জ্ঞান জাহির করেছে এই লোক। এখন আবার কী সমস্যা তাঁর?

default-image


জারা কিছু বলার আগেই বললেন, তিনি পারফেক্ট ইংরেজিতে’ ইয়ে মানে আপনার শাড়ি পরা দেখে আমার দেশের পয়লা বৈশাখের উৎসবের কথা মনে হলো। তাই....।’ জারা বলে বসল, ‘আমি বাংলাদেশি আর বাংলা বছরের প্রথম দিনটি পালন করব চেরির রাজ্যে বাধ্য হয়েই।’ সিয়াম হাসলেন, ভারী চশমাটা খুলে পূর্ণ চোখে তাকালেন, বড় বড় মায়াভরা ছেলেমানুষি চোখে কী এক আভা, যার সঙ্গে একটু আগের চৌকস প্রফেসরের কোনো মিল নেই। তারপর পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘জারা চলুন, আপনাকে বেলি ফুলের মালা, কাচের চুড়ি কিনে রমনা বটমূলে নিয়ে যেতে পারব না কিন্তু চেরি ফুলের সমারোহ তো দেখাতে পারব।’ এতটা আবেগ নিয়ে কেউ কোনো দিন রাইড দেয়নি ওকে।

বিজ্ঞাপন

জারা উঠল গাড়িতে, সানরুফ খোলা সিয়ামের গাড়ির, সূর্যালোকিত চমৎকার একটা দিন, সাদা মেঘের কী অপরূপ কারুকাজ নীলের মাঝে। সিয়াম পথের পাশে সাদা আর গোলাপি চেরির ঝোপ দেখালেন, তারপর বললেন, ‘জারা গান জানেন?’ জারা কিছু বলার আগেই শুরু করলেন বেসুরো সুরে, ‘এসো হে বৈশাখ’। হাসি চাপতে চাপতে জারা গাইল পুরোটা গান তারপর। গাম্ভীর্যের মুখোশ পরা দুষ্টু সিয়াম মুগ্ধ হয়ে গানটা শুনলেন। তারপর ছেলে মানুষের মতো বলে বসলেন, ‘জারা, এই কাঠখোট্টা বিষয় আর পড়াতে ইচ্ছে করছে না। চলুন ফুড ট্রাক দিই আমি আর আপনি। নাম রাখব জার্সি ফুড ট্রাক, জারার জা আর সিয়ামের সি মিলে, আমি শিঙাড়া আর চটপটি বিক্রি করব, আপনি আমাকে গান শোনাবেন।’ জারা এত প্রাণখুলে অনেক দিন হাসেনি। কী আজব এই ছেলে।

ডিসি পৌঁছে চেরি ব্লসম ফেস্টিভালের কাছেই গাড়ি রাখল সিয়াম। টিকিট পাওয়ার কথা না কিন্তু সিয়াম কাউন্টারে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, দুজন বাংলাদেশি মানুষ যাঁরা শত প্রাণ কাঁদলেও বাংলা বছরের প্রথম দিনটি প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটাতে পারবেন না বলে চলে এসেছেন এদিকে।’ টিকিট পেয়ে গেলেন দুটা বিনা ঝামেলায়। তারপর নদীর পারে অপূর্ব ফুলের রাজ্যের মুগ্ধতায় পেয়ে বসল জারাকে। সাদা এক ঝাঁক মেঘ যেন কেউ সাজিয়ে রেখেছে কাছে। এক মুঠো ফুল কত দিন পর কুড়াল ও। একটু ছায়ায় হাঁটতে চাইছে দেখে সিয়াম টিপ্পনী কাটলেন, ‘এ রকম ডাকসাইটে সুন্দরী বিশেষজ্ঞের কালো হয়ে যাওয়ার ভয় নাকি?’ জারাও সমানে উত্তর দিল, আপনার মতো আমার তো আর সোল মেট জুটে যায়নি যে এক সাগর ভালোবাসা নিয়ে বসে আছে আমার জন্য। যত দিন তাঁকে খুঁজে না পাই, আমাকে তার জন্য তৈরি থাকতে হবে, না?’ সিয়াম বলে বসলেন, ‘কোন ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ সোলমেট হিসেবে চাইলে বান্দা হাজির। এ চোখে কেউ কোনো দিন চোখ রাখেনি আপনার মতো মায়াবী চোখে।’ বলেই চট করে লজ্জা পেলেন কি তিনি একটু? ফুল দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যেন।

জারার মনে বেজে উঠল কি এক মোহময়ী সুর—
‘এক বৈশাখে দেখা হোল দুজনার
জৈষ্ঠিতে হোল পরিচয়
আসছে আষাঢ় মাস
মন তাই ভাবছে, কি হয় কি হয়
কি জানি কি হয়’।

হঠাৎ দেখা চিরদিনের অপছন্দ আঁতেল কোনো বিশেষজ্ঞের প্রেমে পড়ে গেল নাকি ও? এত সোজা অচেনা কাওকে ভালোবেসে ফেলা? পরশু তো চলে যেতে হবে ভার্জিনিয়া ছেড়ে অ্যারিজোনাতে। এত আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণটা কী?
তারপর ফেরার পালা হোটেলে। যেতে যেতে বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ উঠল। মুনরুফ খোলা। গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে দিলেন সিয়াম। যাওয়ার পথে অনেক বলছিলেন। এখন শুধু গান শুনতে চাইছেন তিনি। জারা গাইল মন উজাড় করে,
‘ওগো চাঁদ তুমি কি জান না
সে যে আজ নাম ধরে ডাকবে
অনুরাগ জড়ানো চোখে
ঐ নীল জোছনায় কাছে আসবে’

পথটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। হোটেলে পৌঁছে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল জারা, মনে মনে হাঁটছে ঢাকার রাস্তায় উৎসবে মাতাল বৈশাখী রাতে এলো চুলে। যেন মাত্র মেলা থেকে ওকে বাসার সামনে নামিয়েছে ওর স্বপ্নপুরুষ। বৈশাখের প্রথম দিনটার এখানেই সমাপ্তি ওদের।

ও হ্যাঁ পাঠক জারার জন্য বৈশাখী উপহার ছিল সিয়ামের সেলফোন নম্বর। যেটা সিয়াম দিয়েছেন আর জারার নাম্বার টাও নিয়েছেন। অ্যারিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে শিগগির নাকি আসবেন তিনি।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন