default-image

বিয়ে তো করে ফেললাম হুট করে ফিফথ ইয়ারে, আগে–পিছে ভাবিনি! মায়ের জোরাজুরিতে! টোনাটুনির সংসার হয়নি সেভাবে! মাসখানেকের মধ্যে ভিসা পেয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ি, নিজের বাড়ি দেখতে গেলাম! এরপর হুটহাট আসা–যাওয়ার মধ্যেই আবিষ্কার করলাম, আমাদের একটা বেবি হবে! আমরা কেউ খুশি নই। কারণ, ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসছে শিগগির!

আমরা প্রস্তুতও নই! আর খেতে না পারায়, সিভিয়ার হাইপারইমেসিসে ওজনও দ্রুত কমতে থাকে! যা থাকে কপালে বলে দেশে ফিরে এলাম! কী ভীষণ কষ্ট! প্রেগনেন্সি, এর সঙ্গে ফাইনাল প্রফের পড়া, রাত ১২টা পর্যন্ত ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়া, সঙ্গে বমি আর না খেতে পারা!

জীবনটা শাস্তিময় হয়ে গেল!

এর মাঝে বন্ধুবান্ধবী, সিনিয়র আপুদের অসীম সহযোগিতা নিয়ে পরীক্ষায় তো বসলাম! মেয়ের বাবা পরীক্ষা পর্যন্ত ওয়েট করেছে, লাস্ট পরীক্ষার দিন ঢাকায় নেমেছে আর পরীক্ষা দিয়েই আমি শেষবারের মতো কলেজ ছেড়ে এলাম!

বিজ্ঞাপন

গন্তব্য সংসার, টোনাটুনির ঘরে ফিরে এলাম! মেয়েটা এত কিছুর মধ্যেও ঠিকঠাক বেড়ে উঠেছে! আমি অনাগত সন্তানের আশায় আছি! আর এর সঙ্গে ভয়ানক টেনশন—পরীক্ষার রেজাল্ট কী হবে? পাস না করলে তো ফিরে যেতে দেবে না! বউ–বাচ্চা ছাড়া আর একা থাকতে রাজি নন মেয়ের বাবা!

অপেক্ষার অবসান হতে থাকে। সময়ের দুই সপ্তাহ আগেই আমার ঘর আলো করে পরি আসে! এর পরের মাসে রেজাল্ট! আপাতত সব চিন্তার অবসান! আমি ভেবেছিলাম দু-এক বছরের মধ্যেই আমার পরিচিত গণ্ডিতে ফিরে যাব! দরকার হলে দু–একটা ক্লাস নেব। তখন কি জানি, সেই বছর আসতে কত দেরি?

মা–বাবা, শ্বশুর–শাশুড়ি—সবাই টেনশনে আমি কবে ডাক্তারি করব, সময় নষ্ট হচ্ছে! আমিও জানি আমার ফেরার সময় আসছে। কিন্তু মেয়েটার একাকিত্ব দেখে ভালো লাগে না! এর মধ্যেই আবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার মেয়ের খেলার সাথি আসছে! দুই পরিবারের অশান্তি চিন্তা করে আমরা অপেক্ষা করলাম বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত সবাইকে জানানোর জন্য!

দুই পরিবারই জানল আমার ছেলে হয়েছে, ছেলে হওয়ার পর!
আমার ফেরার পথ আরেকবার বন্ধ হলো!
এর মধ্যেও টোনাটুনির সংসারে সময় চুরি করে ক্লাসে গেলাম, উদ্ধার করতে এলেন এক আপা। আমার কয়েক দিনের ছেলেকে আর তার সঙ্গে মেয়েকে বাবা নামিয়ে দিত আপার কাছে। আমি এক মাস ক্লাস করলাম, কিন্তু কন্টিনিউ করা হলো না! ফুলটাইম মাম আমি, আমাকে সাহায্য করার জন্য ছেলের বাবা বাসা থেকে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু তার জন্য আমার কাজ বেড়েছে!

ছেলের বয়স দেড়, নানা–নানি এবার একসঙ্গে আসতে পারল! সবার ফোকাস আমি! আমার মতো অকর্মণ্য মেয়ে যে আজও রেসিডেন্সি করতে পারেনি।
মেয়ে স্কুল শুরু করল, ছেলে মা ছাড়া কিছু বোঝে না! নানা–নানি তাকে কন্ট্রোল করতে পারে না, ঘুরতে নিয়ে যেতে পারে! খাওয়ানো, গোসল, ঘুম আমারই দেখতে হয়। কোলের মধ্যে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করি! সারা রাত পাশে বসে পড়ি। নয়তো জেগে সারা বাসা খুঁজবে, তারপর আমি তাকে না দেখে আবার তন্ন তন্ন করে সারা বাড়ি খুঁজব! কয়েক ঘণ্টার এ খোঁজাখুঁজির চেয়ে, বদটা ঘুমের মধ্যে চোখ খুলে আমাকে দেখে ঘুমিয়ে যায়, আমি পাশে যতক্ষণ না শ্রান্ত, ততক্ষণ পড়ি! জীবন তখন তামা তামা!
এর মধ্যেই পরীক্ষার ডেট নিয়েছি! পরীক্ষার আগের রাতে অসুস্থ ছেলের সঙ্গে সারা রাত জেগে পরদিন সাত-আট ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়েছি!

ফেরার পথে এত অসুস্থ হয়ে গেছি!
তারপর টেনশন—রেজাল্ট!
উফ্‌, কী ভয়ানক টেনশন! ভাগ্যিস সেটা শেয়ার করার লোকজন ছিল! আমি আর আমার বান্ধবীরা পাস করেছি!
একইভাবে পার্ট–২, সিএস, সি কে। মাঝেমধ্যে বাসায় পড়া হতো না বলে রান্নাবান্না করে সবাইকে খাইয়ে দিয়ে চলে যেতাম লাইব্রেরিতে। ভাগ্যিস বাসার কাছেই ছিল! বাবা, ছেলে, মেয়ে দল বেঁধে দেখতে চলে আসত, নয়তো পরের সাত-আট ঘণ্টা আর দেখা হতো না! উইকেন্ডে সংসার না করে লাইব্রেরিতে কাটিয়েছি!
আসলে কথা সত্য নয়। কার কী লাগবে, খাবারদাবার গুছিয়ে দেওয়ার পরই যাওয়া হতো! ছেলে দুই বছরে পড়লে তাকে ডে কেয়ারে দিয়েছি কয়েক ঘণ্টার জন্য। সেটা ছিল পড়ার সময়! যখন যেভাবে পেরেছি, সময়ের কাছ থেকে সময় চুরি করে পড়েছি! খুব যে পড়তে পেরেছি, তা–ও নয়!

ক্লান্ত, শ্রান্ত শরীর আর তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে মাকেও কথা শুনিয়েছি! আসলে ফেরার পথ আর ছিল না! আমার নিজেকে এই অবস্থানে কখনো কল্পনা করিনি! এর মধ্যে অনেক কষ্ট করে এক্সটার্নশিপ জোগাড় করা, ভলান্টিয়ারের কাজ করা, মেয়ের স্কুল, ছেলের চঞ্চলতা—সব ম্যানেজ করতে হয়েছে!
আবিষ্কার করলাম, ইন্টার্নশিপটাই বাকি, যেটা এত দিন করতে পারিনি। বাচ্চাদের দেশে যেতে দিতে বাবা রাজি নয়। এখন যেহেতু দুজনই ম্যানেজেবল, আমার মা–বাবার সঙ্গে থেকে বাচ্চারা অভ্যস্ত; তখন আমার ছুটি মিলল! দুধের দুটি বাচ্চাকে বিমানবন্দরে কাঁদিয়ে আমি চলে এলাম! এত দিন কোলছাড়া হয়নি তারা! দুজনই আমার কাছে ছাড়া কোনো দিন থাকেনি, পাশে ছাড়া ঘুমাতে পারেনি!
এদের ছেড়ে এসেছি!

পাষাণ মা আমি। ডাক্তারি পড়তে পড়তে এত পাষাণ হয়েছি। অলমোস্ট এক বছর নয়নের মণি দুটি ছেড়ে থেকেছি! কয়েক সপ্তাহ ছুটিতে তাদের জন্মদিনে দেখতে এসেছি! এবার বোধ হয় ভগবানেরও মায়া হলো—আমি রেসিডেন্সি পেয়ে ফিরে এলাম নিজ ঘরে! ইন্টার্ন করার সময় অনেকগুলো ভালোবাসার মানুষ পেয়েছি, যারা আমার কষ্টগুলো ভুলতে সাহায্য করেছে; অনেকগুলো নতুন বন্ধু হয়েছে! এত্তগুলো ভালোবাসা তাদের সবাইকে!

বিজ্ঞাপন

ফিরে এসে শুনি, বাঙালি কমিউনিটিতে সবাই অবাক! ছেলে-মেয়ে ফেলে মা ইন্টার্নশিপ করতে দেশে চলে গেছে! এরা তো জানে না, ডাক্তারির জন্য আমি চাঁদেও যেতে পারি। অনেক পরিশ্রমে ডাক্তার হয়েছি। বৃথা হয়ে যাবে সব কষ্ট, মানতে পারব না!
ছেলে–মেয়ে বড় হয়েছে এই অলমোস্ট এক বছরে! আর রেসিডেন্সি? সেটা এবার প্রাণ বের করার সংকল্প করেছে!

কত দিন ভেবেছি, কী দরকার ছিল মেডিকেলে পড়ার? খুব নরমাল একটা জীবন হতে পারত! পাশের বাড়ির কারও সঙ্গে ভেগে যেতে পারতাম (ভাগ্যিস আশপাশে তেমন কেউ ছিল না, আমার জীবনে না হওয়া ফ্যন্টাসি)! সিনেমা দেখে, শাড়ি–চুড়ি পরা জীবন হতে পারত!

কষ্টের জীবন বাছার আগে একটু ভাবার সময়ের দরকার ছিল!
এর মধ্যেও যারা আমাকে সব সময় সাপোর্ট দিয়ে গেছে, সেই মা–বাবা, স্বামী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব—তাদের কথা না বললেই নয়! আমি মানুষটা বা আমার কপালই এমন—ভালোবাসার মানুষগুলোকে কষ্টের সাগরে ভাসাই!

পরে আমাকে কেউ ভালোবাসার আগে জীবনবিমা করিয়ে নেবেন!
ভালোবাসা সবার জন্য! Specially for those strong women!
*চিকিৎসক, আমেরিকা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন