default-image

বোলার মাশরাফিকে মিস করি না বহু বছর হয়ে গেছে। তিনি আহামরি কোনো পেসার নন। পরিসংখ্যান তা–ই বলে। গতি, লাইন লেংথ ইত্যাদি আহামরি কিছু না। তাঁর চেয়ে অনেক জোরে বল করেন রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ; উইকেট বেশি পান মুস্তাফিজ। তাই বোলার মাশরাফি দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ নন।

ব্যাটসম্যান মাশরাফি কখনোই তেমন ইম্প্যাক্ট ফেলেননি। আমাদের তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ আছেন। হালের সেনসেশন লিটন দাস আছেন। মাঝেমধ্যে সৌম্য সরকার কিছু ঝলক দেখান। মাশরাফি মাঝেমধ্যে এসে ছক্কা মেরে দর্শকদের বিনোদন দেন। কিন্তু অবশ্যই, তাঁর ব্যাটিং দলের জন্য খুব বেশি প্রয়োজনীয় সম্পদ নয়।

ফিল্ডিং নিয়ে বলার কিছু নেই। সবাই যা করেন, তিনিও তা–ই করেন।

কিন্তু তাঁর অধিনায়কত্ব, তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, ক্রিকেট–জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দুর্দান্ত লিডারশিপ—এসব পেতে আমাদের আরও বহু বছর অপেক্ষায় থাকতে হবে। আদৌ কখনো পাব কি না জানি না। ওয়েস্ট ইন্ডিজে যেমন আরেকটা ক্লাইভ লয়েড এখন পর্যন্ত আসেননি। ভারত আরেকটা সৌরভ গাঙ্গুলী ও মহেন্দ্র সিং ধোনি কবে পাবে, তারাই জানে। পাকিস্তানে ইমরান খান দ্বিতীয়টা জন্মাননি। অর্জুনা রানাতুঙ্গারা শ্রীলঙ্কার ভূমিতে জন্ম নেওয়া বন্ধ হয় গেছে। স্টিভ ওয়াহ, হ্যান্সি ক্রনিয়েদের এ যুগে দেখা পাওয়া যায় না। তাঁদের লিডারশিপ কী ছিল? তাঁদের খেলা যারা দেখেনি, কেউ কখনোই পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাতে পারবেন না। তাঁদের সাফল্য এখানেই যে তাঁরা একেকটি দল গড়েছিলেন। সেই দলের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উত্তরসূরিরা সাফল্য পেয়েছেন।

আজ যে ওয়ানডেতে প্রতিপক্ষ আমাদের কিছুটা সম্মান করেন, সেটা এই কৌশিক ডাকনামের ছেলেটির জন্যই। আমাদের পাগলা! যাঁর শরীর বারবার বিদ্রোহ করেছিল কিন্তু তিনি কখনোই হার স্বীকার করেননি। দেশকে সামনে রেখে তিনি খেলে গেছেন, ক্রিকেটকে ভালোবেসে তিনি খেলে গেছেন। কয় ম্যাচ জিতেছি, কয়টা হেরেছি ইত্যাদি দিয়ে তাঁকে বিচার করতে বসা মূর্খতা হবে। ক্রিকেট পরিসংখ্যান কখনোই বাস্তব চিত্র চিত্রায়ণ করতে পারে না।

default-image

২০১৮ এশিয়া কাপের উদাহরণ দিলেই সবার বুঝতে সুবিধা হবে।

আমরা ফাইনালে যাব, কেউ কল্পনা করেনি। পাকিস্তান তখন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে এসেছে। জিম্বাবুয়ে সিরিজে একেবারে উড়িয়ে–ধারিয়ে এসেছে। ফখর জামান, ইমাম উল হক, বাবার আজম তখন ভয়াবহ ফর্মে। আছে তাঁদের তারকায় ঠাসা বোলিং লাইনআপ। খেলাটি হচ্ছেও তাঁদের ‘ঘরের মাটি’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। পরিষ্কারভাবে তাঁরা টুর্নামেন্টের ফেবারিট।

আরেক ফেবারিটের নাম ইন্ডিয়া। কেন, সেটা তো আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। বিরাট কোহলি নেই কোনো ব্যাপারই না, রোহিত শর্মা তো আছেন। রথী–মহারথীতে ভরপুর তাদের ব্যাটিং লাইনআপ, এখন বোলিংয়েও তারা বিশ্বজয় করতে শুরু করেছে। ভুবনেশ্বর কুমার, জসপ্রিত বুমরাহ, চাহাল, কুলদীপ, জাদেজা, কেদার যাদব—কে বাজে বোলিং করেন? কাকে টার্গেট করে ব্যাটসম্যানরা রান করবেন? যতই করুন, রোহিত, শিখর, ধোনি, দীনেশ কার্তিক, আম্বাতি রাইডুদের কাছে সেটা কত সময় টিকবে?

তারপর শ্রীলঙ্কাও সমীহ জাগানিয়া দল।

আমাদের অবস্থান চতুর্থে বা পঞ্চমে, কারণ আফগানরাও তখন আতঙ্ক জাগাচ্ছে। রশিদ খান, মোহাম্মদ নবী, মুজিবুর রহমানরা বিশ্বমানের খেলোয়াড়। বিশ্বজুড়ে টি–টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে একেকজনকে নিয়ে টানাটানি হয়। আমাদের একটি ম্যাচে উড়িয়েও দিয়েছে। এর মাঝে আমাদের দলের সেরা ব্যাটসম্যান তামিমও নেই। সাকিবের আঙুলে ব্যথা, ইনজুরি নিয়ে খেলছেন। যতদূর মনে পড়ে, আমি ঠিক নিশ্চিত নই, মুশফিকও শতভাগ ফিট ছিলেন না। প্রধান তিন স্তম্ভই নড়বড়ে।

তারপরও আমরা টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছিলাম।

ফাইনালে পরাশক্তি ভারত, যারা মোটামুটি সব ম্যাচেই প্রতিটা প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে এসেছিল। তারা আমাদের হারাতে গিয়ে একদম শেষ বলটি পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল। মাত্র ২২২ রানের পুঁজি নিয়ে সাকিব-তামিম ছাড়াই আমরা প্রায় জিতে গিয়েছিলাম। এত লড়াই হয়েছিল কেবলই একজনের বুদ্ধির কারণে। রমিজ রাজা তাঁর রিভিউতে বলেছিলেন, ‘এই টুর্নামেন্টের কথা বলতে গেলে অবশ্যই মাশরাফি বিন মুর্তজার কথা স্মরণ করতে হবে। “কাপ্তান অব এশিয়া!” তাঁর কাছে সাকিব ছিল না, তামিম ছিল না, কিন্তু যেটুকু সামর্থ্য ছিল, তা–ই নিয়ে ভারতের মতন শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে এইভাবে লড়াই করেছে সে। হ্যাটস অফ!’

default-image

জি, মাশরাফি হয়তো আমাদের ম্যাচের পর ম্যাচ জেতাতে পারেননি। দেশের মাটিতে বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয় ছাড়া তাঁর সাফল্য তেমন একটা নেই। কিন্তু এ যে বছরের পর বছর ধরে বড় দলগুলোর সঙ্গে আমরা লড়াই করে গেছি, যাচ্ছি এবং হারাচ্ছি, এগুলোর পেছনে ওই একটা ক্রিকেট ব্রেইনই জড়িত।

দাঁত থাকতে দাঁতের, চুল থাকতে চুলের মর্যাদা আমরা যেভাবে টের পাই না, মাশরাফি থাকতেও আমরা বুঝিনি একটি বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, ক্রিকেট জ্ঞানী দলনেতার গুরুত্ব। তাই দলের ব্যর্থতায় সবার আগে উঠেছে তাঁর পদত্যাগের দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে তোলপাড় চলেছে, কবে তিনি রিটায়ার করবেন। তাঁর মতন একটি খেলোয়াড়ের ড্রেসিং রুমে উপস্থিতিই যে কত ভবিষ্যৎ তারকা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, এ বোধটাই আমাদের নেই।

শেন ওয়ার্ন আবদুল কাদিরের সঙ্গে কেবল একটি ডিনার করেই ক্যারিয়ার বদলে ফেলেছিলেন। অভিজ্ঞরা তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, বাকিটা আপনার চেষ্টা ও সাধনা, এত নিপাতনে সিদ্ধ সত্য। মাশরাফির মতন মহিরুহের ছায়ায় থাকতে পারাটাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিরাট সৌভাগ্যের ব্যপার।

এই ছেলেটি আর অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামবেন না। ওই জার্সি তোলা থাকবে যতন করে।
এখন আমরা বুঝব মাশরাফি আমাদের কী ছিলেন।
বিদায় ক্যাপ্টেন!
ধন্যবাদ তোমার হার না মানা লড়াইয়ের জন্য!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0