বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি যথাসময়ে টি-শার্টের জন্য নিবন্ধন করলাম। তারপর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম, কবে আমার কাঙ্ক্ষিত ডেলিভারি আসবে। মার্চের শেষ সপ্তাহে টি-শার্টের ডেলিভারি পেলাম। হ্যাজেল রঙের একটি স্মল সাইজ টি-শার্ট। পরে দেখলাম এটি গায়ে একটু আঁটসাঁট হচ্ছে। অবশ্য ইচ্ছে করেই ছোট সাইজ অর্ডার করেছিলাম। এখন একটু আঁটসাঁট হলেও ওজন কমিয়ে পরে নিজেকে যাতে ছোট সাইজের মধ্যেই ফিট করতে পারি।

ফেসবুকের আগের প্রোফাইল পিকচার বদলে ‘ওয়াক হান্ড্রেড মাইলস ইন এপ্রিল এএলএস অ্যাসোসিয়েশন গ্রেটার নিউইয়র্ক চ্যাপটার’ লেখা টি-শার্ট পরে হাসিমুখের একটি ছবি দিয়ে নতুন প্রোফাইল পিকচার বানালাম। ‘আস্ক মি হোয়াই আই’ম ওয়াকিং হান্ড্রেড মাইলস ইন এপ্রিল’ লেখা একটা বর্ডার যোগ করলাম প্রোফাইল পিকচারকে ঘিরে।

অনেকেই জানতে চাইল, ‘কেন হাঁটবেন, এক শ মাইল?’ ‘শুধু এপ্রিলেই হাঁটতে হবে? “ ‘এএলএস কি’? ‘ডোনেশন কাদের জন্য’? ‘কি কাজে লাগবে? ’ইত্যাদি ইত্যাদি!

নিজের অজ্ঞতায় নিজেই লজ্জিত হলাম। তাই তো, এএলএস সম্পর্কে তেমন কিছু তো আমারও জানা নেই। তবে, বুঝতে পেরেছিলাম ক্যানসার, এইডস—এসব দুরারোগ্য অসুখের মতো এএলএসও একটি দুরারোগ্য রোগ। এই রোগের চিকিৎসা এবং চিকিৎসা সংক্রান্তে গবেষণার জন্যই এই তহবিল উত্তোলনের আয়োজন। আমার বড় কোনো অনুদান দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও আমি নিজে হেঁটে, প্রচার করে, বিত্তবান ও ডোনেশন দিতে আগ্রহী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করব, আমার দায়িত্ব এতটুকুই!

কিন্তু পরে মনে হলো, অল্পবিদ্যা খুব ভয়ংকর। না জেনে, না শুনে এটি নিয়ে আমি মানুষের কৌতূহলের কী জবাব দেব? সুতরাং গুগল ঘেঁটে পড়তে শুরু করলাম এএলএস রোগটি নিয়ে।

স্তম্ভিত হয়ে গেলাম রোগের বিস্তারিত বিবরণ পড়ে। রোগীর ভোগান্তি ও রোগ শুরুর পর রোগীর আসন্ন অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর কথা জেনে। জানলাম, রোগটি নিরাময় অযোগ্য। তেমন কোনো ফলপ্রসূ চিকিৎসা এখনো নেই। ফলে, আক্রান্ত রোগী অনেক ভোগান্তির পর পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই মারা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বেসবল খেলোয়াড় লু গেরিগ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ প্রথম জানতে পারে। এর আগে চিকিৎসা শাস্ত্রেও এই রোগ নিয়ে বিশদ কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। তাই তখন রোগটির নাম ল্যু গেরিগের নামে নামকরণ করা হয়। এখনো অনেকে এই নামেই রোগটি চিনে। পরে রোগটিকে ‘অ্যামিওট্রফিক ল্যাট্রাল স্কলেরোসিস’ নামকরণ করা হয়, যা সংক্ষেপে এএলএস নামেই পরিচিত। এএলএস মোটর নিউরন ডিজিজ হিসেবে পরিচিত রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম।

নিউরন হল স্নায়ু কোষ। মোটর নিউরন হল নিউরন যা মানুষের চলাচল, কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। এএলএস রোগে শরীরের ওপরের ও নিচের অংশের সব মোটর নিউরনই আক্রান্ত হয়।

তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা দিয়ে রোগটি প্রথমে আত্মপ্রকাশ করে। কারও শুরুতে কথার জড়তা দেখা দেয়। কারও খাবার গিলতে সমস্যা দিয়ে শুরু হয়। কেউ হয়তো হাঁটতে গিয়ে পায়ের গোড়ালি বা হাঁটুতে দুর্বলতা অনুভব করেন। কেউ হাতের মাংসপেশির কমজোর অনুভব করেন।

কিন্তু ধীরে ধীরে আক্রান্ত সবারই হাঁটা-চলা, হাত দিয়ে কাজ করা, খাওয়া, কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগীরা অপুষ্টিতে ভোগে এবং অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে ও মনোভাব প্রকাশে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফুসফুস আক্রান্ত হলে রোগী শ্বাসকষ্টে খুব দ্রুত মারা যায়।

এএলএস যেকোনো বয়সে দেখা দিতে পারে। তবে ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। নারীদের চেয়ে পুরুষেরা বেশি আক্রান্ত হয়। এএলএস থেকে নিরাময়ের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে শরীরের নিউরন হ্রাসের কারণ অনুসন্ধান এবং এটি বন্ধে গবেষণা চলছে।

এএলএসের প্রকৃত কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তবে এএলএস বংশগত ও পরিবেশগত কারণে হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া মানুষের এএলএস হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। ধারণা করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক ধকল, স্ট্রেস এবং লিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তাও এএলএস রোগের জন্য দায়ী। অতিরিক্ত ধূমপানেও এটি হতে পারে।

এসব জানার পর আমার সত্যি সত্যিই মন ও শরীর খারাপ হতে শুরু করল। এই পৃথিবীতে মানুষের এত রোগ, এত কষ্ট, এত ভোগান্তি! অথচ তারপরও মানুষ কেন মানুষের ভোগান্তির, কষ্টের কারণ হই? আমার মন হাহাকার করে উঠল। আহা, আমার যতটুকু সামর্থ্যে কুলোয় ততটুকু উপকারতো আমি মানুষের জন্য করতেই পারি। অন্তত চেষ্টা করতে পারি। উপকার করতে না পারি, ক্ষতি যেন কোনোভাবেই না করি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো এমন একটা উন্নত দেশেও মানুষ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছে, মারা যাচ্ছে। মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়।

আমার স্বামী ও ছেলেদের ধারণা, আমার মধ্যে কিছু পাগলামি আছে। তাই, কোনো কিছু একবার মাথায় ঢুকলে সেটা নিয়ে অস্থির হয়ে উঠি। না করে পারি না। সহজেই আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। নিজের সমস্যা হলেও অন্যের সমস্যা সমাধানে নিজেকে জড়িয়ে ঝামেলায় পড়ি।

আমি আমার ছেলেদের বলি, ‘শোন, ভালো কিছু করতে হলে আমাদের সবাইকেই পাগল হতে হবে। পাগল না হলে এমন কিছু কাজ আছে, যা মানুষ করতে পারে না। অন্যে কী বলবে, মানুষ হাসবে, নিজের কষ্ট হবে, সময় ও অর্থ নষ্ট হবে—এত সাতপাঁচ ভাবলে জগতে কোনো ভালো কাজ কখনো হতো না, হবে না। তাই, কেউ হয়তো রাস্তায় অকাতরে আবর্জনা ফেলে নিরুদ্বেগে হেঁটে চলে যায়। আরেকজন এসে মাথা হেট করে সেই আবর্জনা তুলে গার্বেজ বক্সে নিয়ে ফেলে।

ভালো কাজ করতে হলে আমাদের পাগল হতে হবে। এসব পাগল পকেট থেকে ডলার বের করে ডোনেশন দিচ্ছে বলেই জগতে কতশত ভালো কাজ হচ্ছে। আমি নিজে পাগল বলেই পণ করেছি এপ্রিলে এক শ মাইল হাঁটব।

আমরা দেখতে পাই, আমাদের আশপাশের অনেক সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যেও পাগলামি বা খেপামি আছে। এই পাগলামিটুকু ছাড়া কিন্তু তাঁকে দিয়ে ওই সব সৃষ্টিশীল কাজ একদম হতো না।

যত দিন যেতে লাগল, ততই আমরা ওয়াকিং গ্রুপের সব সদস্যের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। জানা গেল, অনেকেরই এই গ্রুপে যোগ দেওয়ার পেছনে খুব স্পর্শকাতর কারণ রয়েছে। কারও বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয় বা বন্ধু-স্বজন এএলএসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বা রোগে ভুগছেন। তারা তাদের কথা স্মরণ করে, তাদের কষ্টে একাত্মতা প্রকাশ করে, চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতি আসবে—সেই আশায় এই তহবিল সংগ্রহ ও রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এতে অংশ নিচ্ছে।

কতজনের ছবি দেখলাম, ভিডিও দেখলাম। এএলএসের সঙ্গে তাদের জীবনযাপনের করুন চিত্র দেখলাম। এসব মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বন্ধু, পরিবার আর পরিচিত মানুষের সহমর্মিতা। সহিষ্ণুতা আর ধৈর্য নিয়ে তাদের পাশে থাকার মতো প্রিয়জন। তাঁদের জীবন বড় ক্ষণস্থায়ী, বড় সংক্ষিপ্ত। নিশ্চিত মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে তাদের কাঁধের পাশে।

এএলএসকে যতই জানলাম, ততই আমার হাঁটার অস্থিরতা বাড়তে লাগলে। কখন ১ এপ্রিল আসবে আর আমি আমার কাঙ্ক্ষিত টি-শার্ট পরে হাঁটতে বের হব। অবশেষে এল ১ এপ্রিলের সকাল। ঘুম থেকে উঠেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। মেঘলা আকাশের মতোই আমার মনের কোণে জমে উঠল কালোমেঘ। আজ সকালটা যেন রাবার দিয়ে মুছে ফেলা ছবির মতো। আবছা। কুয়াশামাখা। আবহাওয়া বার্তা জানাল, বাইরের তাপমাত্রা হলো ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। তার মানে বৃষ্টি, সেই সঙ্গে কনকনে শীত।

আহা, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়।’ কম্বল গায়ে চাপিয়ে গল্প বা খুনসুটি করা যায়, এটি এমন একটি দিন। কিংবা চোখে জল আনা ঝাল-ঝাল গরুর মাংস কষিয়ে, ভুনা করে রান্না করে, সঙ্গে সোনা মুগের ডাল দিয়ে ঝরঝরে ভুনা খিচুড়ি পেট পুরে খেয়ে টেলিভিশনে জুলিয়া রবার্টসের ‘প্রেটি ওম্যান’ টাইপ একটি মুভি ছেড়ে বসলে দারুন লাগত। কিংবা ফেসবুকে রান্নার সচিত্র বর্ণনা দিয়ে কারও কারও পিত্ত জ্বালিয়ে দেওয়াও খুব কঠিন কাজ না।

কিন্তু আমার পাগল মন আজ সেদিক দিয়েই গেল না। আবহাওয়া বার্তা জানাল, বেলা একটার দিকে বৃষ্টি নেই হয়ে যাবে। আমি ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ওয়াটার রেজিস্ট্যান্স হুডিওয়ালা ওভারকোট, গ্লাভস, মাথায় উলের টুপি পরে, টুপির ওপর হুডি টেনে দিলাম। উইন্টার বুট পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে, হাতের আইফোনের ‘ম্যাপ মাই ওয়াক’ অ্যাপস চালু করে বরফ-শীতল ঠান্ডা পথে হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম। খানিকটা হাঁটার পরই টের পেলাম, কনকনে ঠান্ডা বাতাসে কান ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। দুচোখ দিয়ে কান্নার মতো অশ্রু ঝরে পড়ছে।

ওই যে বললাম, আমাদের পাগল হতে হবে। আমি পাগলের মতো শীতের বুক চিরে হাঁটতে লাগলাম। যত দূর চোখ যায়। আমি ছকে রেখেছিলাম, যে করেই হোক, আমাকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ মাইল হাঁটতেই হবে। ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন। তবে কখন যে হাঁটায় তাল, লয়, এসে গেল জানতেই পারিনি। কখন যে পাঁচ মাইল হেঁটে ফেললাম, টেরই পেলাম না।

মনপ্রাণ দিয়ে চাইলে যেকোনো কাজ সহজেই করা যায়। একাগ্রতা থাকলে, যেকোনোভাবে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব।

সেই থেকে হ্যাজেল রঙের টি–শার্টটা পরে যখন হাঁটতে বের হই, মনটা উদ্দীপনায় ভরে ওঠে। সম্ভবত, এ কারণেই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও পুলিশের ইউনিফর্ম পরার রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। কারণ, পোশাক মানুষের ভেতরের আনন্দ ও শক্তিকে জাগ্রত করে। প্রতিদিনই পথে-পথে কিছু মানুষের প্রশংসার দৃষ্টি, হাসি, মাথা নোয়ানো, হাত নাড়া আমাকে ছুঁয়ে যায়।

‘ওয়াও। গড ব্লেস ইউ!’ এমন অনেক আশীর্বাদ আমার মাথায় ঝরে পড়ে!

আমি জানি, ‘ওয়াক হান্ড্রেড মাইলস ইন এপ্রিল এএলএস অ্যাসোসিয়েশন গ্রেটার নিউইয়র্ক চ্যাপটার’ লেখা টি–শার্টটিই এর মূল কারণ। এটি গায়ে দেখেই সবাই বুঝে যায়, আমার হাঁটার উদ্দেশ্য!

যা সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের হৃদয়েও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।

আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এপ্রিল মাসে এক শ মাইল হাঁটব এবং দুই শ ডলার তহবিল সংগ্রহ করব। চ্যালেঞ্জ শুরু করতেই দেখলাম, অনেকেই স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন। জহির মাহমুদ, ভায়লা সালিনা, রোল্যান্ড গেল, বিলকিস দোলা, রওশন হাসান, ইব্রাহীম চৌধুরী প্রমুখ বন্ধুদের দেওয়া অনুদানে ইতিমধ্যেই আমার তহবিলে দুই শ ডলার ছুঁই-ছুঁই।

বলেছিলাম, ভালো কাজ করতে হলে আমাদের পাগল হতে হবে। এসব পাগল পকেট থেকে ডলার বের করে ডোনেশন দিচ্ছে বলেই জগতে কতশত ভালো কাজ হচ্ছে। আমি নিজে পাগল বলেই পণ করেছি এপ্রিলে এক শ মাইল হাঁটব।

‘ধন্য আমি ধন্য হে, পাগল তোমার জন্য যে’!

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন