default-image

আমরা প্রায়ই বলে থাকি ব্রিটিশরা আমাদের চা পান করা শিখিয়েছে। যদিও ইংরেজরা প্রায় ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চা পান করে আসছে। তবে আসলে চায়ের ইতিহাস আরও অনেক পেছনে।

চায়ের গল্প শুরু হয় চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে, চীনা সম্রাট ও ভেষজবিদ শেন নুং একটি গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছিলেন। যখন তাঁর চাকর পানি সেদ্ধ করছিল, তখন গাছ থেকে কিছু পাতা পানিতে এসে পড়ে। সেই পাতা গরম পানিতে মিশে মিশ্রণ তৈরি হয়। শেন নুংয়ের চাকর কর্তৃক দুর্ঘটনাক্রমে যে পানীয় তৈরি হয়, তা তিনি পান করেন। গাছটি ছিল একটি ক্যামেলিয়া সিনেনসিস এবং সেই পানীয়কেই এখন আমরা চা বলি। যদিও এই গল্পের সত্যতা যাচাই অসম্ভব, তারপরও পশ্চিমা দেশের চায়ের খোঁজ পাওয়ার শত শত বছর আগে থেকেই চীনারা চা পান করে আসছে।

পর্তুগিজদের বিশ্ব অন্বেষণ এবং সামুদ্রিক রুট আবিষ্কারে ভূমিকা পৃথিবীর বুকে অন্যতম। ১৪০০ থেকে ১৬০০ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের সামুদ্রিক অন্বেষণে আফ্রিকা, এশিয়া, কানাডা, ব্রাজিলসহ ছিল অসংখ্য স্থান ও সামুদ্রিক রুট। এই পর্তুগিজরাই চীন থেকে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে চা নিয়ে গিয়েছিল।

পর্তুগিজ রাজা চতুর্থ জনের কন্যা ক্যাথরিন অফ ব্রাগাঞ্জা সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডে চা নিয়ে আসেন। এর আগে ভেষজ হিসেবে ‘চায়না ড্রিংক’ নামে চায়নিজ গ্রিন টি ইংল্যান্ডে পাওয়া যেত।

ক্যাথরিন ছিলেন ১৭০০ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের স্ত্রী। তখনকার দিনে পারিবারিক বিবাহব্যবস্থা বা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের প্রচলন ছিল, যেখানে স্বামী–স্ত্রী একে অন্যকে জানার বা চেনার সুযোগ থাকত না। ক্যাথেরিন তাঁর স্বামী রাজা চার্লসের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য একটি ভিন্ন চিন্তা করলেন। তিনি বিকেলের খাবারের মেন্যুতে চা সংযুক্ত করলেন, যা তিনি পর্তুগাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন। ঠিক হলো প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় তাঁরা চা খাবেন। চা একটি গরম পানীয়, যা পান করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। ক্যাথরিন সেই সময়টা কাজে লাগাতেন স্বামী চার্লসের সঙ্গে কথা বলে, যা একে অন্যকে জানতে ও চিনতে সহায়ক ছিল। শিগগিরই এই চা জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং ছড়িয়ে গেল রাজপরিবার, রাজ্যের কর্মকর্তা ও নামীদামি ব্যক্তিদের মাঝে।

default-image

জনশ্রুতিতে রয়েছে যে ক্যাথরিন পর্তুগাল থেকে একটি বড় সিন্দুকের মতো বাক্স নিয়ে এসেছিলেন, যার গায়ে লেখা ছিল Transport of Aromatic Herbs or ‘TEA’।

১৭০৬ সালে টমাস টুইনিং প্রথম ইংল্যান্ডে চায়ের দোকান খোলেন, যা পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে ইংল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে যায়। সেই টুইনিং চায়ের বয়স এখন তিন শ বছর ছাড়িয়েছে, যা এখনো অনেক জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড।

উল্লেখ্য, ক্যাথরিন ইংল্যান্ডে চা নিয়ে আসার আরও অনেক পরে ১৮২০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত উপমহাদেশে চা চাষ ও উৎপাদন শুরু করে। ১৮৪৩ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে পরীক্ষামূলক চা চাষ ও এর স্বাদ নেওয়া হয়। পরে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়া চা–বাগানে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন ও বিক্রি শুরু হয়। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৫০টিরও বেশি চা–বাগান রয়েছে, যা চা উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে দশম। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন আর ভারত। ক্যাথরিনের দেশ পর্তুগালই ইউরোপের মধ্যে একমাত্র দেশ, যেখানে এখনো চা উৎপাদিত হয়।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন