বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০ বছর উত্তর-উপনিবেশবাদী অধ্যাপক হিসেবে আরও কয়েকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে শিক্ষকতার পর এ জি স্টক অবসর নেন। ইংল্যান্ডের একটি নির্জন গ্রামে ১৯৭০ সালে রচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক বই ‘Memoirs of Dacca University-1947-51’ বইটি প্রথমে ১৯৭৩ সালে ঢাকার গ্রিন বুক হাউস থেকে প্রকাশিত হয়। পরে ২০১৭ সালে এটি বেঙ্গল লাইটস বুকস থেকে খাদেমুল ইসলামের সম্পাদনা ও কায়সার হকের ভূমিকাসহ পুনঃপ্রকাশিত হয়। খাদেমুল ইসলাম সম্পাদকীয়তে বইটি পাঠের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
বইয়ের ভূমিকায় অধ্যাপক স্টক পাঠকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটি স্মৃতিকথন, ইতিহাস নয়, গবেষণা নয়। কিন্তু তাঁর স্মৃতিকথন শেষমেশ ১৯৪০–এর দশকের শেষ ও ১৯৫০–এর দশকের শুরুর সময়কালে ব্রিটিশ শাসন থেকে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এক দেশের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চালচিত্রের এক মূল্যবান সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
‘মেমোয়ারস অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক স্টকের সাহচর্যে আসা প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি জায়গার অনুপুঙ্খ বিবরণ আছে এতে; এটি নির্মোহ-বহিরাগতের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসপাঠ; এটি সব বয়সী নারীদের জন্য অনুপ্রেরণারও, যারা অপ্রথাসিদ্ধ ও মুক্ত জীবন যাপন করতে চায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাপিয়েও বইটির ক্যানভাস অনেক ব্যাপ্ত এবং সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার, শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপারে লেখকের ইতিবাচক ও নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ এখনো দুই বাংলাতেই যে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা দেখে চমকে যেতে হয়।

একাডেমিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-বিপ্লবের অনন্য প্ল্যাটফর্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষের মাইলফলক পার হলো। এখনই যথার্থ সময় সেসব লেখার দিকে ফিরে তাকানো, যেখানে উঠে এসেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবিস্তার বৃত্তান্ত। যে সময়টায় সর্ব অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সগৌরব অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল, সে সময়ের ইতিবৃত্ত সবচেয়ে সার্থকভাবে ধরা আছে যে গুটিকয় বইয়ে, এ জি স্টকের ‘মেমোয়ারস অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ বইটি তার অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে, এ জি স্টকের ‘মেমোয়ারস অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ বইটি ঘিরেই হয়েছে পাঠশালার চতুর্থ বর্ষপূর্তি আসর।

আলোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এ জি স্টকের ‘মেমোয়ারস অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ একটি অসাধারণ বই। এটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষেই পাঠ্য নয়, বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতেও এই বইটি একটি উল্লেখযোগ্য আকর গ্রন্থ বলা যায়। কারণ, মনে রাখতে হবে, তিনি বাইরে থেকে এসেছিলেন। বাইরে থেকে এসে সাড়ে তিন বছরের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। সেই সময় তিনি চেষ্টা করেছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে পাঠ করতে। কিন্তু যেসব মন্তব্য তিনি করেছেন, তাতে খুব যুক্তিবাদী মনের একজন মানুষের যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে যেন তাঁর কিছু আবেগেরও প্রকাশ ঘটেছে। তিনি ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। এক জায়গায় এমনও বলেছেন, উর্দু থেকে বাংলা অনেক ভালো একটি ভাষা। তিনি নিজেই বলছেন, তিনি দুটি ভাষার একটা ভাষাও জানেন না। এরপরও যে মন্তব্যটি করলেন, তার কারণটা হচ্ছে, তিনি জানতেন এই ভাষাটি জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। উর্দু ভাষা নিয়ে তাঁর কথা আছে, মন্তব্য আছে, কিন্তু বাংলা নিয়ে তাঁর যে ভালোবাসা, সেটি অবিশ্বাস্য।

default-image

আলোচক বলেন, মনে রাখতে হবে, এ জি স্টক কোনো মেমসাহেব হিসেবে এই উপমহাদেশে আসেননি। মেমসাহেব বলে তখন একটা গোষ্ঠী ছিল। তারা ছিলেন খুব বড় বড় ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রী। অভাব বলে কিছুই তাদের জীবনে ছিল না, কিন্তু করারও কিছু ছিল না। বিকেলে বাগানে চায়ের পার্টি করেই তাদের সময় কাটত এবং তাদের আচার-আচরণে যে ঔদ্ধত্য থাকত, মানুষের থেকে বিশাল দূরত্ব থাকত, তার কিছুই এ জি স্টকের জীবনে ছিল না।

এ পর্যায়ে অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম বলেন, তাঁর সুযোগ হয়েছে এ জি স্টকের ক্লাসে পড়ার, তাঁর সঙ্গে কথা বলার। এ জি স্টক ইয়েটসের ওপর ‘W B Yeats: His Poetry and Thought’ শিরোনামে একটা বই লিখেছেন। বইটি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯৯ সালে রিপ্রিন্ট হয়। খুবই মূল্যবান বই সেটি। বইটা প্রফেসর স্টক তাঁকে পড়তে দিয়েছিলেন। তিনি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে শেক্‌সপিয়ার নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইলেও পরে সুপারভাইজারের কারণে তাঁকে মত পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু এ জি স্টকের উৎসাহেই তিনি ইয়েটসকে বেছে নেন। ফলে তাঁর জীবনে এ জি স্টকের একটা বড় প্রভাব ছিল বলা যায়।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এ জি স্টক ক্লাস নিতেন ইয়েটসের ওপর। তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি খুব মন দিয়ে শুনতেন। এমনকি সবচেয়ে দুর্বল প্রশ্নটাও তিনি কখনো নাকচ করে দিতেন না। তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, অগ্রসরবাদী চিন্তা ছিল। তিনি ছিলেন স্বঘোষিত এন্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একজন মানুষ। তিনি জীবনে কখনো প্রতিষ্ঠা চাননি। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যখন পাস করে বের হলেন, তখন চেষ্টা করলে তিনি অনেক ভালো চাকরি পেতে পারতেন, ইংল্যান্ডে সুন্দর একটা জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে জীবন বেছে নিলেন, সেখানে ওপরের দিকে ওঠার কোনো উপায় ছিল না। তিনি ঢাকায় কয়েক বছর অধ্যাপনা করলেন, তারপর পাঞ্জাব চলে গেলেন পড়াতে। এরপর আরও কয়েকটি জায়গায় শিক্ষকতা শেষে বাড়িতে যখন ফিরলেন, তিনি তো সেই অবস্থানে আর যেতে পারেননি, যেখানে একজন অধ্যাপনার চূড়ান্ত পর্যায়ে, অনেক বই প্রকাশ করে, একটা তৃপ্তি নিয়ে অবসরে যায়।

এ জি স্টক শিক্ষাঙ্গনের সহকর্মীদের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি ছিলেন আগাগোড়া একজন শিক্ষা-সমর্পিত মানুষ। শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে এ রকম নিবেদিতপ্রাণ মানুষ খুব কমই দেখা যায়। তাঁর শিক্ষা নিয়ে উৎসাহ ছিল, ভাষা নিয়ে উৎসাহ ছিল, সংস্কৃতি নিয়ে উৎসাহ ছিল। জসীমউদ্‌দীন, যাকে আমরা পল্লিকবি বলি, তাঁকে তিনি পেয়েছিলেন একজন বন্ধু হিসেবে এবং জসীমউদ্‌দীন তাঁকে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একেবারে ভেতরে শারীরিকভাবে না নিয়ে, তাঁকে মানসিকভাবে সেখানে একটা জায়গা দিতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি জসীমউদ্‌দীনের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেছেন। আমাদের অনেকের সেই সুযোগ কোনো দিন হয়নি, হবেও না। জসীমউদ্‌দীনের সময় অনেকেই সেই সুযোগটা নিতেও চাননি। জসীমউদ্‌দীনের চোখ দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশকে দেখেন, তবে তিনি কোন বাংলাদেশ দেখবেন? স্টক সেই বাংলাদেশকে দেখতে পেয়েছেন, তাঁর জীবনটাকে দেখেছেন। সে জন্য দেশটির প্রবাহের সঙ্গে, সেটির প্রাণস্পন্দনের সঙ্গে নিজেকে এতটা একাত্ম করতে পেরেছেন তিনি।

এ জি স্টক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবযাত্রার সাক্ষী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশটাও লক্ষ্য করেছেন। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি মধ্যবিত্তের সূচনা করেছিল। বাঙালি মধ্যবিত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই প্রস্তুত হয়েছিল। কারণ, মধ্যবিত্তের বিকাশের জন্য কয়েকটি বিষয় প্রয়োজন: একটা হচ্ছে শিক্ষা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বস্ততা, যার প্রকাশ ঘটবে নানাভাবে যেমন সাহিত্য রচিত হবে, নাটক অভিনীত হবে, চিত্রকলার চর্চা হবে।

default-image

এ জি স্টক আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বলেছেন। তবে তাঁর এখানেই একটু দুঃখ। সেই সময়েই তিনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষা পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং এখনো পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষার ওই আবর্ত থেকে বের হতে পারেনি। যতীন সরকার বলেছেন, আমরা শিক্ষার্থী তৈরি করি না, শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করি। পরীক্ষার্থীর কাজ হচ্ছে পরীক্ষা শেষে সনদ হাতে নিয়ে চাকরির বাজারে ঢুকে পড়া। তাতে তো মানুষের সেবা করা যায় না। এ জি স্টক আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বলেছেন examination bound network. তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এ দেশের মানুষগুলো এত কল্পনাপ্রবণ, এত তাদের সৃষ্টিশীল-সৃজনশীল চিন্তা অথচ তারা এই পরীক্ষার দুষ্টচক্রে বন্দী হয়ে দিনের পর দিন শুধু মুখস্থ করছে, চিন্তা করছে না। আলোচক বলেন, আমাদের সৃজনশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, পরীক্ষা বাদ দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়নের হরেক রকম পদ্ধতি আছে। সেসব বিবেচনায় নিতে হবে।

এ জি স্টকের এক ছাত্র ছিল খোরশেদ। সেই খোরশেদ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে তার গ্রামে, নোয়াখালীতে। তিনি ট্রেনে করে, নৌকায় করে সেখানে গিয়েছেন। খোরশেদ সেখানে তাঁকে একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি বলছেন, ‘আমাকে একটা চিড়িয়াখানার জন্তুর মতো রেখে দিয়েছে।’ কিন্তু তাতে তাঁর কোনো শ্লেষ নেই, কোনো তির্যক মন্তব্য নেই। অসাধারণ একটা ভালোবাসা থেকে কথাগুলো বলে গেছেন তিনি। বলছেন, গ্রামের মেয়েরা আসছে, তার সঙ্গে কথা বলছে। বলছেন, ‘তারা কেউ আমার ভাষা জানে না। তাদের ভাষাও আমি জানি না। কিন্তু একটা মেয়ের সঙ্গে ভাষাহীন ভাষায় আমার কথা হয়ে গেল। তার জীবনের আদ্যোপান্ত আমি বুঝতে পারলাম, সে–ও আমাকে বুঝতে পারল।’ মানুষকে বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা না থাকলে এসব সম্ভব হতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মশতবর্ষে নিবেদিত পাঠশালার চতুর্থ বর্ষপূর্তি আসরে আলোচক শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পাণ্ডিত্যপূর্ণ, গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা দর্শক-শ্রোতারা ভীষণ উপভোগ করেছেন এবং প্রশ্ন-মন্তব্য করে সক্রিয় থেকেছেন আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এ আসরের সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ফারহানা আজিম শিউলী।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন