default-image

একটি গাছের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে। প্রতিটির সুনির্দিষ্ট কাজ আছে। একটির কাজ আরেকটি দিয়ে হয় না। গাছের যে পাতা থাকে, তা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কাজ করে। সূর্যের আলোর সহায়তা নিয়ে নিজে খাবার তৈরি করে। এভাবে গাছের শিকড় যেমন মাটি থেকে পানি, খনিজ উপাদান সংগ্রহ করে থাকে, তেমনি কাণ্ডও পানি ও অন্যান্য খনিজ উপাদান পরিবহন করে। প্রতিটিই স্ব-স্ব কাজ ঠিকমতো করলে আমরা কিছুদিন পর বা কয়েক বছর পর গাছে ফুল ও ফল পাই। যা দেখতে যেমন ভালো লাগে, তেমনি খেতেও।

ফল কিন্তু গাছের পাতায়ও ধরে না, আবার শিকড়েও না। ধরে গাছের কাণ্ডে। ধরুন, গাছে যখন ফল ধরা শুরু করল, তখন যদি কেউ গাছের পাতায় সূর্যালোক এবং গোড়ায় (শিকড়ে) পানির সরবরাহ বন্ধ করে সিস্টেম লস কমাবে বলে শুধু গাছের কাণ্ডে দেবে, যেখানে ফুল বা ফল ধরেছে। কারণ, গোড়া বা পাতায় দিলে তা থেকে ফুল ও ফলে যেতে সময় ও খাদ্যের অপচয় হবে এই ভেবে। তখন আমরা কি ফল পাব, না গাছটিসহ মেরে ফেলব? এতে আমও যাবে, ছালাও যাবে।

আমাদের এই শহরে অনেক এশিয়ান অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশিরা অন্যতম। তাঁদের সন্তানেরা এখানে কানাডীয় আবহে বড় হলেও তাদের বাবা-মায়েরা তো খাঁটি বাংলাদেশি আবহে বড় হওয়া। অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারলেও তো আর সব করা যায় না। এখানকার শিশুদের স্কুলগুলোতে আমাদের দেশের মতো ভালো ফল করার জন্য প্রতিযোগিতা হয় না। রেজাল্টের চেয়ে কি শিখল, তা–ই বড় কথা। সবচেয়ে বড় কথা এসব শিখে ভালো মানুষ হচ্ছে কি না।

আমাদের স্কুলের শিশুদের মতো এখানে গাদা গাদা বই থাকে না, কোচিং বা প্রাইভেট থাকে না, তাই শিশুরা বাসায় এসে এসবের টেনশন করে না। খেলাধুলা করে, অবসর সময়ে নতুন কিছু ভাবে। তাতে তাদের সৃজনশীলতা ও মানবিক বিকাশ বিকশিত হয়। শুধু পড়ে হয় না, ভাবার জন্যও তো সময় দিতে হয়। আর যা–ই হোক, চাপের মধ্যে শর্টকাট ব্যতিরেকে সৃজনশীলতা আসে না।

শিশুদের এমন অবসর সময় কাটানো দেখে এক বাবা স্কুলে গেলেন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য, যেন ছাত্রছাত্রীদের আরেকটু চাপে রাখে হোমওয়ার্ক (বাসার কাজ) দিয়ে। তাদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়। যথারীতি তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়নি। শিক্ষকেরা বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা ভালো মানুষ হিসেবে শিশুদের গড়ে তুলতে চাই, এবং সে ভালো ছাত্র না–ও হতে পারে।’

প্রতিবছরই বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (শিক্ষকের সহকারী) হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের কিছু পড়ানোর সুযোগ হয়। সেই শিশুরাই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তাদেরই একই মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। মার্কস নিয়ে তাদের উদ্বেগ তেমন দেখা যায় না, কী শিখল সেটাই বড় কথা। কেন কম মার্কস দিলাম, সেটা নিয়ে কদাচিৎ জিজ্ঞাসা করে। পরীক্ষার হলে পাশাপাশি বসলেও কেউ কারও উত্তর দেখার চেষ্টা করে না। কারণ একটাই, ওই যে তারা ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে।

আমরা সেখানে ভিন্নভাবে অনেক দূর এগিয়ে। মা–বাবা থেকে স্কুলের শিক্ষকেরাও অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় কপি বা প্রশ্ন ফাঁসে সহযোগিতা করে থাকি। সেটি হোক স্কুলের, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষা। এটির কারণও যথাযথ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক অবক্ষয়।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন রিজেন্ট হাসপাতালের শাহেদ, জেকেজির সাবরিনা–আরিফের অমানবিক দুর্নীতি দেশ পেরিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জায়গা নিয়েছে, তেমনি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে গ্যাং স্টার, সেভেন স্টার, ফাইভ স্টার তৈরি হচ্ছে। ঈদের গরুকে মোটাতাজা দেখাতে অমানবিক কায়দায় পেটে পানি ঢোকানোও হচ্ছে মূল্যবোধ অবক্ষয়ের কারণেই। এখন তো দেখে মনে হয়, এমন হীন, গর্হিত কাজগুলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এসব তো গুটিকয় নমুনা মাত্র। আরও অফুরন্ত উদাহরণ আছে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান।

কারণ কী, আমরা কী খুবই অস্থির? ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছি? অরাজকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি? মনে হয় সবাই আমরা সফলতার শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে মহাব্যস্ত। কী দিলাম, কী শিখলাম, এসবের চেয়ে কী পাইলাম এ নিয়েই চিন্তিত। পাওয়ার চিন্তায় আত্মহারা। গাছের গোড়ায় পানি ঢালার পরিবর্তে কাণ্ডে পানি ঢালার দিকে বেশি ঝুঁকছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি, ‘শর্টকাট সাধারণত যা পাই, তার থেকে বেশি মাশুল দিতে হয়’, ব্রায়ান্ট ম্যাকগিল।

দুর্ভিক্ষ হলে যেমন আমরা সবার আগে যেমন করেই হোক খাবার পেতে চেষ্টা করি, তেমনি এখন যেমন করেই হোক অর্থবিত্ত আর বৈভবের পেছনে ছুটছি। আমরা ভালো মানুষ হতে চাই না, চাই অর্থবিত্ত আর বৈভব। এ দুর্ভিক্ষ যে খাদ্যের নয়, এ দুর্ভিক্ষ যেন লোভ-লালসার।

*লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউব্রান্সউইক, ফ্রেডেরিক্টন, কানাডা। mnalam.mb@gmail.com

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন