default-image

কোথায় যেন একটা কিছু নেই। একটা কিছু কেন বলছি, অনেক কিছুই তো নেই। অনেকেই নেই। মাসুম-সিজানদের ঈদ কার্ডের দোকান নেই। দরজায় একের পর এক ‘ফিতরার টাকা দেন বাও’ শব্দ নেই। সারা রাত জেগে নতুন জামাকাপড় কেনার উৎসব নেই। অবশ্য এসবের কোনোটাই থাকবে না। বেশ জানা ছিল। ইশতি, সাকিব, আতিক ওরা কেউ থাকবে না। জানতাম। ওদের সঙ্গে রাতভোর লুডু খেলা। আতশবাজির আয়োজন করা। আর ভোর ভোর নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া। উফ, স্মৃতিকাতরতা খুব দম বন্ধ করা একটা অনুভূতি।

যেকোনো উৎসব আয়োজনে আনন্দটাই বোধ হয় মুখ্য। স্মৃতি রোমন্থন ব্যাপারটা উৎসবের লক্ষ্য কখনো নয়। জানি। জানলেই বা কি! রোমন্থনেই বাঁচি। তাই বলে ডরমিটরি থেকে বের হয়ে কালেভদ্রে ইস্তাম্বুলের উৎসবমুখর পরিবেশটায় খানিকটা ঢুঁ মারতে ভাগ্যিস ভুলিনি। দেশ থেকে এত সহস্র মাইল দূরের এই ঈদ আয়োজন। রমজানের রোজা, ইফতার, কেনাকাটা—এর সবটাকে ঘিরে তারুণ্য। যদি এত কাছ থেকে কখনো না দেখতাম, হয়তো বুঝতেই পারতাম না, পৃথিবীব্যাপী উৎসবের ভাষা এক। শতসহস্র প্রাণের ঐকতানের প্রকাশ যেন উৎসব।

জাতি হিসেবে তুর্কিরা সুন্দর। সত্যিই সুন্দর। তুর্কিদের সবাইকে দেখে আমার মনে হয় ওরা কোনো এক কল্পরাজ্যের বাসিন্দা। এখানে প্রথম আসার পরপর এক মাসের মতো আমি শুধু অবাক হয়ে মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তাদের পরোপকারের মানসিকতা, অতিথিপরায়ণতা, দেশপ্রেম—এর সবটা নিয়েই তারা সুন্দর। এখন অবশ্য সৌন্দর্যটাকে খুব বিশেষ বলে বোধ হয় না। খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে সৌন্দর্যের প্রশংসা করাটা উচিতও। তাই করছি। ইস্তাম্বুলও খুব সুন্দর, মানুষগুলোর মতোই। শহরের রাস্তায়, মোড়ের বাঁকে—সবখানে পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন। পুরোনোর দাম্ভিকতা। পথে পথে এই দাম্ভিকতাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব যেন বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের। রমজানের শেষ কয়েকটা দিন পর্যটকের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। ইতিহাসের পাতার সেই অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ, আয়া সোফিয়ার নিকটস্থ সবুজ চত্বরে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় তুর্কিরাও পরিবারসহ আসেন। খোলা আকাশের নিচে একসঙ্গে ইফতার আয়োজনে অংশ নেন।

শহরের ইউরোপীয় অংশের পুরোনো আবাসিক এলাকাগুলোর ক্লান্ত যুগের ছাপ পড়া স্থাপত্য। তুর্কি মায়েদের ইফতার–প্রস্তুতি। বাবাদের এলাকার চায়ের টঙে বসে গল্প। পড়ন্ত বিকেলে ইফতারের অপেক্ষা। টং আর বাসার পাশে পাহাড়ি উঁচু–নিচু রাস্তায় গোলাপের রাজ্য আর অনেকগুলো বিড়াল। বাসার ভাইবোনদের একসঙ্গে সেই বিড়ালগুলোর সঙ্গে খেলা করা। দূর–দূরান্তের নতুন-পুরোনো মসজিদগুলো থেকে হালকা চালে ভেসে আসা আজানের শব্দ। আর এর সবকিছুর সঙ্গে মারমারা সাগরে স্নাত স্নিগ্ধ হাওয়া। সবটার মিশেলেই যেন সবার আড়ালে রচিত হয় কোনো এক কবির লেখা সেরা কবিতার ছন্দ। আর এই কবিতার মুগ্ধ পাঠক পৃথিবী নিজেই। নেপোলিয়নের অনুভবে ঠিক ধরা পড়েছে এর সবটা, বোধ হয় সে জন্যই তিনি বলেছিলেন, পুরো বিশ্ব একটা দেশ হলে, ইস্তাম্বুল হবে তার রাজধানী।

default-image

পূর্ব আর পশ্চিমের সংস্কৃতির একটা যৌথ উপস্থিতি উপলব্ধিতে আসে ইস্তাম্বুলের পথে প্রান্তরে। এখানকার তরুণেরা বেশ ফ্যাশন সচেতন। আবহাওয়া ও ঋতু অনুসারে পোশাক ঠিক হওয়াটা চাই-ই চাই। আমি আবার এই বিষয়ে খুব অসচেতন। তুর্কি হিতাকাঙ্ক্ষী ধরনের বন্ধুরা দেখা হলে প্রথমেই আমার পোশাক নিয়ে কথা বলেন, মানে বলতেন আর কী। ইদানীং একটু সচেতনতা বাড়িয়েছি। এই ফ্যাশন সচেতনতার জন্য খুব নিয়মিতভাবেই নতুন পোশাকে অভ্যস্ত তুর্কি তরুণেরা। সেদিন বুরাককে ‘ঈদ শপিং কত দূর?’ প্রশ্ন করলাম, উত্তরে তাকে খুব অপ্রস্তুত হতে দেখলাম। বাঙালি তরুণদের ঈদ উপলক্ষে বিশেষ কেনাকাটার আনন্দ তারা কী আর বুঝবে!

তবে ইস্তাম্বুলে আমার ডরমিটরির এলাকায় বিপুলসংখ্যক দেশান্তরিত সিরিয়ান জনগোষ্ঠীর বসবাস। পুরো এলাকায় সিরিয়ানদের খাবার, পোশাক-আশাকসহ বিভিন্ন খুদে ব্যবসার দোকান। ঈদকে কেন্দ্র করে তাদের দোকানগুলোতে বিশেষ ছাড়ের আয়োজনসহ খুব উৎসবমুখরতা চোখে পড়ল। সিরিয়ার তরুণেরাও ঈদে নতুন পোশাক কেনাকে তাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করে। আমার দুজন সিরিয়ান ক্লাসমেট থেকেও একই বিষয় জানলাম।

ঈদ উপলক্ষে আমাদের বাঙালিদের বেশ অনেক পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হলো আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাসায় বেড়াতে যাওয়া। তুরস্কে আসার পর থেকে এ অবধি অনেক তুর্কি বন্ধু হয়েছে। খুব নিকট বন্ধু। কিন্তু কেউ বাসায় দাওয়াত করেনি। অন্তত ঈদে আশা করেছিলাম দাওয়াত করবে। কিন্তু না, করেনি। শুনেছি তুরস্কের অন্য শহরের মানুষের মধ্যে তুর্কি আঞ্চলিক আমেজটার দেখা মেলে। কিন্তু ইস্তাম্বুলের মানুষজন খুব ক্যারিয়ার ব্যস্ততার জন্যই হয়তো তুরস্কের সত্যিকারের আতিথেয়তার সংস্কৃতিটা থেকে একটুখানি চ্যুত। তবে, মানুষগুলো খুব সামাজিক ধরনের একটা জীবন যাপন করেন। শহরের মোড়ে মোড়ে দেখা মেলে কনসেপচুয়্যাল সব ক্যাফে। এক কাপ চায়ের চুমুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা চালানো যায়, সেগুলোতে বসে। আর আড্ডার তুর্কি সঙ্গীরা যখন ঈদ উপলক্ষে পরিবারসহ নিজ নিজ শহরে চলে গেছে, তখন আমার খুব নিয়মিত কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে থিয়েটার, অর্থাৎ মঞ্চনাটক।

বছরজুড়ে তুর্কি দর্শকদের উপস্থিতিতে জমজমাট থাকে থিয়েটারগুলো। টিকিট পাওয়া খুব শক্ত। শোর প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকে কেটে রাখতে হয় প্রবেশ কুপন। ঈদ উপলক্ষে ইস্তাম্বুল বেশ জনশূন্য আর শান্ত হয়ে যাওয়ায় টিকিট পাওয়াটাও খুব সহজ। আর তাই আমার এই সুযোগের সদ্ব্যবহার।

অনেকগুলো দেশের শিক্ষার্থীর বাস আমার ডরমিটরিতে। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কসোভোর জাকারিয়া। বাঙালি সংস্কৃতি নাকি ওকে খুব টানে। সবশেষ বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় ওর জন্য একটা পাঞ্জাবি এনেছিলাম। কী যে খুশি হয়েছে। পারলে যেন বাঙালি হয়ে যায়। সংস্কৃতি খুব অদ্ভুত একটি বিষয়। মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে নতুন একটি ধর্মের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিচয় মানুষের পাথরে লেখা পরিচয়, চিরদিন রয়ে যায়। সে যা হোক, জাকারিয়ার মতো যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মতো তুরস্কের নিকটবর্তী দেশগুলো থেকে পড়ালেখা করতে এসেছে, তারা সামান্য চার-পাঁচ দিনের ছুটিতেই ছুটে যায় পরিবারের কাছে। আমার গ্রিক রুমমেট জেন তো প্রতি সপ্তাহেই পারলে একবার করে ঘুরে আসে গ্রিস থেকে।

দূর পরবাসের নিঃসঙ্গ তারা গুনতে হয় আমাদের। যারা খুব দূরের দেশ থেকে এসেছি। নিঃসঙ্গতা যেন দ্বিগুণ হয়ে যায় ঈদের মতো বিশেষ সময়গুলোতে। সব রকমের সামাজিক রাজনৈতিক দ্বিধা–বিপত্তি কোন্দলের থেকেও আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক সামান্যতম মিল। এই যেমন খাবারের ধরনের মিল। এই মিলের জন্যই অনেকটা আমরা যারা বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা একই ডরমিটরিতে থাকি। উৎসবগুলোতে অন্তত রান্নাবান্নার পরিকল্পনাটা একসঙ্গে করে থাকি।

বিদেশি শিক্ষার্থীরা সবাই মিলেমিশে যেন নিজেদের অজান্তেই হয়ে যাই একেকটি পরিবার। ঈদের কেনাকাটা একসঙ্গে করি। একসঙ্গে ঈদের নামাজে যাই। ঈদের ছুটিতে ফুটবল ম্যাচের পরিকল্পনা করি। কখনো আবার দূরের কোনো জায়গা থেকে একসঙ্গে ঘুরে আসার পরিকল্পনা। সব মিলিয়ে ওই যে আমাদের মধ্যে একটা শক্ত একতাবদ্ধতা কাজ করে। উৎসব আমাদের আরও এক করে। কিন্তু এর সবকিছুর মাঝেও কোথায় যেন কীসের একটা ফাঁক থেকেই যায়। একটা খুব অদ্ভুত রকমের অভাব। এই যেমন আমি ডরমিটরির একমাত্র বাঙালি। খুব আনন্দের মুহূর্তে গলা ছেড়ে মান্না দে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল একটার পর একটা গাইতেই থাকি, কেউ বোঝে না। কেউ মনোযোগ দেয় না। সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে অপুর সংসারটা আরেকবার দেখতে খুব মন চায়। মনে হয়, যদি ওরাও কেউ আমার সঙ্গে বসে একটু দেখত! পয়লা বৈশাখের সকালটায় অন্তত পাশের বাসার স্পিকারে বাজতে থাকা ‘এসো হে বৈশাখ’ শুনে ঘুমটা ভাঙুক, তা হয় না। তবে সবকিছুর শেষে যখন ডেস্কে টাঙানো লাল-সবুজের পতাকাটা দেখি, নতুন একটা উদ্যমে সবকিছু শুরু হয়, চলতেও থাকে বেশ। বাকি বিদেশি বন্ধুগুলোর অনুভূতিও হয়তো আমারই মতো।

ঈদের দিন বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে সারা দিনের রান্নাবান্না, ঘোরাঘুরি শেষে বেশ ক্লান্তি যখন শরীরজুড়ে। দেশে সবার ঈদ প্রস্তুতির কথা ভেবে যখন মন খুব খারাপ হওয়ার পথে, ঠিক তখনই ই–মেইলের স্ক্রলে চোখে পড়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট ইস্তাম্বুলের মেইল। বাংলাদেশিদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। কনস্যুলেট অফিসে। ছুটে যাই সেখানে। সব বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়, সালাম আর শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, বাঙালি খাবার খাওয়া হয়। এই তো! একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে এভাবেই জায়গা করে নেয় প্রবাসের ঈদ। দিন শেষে আসলে ওই যে ওই কথাটা খুব সত্য, বিশ্বব্যাপী উৎসবের ভাষা এক, শতসহস্র প্রাণের ঐকতানের প্রকাশ যেন।
...

শাকিল রেজা ইফতি: শিক্ষার্থী: ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0