ওমরাহ হজ

বিজ্ঞাপন
default-image

রেসিডেন্সি শুরুর আগে দুই সপ্তাহের মতো সময় পাব! সে সময়টা দুজনে ওমরাহ পালন করতে যাব ঠিক করলাম! হজে যাওয়া পিছিয়ে যাচ্ছে; বাচ্চাদের কারণে সময়ে মিলছে না বলে। বা করার সময় এখনো লেখা হয়নি বলে। যা–ই হোক, বাচ্চারা আমাকে ছেড়ে বছরখানেক থেকেছে অলরেডি! ওমরাহর দুই সপ্তাহ দেখতে দেখতে চলে যাবে।

তবে বন্ধুরা মজা করে বলছেন, মনে রেখো, ওমরাহ করলে পরে কিন্তু জামাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করা যাবে না! সারা জীবন এভাবেই থাকতে হবে! সে যা–ই হোক, আমরা তৈরি!

নির্দিষ্ট দিনের আগেই আমাদের ওমরার প্যাকেজ হিসেবে সাদা কাপড় চলে এসেছে। আমরাও নির্দিষ্ট দিনে রওনা দিলাম, দুবাই হয়ে জেদ্দা। নিউইয়র্কে প্রথম স্টপ, কয়েক ঘণ্টা সময় হাতে! চলে গেলাম বাঙালি পাড়ায়। দুপুরের খাবার খেয়ে পাশেই এক দোকানে নিজের জন্য বোরকা পেয়ে গেলাম।

সেখান থেকে ফিরে প্লেন ধরে দুবাই টু জেদ্দা। ফ্লাইটে ওমরাহ করতে যাচ্ছেন, এমন অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। মনটা অন্য রকম প্রশান্তিতে ভরা। নির্দিষ্ট কারণে যাচ্ছি। দুবাইয়ে নেমেও কয়েক ঘণ্টা স্টপ ওভার! সহযাত্রী ওমরাহকারীরা সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁরা বাইরে ঘুরে দেখবেন! সঙ্গে আমরাও যোগ দিলাম! বাইরে সন্ধ্যা-বেশি কিছু দেখার নেই বলে ফিরে এলাম! জেদ্দায় পৌঁছালাম ভোরবেলা।

সব প্রক্রিয়া শেষ করে বাসে উঠতে উঠতে কয়েক ঘণ্টা লেগে গেল! সেখান থেকে প্রথম স্টপ মদিনা! কয়েক ঘণ্টা বাসে যেতে যেতে মরুভূমির কালো পাথুরে মাটির ভেতর দিয়ে চলছি! ভিন্ন রকমের প্রকৃতি, কালো পাথর, গাছপালা নেই; বিরান প্রান্তরের রাস্তা দিয়ে বাস যাচ্ছে। একসময় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে হোটেলে! খালি রাস্তাঘাট! হোটেলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দেখি আজান দেয়! জানালা দিয়ে দেখি মসজিদে নববী! মনটাই ভালো হয়ে গেল। হোটেলের পেছনের দরজা দিয়ে বের হলেই মসজিদ! হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম নামাজ পড়তে। মসজিদের সেই বিশাল চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে মনে স্পন্দন জাগে। মনটা অপার্থিব ভালো লাগায় ভরে যায়।

সব সময় মসজিদের ছাতিগুলো খোলা থাকে না! জুতোগুলো দরজায় রেখে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম! নামাজ পড়ে দেখি নারীরা একদিকে যাচ্ছেন, আমিও গেলাম পিছু পিছু। নবীজির (সা.) রওজা, মসজিদ দেখেই মন শান্ত হয়ে গেছে। রওজা দেখে আরও প্রশান্তি মনে। দেখলাম, আল্লাহর অশেষ রহমত!

মসজিদের ভেতর থেকে নামাজ শেষে বের হয়ে চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, একেক কোণে একেক জিনিস। এক কোণে সাহাবাদের কবরস্থান! একসময় নাকি জৌলুস ছিল। এখন কালো পাথুরে মাটি ছাড়া আর কিছু নেই।

আরেক কোণে দেখলাম বাজার। তৃতীয় কোণে খাবারের দোকান দেখেই ক্ষুধা লেগে গেল। ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি এবং বাঙালি দোকান। খাবার কিনে ফিরে গেলাম হোটেলে খেয়েদেয়ে ঘুম। ঘুম ভাঙল আসরের আজানে। মসজিদে নববীর সৌন্দর্য দেখে সুবহানআল্লাহ বের হয়ে আসে মুখে। আমি যে কদিন ছিলাম মদিনায়, সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা, রাতে তা উপভোগ করতাম রুমের জানালা থেকে। আমার রুমটা ছিল মসজিদের ওপরে। মাঝে কোনো দূরত্বই নেই। আজান পড়লেই ভীষণ ভালো লাগা নিয়ে নামাজে দৌড়ে যেতাম! এত প্রশান্তি মনে হয় কোনো কিছুতে পাইনি। কোনো পিছুটান নেই। আল্লাহর দরবারে হাজির। ছাতাগুলো খোলা থাকলে মসজিদের একরূপ আর বন্ধ থাকলে ভিন্ন রূপ। রুম থেক সারাক্ষণ সেটাই দেখতাম। যে কদিন ছিলাম, মনে হতো, যদি জীবনের শেষদিনগুলো এখানে কাটাতে পারতাম।

মসজিদ থেকে বের হতেই পর্যটকদের বা হাজিদের ঘুরতে নেওয়ার জন্য অনেক ট্যাক্সি বসে থাকে। আমরা গেলাম দেখতে উহুদের যুদ্ধস্থল। সেখান থেকে উসমান (রা.) খেজুর বাগান, নামাজ পড়লাম কেবলা মসজিদে। দেখলাম নবিজির বাসস্থল।

তবে সবচেয়ে প্রশান্তি ছিল মসজিদে নববীতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়।

সেখান থেকে কয়েক দিন পর গেলাম মক্কায়। যাওয়ার পথে রাস্তায় পড়ে আয়শা মসজিদ, সেখানে নামাজ পরে আমরা পৌঁছে গেলাম মক্কায়। কালো পাথরের বুক চিড়ে বিশাল বিশাল অট্টালিকার সমাহার। হাঁটার দূরত্বে মসজিদে হারাম, প্রথমে বুঝিনি।

হোটেল রুমে টিভিতে লাইভ তাওয়াফ দেখাচ্ছে। আমরা ফ্রেশ হয়ে হোটেলের গাড়িতে চলে গেলাম হারাম শরিফে। বিশাল মসজিদ, সেটার রেনোভেশন চলছে চারদিকেই। মসজিদ সমানে পরিষ্কার করছে, জমজমের পানি কোনায় কোনায়, সঙ্গে কোনে কোনে অজুস্থল। এই সেই স্থান, যা দেখার জন্য, যেখানে তাওয়াফ করার জন্য সারা মুসলমান জাহান সারা জীবন অপেক্ষায় থাকে শুধু একটিবার দেখবে বলে। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেললাম।

দেখি বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন গ্রুপ এসেছে, চেনার সুবিধার জন্যই একই ধরনের কাপড় পরা, সামনে তাদের দলনেতা। বেশির ভাগই আমাদের মতো বয়সী। মালয়েশিয়ায় নাকি বিয়ের পাত্রের ক্রাইটেরিয়া দেখা হয় ওমরাহ বা হজ পালন করেছেন কি না! আমাদের সবাই একটু বয়স করে যান, তবে যাঁদের সামর্থ্য আর সঠিক পথে চলার ইচ্ছা, তাঁরা বয়সকালেই করে নেবেন। মিনার তাঁবুতে বয়সকালে থাকা বা সেই লাখ লাখ লোকের ভিড়ে নিজের স্ট্যামিনা বজায় রাখা আসলেই কঠিন। রাস্তা হারানো, পদদলে দলিত হওয়ার বা অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়!

সাফা মারওয়া আমার কল্পনায় বিশাল পাহাড় ছিল। দেখলাম সেটা আসলে সমতল করে দেওয়া, মনে হয় সবার দৌড়ানোর সুবিধার্থে। টাইলস বসানো কয়েক গজ জায়গা। পাশেই জমজমের কূপ। তাওয়াফ করার জন্য এমন সময় যাওয়া উচিত যখন খুব বেশি লোকজন না থাকে, তাহলে একদম কালো পাথর ছুঁয়ে আসা যায়। সব কাজ শেষে বের হয়ে ক্ষুধা টের পাই, হাঁটতে হাঁটতে ফিরতেই দেখি প্রচুর বাঙালি দোকান। হোটেলেই চুল কাটার ব্যবস্থাও আছে। যে কদিন সেখানে ছিলাম, এরপর হোটেলের গাড়িতে নয়, হেঁটে হেঁটেই আসা–যাওয়া করতাম প্রতি বেলা। হেঁটে বেড়াতাম আশপাশের অলিগলি। প্রচুর দেশি ভাইকে দেখলাম, ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানিদেরও দেখলাম। পরিবেশ ছাড়া মনেই হলো না দেশের বাইরে।

সেখান থেকেই গেলাম হেরা গুহা দেখতে, যেখানে পবিত্র কোরআন শরিফ নাজিল হয়েছিল। আরও দেখলাম জাবাল আল নুর; তুর পাহাড়, যেখানে নবীজি তিন দিন আত্মগোপনে ছিলেন; আরাফাতের ময়দান, যেখানে বিদায় হজের ভাষন হয়েছিল।

মসজিদে হারামে এক জুমা শেষ করে বেরোতেই দেখি লাশের খাটিয়া কাঁধে নিয়ে সদ্য মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, জীবনের শেষ নামাজ তাঁর হারাম শরিফে। কারও কোনো কাজের ব্যত্যয় নেই; পরে জেনেছিলাম এটাই স্বাভাবিক এখানে। কোনো কোনো দিন আরও বেশি লাশ যায়। মসজিদ কমিটি তাদের দাফন–কাফনের ব্যবস্থা করে। কেউ মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সবকিছুর মালিকের কাছে প্রত্যাবর্তন!

তাঁর কোনো নেয়ামত অস্বীকার করার নেই। সৌদি সরকার এখানে খুব সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকভাবে মানুষদের ওমরাহর বা নামাজের ব্যবস্থা রেখেছে। ভীষণ পরিচ্ছন্নতা মেইনটেইন করে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়, আসলে কনস্টান্টলি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ধোয়ামোছা করে, পানির সরবরাহ বজায় রাখে।

হারাম শরিফে আমাদের ওমরাহ পালন শেষে আবার সেই বিমানবন্দরে, এত লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর পবিত্র ওমরাহ এবং হজ পালনে সৌদি আরবে যায়, তাদের বিমানবন্দরে দৈন্যদশা এবং সেখানকার প্রফেশনিজমের অভাবটা কিন্তু দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। কেউ অন্যভাবে নেবেন না। পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দরে আমাকে বছরে কয়েকবার ভ্রমণ করতে হয়, অ্যাটলিস্ট চোখে লাগে। তবে হয়তো এটা তাদের জন্য ঠিক আছে। হয়তো এখন সেটা আরও উন্নত করেছে।

বর্তমানে করোনার কারণে ওমরাহ এবং হজের অনেক বিধিনিষেধ এসেছে। আমরা আবার কবে আগের দিনগুলোর নিয়মে ওমরাহ এবং হজ করতে পারব, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

আমি এখন পবিত্র হজ করতে চাই এবং মসজিদে আল আকসা দেখতে চাই। যদি তত দিন বেঁচে থাকি আর কপালে থাকে, দোয়া রাখবেন।

*লেখক: মার্কিন চিকিৎসক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন