বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ম্যানচেস্টার শহরে ট্রামের ব্যবস্থা অনেক সুন্দর। শহরের বুকে প্রশস্ত রাস্তার প্রান্ত দিয়ে বাসের পাশাপাশি হেলেদুলে ছুটে চলা ট্রামের ছন্দে পা মিলিয়ে মানুষ ছুটে চলেছে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ম্যানচেস্টার শহরটি অনেকটা পুরোনো ধাঁচের অবয়ব সযত্নে ধারণ করে আছে। বাড়িগুলোতে সেই পুরোনো আবহ এখনো সযত্নে সমুজ্জ্বল। তবে নতুনের আবাহন যে মোটেও নেই, সেটি বললে অন্যায় হবে। অন্যান্য শহরের মতো এখানেও সিটি সেন্টারকে ঘিরে আধুনিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ট্রাম থেকে নেমে আমরা হেঁটে চলেছি ওল্ড ট্রাফোর্ডের দিকে। আসলে ম্যানচেস্টার শহরে ওল্ড ট্রাফোর্ড বললে দুটো স্টেডিয়ামের কথা ক্রীড়াপ্রেমীদের মানসপটে ভেসে ওঠে।

একটি ফুটবল স্টেডিয়াম এবং আরেকটি হলো ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ক্রিকেটের দেশের মানুষ হিসেবে মাঝপথে ওল্ড ট্রাফোর্ড ক্রিকেট স্টেডিয়াম দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। তখন স্টেডিয়ামের ভেতরে ট্যুর দেওয়ার মতো সময় নেই। অগত্যা মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রিকেট মাঠের সবুজ গালিচা সন্দর্শন হলো।

কয়েকটি ফুটবল স্টেডিয়ামের ভেতরের জৌলুশ দেখার পর ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে নিতান্তই সাধারণ মনে হলো। স্টেডিয়ামের জৌলুশ দেখেই অনুভব করা যায় ইংল্যান্ডে জনপ্রিয়তার নিরিখে ফুটবল এবং ক্রিকেটের মাঝে কতটা তফাত। ওল্ড ট্রাফোর্ডের ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচার দিকে তাকিয়ে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়ি। এই সেই ক্রিকেটের তীর্থভূমি, যেখান থেকে ক্রিকেট ইতিহাসের এক অসাধারণ স্বপ্নযাত্রার শুরু হয়েছিল, যে রেকর্ড কোনো ক্রিকেটপ্রেমী কখনো কল্পনায় আনতে পারেননি, সেই রেকর্ডের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল। সেটি হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শততম শতরানের কীর্তি। যেটি এখনো শচীন তেন্ডুলকারের নামের পাশে হিরের মতো উজ্জ্বল শোভা বর্ধন করে চলেছে। মজার ব্যাপার হলো, ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে যে মহিরুহের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল, ঢাকার মিরপুরে সেটি পূর্ণতা পেয়েছিল।

default-image

১৭ বছর ১১২ দিন বয়সে ওল্ড ট্রাফোর্ডে শচীন ব্যাট হাতে নেমেছিলেন। প্রথম ইনিংসে ৬৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। টেস্টের পঞ্চম দিনে এসে চতুর্থ ইনিংসে যখন ব্যাট করতে নামেন, তখন ভারতীয় দল যথেষ্ট বিপদে। ১৮৩ রানে যখন ৬ উইকেট পড়ে গেছে, তখনো দিনের খেলার অনেক ওভার বাকি। মনোজ প্রভাকরকে সঙ্গে নিয়ে ১৭ বছরের এক বিস্ময়বালক শুধু ম্যাচই বাঁচালেন না, নিজের জীবনের প্রথম শতরানের দেখাও পেলেন। ৯৮ রানের মাথায় এঙ্গাস ফ্রেজারকে মিড অফে পাঞ্চ করলেন, ক্রিস লুইস সীমানা থেকে বল কুড়িয়ে ফেরত পাঠানোর আগে তিন রান নিলেন, লজ্জাবনত হয়ে ব্যাট তুলে দুহাত উঁচু করে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দিলেন। পেয়ে গেলেন অসাধারণ স্বপ্নযাত্রার প্রথম মুকুট। ম্যাচসেরার পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশ ঐতিহ্য মেনে হাতে পেলেন শ্যাম্পেনের বোতল। কিন্তু বিধিবাম, বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়াতে শ্যাম্পেনের বোতলের কর্ক খুলতে পারলেন না। পরে ১৯৯৮ সালে মেয়ে সারার প্রথম জন্মদিনে সেই শ্যাম্পেনের বোতলের কর্ক খুললেন।

ক্রিকেট মাঠের নস্টালজিয়াকে পেছনে ফেলে ফুটবল মাঠের দিকে পা বাড়ালাম। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, নিয়ন আলোর উজ্জ্বল আলোকছটার মাঝে আমাদের দুজনের মতো হাজারো ফুটবলপ্রেমী পা মিলিয়েছেন ফুটবল মাদকতায় বুঁদ হয়ে অসাধারণ এক সন্ধ্যা কাটানোর উদ্দেশ্য সামনে রেখে।

এনফিল্ডে ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ ছিল, কিন্তু ওল্ড ট্রাফোর্ডে সে সুযোগ নেই। ফলে বাইরে ব্যাগ রাখতে হবে, তবে ব্যাগ রাখা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই যদি পকেটে পাউন্ড থাকে। পাঁচ পাউন্ড দিলেই ওরা ব্যাগ রেখে একটা কাগজের স্লিপ হাতে ধরিয়ে দেয়। পাঁচ পাউন্ড দিয়ে ব্যাগ রাখার পর একটু খারাপই লাগছিল, দুই ঘণ্টা সময়ের জন্য একটা ব্যাগ রাখতে পকেট থেকে প্রায় ছয় শ টাকা বেরিয়ে গেল; মানুষের পকেট থেকে টাকা খসাতে এরা অবধারিত চ্যাম্পিয়ন! ওল্ড ট্রাফোর্ডে ঢোকার আগে দেখলাম এখানেও রাস্তার দুপাশজুড়ে রীতিমতো খাদ্যোৎসব চলছে। নানা পদের গরম–গরম খাবারের সহায়তায় উদরপূর্তি করে সবাই নিজ ক্লাবের হয়ে গলা ফাটানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওদিকে কিছু মানুষ টিকিট বিক্রির জন্য গলা ফাটিয়ে চলেছে যেন খুব অল্প সময়ে বেশি লাভের পাউন্ড নিজের পকেটে ঢোকানো যায়। ভিড়ের স্রোতে পা মিলিয়ে আমরাও পৌঁছে গেলাম স্টেডিয়ামের দিকে।

স্টেডিয়ামের সামনের খোলা জায়গায় পৌঁছাতেই ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লেখা MANCHESTER UNITED শব্দগুলো লাল আলোর উজ্জ্বল আভায় ক্লাবের গৌরবগাথার বর্ণিল ইতিহাসকে স্বমহিমায় মানুষের সামনে তুলে ধরছে বলে মনে হলো।

ওদিকে ডান পাশে তাকাতেই চোখে পড়ল তিন ফুটবলারের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। কাছে গিয়ে ছবি তুললাম, এরপর ভাস্কর্যের গায়ে খোদাই করা লেখা পড়ে বুঝলাম, এটি হলো The United Trinity/Holly Trinity। আসলে এটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফুটবল ইতিহাসের ত্রিরত্ন জর্জ বেস্ট, ডেনিস ল এবং স্যার ববি চার্লটনের মিলিত ভাস্কর্য, যেখানে ঠিক মাঝখানে ডেনিস ল ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ডান পাশে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জর্জ বেস্ট এবং বাঁ পাশে ডেনিস লর এক হাত এবং অপর হাতে একটি ফুটবল ধরে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন স্যার ববি চার্লটন। এ Holly Trinity ভাস্কর্য নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবের অতীত গৌরবগাথাকে ভক্তদের মাঝে অম্লান করে রাখা। ১৯৬৮ সালে এ ত্রয়ীর হাত ধরে ইংল্যান্ডের প্রথম ক্লাব হিসেবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ জয়লাভ করে। এই তিনজন মিলে ষাটের দশকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে একপ্রকার ফুটবল বিপ্লব এনেছিলেন। তিনজন একে অপরকে খুব ভালো বুঝতে পারতেন, যার ফলে তাঁদের মাঝে এক অসাধারণ রসায়ন গড়ে ওঠে।

ওল্ড ট্রাফোর্ডের লাল-সবুজের আবাহনে গড়ে ওঠা এই ফুটবলতীর্থে কেমন করে ফুটবলের ফুল ফোটাতেন এ তিনজন মিলে? সেটি আমরা স্কটিশ ফুটবলার Pat Crerand-এর করা একটি মন্তব্য থেকে কিছুটা আঁচ করতে পারি। উনি বলেছিলেন, ‘Right away, you could see the great chemistry between them. Great players know how to play together. However tough the match was, you always knew Bobby could unleash one of his strikes from God-knows-where, Denis would make something out of nothing inside the box or George would just do something magical’.
খেলা শুরু হতে তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি, কিন্তু বাইরে সমর্থকেরা ততক্ষণে ফুটবল-আনন্দে অবগাহনের প্রস্তুতি সেরে নিতে উন্মুখ। প্রায় সবার গায়ে ক্লাবের ট্রেডমার্ক লাল জার্সি, হাতে লাল মাফলার আর মুখে চওড়া হাসি। যে হাসি দেখে বোঝা যায়, জগতের সব দুঃখকষ্ট, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা ভুলে ৭৪ হাজার ১০০ জন সমর্থক ফুটবলের লাল দুর্গে ৯০ মিনিটের জন্য ফুটবল নামক মাদকতায় বুঁদ হয়ে থাকবেন। বাইরে থেকে ছবি তোলার পর্ব শেষ করে এবার স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশের পালা। ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রবেশপথে প্রতি পদে লালের ছোঁয়া আছে। এনফিল্ডেও দেখেছিলাম লালের ছোঁয়া কিন্তু এনফিল্ডের তুলনায় ওল্ড ট্রাফোর্ডের লাল রঙের ছোঁয়ায় একটু বেশি তীব্রতা অনুভূত হলো। টিকিট পরীক্ষার পর লিফটে চড়ে ওপরে উঠে ছোট্ট গেট পেরিয়ে মূল স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেই মনে হলো লাল সমুদ্রের মাঝে ডিঙি নৌকা নিয়ে হাজির হয়েছি, যার মাঝে শ্রমে আর ঘামে, সমর্থকদের আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিবর্তনের ধারায় আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ফুটবলের আলো ছড়িয়ে চলেছে একটা আস্ত সবুজ দ্বীপ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত, ‘পাহাড়চূড়ায়’ কবিতায় একটি দ্বীপের বদলে প্রবহমান ছিপছিপে তন্বী নদী কিনেছিলেন। কারণ, যৌবনে তাঁর দ্বীপটিকে অনেক ছোট লাগত, আর নদী তাঁর অনেক প্রশ্নের উত্তর দিত। লাল সমুদ্রের মাঝে এই সবুজ দ্বীপটিকে দেখে তখন সত্যি মনে হচ্ছিল, সুনীলবাবু যৌবনে এখানে এসে ফুটবল জনারণ্যে মিশে গেলে হয়তো সেই ছিপছিপে তন্বী নদীর পরিবর্তে এই সবুজ দ্বীপটিই কিনতে চাইতেন। কারণ, এই দ্বীপটি ফুটবলের অনেক উত্তর দেয়, ভালোবাসার প্রতিদানে জীবনের জয়গান গাইবার মহামন্ত্রের জোগান দেয়, দুঃখকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।

default-image

এ ফুটবল ক্লাবটাকেও যেন জীবনের জলছবি মনে হয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখায়। এই তো গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ধীরে ধীরে সাফল্য পেতে শুরু করেছে। ইউনাইটেড ম্যানেজার স্যার ম্যাট বাজবি একদল তরুণকে এক ছাতার নিচে এনে সম্ভাবনার ফুল ফোটাতে শুরু করেছেন। এই দলটির গড় বয়স ২১ বছর। তাই এই শিশুসুলভ দলকে সবাই আদর করে ‘Busby Babes’ বলে ডাকে। ১৯৫৫ সাল থেকে ইউরোপিয়ান কাপের যাত্রা শুরু হয়েছে, কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেনি। ১৯৫৬-৫৭ মৌসুমে অংশ নিয়েই সেমিফাইনালে উঠে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরে বিদায় নেয়। ১৯৫৮ সালে ইউরোপিয়ান কাপের খেলায় রেড স্টার বেলগ্রেডের মাঠে ৩-৩-এ ড্র করে ঘরের মাঠে জয়ের সুবাদে পরের রাউন্ডে উঠে গেছে। ক্লাবের পক্ষ থেকে ভাড়া করা চার্টার্ড বিমানে খেলোয়াড় এবং সাপোর্ট স্টাফরা আনন্দে ঘরে ফিরবেন। কিন্তু ইউনাইটেড ফরোয়ার্ড জনি বেরি পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলাতে ৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর প্লেন ছাড়ল। চলতি পথে মিউনিখে তেল ভরার জন্য প্লেন ল্যান্ড করল। তেল ভরার পর দুবার প্লেন টেকঅফ করাতে পাইলট ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বারের মতো চেষ্টা করলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রানওয়ের শেষ প্রান্তে তুষার জমে থাকায় পাইলট প্রয়োজনীয় গতি তুলতে পারলেন না। ফলে প্লেন উড্ডয়নের আগেই দুর্ঘটনার মুখে পড়ল। এই দুর্ঘটনায় ইউনাইটেড তাদের আটজন ফুটবলশিল্পীকে হারিয়ে শোকার্ত হয়ে পড়ল। একপর্যায়ে ক্লাব বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো, কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাইভস্ম থেকে আবার ডানা মেলে ওড়া শুরু করল। শোককে শক্তিতে পরিণত করে সেই মহাদুর্যোগের ঠিক ১০ বছর পর ১৯৬৮ সালে বেনিফিকাকে হারিয়ে প্রথম ইউরোপ সেরার মুকুট নিজেদের অধিকারে নিয়ে এল! এই মিউনিখ ট্র্যাজেডি নিয়ে ইংরেজ লোকগীতির ব্যান্ড দল দ্য স্পিনার্স ‘The Flowers of Manchester’ নামে এক হৃদয়স্পর্শী গান লিখল। যে গানের কয়েকটি চরণ ছিল এ রকম:
‘One cold and bitter Thursday in Munich, Germany
Eight great football stalwarts conceded victory
Eight men will never play again who met destruction there
The flowers of English football, the flowers of Manchester
Matt Busby’s boys were flying, returning from Belgrade
This great United family, all masters of their trade
… … … … … … …
Eight men will never play again, who met destruction there
The flowers of English football, the flowers of Manchester’
তখনো খেলা শুরু হতে ঘণ্টাখানেক বাকি। বন্ধু থাইকে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে একেবারে মাঠের কাছে চলে গেলাম ছবি তুলতে। মখমলের মতো সবুজ প্রান্তরের কাছে গিয়ে খানিকটা নস্টালজিয়া এসে ভর করল। এই সেই ফুটবলের ছোট্ট সবুজ দ্বীপ, যেখানে জর্জ বেস্ট, স্যার ববি চার্লটনের মতো ফুটবলারের পদস্পর্শে এই মাঠে সুন্দর ফুটবলের ফুল ফুটেছে। ডেভিড বেকহ্যাম তাঁর বাঁকানো শটে সমর্থকদের মুগ্ধ করেছেন, ওয়েন রুনির সেই বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রমোতে সসম্মানে জায়গা করে নিয়েছে আর সবশেষে বলতে গেলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নামক এক ফুটবল মহানায়কের অমরত্বের পথে পা বাড়ানোর শুরুটা এই ওল্ড ট্রাফোর্ডের সবুজ চত্বর থেকেই হয়েছিল।

default-image

সুযোগ পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে গোলপোস্টের পেছনে চলে যাই। মূল মাঠের কিছুটা দূরত্বে এসে থামতে হয়। সেখানে ফেন্সিংয়ের ব্যবস্থা আছে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে খেলা শুরুর আগে থেকেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ব্রিটিশ পুলিশ দর্শকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের চোখে চোখ পড়তেই একটু মুচকি হেসে কুশল বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার প্রিয় ক্লাব কোনটি? পুলিশ উত্তর দিল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। পেছনে প্রিয় দল খেলছে, একটা গোল হলে হাজারো দর্শকের উল্লাসধ্বনিতে কান পাতা দায়। অথচ এর মাঝেও এই পুলিশগুলো মাঠের উল্টো দিকে ফিরে দর্শকের দিকে নজর রেখে চলেছে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এটি আসলেই মুনিঋষিদের মতো সাধনা মনে হলো।

গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে উল্টো দিকে ঘুরতেই স্যার এলেক্স ফার্গুসন স্ট্যান্ড চোখে পড়ল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের ইতিহাস লিখতে গেলে এ মানুষটি অবধারিতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হয়ে থাকবেন। ১৯৮৬ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যখন তাঁর হাতে ক্লাবের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল, তখন তিনি অতটা নামী ম্যানেজার ছিলেন না, ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ হয়তো তাঁর মাঝে কোনো স্পার্ক দেখেছিলেন; সত্যি বলতে কি, ২৭ বছর পর ২০১৩ সালে স্যার এলেক্স ফার্গুসন যখন ক্লাবের দায়িত্বভার হস্তান্তর করলেন, তখন সেই সৌম্যদর্শন তরুণটি যেন ক্লাব ফুটবলের এক ঋষিসত্তা হয়ে উঠেছেন। ২৭ বছরের ক্যারিয়ারে ইউনাইটেডকে ১ হাজার ৫০০ ম্যাচ খেলিয়েছেন, যার মধ্যে ৮৯৫টি জয় (জয়ের হার ৫৯.৭ ভাগ), ৩৩৮টি ড্র (২২.৫ ভাগ) এবং মাত্র ২৬৭টি পরাজয় (১৭.৮ ভাগ)। এ ২৭ বছরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সব মিলিয়ে ৩৮ টা ট্রফি জিতেছে, তার মাঝে ১৩টি প্রিমিয়ার লিগ টাইটেল, ৫টি এফএ কাপ এবং ২টি চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে তিনি ইউনাইটেডকে ট্রেবল জেতাতে সক্ষম হন। আসলে ওল্ড ট্রাফোর্ডে স্যার এলেক্স ফার্গুসনের প্রভাবকে নীরস পরিসংখ্যানের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা অসম্ভব। তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল, লন্ডন স্কুল অব বিজনেসের মতো বনেদি স্কুলগুলো গবেষণা করেছে, করপোরেট দুনিয়ায় সাফল্যের রেসিপি হিসেবে পেশ করেছে। এ মানুষটার হাত ধরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

স্যার এলেক্স ফার্গুসন স্ট্যান্ডের ঠিক নিচে লেখা ‘The Theater of Dreams’ কথাটির মর্মার্থ অনুধাবন করা শুরু করলাম খেলা শুরু হওয়ার মিনিট দশেক আগে থেকে। তখন গ্যালারি প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। খেলোয়াড়েরা মাঠে নামতেই করতালির বৃষ্টিতে যেন ভিজে গেল। ইউরোপা লিগের খেলা আসলে গরিবের চ্যাম্পিয়নস লিগ। তারপরও মাঠে সমর্থকদের উৎসাহের কমতি নেই, সুখে-দুঃখে এই সমর্থকেরা দলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশে থাকে বলেই খারাপ সময়কে অতিক্রম করে ক্লাব আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নতুন করে দল সাজায়, নতুন রণকৌশল নিয়ে হাজির হয় এবং ঠিকই দুঃসময়কে পেছনে ফেলে নবমুক্তির দিশা পায়।

খেলা শুরুর ২৭ মিনিটের মাথায় ফারনান্দেজ পেনাল্টি থেকে গোল করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাঠ উল্লাসে ফেটে পড়ল। আমার সিট থেকে উল্টো পাশের গোলপোস্টে গোল হওয়াতে তেমন কিছুই দেখতে পাইনি। দর্শকের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আমিও উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলাম। প্রথম গোল হওয়ার পর আর বসে থেকে খেলা দেখার উপায় নেই।

কারণ, ইউনাইটেড তখন আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করেছে। ছোট ছোট পাসে একেকটা আক্রমণ বিপক্ষের গোলবারের সামনে আছড়ে পড়ছে, গোলের সম্ভাবনা তৈরি হলে সবাই মিলে সমস্বরে চিৎকার করে বলছে, Go United Go, আবার গোল মিস করলে সবাই মিলে একসঙ্গে হতাশা প্রকাশ করছে। এই হতাশা প্রকাশের সময় সবার মিলিত কণ্ঠ থেকে অদ্ভুত এক নৈরাশ্যের শব্দব্রহ্ম তৈরি হচ্ছে, আবার পরমুহূর্তে নতুন আক্রমণের ঢেউ উঠলে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠছে। এই আশা-নিরাশার দোলাচলে দোল খেতে খেতে চকিত এক আক্রমণ থেকে ওডিওন ইগালো দ্বিতীয় গোল করল এবং ৪১ মিনিটের মাথায় ডি বক্সের বাইরে থেকে স্কট ম্যাকটোমিনের নিখুঁত ফিনিশিং ইউনাইটেডকে ৩-০ গোলে এগিয়ে দিল। এই যে ২৭ মিনিট থেকে ৪১ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়, একমুহূর্তের জন্য নিজের সিটে বসতে পারিনি। গ্যালারিজুড়ে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ একসঙ্গে গাইছে—
Glory glory Man united,
Glory glory Man united,
Glory glory Man united,
As the reds go marching on on on!
Just like the busby babes in days gone by,
We’ll keep the red flags flying high,
Your gonna see us all from far and wide,
Your gonna hear the masses sing with pride…।
এ যেন এক পরাবাস্তব জগতের জলছবি। এর মাঝে হঠাৎ দেখি নরম তুলোর মতো সাদা তুষার আকাশ থেকে আপন মর্জিতে ঝরে পড়ছে। স্টেডিয়ামজুড়ে তীব্র আলোর ঝলকানির মাঝে আকাশ থেকে নেমে আশা তুষারকণাকে তখন সাদা পরির মতো লাগছিল। যা-ই হোক, প্রথমার্ধে তিন গোলে এগিয়ে থাকায় সব দর্শকের মাঝে এক খুশির ঝলক, আনন্দের আভা।

default-image

খেলার মধ্যবিরতি শুরু হতেই দেখি গ্যালারি অতি দ্রুত ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কৌতূহল মেটাতে আমিও আসন ছেড়ে করিডরের দিকে গেলাম। করিডরে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট ছোট কফি শপের মতো জায়গার সামনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রায় সবার হাতে বিয়ারের গ্লাস। বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে টিভিতে ইউনাইটেডের গোলগুলো দেখছেন আবার নতুন করে উল্লাসে মেতে উঠছেন। পাশের বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গোলের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে আলোচনা করছেন। আসলে ফুটবল যে এঁদের মননে কতটা গেঁথে আছে, সেটি এঁদের খুব কাছে থেকে না দেখলে অনুভব করা মুশকিল। এনফিল্ড এবং ওল্ড ট্রাফোর্ডে খেলা দেখার সময় একটি বিষয় আমার কাছে অবাক লেগেছে, সেটি হলো মাঠে কোনো বড় পর্দার উপস্থিতি নেই। করিডরে দর্শকদের গোলের হাইলাইটস দেখার সময় মনে হচ্ছিল, মাঠে বড় পর্দা না থেকেই বরং ভালো হয়েছে, মনের মাঝে খেলা শেষ হওয়ার পরও একটা রেশ থেকে যায়, নতুন করে খেলার চুম্বক অংশ দেখার জন্য একটা গভীর আকুতি কাজ করে। এই যে আকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রাখা, এটা মাঠে বড় পর্দা থাকলে ওখানেই সেই আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যেত। আরেকটি বিষয় হলো, মাঠে বড় পর্দা না থাকাতে দর্শকেরা অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে খেলাটা উপভোগ করেন, খেলার উত্তেজনার সঙ্গে মিশে যেতে পারেন।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় ম্যান ইউয়ের আক্রমণ এবার আমাদের গোলপোস্টের দিকে। ফলে এবার খুব কাছে থেকে গোল দেখা যাবে বলে মনে মনে ম্যান ইউয়ের পক্ষে আরও গোল প্রত্যাশা করলাম। ব্রাজিল-অন্তঃপ্রাণ ফুটবল সমর্থক হওয়াতে ইচ্ছাপূরণের ভার যেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ফ্রেড তাঁর নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এ মানুষটি অনেক দিন ধরে অফ ফর্মে ছিলেন, কিন্তু এদিন শেষের ৮২ মিনিটে এবং যোগ করা সময়ে ৯৩ মিনিটে দুটো গোল করে নিজের ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত দিলেন। বিশেষ করে শেষের গোলটি ছিল দেখার মতো। ডি বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের তীব্র বাঁকানো শট গোলকিপারের আটকানোর সুযোগ ছিল না। শেষ মুহূর্তে ম্যান ইউ গোল করাতে সমর্থকেরা বেজায় খুশি। স্যার এলেক্স ফার্গুসন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর ম্যান ইউ আগের মতো সাফল্য পায় না, তারপরও দলকে ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। দলের ভালো সময়, খারাপ সময়ে এই সমর্থকেরাই দলকে আগলে রাখেন বলেই এই ফুটবল ক্লাবগুলো জীবনদর্শনের সঙ্গে মিশে যায়।

আমার পাশের সিটে বছর দশেকের এক ছেলেকে দেখলাম। ও ওর বাবার হাত ধরে মাঠে খেলা দেখতে এসেছে। দলের প্রতিটা মুভমেন্টের সঙ্গে ওর উচ্ছ্বাসের প্রকাশভঙ্গি দেখে বুঝতে পারি, ইউনাইটেডের পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে মেলবন্ধন খুব অটুটভাবে গড়ে উঠছে। ছেলেটির হাসিমুখের ছবি দেখে অনুভব করতে পারছিলাম স্যার এলেক্স ফার্গুসন স্ট্যান্ডের নিচে লেখা সেই ছোট্ট অথচ অতি শক্তিশালী কথাটির পরিপূর্ণ মাহাত্ম্য। আসলেই এটি ‘The Theater of Dreams’!
*লেখক: সুব্রত মল্লিক, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন