বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হলফ করে বলতে পারি, কেউ করিমের সঙ্গে এক দিন পুরো সময় কাটালে তাকে এমন হাসি হাসতে হবে যে তার আয়ু কমপক্ষে ১০ বছর বেড়ে যাবে।
যেমন ধরুন, দিনটা শুরু হয়েছে কফিশপ থেকে। করিম ও আমি নাশতা খেতে গিয়েছি বাসার কাছের কোনো একটা কফিশপে। সে ঢুকেই রোমানিয়ান ওয়েট্রেসকে আলিঙ্গন করে বলবে: ‘গুড মর্নিং সিমোনা! টু ব্রেকফাস্ট কর্নার টেবিল, কুইকলি। ব্যাংক অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আফটার ওয়ার্ক, টেসকো শপিং, বিজি লাইফ, ইন ইট!’
সিমোনার সঙ্গে করিমের সখ্য দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ও যে এই কফিশপের নিয়মিত ক্রেতা। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, সিমোনা আমাদের জন্য নাশতা বানাচ্ছে, আর করিমের সঙ্গে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছে। কথাবার্তায় আমার দোস্ত বিন্দুমাত্রও কোথাও আটকাচ্ছে না। যেন ইংরেজিটা তার মাতৃভাষা।
নাশতা দেওয়া হলো। টোস্টে কামড় দিতে দিতে করিম সিমোনাকে বলে, ‘ইউ নো! গুড নিউজ! বেবি কামিং!’

আমি বোঝার আগেই দেখি সিমোনা বুঝে গেল। সে পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়েন?’
করিমের উত্তর: ‘মাই ওয়াইফ সিক্স মানথ প্যাগনেট। অ্যানাদার থ্রি মানস, ইন ইট!’
‘প্রেগন্যান্ট’কে ‘প্যাগনেট’ বলে সে ঠিকই চালিয়ে দিল। এই ‘ইন ইট’টা সে দারুণভাবে রপ্ত করেছে। হুবহু লন্ডনের হ্যাকনি এলাকার পোলাপানের মতো। কথার আগে–পিছে–মাঝখানে শুধু ‘ইন ইট’।
যাহোক, সিমোনা আর করিমের কথাবার্তা থেকে যা উদ্ধার করতে পারলাম, তার অর্থ হলো, ওর স্ত্রী গর্ভবতী, ছয় মাস চলছে, আরও তিন মাস পর তারা সন্তান আশা করছে। এই কথাগুলো সে যেভাবে অনায়াসে কোনো ব্যাকরণের নিয়মকানুন না মেনে বলে গেল, তা সত্যিই উপভোগ্য।

default-image

নাশতা শেষ করে ব্যাংকে আমরা। আমি সঙ্গে দাঁড়ানো। এ দেশে নতুন এসেছি, নিয়মকানুনের তেমন কিছুই জানি না। ও বেশ আগে থেকেই থাকে। সে কারণে জানেও অনেক। ও–ই আমাকে নিয়ে গেল বার্কলেইস ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য। লোকজন নাকি ওর পরিচিত। যাওয়ার আগে আমাকে বলে, গেলে দেখবি কেমন ভালো ব্যবহার করে আমার সঙ্গে।
কথা সত্য। আসলেই সবাই ওকে খুব পছন্দ করে, দেখলাম। আমাদের একটা কক্ষে ডাকা হলো। ঢুকেই সে কর্মকর্তাকে বলছে, ‘ইউ নো মি, সারওয়ার। মাই ভেরি গুড ফ্রেন্ড। কামিং ফ্রান্স, ওয়াইফ অ্যান্ড আ ডটার। পসিবল ওপেনিং নিড অ্যাকাউন্ট? আর্জেন্ট!’

কর্মকর্তা দক্ষিণ এশীয়। পরে জেনেছি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। সব কাগজপত্র নিয়ে তিনি আমাকে হিসাব খুলে দিলেন।
ব্যাংক থেকে বের হয়ে গেলাম ওর কাজের জায়গায়। একটা লেবানিজ রেস্তোরাঁ। করিম প্রধান শেফ। সবাই দেখি ওর জন্য জানপ্রাণ। বিশাল রান্নাঘরে নারী–পুরুষ মিলিয়ে সাত থেকে আটজন। অধিকাংশই পূর্ব ইউরোপের। সবাই ওর বন্ধুর মতো। রান্নাঘরে ঢুকেই সে সবার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল এভাবে—‘লিসেন গায়েজ, হি ইজ মাই গুড ফ্রেন্ড। নেইম সারওয়ার। কামিং ফ্রান্স। ইউ নো গুড জার্নালিস্ট, লিভিং বার্কিং নাউ।’ সবাই এসে আমার সঙ্গে করমর্দন করল।
পরিচয় পর্ব শেষ। রান্নাঘরের নিয়মিত কাজ শুরু। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে শেফের নির্দেশনার অপেক্ষায়। বেশ অনুগত বাহিনী। করিম প্র্যতেকের নাম ধরে ধরে নির্দেশনা দিচ্ছে কে কী প্রস্তুতি নেবে আজকের জন্য।
শুরু হলো আন্দ্রিয়া নামের একজনকে দিয়ে। সম্ভবত অন্যদের তুলনায় বেশি অভিজ্ঞ। আন্দ্রিয়াকে উদ্দেশ করে করিম বলছে, ‘লিসেন আন্দ্রিয়া, ইয়েসটারডে ঠু মাস কমপ্লেইন। বিগ বস নো হ্যাপি। কল মি লাস্ট নাইট। সেইড, বিফ স্টেইক নট কুক ইনসাইড। টু ডে প্লিজ ইউ ভেরি কেয়ারফুল, ওকে মাই ফ্রেন্ড!’
আন্দ্রিয়া ঘাড় নাড়িয়ে ইয়েস বলে সায় দিল।

আন্দ্রিয়ার পর নিকোলা। সহকারী পর্যায়ের মনে হলো। খুব সম্ভবত বেশি দিন হয়নি। ওর কাছে গিয়ে করিম বলল, ‘ইউ ভেরি স্লো, নিকোলা। ইয়েসটারডে ফাইভ টাইম আসকিং ফর গ্রেভি। নট রেডি। ইউ নো, কাস্টমার কামিং টুয়েলভ ও ক্লক, ইন ইট? হোয়াই নট গ্রেভি রেডি?’
বোঝা গেল নিকোলা লজ্জিত তার বিলম্বের জন্য। আজ যথাসময়ে গ্রেভি সরবরাহ করবে বলে সে নিশ্চিত করল। প্রত্যুত্তরে ওর কাছে গিয়ে করিম জামার হাতাটা গুটিয়ে বিশাল ছুরিটা হাতে নিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে দেখাল, ‘লুক নিকোলা, কাট অনিয়ন, কাট ক্যারট দেন মিক্স ওয়াটার অ্যান্ড স্পাইসেস, দ্যাটস ইট! হোয়াই ইউ টেইক ঠু মাচ টাইম নো আইডিয়া। ম্যাক্সিমাম, ম্যাক্সিমাম থার্টি মিনিটস! ইন ইট!’
নিকোলা ও অন্যরা মাথা নাড়াল।
শেফের নির্দেশনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। এরই মধ্যে ‘বিগ বস’ এসে ঢুকলেন। গতকালকের বিফ স্টেক নিয়ে খুব রাগ মনে হলো। কিন্তু লক্ষ করলাম, করিম ভদ্রলোককে সেভাবে কোনো কথাই বলতে দিল না। ভদ্রলোক ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুড মর্নিং জানিয়ে বলল, ‘আই অলরেডি এক্সপ্লেইন এভরিবডি। বিফ স্টেক নট কুক ইনসাইড, কাস্টমার কমপ্লেইন! টু ডে নো মার্সি, এভরিবডি ভেরি অ্যাটেনশান!’
সে একরকম বিগ বসকে রান্নাঘর থেকে কৌশলে বের করে দিল। বুঝতে পারলাম সে রান্নাঘরটাকে পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
সেদিন মধ্যাহ্নভোজের পুরোটা সময় রান্নাঘরে ওদের কাজ দেখলাম। সার্ভিস শেষ হলে বিগ বস এসে সবাইকে ধন্যবাদ দিলেন। জানালেন আজকের কাস্টমাররা খেয়ে অনেক খুশি। খুব ভালো সার্ভিস হয়েছে।

কাজ শেষ করে বের হওয়ার সময় একটা মেনু হাতে নিয়ে দেখলাম এটা যেনতেন রেস্টুরেন্ট নয়। মিশেলিন স্টার পাওয়া রেস্টুরেন্ট। সেলিব্রিটিরা খেতে আসে। ধারণা করতে অসুবিধা হলো না, এ রকম একটা রেস্টুরেন্টে হেড শেফ হতে গেলে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। তার মানে, করিম হাতের কাজে এতটাই দক্ষ, আর রান্নাঘর ব্যবস্থাপনায় এতটাই পারদর্শী যে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা তার সাফল্যে কোনো বাধাই হতে পারেনি। করিমের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। আসলেই মানুষের আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় থাকলে কি না হয়। ভাষা তো যোগাযোগের একটা বাহনমাত্র।
লেখক: লন্ডনপ্রবাসী কবি

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন