>করোনাভাইরাসে পাল্টে গেছে জীবনের বাস্তবতা। আক্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। করোনায় জীবন নিয়ে লিখছেন অনেকেই। এই চিকিৎসকও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সিরিজ লিখছেন। আজ পড়ুন চতুর্থ পর্ব।
default-image

কাল দেরি করে ঘুমিয়েছি। ঘুম ভাঙতেই ব্যথা টের পাচ্ছি। বুঝতে পারছি বেলা হয়ে গেছে। মেয়ে দেখি কাশছে। এসে জিজ্ঞাস করছে কিছু লাগবে কি না? আপাতত কিছু লাগবে না, ফ্রেশ হয়ে নিচে নামব।

বললাম মাস্ক পরে থাকতে।

নিচে নামতেই বাবাকে জিজ্ঞাস করলাম কী অবস্থা? না, তার আর জ্বর নেই। আলহামদুলিল্লাহ! বললাম দুজনকেই টেস্ট করে আসতে। গত সপ্তাহে দুজনই নেগেটিভ ছিল। আর বাইরে দৌড়াদৌড়ি করতে না করলাম, সঙ্গে ঠিকমতো খাবার খেতে। কাজে ব্যস্ত সে আজ, দেখি সময় পায় কি না। কাজের চাপে সে নিজের নাওয়া–খাওয়া ভুলে যায়, মনে করিয়ে দিতে হয়। এখন তার ওপর আমাদের খেয়াল সে রাখতে পারবে না, জানা কথা। আমার সংসারে আমাকেই সবার খেয়াল রাখতে হয়, যদিও আমাকেই সবাই ছেলেমানুষ ভাবে।

নিজের ওষুধ নিয়ে পোর্চে বসে দেখি দূরে হরিণের পাল দেখা যায়। একটু পর হামিংবার্ড বাগানে এল। আমি পেছনের বাগানে একটু হাঁটতে গেলাম। যে রোদ্দুর! ফিরে এলাম মিনিট দুয়েকেই।

গাছের আঙুর পাকছে, তুলতে হবে। তুলব কি না, দোটানায় আছি।

পোর্চে বসে আবার হরিণ দেখছি। এলোমেলো ভাবনায় মনে হলো, আমি আমার জীবনটাকে উপভোগ করার সময়ই পেলাম না। এ যে সুন্দর সকাল, কাজের চাপে সময় হয় না দেখার। আবার যখন কাজ করিনি, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম, দরজা খুলে দিন দেখার সময় হয়নি। আবার তারও আগে, ভালো রেজাল্ট হলে, যেসব বন্ধুর খারাপ হয়েছে, তাদের মন খারাপ হবে বলে নিজের অর্জন কখনো সেলিব্রেট করতে পারিনি বা করিনি। মনে হলো, আসলে করা উচিত ছিল। অন্যের জন্য সারা জীবন ভালোমানুষের মতো সেক্রিফাইস করার মানে নেই। কেউ আমার জন্য সেক্রিফাইস করেনি। তবে সান্ত্বনা, তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?

সে যা–ই হোক, ছেলেকে ২৪ ঘণ্টা পর দেখলাম। ও আপাতত ঠিক আছে। মেয়ে প্রথমে বলে ভালো আছে। একটু পরে এসে বলে, ‘মামি আমি কাশছি।’ ওষুধ খেয়ে নিতে বললাম। কলিগকে বললাম আমার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ফার্মাসিতে পাঠাতে।

মা–বাবা, ভাই, আত্মীয়েরা সারাক্ষণ টেনশনে! অনেক সময়ই ঘুমে থাকায় সবার ফোন ধরার সময় পাই না। বাবা–মায়ের টেনশন সব কেন ফেসবুকে বলি, সবাই তো সবার ভালো চায় না। বন্ধুবান্ধবেরা সবকিছু হালকা রসিকতায় না নিতে বলে সিরিয়াস হতে বলে। এত সিরিয়াস হয়ে কী করব? সিরিয়াস হলেই যে সবকিছুর পজিটিভ রেজাল্ট পাওয়া যায়, তা–ও তো নয়। জীবন চলে জীবনের নিয়মে।

ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে পারছি। ঘুম ভাঙলেই ব্যথায় কমফোর্টেবল পজিশন পাচ্ছি না, ওষুধ কাজ শুরু না করা পর্যন্ত।

মেয়ে ছবি পাঠায় গাছের ফলের, না তুললে গাছেই নষ্ট হবে। তুললে ঘরে নষ্ট হবে। কাউকে পাঠাতেও পারব না। লাউগাছের পাতা ফাইনালি খাবারযোগ্য, কিন্তু তোলার কেউ নেই। আমি শুধু পাতার জন্যই গাছ লাগাই, লাউ তো কিনতেই পাওয়া যায়!

সাধারণ জ্বর, ঠান্ডার ওষুধ চলছে। এতেই কয়েক ঘণ্টার জন্য ভালো লাগে ব্যথামুক্তভাবে হেঁটে বেড়াতে পারি আর বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি, ছেলেমেয়েদের বকতে পারি—মনে হয় কোনো সমস্যা নেই। স্বাদ–গন্ধের সমস্যা নেই। চলবে...


*চিকিৎসক

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন