মনে করেন, পাড়ার কোনো দুষ্টু ছেলে (জুয়েল) একদিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আপনার জানালার কাচ ভেঙে ফেলল। আপনি নিশ্চয় খুব রাগ করবেন। কিন্তু ওদিকে কাচের দোকানদার, কর্মচারী কিন্তু খুশি হবে। সেই দোকানদারের একমাত্র ছেলে আবার একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এখন জুয়েল যদি কাচ না ভাঙত, আপনি সেটা ঠিকও করতেন না, ওদিকে কাচওয়ালার সংসারও চলত না। এমনকি হতেও পারে সেই কাচ-দোকানির ছেলেটি একদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের খুব জাঁদরেল গভর্নর অথবা দেশের অর্থমন্ত্রী হয়ে গেলেন। ভাঙা থেকে যদি ভালো কিছু হয়, তা হলে তো ভাঙাই ভালো।

স্বল্প মেয়াদে কিছু সম্পদ নষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটার ভালো কিছু প্রভাব প্রখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন কেইনস প্রমাণ করে দেখিয়েছেন (প্যারাডক্স অব থ্রিফট)। জন মেনার্ড কেইনস এমনই বড়মাপের অর্থনীতিবিদ ছিলেন, পরে তাঁর নামানুসারে কেইনিশিয়ান অর্থনীতি নামে একটা ধারা আজও প্রচলিত। তাঁর কথা তো আর ফেলে দেওয়া যায় না।

যেমন ধরুন, একটি দেশের অর্থনীতি যখন খুব ভঙ্গুর, কর্মচাঞ্চল্য নেই, বেকারের সংখ্যা বেশি, মানুষের আত্মবিশ্বাস খুব কম, কেউ ভবিষ্যতের ভয়ে টাকা খরচ করতে চাইছে না, মানুষ ব্যাংকেও জমা রাখতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ব্যাংকগুলো আস্তে আস্তে জামানত হারাচ্ছে। এ অবস্থায় জুয়েলকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া যেতেই পারে। তার ভাঙার কারণে কাচ ইম্পোর্টার কাচ আমদানি করবে, সরকার রাজস্ব পাবে, সেই রাজস্ব দিয়ে ট্যাক্স অফিসারের বেতন হবে, কাচ দোকানি, কর্মচারী কাজ পাবে, যে রিকশায় চড়ে কর্মচারী কাজ করতে আসবে, তারও একটা আয় হবে, তারা আবার সেটা খরচ করবে, সেটা দিয়ে আরেকজনের (সবজিওয়ালা, মুদিওয়ালা) সংসার চলবে, এমন করে করে অর্থনীতিতে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসবে। ঠিক যেমন টাকায় টাকা আনে, কাজে আনে কাজ।

ভাঙাগড়ার খেলা শুধু পাড়ায় কিংবা দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ যেহেতু কাচ বানায় না (খুব কম), তাই চায়নিজ গ্লাস ফ্যাক্টরিও কিছু করে খেতে পারবে। আবার আমেরিকা তার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ইরাক, আফগানিস্তান, ইরান-সৌদি যুদ্ধ লাগিয়ে দিল। সেই যুদ্ধের জন্য দেশে বসে থাকা কিছু সেনাকে কাজে লাগানো গেল, বেকারত্বের হার কমল, নতুন নতুন অস্ত্র আবিষ্কৃত হলো, যেগুলো পরে বিক্রি করা যাবে। ইরাক, ভেনেজুয়েলা থেকে কম দামে তেল আনা গেল আবার সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি করে বেশ ভালো আয়ও হলো। বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ বেশ ভালো ভূমিকা পালন করেছিল। আবার জাপানও কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৫৫-১৯৭২) সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সাফল্য পায়। যুদ্ধের আগে জাপানের শিল্পোৎপাদন ছিল ২৭ শতাংশ কম আর যুদ্ধের পরপর (১৯৬০ সালে) সেটা বেড়ে হলো ৩৫০ শতাংশ। আবার দেখা গেল, পশ্চিম জার্মানিও শীতল যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল। তার মানে দেখা গেল, সব ভাঙা বা ধ্বংসই খারাপ নয়, কিছু কিছু ভাঙা থেকে অর্থনীতিও চলে। তাইলে কি আজ থেকে আমরা সবাই ভাঙাভাঙি শুরু করে দেব?

default-image

ধরেন, যদি জুয়েল আপনার জানালাটা না ভাঙত, তাহলে হয়তো আপনি সেই টাকা দিয়ে একটা জুতা কিনতে পারতেন অথবা পরিবারকে নিয়ে ফুচকা খেতে পারতেন। তখনো কিন্তু এমন কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতো। আবার কাচ ভাঙার কারণে যে সম্পদ নষ্ট হলো, সেটাও হতো না। আবার আপনার টাকা এবং এ সময় আপনি কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করতে পারতেন, যেটা দিয়ে দেশ এবং সমাজ আরও বেশি লাভবান হতো। আবার ভাঙা গ্লাস জোড়া লাগানো মানে নতুন কিছু করা না, আগে যা ছিল, সেই অবস্থানে নিয়ে আসা। কাচ ভাঙার কারণে আপনার মনমেজাজও ঠিক থাকবে না। হয়তো গ্লাস ঠিক করতে লাগবে ১০০ টাকা, কিন্তু আপনি গ্লাস ক্রয় করা, সময় অপচয়, কর্মচারী খোঁজা—এসব ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য ১৫০ টাকা জুয়েলকে দিয়ে বললেন, বাবা, তোমার এখানে খেলারও দরকার নেই, গ্লাস ভাঙারও দরকার নেই। তাহলে তো সূত্র অনুসারে না ভাঙলেই অর্থনীতি বেশি লাভবান হতো। তাহলে কি আমরা ভাঙব নাকি গড়ব, ব্যক্তিক ব্যয়, প্রান্তিক ব্যয় বাড়াব, নাকি বাড়াব না?

অনেক অর্থনীতিবিদ ভোগের নীতিতে বিশ্বাসী (যেমন প্রখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক বস্টিয়াট) আবার অনেকে সঞ্চয়ের। কিন্তু অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যয় আর সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তির প্রতিফলন ঘটাতে। ব্যয়সংকোচন নীতি দিয়ে যেমন আমরা অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারি না, আবার অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে সম্পদও ধ্বংস করতে পারি না। শুনতে অবাক লাগলেও জিডিপির ৬৩ শতাংশ কিন্তু ভোগ ব্যয়। তাই এই যে ৮ শতাংশ, ৯ শতাংশ জিডিপির কথা শোনেন আর মানেন, সেটা অর্জন করতে গেলেও কিন্তু আমাকে আপনাকে ভোগের ব্যয় বাড়াতেই হবে। আবার ওই দিকে হারোড-ডোমার নীতি (harod-domar model) বলে সঞ্চয় বাড়ালে বিনিয়োগ বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়লে বেশি বেশি ক্যাপিটাল স্টক বাড়বে, সেটা হলে অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। অর্থনীতি আসলেই একটা ফ্যালাসি। এমন একটি ফ্যালাসি হলো ‘Broken Window Fallacy।’

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমরা বাংলাদেশিদের ভোগের ব্যয় আরেকটু বাড়ানো উচিত। এমনিতে সরকারের বেশি মুনাফায় সঞ্চয়ের (উন্নত দেশে ২ থেকে ৩ শতাংশ আমাদের দেশে ৬ থেকে ১২ শতাংশ) লোভে মানুষ খুব একটা বেশি ব্যয় না করে বরং অতি সঞ্চয় করে। গত কয়েক বছরে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ দেখলে সেটা পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের সরকারি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এত ভালো মানের না হওয়ায় অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য খুব নেই। আবার ওদিকে ব্যাংকগুলোর কাছেও নাকি তারল্যসংকট। কেমন যেন একটা স্থবির ভাব সব জায়গায়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে করোনার আবির্ভাব।

একটু সহজভাবে ঢাকার কথা চিন্তা করুন। কেন এত মানুষ ঢাকা আসে? গ্রাম থেকে ঢাকা এলেই কিছু একটা হয়ে যাওয়ার আশায়। এর একটা কারণ হলো ঢাকাবাসী ব্যয় বেশি করে, আর এখন একটি শ্রেণি আজ ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ ওই অতিরিক্ত ব্যয় কমে গেছে। উচ্চবিত্তের কিছুটা লাক্সারি জীবনযাপনই নিম্নবিত্তের জীবন–জীবিকা। আবার করোনাকালীন অনেক দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এমনকি অনেক সরকার তো তাদের নাগরিকদের টাকা দিচ্ছে খরচ করার জন্য।

default-image

তাই আমার ধারণা, অনলাইন অথবা অফলাইন, ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ড, নিজের জন্য পর্যাপ্ত রেখে কিছুটা খরচের হাত প্রসারিত করুন, একটি নির্দিষ্ট সময় এবং পরিমাণ পর্যন্ত সঞ্চয় করুন এবং সেই সঞ্চয় বিনিয়োগ করুন। অতিরিক্ত সঞ্চয় করে কোনো লাভ নেই, যদি সেটা অর্থনীতিতে কাজে না লাগে। যখন পুরো দেশের অর্থনীতি খারাপ হবে, আপনার এত কষ্টের জীবনের সঞ্চয়ের টাকার মূল্য কমে যাবে (ইনফ্লেশনের কারণে), তখন আমও যাবে সঙ্গে ছালা। কেউ কেউ আবার মনে করতে পারেন, এই যে সরকার এত এত টাকা খরচ করে প্রজেক্ট করছে, কিংবা ঠিকাদার এক টাকার রাস্তা ১০ টাকায় করে দিচ্ছে, সাহেদ সাহেব রাত–দিন এই–সেই করে টাকা ওড়াচ্ছে, তাতে কি দেশের উন্নতি হচ্ছে? সেখানেই আসলে বিবেক, যুক্তি আর তর্কের খেলা। তার চেয়ে আয়, ব্যয় আর সঞ্চয়ের যুক্তির অঙ্ক কষে মুক্তির হিসাব মেলানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কয়জন আর কয়টা দেশের সরকারই বা পারে সে হিসাব মেলাতে?

*লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব ফাইনান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, চীন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন