করোনায় সৌদিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যেমন আছেন

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রবাসের শিক্ষাজীবন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকতে হয় নিজেদের। পড়াশোনার এই চৌহদ্দি পেরিয়ে অন্য কিছু করার সুযোগ আর থাকে না। চলমান সেমিস্টারের শুরুটা ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ যেন সব থমকে গেল। শোরগোলের এ জগৎটা আজ যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস আজ বিশ্বের লাগাম টেনে ধরেছে। বিশ্বব্যবস্থা যেন আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশ থেকে দেশ বয়ে একে একে আঘাত হেনেছে নানা প্রান্তে।

বাদ যায়নি পুণ্যভূমির দেশ সৌদি আরবও। গত ২ মার্চ দেশটির তেল উৎপাদনকারী প্রদেশ কাতিফে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। তারপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত সিদ্ধান্তে ৬ মার্চ বন্ধ করে দেওয়া হয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত লকডাউন চলছে। গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব জনসমাগম এড়াতে নানা আদেশ জারি করেছে সৌদি প্রশাসন। দিন যত যাচ্ছে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ততই বাড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ৩৫১ জন, মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের।

default-image

সৌদি প্রশাসন সতর্কতামূলক নানা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটিই রাখছে না।

ক্যাম্পাস বন্ধ। তবে অনলাইনে ক্লাস, মধ্য সেমিস্টার পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সব রীতি চালু আছে। করোনাকালে এই অবসরটা যেহেতু হুট করে পাওয়া এবং যেহেতু কার্যত আমরা একপ্রকার গৃহবন্দী, তাই একাডেমিক পড়াশোনাটা আপাতত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। সত্যি বলতে কি, অনলাইনের ক্লাসে সে রকম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। ক্লাসরুমে শিক্ষক এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন, যাতে একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারেন। কারণ, একে অন্যের কাছ থেকে শেখার প্রবণতাটি অনলাইনের ক্লাসে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।

মক্কার উম্মুল–কুরা ইউনিভার্সিটির আবাসিক ছাত্রাবাস প্রতিনিধি ঈসা আমিনী বলেন, ‘করোনা থেকে নিজেদের সুরক্ষায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের আবাসিক হল থেকে স্থানান্তর করে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে পাঠিয়েছে। একেবারে কোয়ারেন্টিনে। কর্তৃপক্ষ নিয়মিত আমাদের খোঁজ রাখছে। আর আমরা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চলছি। পাশাপাশি নিজেদের ব্যক্তিগত পড়াশোনা ও অনলাইন ক্লাসে যুক্ত রাখছি।’

default-image

জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আনোয়ার শাহাদাত জানান, ক্লাস বন্ধের এই সময়গুলোয় কিছুটা খারাপ লাগা কাজ করছে ঠিকই, তবে সময় একেবারে অবসরে কাটানোর সুযোগ নেই। স্ক্রিন মাধ্যমে ক্লাস অব্যাহত আছে। তা ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির বন্ধনীতেই নিজেকে আবদ্ধ রাখছেন। এই হলো অবস্থা।

ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সিফাতুল্লাহ নিজেদের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘এ সময়গুলোতে একেবারে বোর হয়ে গেছি। ক্যাম্পাস প্রশাসনের নির্দেশনাগুলোকে গুরুত্বের সাথেই দেখছি আমরা। অতিরিক্ত সতর্কতা বিবেচনা করে লন্ডন সরকার তার দেশের শিক্ষার্থীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। অন্য দেশগুলো এমনটি চাইলে কর্তৃপক্ষের কোনো মানা নেই।’

অপর শিক্ষার্থী ইবরাহীম খলীল বলেন, ‘নিয়মিত আমাদের ক্যাম্পাস এরিয়ায় অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়ির টহল অব্যাহত আছে। ক্যানটিন থেকে পার্সেল খাবার সংগ্রহ এবং ক্যাম্পাসের ভেতরের গ্রোসারিতে অতীব প্রয়োজনীয় কিছু কেনার থাকলে নিয়ে দ্রুতই হলে ফিরে আসি।’

default-image

রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ বিন বলেন, ‘ক্যানটিনে আসা–যাওয়ার পথটুকুতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। ক্যানটিনে ঢুকতেই কপালে থার্মোমিটার ধরে নিয়মিত তাপমাত্রা দেখছে আমাদের।’ সউদ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সাঈদ হোসাইনের কাছে বর্তমানে আবদ্ধের এ পরিস্থিতি জানতে চাইলে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি খুবই আন্তরিক।’

সত্যি বলতে কি, আমরা আমাদের সুরক্ষার বিষয়ে যতটা না ভাবছি, তার চেয়ে বেশি ভাবি নিজ দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা। দেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি। মানবতা সুস্থ হোক। সব পঙ্কিলতা দূর করে পৃথিবী আবার ফিরে পাক তার স্বভাব-সভ্যতা।

*লেখক: শিক্ষার্থী, উম্মুল-কুরা ইউনিভার্সিটি, মক্কা মুকাররমা

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন