করোনা-উত্তর চ্যালেঞ্জ: দুর্নীতির ওপর বসাতে হবে কর

বিজ্ঞাপন
default-image

কঠিন সময় অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে। বিষণ্ন কঠিন সময়। এই কঠিন সময় আমাদের কি করোনোই হতে পারে? আসছি এ প্রসঙ্গে একটু পরে।

পোশাক রপ্তানিতে ভাটা পড়ে গেছে ইতিমধ্যে। করোনা উত্তর অর্থনৈতিক বাজারের ক্রিয়াকর্মে শিথিলতা স্পষ্টই প্রতীয়মান। সামনে আছে একটির পর একটি এবড়োখেবড়ো রাস্তা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন বহির্বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিল রীতিমতো, যখন উন্নত বিশ্ব আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে তাদের হাত সম্প্রসারিত করতে মাত্র উৎসাহিত হচ্ছিল, যখন দেখলাম বিশ্বের সেরা নিউজপেপারগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে প্রশংসায় পঞ্চমুখ, যখন এই বাংলা রমণী ধীরে ধীরে আপন রূপে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছিল, যখন সিরাজউদ্দৌলার বাংলা আবার গর্জে উঠেছিল, যখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ ৮.৩ শতাংশ জিডিপিতে পৌঁছে গিয়েছিল, তখনই সব প্রত্যাশায় কালো মেঘের সাজ নিয়ে দেখা দিল করোনাভাইরাসের করাল গ্রাস। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাবাস নিয়ে এল অনাকাঙ্ক্ষিত সব অপ্রত্যাশা। এখন ভালো নেই সময়, ভালো নেই আমরা। এখন ঘটছে অঘটন একটির পর একটি। অন্যদিকে এ দুঃসময়ে (কিছু) মানুষ হিংস্র হয়ে উঠছে বন্য পশুর মতো। এখন এমনই কঠিন সময় যে যারা সেবামূলক পেশা গ্রহণ করেছিল জীবনে, যারা প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল মানুষের সেবায়, তারাই হিংস্র জানোয়ার হয়ে যাচ্ছে টাকার জন্য। দুঃসংবাদ শেষ হওয়ার নয়; দুঃস্বপ্নের পর দুঃস্বপ্ন। এ যেন বেদনার বালুচরে নিশিদিন খেলা করে বিষাদের যাতনা বিরহের জলাশয়ে স্রোতের শেওলা। এখন আমাদের প্রভাতের আকাশ ঢাকা আছে এত এত কালো মেঘে।

বলা বাহুল্য, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহায়তায় দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করে আসছিল কয়েক বছর ধরে। বলতে পারি সাম্প্রতিক সময়ের আগ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য ছিল। জিডিপিতে অবিচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধির দ্বারা অগ্রগতি ছিল, যা গত কয়েক বছরে বেড়ে গিয়ে গড়ে ৮.৩ শতাংশ (সরকারি অনুযায়ী)। স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিবহন এবং নগরায়ণের চাহিদা বৃদ্ধি করে আসছিল। কিন্তু সব ধরনের পূর্বাভাষ এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতায় খড়গ হয়ে দাঁড়াল করোনা নামক অদৃশ্য শত্রু।

default-image

বিশ্বব্যাংক প্রেডিক্ট করেছে করোনাভাইরাসটির আক্রমণে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তথা দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর ৪০ বছরে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থার মুখোমুখি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার উন্নয়নে এ ভাইরাসের আক্রমণ বিরূপ প্রভাবের নিখুঁত ঝড়ের স্পষ্ট ছাপ ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলেছে, সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে করোনার করাল গ্রাসে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের থাবায় বন্ধপ্রায় জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মান। মহামারির করাল গ্রাসে প্রায় চার মাস কাটতে চললেও আতঙ্ক কাটছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো করোনায় প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নগর, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বন্দর, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশ এবং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মান। ইতিমধ্যে উন্নত দেশগুলোয় পোশাকের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে, ফলে রপ্তানিশিল্পে নেমেছে ধস এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ এবং বিনিয়োগপ্রবণতা মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেডিকশন, পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর কোটি কোটি লোক এই লকডাউনের কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তাঁরা আর্থিকভাবে নিদারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন।

সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে তীব্র অবকাঠামোগত বাধা, যানজট এবং পরিবেশদূষণ দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যে সর্বস্তরে। প্রশাসনে বিকেন্দ্রীকরণ এখন শুধু সময়ের দাবি। প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সম্ভব। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার উচ্চাভিলাষ অর্জনের জন্য সরকারকে অবিলম্বে সুরক্ষিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন, মানবপুঁজিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের মাধ্যমে উত্পাদনশীলতা বাড়াতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসায়ের নতুন উত্পাদনশীল খাতগুলোকে মানসম্পন্ন, স্বল্প আয়ের স্মল বিজনেসে উৎসাহ এবং কর্মসংস্থান বিকাশ করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নীতিনির্ধারণ এবং উন্নয়নের অনুশীলনকারীদের পক্ষে বাংলাদেশ যেমন অনুপ্রেরণা, তেমনই চ্যালেঞ্জ। আয় বৃদ্ধি, মানব বিকাশ এবং চিহ্নিত করে দুর্বলতা হ্রাসের প্রচেষ্টা অসাধারণ হলেও, বাংলাদেশ প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। আমরা এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছি। এই মুহূর্তে সঠিক নীতিমালা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিতে পারলে আমরা নিম্ন আয়ের বন্ধনীর মধ্যে চলে যাব নিশ্চিত।

default-image

বিশ্বব্যাংক চাকরির ক্ষেত্র বাড়ানো, নারীদের চাকরি ক্ষেত্রে এগিয়ে আসার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। উভয়টি দেশের শীর্ষ উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্ব এবং চাকরিগুলোর অনানুষ্ঠানিক প্রকৃতি–সম্পর্কিত সমস্যাগুলো পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বেকারত্ব দূর করা বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করা যেকোনো স্ট্যান্ডার্ডে অতি প্রয়োজনীয়; তা বলা বাহুল্য। এটি করার জন্য, বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ, দুর্বল পরিবহন অবকাঠামো সংশোধন, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চিত এবং জটিল রেগুলেশন শিথিল তথা স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা ঋণ প্রদান ইত্যাদি দ্বারা বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন–সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা দরকার। দুর্নীতিবাজদের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আওতায় যেমন নিয়ে আসতে হবে, তেমনই যাঁরা কালো ও সাদাটাকার অধিকারী, তাঁদের অর্থ উপার্জনের উৎস খতিয়ে দেখতে হবে। যদি সঠিক তথ্য দিতে অক্ষম হন, এসব বাসায়ীর ২২ শতাংশ আয়কর দিয়ে তাঁদের অবৈধ উপার্জনকে বৈধতার সার্টিফিকেট সংগ্রহের পদক্ষেপ নিতে পারেন। এতে যেমন রাষ্ট্রীয় কোষাগার হবে উপকৃত, তেমনই অবৈধ্য টাকার পাহাড় যাঁরা গড়েছেন, তাঁরাও তাঁদের টাকার বৈধতার স্বীকৃতি পেয়ে নতুন করে বিনিয়োগে উদ্যোগী হবেন নিশ্চয়ই। একটি নির্ধারিত অঙ্কের অধিক টাকা যাঁরা ব্যাংকে রেখেছেন, তাঁদের ব্যাংক স্বেচ্ছায় সরকারের কাছে রিপোর্ট করবেন এবং সরকারের আয়কর বিভাগ তাঁদের সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখবে।

দুর্নীতিবাজদের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আওতায় নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে এসে আবার ঋণখেলাপিদের ঋণ দিয়ে দিলে সেই অর্থ আবার উধাও হয়ে হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বরং সরকার সেই অর্থ স্বল্প আয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ইন্টারেস্ট ফ্রি ঋণ দিয়ে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহী করতে পারে। সরকার এই কাজ নিজেরা না করে গ্রামভিত্তিক এই কাজ জিও অথবা এই প্রজেক্ট গ্রামীণ ব্যাংক কিংবা ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারেন। কালো ও সাদাটাকার ওপর আয়কর আরোপ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল করে রাখতে হবে।

default-image

বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, সার্চ ইঞ্জিন এবং ডিজিটাল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে মোটা অঙ্ক হাতিয়ে নিচ্ছে। গুগল, ফেসবুক, উবার, ইউটিউবের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে হাজারো কোটি টাকা। অথচ সরকার ইচ্ছা করলেই আইন করে এসব কোম্পানির কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারত। সরকার ডিজিটাল আইন করতে পারে, সুতরাং নিশ্চয়ই এসব সার্চ ইঞ্জিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের আয়ের ওপর কর বসানোর জন্য আইন করতে পারত। এসব কোম্পানিকে নিশ্চয়ই তাদের নিজেদের স্বার্থে আয়কর দিতেও প্রস্তুত থাকা উচিত। যে যেখান থেকেই আয় করবে, সেই কোম্পানিগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব আছে যে সে দেশের অর্থনীতিতে, কাঠামোগত উন্নয়নে অবদান রাখতে হবে। সরকার যদি পার্লামেন্টে আইন পাস করেন যে এই কোম্পানিগুলো তাদের বাংলাদেশের আয়ের একটি অংশ (যেমন ৫ শতাংশ) আয়কর হিসেবে সরকারকে দিতে হবে, তাহলে অবশ্যই তারা তা দিতে বাধ্য। এখনই সময়। আমরা দেখেছি ইংল্যান্ডেও সিমিলার আইন করা হয়েছে। এখন ইংল্যান্ডে আইন পাস করা হয়েছে যে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে, সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসের আয়ের ওপর ২ শতাংশ কর প্রবর্তন করবে, যা ইউকে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে উপার্জন করবে। আমরা সরকারের কাছে আহ্বান করব আমাদের দেশেও অনুরূপ আইন করা হোক।

*লেখক: আইনজীবী ও গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন