default-image

করোনাত্রাসে পৃথিবীর সবকিছু উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। থমকে গেছে পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। চিরাচরিত অভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষগুলো ধীরে ধীরে সামনে পা বাড়াচ্ছেন। আশায় দিন গুনছেন ঘরবন্দী মানুষগুলো। তবু থেমে নেই মানুষ। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে স্বল্প পরিসরে হলেও তাঁরা নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে চলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা।

শরৎকালীন দুর্গাপূজা বাংলা পঞ্জিকার আশ্বিন মাসে হলেও মূলত এবার কার্তিক মাসে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দুর্গার মৃণ্ময়ী সত্তাকে চিন্ময়ীরূপে সর্বজনীনতার সর্বোত্তম প্রকাশ মঙ্গল ও কল্যাণরূপ কামনা করে কলাকার আর্টস ফেসবুক অনলাইন মিউজিকের মাধ্যমে মহাশক্তিকে স্মরণ করে। এটি কলাকারের ৪২তম পর্ব। ভাবনা, পরিচালনায় এবং সঞ্চালনায় চন্দ্রা চক্রবর্তী এবং প্রযোজনায় বর্তমান ইউরোপের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন কলাকার আর্টস, ইউকে। গত ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর কলাকার আর্টস মহালয়া উপলক্ষে ফেসবুক অনলাইন মিউজিকের মাধ্যমে দুর্গতিনাশিনীকে স্মরণ করে।

বিজ্ঞাপন
default-image

লাইভ অনুষ্ঠান নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং গুণী শিল্পীরা ছিলেন। কলকাতা থেকে কথকশিল্পী অনুরেখা ঘোষ, ইউকে থেকে আবৃত্তিকার ও সম্পাদক সোমা ঘোষ, ইউকে থেকে কণ্ঠশিল্পী শর্মিষ্ঠা গাঙ্গুলি, ইউকে থেকে শিক্ষক ও কবি মাহের আহমেদ, ইউকে থেকে কামালবীর সিং, বিশিষ্ট বেহালাবাদক ও সুরকার, ইউকে থেকে প্রকল্প পরিচালক, কলাকার আর্টস, ইউকে, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী এবং আনন্দধারা আর্টস, ইউকের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ, সাহিত্য-শিল্পের বিশেষ অনুরাগী, আবৃত্তিকার ইউকে থেকে সংযুক্তা ঘোষ, শৈল্পিক পরিচালক (Artistic Director), সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট এবং Non Executive Director, কলাকার আর্টস, ইউকে, কলকাতা থেকে প্রকৌশলী ও চিত্রশিল্পী স্পন্দন ব্যানার্জী ছিলেন।

দুর্গাপূজার বিশেষ অনুষ্ঠান গুরুশিষ্য পরম্পরা মহাশক্তি শিরোনামে অনুষ্ঠানের শুরুতেই পুজোর থালা নিয়ে দুর্গাপূজার সব অনলাইন দর্শক-শ্রোতাদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানালেন সঞ্চালক চন্দ্রা চক্রবর্তী। প্রথমে ‘জয় জয় মা ভবানী দয়ানী’ গানের সঙ্গে কত্থক নাচ দিয়ে দুর্গার মহাশক্তির ভাবকল্পনা শুরু হয়। অনুরেখা ঘোষ মাতৃশক্তি দুর্গার আত্মজ রূপ ও কর্মের প্রকাশ নাচের মধ্য দিয়ে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গুণী শিল্পীর অসামান্য উপস্থাপনায় মুগ্ধ শ্রোতারা।

পৃথিবীতেই নারীরা আজ বঞ্চিত, অবহেলিত, পদদলিত। সময় এসেছে তাঁদের নিজ শক্তিকে জাগরিত করে চিরায়ত অবহেলার বলয় থেকে মুক্ত করে দাসপ্রথাভাব কিংবা সামন্তবাদতন্ত্রের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা। কিন্তু এ জাগরণের প্রেরণা কী? প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে মহিষাসুরদলনী মা দুর্গার অমিয় তেজঃপুঞ্জ শক্তি। এই শক্তিকে বুকে ধারণ করে সোমা ঘোষ সুখদাস গুপ্তর কবিতা ‘আমি সেই মেয়ে’ আবৃত্তি করেন। আর স্পন্দন ব্যানার্জী এই কবিতার মূল থিমের ওপর শোষিত–বঞ্চিত–পদদলিত নারীর স্কেচ আঁকেন। মহাভারতকে অবলম্বন করে বুদ্ধদেব বসুর ‘অনামিকা’ নাটকের কিয়দংশ সোমা ঘোষ পাঠ করেন, যা নারীশক্তিকে কেন্দ্র করে রচিত।

কাজী নজরুল ইসলামের মহাশক্তি মা দুর্গাকে নিয়ে লেখা গানে শর্মিষ্ঠা গাইলেন। এ গান শুনে শ্রোতারা ক্ষণিকের জন্য হলেও অমৃতের পানে চলে গেছেন। বাণী, সুর এবং কণ্ঠের এ এক অপূর্ব সম্মিলন। শর্মিষ্ঠার দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল দেবী পার্বতীর বন্দনা নিয়ে। সুরের মায়াজালে বন্দী সব শ্রোতা। সুর ও কণ্ঠের সাযুজ্য মিলেমিশে একাকার।

অসাধারণ কণ্ঠ! এককথায় শর্মিষ্ঠাকে বলা যায় সম্মোহনী কণ্ঠশ্রী।

কামালবীর সিং একাধারে বেহালাবাদক ও সুরকার। তিনি দুটি গজল গেয়েছেন। প্রথমটি জগজিৎ সিংহের গাওয়া ‘ঝুকি ঝুকি সি নজর’। হৃদয়–মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো গজল।

শৈশবের প্রেম, ভালোবাসা, প্রণয়ের উচ্চরিত হৃদয়ের দুঃখকথা, না পাওয়ার বেদনার কথা, আবার পেয়ে হারানোর ব্যথা। তবু যাচিত-অযাচিত প্রেমের হৃদয়কে চেপে রাখার বাসনা মনকে কোনো ত্রিবেণির ঘাটে বেঁধে রাখা যায়! দ্বিতীয় গানটি তাঁর নিজের সুর করা। ‘মেরে অন্দর নুর কি বারিস বারসা দে’, ‘আমার মধ্যেই তুমি থাকো, আমার মধ্যে তুমি সৌন্দর্যের বৃষ্টি আনাও, তোমার সুগন্ধে আমাকে সুগন্ধিত করে তোলো; বেশ আবেদনময়ী এবং মনের আবেগ অনুভূতি দিয়ে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন। সত্যিই অভিভূত হওয়ার মতো গজল। রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনান ইমতিয়াজ আহমেদ। এ গানের সঙ্গে অনুরেখা ঘোষের নাচ এবং স্পন্দনের ছবি আঁকা এক অন্য রকম অনুভূতির প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ। ধন্য হলো ধন্য হলো মানবজীবন...জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব এ মোর নিবেদন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ থেকে কিয়দংশ সমসাময়িক ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে ড. সংযুক্তা ঘোষ পাঠ করে জানান দিয়েছেন স্মৃতির আত্মকথা। পেছনে ফেলে আসা স্মৃতির রোমন্থন স্মরণের সঙ্গে সঙ্গে অনুরেখার নাচের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে স্মৃতিকথা।। মাহের আহমেদ তাঁর লেখা কবিতা ‘অন্তহীন ভাবনা’ আবৃত্তি করে বহমান জীবনের নানা প্রশ্ন, জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

সম্মানিত অতিথিরা এবং দর্শক–শ্রোতাদের বিশেষ অনুরোধে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ধ্রুপদিসংগীত বিশেষজ্ঞ চন্দ্রা চক্রবর্তী খাম্বাজ রাগে ঠুমরি পরিবেশন করেন। সঙ্গে বেহালা সংগত করেন কামালবীর সিং। বেহালার বাজনা আর ললিত কণ্ঠে সুরের মূর্ছনা এতটাই প্রবল ছিল যে শ্রোতারা সবাই বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কণ্ঠের সঙ্গে বেহালা বিশেষ করে আমার চোখে জল এনে দিয়েছে। ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের পুরো অনুষ্ঠানটি এত বেশি প্রাণবন্ত ছিল, তা বলা বাহুল্য। বিশেষ করে স্পন্দন ব্যানার্জীর ছবি আঁকা ছিল একটি বিশেষ আকর্ষণ। প্রতিটি নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে তাৎক্ষণিক ছবি আঁকা নজরকাড়ার মতো। চিত্রশিল্পের প্রতি স্পন্দনের গভীর আসক্তি সত্যিই প্রশংসনীয়।

পারফরমিং আর্ট হিসেবে কলাকারের প্রতিটি পর্বই সফল, সার্থক এবং ব্যতিক্রমী।

কলাকার মানেই নতুনত্ব, ভিন্ন মেজাজের কিছু, যা একাধারে শিক্ষণীয় এবং আনন্দের।

সেরাটা উপহার দেওয়াই কলাকারের মূল উদ্দেশ্য। এখন পর্যন্ত এ অনুষ্ঠান যাঁরা অলংকৃত করেছেন তাঁরা সবাই সংগীতের মহারথী ও দিকপাল। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে কলাকার ঘোষণা দিয়েছে যে আগামী ১৪ নভেম্বর, শনিবার উপমহাদেশের একমাত্র জীবন্ত গজল কিংবদন্তি উস্তাদ গুলাম আলী খান সাহেব কলাকারের ফেসবুক লাইভে গান গাইবেন।

অন্যান্য পর্বের মতো এ পর্বেও আশাতীত দর্শক–শ্রোতা যুক্ত হয়েছেন। লাইক, শেয়ার, কমেন্টসও অগণিত। যদিও এটি অনলাইন, তারপরও বোঝা যায় অনুষ্ঠানটি শ্রোতাদের কাছে ভীষণ ভালো লেগেছে। এমন অনুষ্ঠান স্টেজে পারফর্ম করতে পারলে আরও অনেক বেশি ভালো করা যেত। এমন সৃষ্টিশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কলাকার আর্টস প্রশংসার দাবি রাখে।

মন্তব্য পড়ুন 0