default-image

পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ এত কথা বলা যায় যে ‘কুসুমকলিদের’ নিয়ে বেশ কয়েকটি পর্ব চলতে পারে। তবে, শুরুতেই বলে রাখছি এই কুসুমকলিরা কেবল শিশু শ্রেণিরই নয়, আঠারোর আগ পর্যন্ত যেহেতু সবাই শিশু, সুতরাং এর পরিধি শিশু শ্রেণির দেয়াল ডিঙিয়ে হাইস্কুলের চৌকাঠে পা রাখতেই পারে। আশা করি পাঠক হতাশ হবেন না বরং সঙ্গেই থাকবেন। প্রথম পর্বে গল্পচ্ছলে শিশু শ্রেণির শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রমে শিক্ষক ও শিশুর সম্পর্ক এবং শ্রেণিকক্ষের ভৌত সুবিধাদি নিয়ে বলেছিলাম। আজকে বলব বিষয় নির্বাচন ও শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে।

আমাদের শৈশবে মূলধারার (সরকারি) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি বলে কিছুই ছিল না। মূলত প্রথম শ্রেণি দিয়েই আমাদের ভীতিকর স্কুলজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতো। যারপরনাই নিরানন্দের, নীরস ও খটমট বিষয়াদিই ছিল আমাদের আবশ্যিক পাঠ্যসমূহ। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত—প্রধানত এই তিন বিষয় নিয়েই প্রথম শ্রেণিতে পঠন-পাঠন শুরু হতো। তৃতীয় শ্রেণি থেকে আমাদের বিষয়ের কলেবর বৃদ্ধি পেত। যদিও প্রথম শ্রেণিতে চারু-কারু ও শরীরচর্চা নামক বিষয় যুক্ত ছিল কাজির গরুর মতো। তবে, বেসরকারি ব্যবস্থায় কিন্ডারগার্টেন নামক স্কুলগুলোতে শিশু শ্রেণিতে এই চিত্র অনেকাংশেই পাশ্চাত্যের মতো। যদিও তা একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে না। আমাদের দেশে যেগুলোকে আমরা সহপাঠ্যক্রমিক বিষয় বলে অভ্যস্ত, শৈশবের এই বয়সে সেগুলোই বেশি জরুরি। যেসব বিষয় শিশুর মনের কোমল বৃত্তি বিকাশে সহায়তা করে, সেসব অনুষঙ্গহীন স্কুল জীবন শিশুর কাছে হয়ে যাবে মৃতের মতো। আনন্দ-বিনোদন ছাড়া শিশু বেড়ে উঠবে এক অবোধ যন্ত্রের মতো কিংবা মুখস্থ বিদ্যায় পণ্ডিত এক তোতাপাখি হবে। বলা বাহুল্য, বিষয় নির্বাচনে বয়স অনুযায়ী শিশুর শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা, এর বিকাশ ও উন্নয়নকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং সেটাই বিজ্ঞানসম্মত। একজন মানব শিশুকে পরিপূর্ণরূপে মানবীয় গুণাবলিসমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে তৈরি করাই শিক্ষণ-শিখনের প্রধানতম শর্ত হওয়া উচিত যেকোনো দেশেই।

সুতরাং এখানকার শিশু শ্রেণিতেই ভাষা এবং গণিতের সঙ্গে সামাজিক বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও শরীর বিজ্ঞান, অঙ্কন-নাচ-গান-নাটক ইত্যাদি বিষয় বাধ্যতামূলক হিসেবেই রয়েছে। সুনির্দিষ্ট সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সব বিষয়েই সমান গুরুত্বের সঙ্গে পাঠদান করা হয়ে থাকে। তবে, কোনো বিষয়কে মুখ্য আর কোনোটিকে গৌণ বলে গণ্য করা হয় না। উপরন্তু, শিশু শ্রেণিতে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ, মানবীয় মৌলিক গুণাবলির বিকাশ ও চর্চায় শিক্ষকদের ফোকাস এবং প্রচেষ্টা অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গেই লক্ষণীয়। এখানকার শিক্ষকেরা বিষয়ভিত্তিক পাঠদানে শিশুর দুর্বলতা নিয়ে যতটা সময় না ব্যয় করেন, তার চেয়ে অধিক সময় ব্যয় করেন শিশুর চরিত্র গঠন ও আচরণ শিক্ষণে। দিনব্যাপী ক্লাসরুম, খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, অ্যাসেমব্লি ও ডাইনিং রুমে হাজারবার শিক্ষকেরা যে শব্দগুলো উচ্চারণ করেন তা হলো; Be nice, be kind, be polite, you helpful, be friendly, be supportive and positive, care for others, respect others, listen others, be patient, be empathic, learn manners, We want to proud of you, এবং সর্বোপরি I do not want to use my teacher’s voice…এ জাতীয় আরও শত শত সুন্দর, ইতিবাচক, প্রশংসাসূচক বাক্য ব্যবহার করেন শিশুদের নির্দেশনা দিতে। এই Teachear’s voice বিষয়টি খুব মজার। শিশুরা এই বাক্যটি শুনেই বুঝে নেয়, শিক্ষক রেগে গেছেন, এবার উচ্চ স্বরে কথা বলবেন; যেটা এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারেই যায় না। শিক্ষক ও শিশু কেউই চিৎকার করে কথা বলবেন না কোনোভাবেই, সেটাই অলিখিত ও অবশ্যপালনীয় নিয়ম।

default-image

শিক্ষকেরা শিশুদের কেবল ভালোই বাসেন তা নয়, শাসনও করেন। সেই শাসনের ধরনও অতীব মধুর। শিশুরা যখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, মারামারি করে, তখন শিক্ষকেরা কী করেন? বকাঝকা দেন? গালমন্দ? নাকি শাস্তি দেন? কিছুই করেন না। শিক্ষকের ভূমিকা হলো মেডিয়েটরের। শিক্ষক বাদী-বিবাদী দুই দলের কথাই শোনেন, যত অন্যায়ই করুক কাউকেই গালমন্দ করেন না আবার কারওই পক্ষ নেন না। শিক্ষক বল তাদের কোর্টেই দিয়ে দেন। সব শুনে কেবল প্রশ্ন করেন, তুমি বা তোমরা কী মনে করো, কোনটা ঠিক, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। তুমি যদি বুঝতে পারো ভুল কিংবা সঠিক তবে তোমার কী করণীয়? এ জাতীয় প্রশ্নবাণে শিক্ষক শিশুদের নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানের দায়িত্ব দিয়ে দেন। এতে তারা দায়িত্বশীল হয়, মারামারি দুষ্টুমি অপেক্ষাকৃত কম করে এবং নিজেদের সমস্যা সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও অর্জিত হয়। অথচ, আমাদের শিক্ষকেরা হয় দুই দলকেই সমানভাবে আঘাত করতেন কিংবা এমন ভর্ৎসনাসূচক বাক্যবাণে জর্জরিত করতেন যা কেবল ঘৃণারই উদ্রেক করত মনের মাঝে। আমরা ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে এমন কুঁকড়ে থাকতাম যে শিক্ষককে বাঘের চেয়ে কিছুমাত্র কম ভয় পেতাম না।

আগেই উল্লেখ করেছি, শিক্ষক ও শিশুর মাঝে মধুর সম্পর্কের কথা; এই সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভৌত ব্যবস্থাও কিছুমাত্র কম ভূমিকা রাখে না। যেমন ক্লাসরুমে শিশুর উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী ছোট ছোট চেয়ার, ডেস্ক ও টেবিল থাকে। যেখানে শিক্ষকের জন্য আলাদা উচ্চ কোনো আসনের ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকও শিশুদের চেয়ারেই বসে থাকেন প্রয়োজনে। যখন দলীয় কাজ করেন ওদের সঙ্গেই কার্পেটে কিংবা মেঝেতে বসেন। এই কাছাকাছি বসার ব্যবস্থা, যে নৈকট্য এটা দুই তরফের দূরত্ব কমিয়ে দেয়, সহজ যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করে। দুই পক্ষের মধ্যে প্রভু-ভৃত্যতার অবসান ঘটায়। আমাদের সময়ে আমরা ভাবতাম, শিক্ষক মানেই পাহাড়ের সমান উচ্চতার কেউ, আমরা শিরদাঁড়া সোজা করে তাঁদের দিকে তাকাতেও ভয় পেতাম বরং আমরা তাঁদের পদতলের কেউ। এখানকার শিশুরা শিক্ষককে দেখে দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় না। শিক্ষককে মি. অমুক, মিস অমুক বলেই সম্বোধন করে। যদিও এটা এদের সংস্কৃতির অংশ! তবে, এর মানে এই নয় যে, এরা শিক্ষককে সম্মান করে না। এরা ভয়ও পায়, সম্মানার্থে! আবার ভালোও বাসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়ের থেকে অনেক বেশি ভরসা করে শিশুরা শিক্ষককে, অনেক বেশি ভালোবাসে। উল্লেখ্য, এখানকার প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৯০ শতাংশের ওপরে (সে কারণেই অনেক উদাহরণে বারে বারে মা শব্দটি এসে যাচ্ছে)।

ক্লাসরুমে পাঠদানকালে শিক্ষকেরও ভুল হয় অল্পবিস্তর। শিশুরা অকপটে সেই ভুল চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয়। শিক্ষকও খুব বিনয়ের ভঙ্গিতে নিজের ভুল শুধরে নেন। স্বীকার করেন আমিও মানুষ, আমারও ভুল হতে পারে, আর ভুল হওয়াটা দোষেরও কিছু নয়! যে কেউ ভুল করতে পারে। এই বিনয় এবং নমনীয়তা থেকে শিশুর মধ্যে একধরনের ইতিবাচক বোধ তৈরি হয়, যাতে শিশু বোঝে ভুল মানুষমাত্রেই হয়। এটা স্বাভাবিক এবং ভুল হলে সরি বলতে হয়, আর সেটা শুধরে নিলেই হয়ে যায়। মূলত, শিক্ষকেরা সব আচরণেই এক ধরনের রোল মডেল হিসেবে শিশুর সামনে নিজেদের উপস্থাপন করেন। জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় প্রতিদিন আমাদের হেডমাস্টার কে কে উচ্চ স্বরে গায়নি, তাদের পাশ্চাদ্দেশে সপাং সপাং জোড়া বেত দিয়ে নিষ্ঠুর আঘাত করতেন! অথচ নিজেরা কোনো দিন জাতীয় সংগীত গাননি। এ যেন কেবল ছাত্রদেরই কাজ। এখানের শিক্ষকেরা নিজেরাই প্রথমেই উচ্চ স্বরে গান জাতীয় সংগীত এবং সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের উৎসাহিত করেন গাইতে। একইভাবে শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন রাখা, খেলার সরঞ্জামাদি গুছিয়ে রাখা, শিক্ষা উপকরণ যত্ন করে রাখা, সব বিষয়ে ক্লাসরুমে একটা টিম ওয়ার্ক লক্ষণীয়। শিক্ষক আওয়াজ তোলেন, ‘কে কে আমাকে সাহায্য করতে চাও, চলে এসো।’ অমনি ফুলকলিরা হুড়মুড়িয়ে হাতে হাত লাগিয়ে সব কাজ গুছিয়ে ফেলে। এই টিমওয়ার্কসহ সাথিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করে, সহযোগী মনোভাবাপন্ন তৈরি করে, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধা তৈরি হয়। সর্বোপরি, পরবর্তী জীবনেও পেশাগত দক্ষতা হিসেবে ভীষণভাবে কাজে আসে। আদতে, আজকের শিশু যে আগামীদিনের সুনাগরিক, এ কথা মনেপ্রাণে এবং কাজেই বিশ্বাস করেন এখানকার শিক্ষকেরা। তাই সব ক্ষেত্রেই তাঁরা ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন একজন শিশুর পরিপূর্ণ জীবন গঠনে।

বিভিন্ন বিশেষ দিবসে এখানকার স্কুলও ছুটি থাকে। শিক্ষকদেরও ছুটি দরকার বৈকি। তবে আনন্দের কথা হলো, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিন কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রে ছুটির দিনের আগের সপ্তাহে স্কুলে সেই বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান, গল্প পাঠ, ক্লাস বিতর্ক, কুইজ, প্রামাণ্য চিত্র কিংবা ভিডিও প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক উল্লেখযোগ্য বিষয় ছাড়াও মা দিবস, ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবসও এই তালিকা থেকে বাদ যায় না। মূলত এই জাতীয় বিষয়কে ঘিরে যে অবকাঠামোগত শিক্ষণ-শিখন সম্পন্ন হয়, তা শিক্ষার্থীর জীবনে যথেষ্ট ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে শিশুদের আনুষঙ্গিক আরও কিছু দক্ষতাও তৈরি হয়, যা মৌলিক শিক্ষার কাঠামোকে সমৃদ্ধ করে অধিকতর। আমাদের শৈশবে বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে ক্লাস বন্ধ রেখে স্কুল খোলা থাকত; নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা অনুষ্ঠান হতো। তাতে করে আমরা কিছু না কিছু জানতে পারতাম সেই ছুটির ইতিহাস সম্পর্কে। আজকাল শহুরে স্কুলগুলো সব বন্ধ থাকে। গ্রামে আদৌ কী হয়, জানি না। পনেরোই আগস্ট সরকারি ছুটির দিন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার ফলে। কিন্তু শিশুরা কী জানে, কতটুকুই বা জানে কেন এই দিন স্কুল ছুটি? রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী কিংবা নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে স্কুল হয়তো ছুটি থাকে না, তবে আমাদের স্কুলগুলোতে আদতেই কি কোনো আলোচনা হয়? কোনো বাড়তি দুই কথা বলার সময় কি আমাদের শিক্ষকেরা পান যাতে করে শিশুদের কোমল মনে এসব মহৎপ্রাণের কিছুটা হলেও পরশ লাগতে পারে? যদিও আমাদের মহতী উদ্যোগ সৃজনশীল প্রশ্নব্যাংক রয়েছে, সেখানেই ওরা আজকাল শর্টকাটে জেনে নেবে অনেক কিছুই!

শিশুদের ভাষার দক্ষতা উন্নয়নে পঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ টুলস। আমাদের সময়ও ছেলেমেয়েররা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অনেক বই পড়ত অনেকটা লুকিয়ে চুরিয়ে। এখনকার শিশুরা অপাঠ্য কতটা পড়ে, জানা নেই। তবে, বাবা-মায়েরা যেভাবে জিপিএ-৫-এর পেছনে দৌড়ান, তাতে অপাঠ্য বই পড়ার কোনো ফুরসত পায় কি না, সেটাই প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় কথা হলো, আমাদের শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পঠনের কোনো ভূমিকা আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। শিশুকাল থেকেই পাঠাভ্যাস কেবল ভাষার দক্ষতাই নয়, শিশুমনে কল্পনার জগৎ তৈরিতে, শিশুর মনে আনন্দের প্রতিচ্ছবি আঁকতে, বুদ্ধির বিকাশ, নতুন তথ্য প্রদান এবং শব্দভান্ডার তৈরিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিশুর অতিচঞ্চলমতিতা দূর করতেও পঠন অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখানকার স্কুলের সব শ্রেণিতেই প্রতিদিন সকালে ২০ মিনিট নীরব পঠন বাধ্যতামূলক। এটি দিনের কার্যাবলিরই অংশ। এই নীরব পঠন কেবল পাঠাভ্যাস গঠনের জন্যই নয়, দিনের একটি চমৎকার শুরুর জন্যই ক্লাসরুমের আবহ তৈরি করার জন্যই চর্চা করা হয়ে থাকে। কবিতা পাঠের জন্য যেমন ব্যাকগ্রাউন্ডে যন্ত্রসংগীত এক আবহ তৈরি করে, কিংবা গানের শুরুতে হামিং, তেমনি এই নীরব পঠন শ্রেণিতে এক সুন্দর আবহ তৈরি করে সুস্থ চিন্তার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে।

default-image



অতি অবশ্যই যে বিষয়টি আলোচনায় আনা দরকার, সেটি হলো-জেন্ডার সংবেদনশীলতা তৈরিতে এখানকার স্কুলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেহেতু এটি বহুজাতিক, বহু সাংস্কৃতিক সমাজ, এখানে সব পরিবারে সমান চর্চা হয় না। তথাপিও, স্কুল সব সময়ই মূল বার্তাটি সমাজের কর্ণকুহরে পৌঁছে দেবেই। শিশু শ্রেণি থেকেই ক্লাসরুমের সব আলাপ-আলোচনায়, পাঠদানে, দায়িত্ব বণ্টনে, দলীয় কাজ কিংবা খেলাধুলায় ছেলেতে-মেয়েতে সমানাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করেন শিক্ষকেরা। মূলত, জৈবিক বিষয়াবলি ছাড়া সব ক্ষেত্রেই ছেলে-মেয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠায়, সমানুভূতিশীল হয়ে ওঠায় শিক্ষকের করণীয় সীমাহীন।

এক কথায় বলতে গেলে, মা-বাবার কাজ সন্তান জন্ম দেওয়া, আর শিক্ষকের কাজ তাদের মানুষ করা! দেখতে মানুষের মতো এই মানবশিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চাট্টিখানি কথা নয়! সেই কঠিন কাজটিই এখানকার শিক্ষকেরা করে থাকেন ভালোবেসে, মনের আনন্দে, কোনো রকম মারধর, চিৎকার-চেঁচামেচি না করেই। কারণ, একদিন এসব শিক্ষকও এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন। জীবন থেকে তাঁরা যা যা শিখেছেন, তা-ই শেখাচ্ছেন আগামীর সৈনিকদের। এভাবেই তো চলতে থাকে সুন্দরের রথযাত্রা। সময় আর সংস্কৃতি হাত ধরে এগিয়ে নেয় সভ্যতাকে। আমরা প্রায়ই হতাশার সুরেই বলি, ওরা (পশ্চিমা) তো একদিনে ওইখানে পৌঁছায়নি। ওদেরও সময় লেগেছে। সে কথা সত্য, তাঁদেরও সময়ের হাত ধরে পাড়ি দিতে হয়েছে বহু চড়াই-উতরাই। তবে, সত্যটা হলো, একদিন তাঁরা শুরু করেছিলেন বলেই আজ এখানে এসেছেন। আমাদেরও শুরু করতে হবে। নির্ধারণ করতে হবে লক্ষ্য, কোথায় যেতে চাই, কী অর্জন করতে চাই, সেটাই নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে আজ।

এই যে চলতি মাসের ৬ তারিখে ফেসবুক জুড়ে কারও কারও আহাজারি আবার কারও কারও মিষ্টি বিতরণ, বাচ্চাদের জিপিএ-৫ প্রাপ্তি নিয়ে। এর সূত্র ধরে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে আমাদের জীবনে। তথাপিও আমরা সেই রেসের ঘোড়ার পেছনেই ছুটছি। জিততেই হবে সেই রেসে। যে রেসের নাম গোল্ডেন জিপিএ-৫! যা না পেলে থেমে যাবে জীবন আমাদের। এই পোড়া জীবনবোধ থেকে শিগগির আমাদের মুক্তি মিলুক। আমরা জাতি গঠনে, দেশ গঠনে, শিশুদের চরিত্র গঠনে অধিকতর মনোযোগী হই। যাতে করে আগামীর বাংলাদেশ সুস্থ, সুনাগরিকদের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি। যারা এগিয়ে নিতে পারবে স্বপ্নের স্বদেশকে বহু দূরের যাত্রায়...। লাল-সবুজের নিশানকে যারা ভালোবেসেই আঁকড়ে ধরবে বুকের গহিনে। (চলবে)

ধারাবাহিক এ রচনার আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন : কাননে কুসুমকলি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0