default-image

অনেক দিন ধরে ইচ্ছা ছিল জার্মানি ঘুরতে যাব। জার্মানির আখেন শহরে আমার একজন বন্ধু থাকেন। আবার জার্মানির বিখ্যাত রাইন নদী দেখারও ইচ্ছা ছিল। তাই এই ছুটিতে জার্মানি যাব বলে মনস্থির করলাম। যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে টিকিট কিনে ফেললাম। আমি কানাডার এডমন্টনে থাকি। বছরে আট মাস বরফে ঢাকা থাকে উত্তর কানাডার এই শহরটি। শীতকালে মাইনাস চল্লিশ তাপমাত্রা নেমে আসে অনেক সময়। এখন এডমন্টনের তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। আর আখেনের তাপমাত্রা পঁচিশের কাছাকাছি। মন ভালো হয়ে গেল। অন্তত ছুটির কয়েকটা দিন উষ্ণতা উপভোগ করা যাবে।

কানাডার টরন্টো থেকে লন্ডনের হিথ্রো। সেখান থেকে জার্মানির ডুসেলডর্ফ। হিথ্রো থেকে ডুসেলডর্ফের বিমান ধরতে যখন গেটের কাছে এলাম, গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে বারবার তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। যারা এই বিমানে যাবেন তাদের অধিকাংশই জার্মান। কানাডায় আসার পর আমার একটা বদ অভ্যাস হয়েছে, তা হলো একেক দেশের মানুষের চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা এবং বের করা কোন দেশের মানুষের চেহারা কেমন। যখন লোকগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম, তারা কী ভাবছিল কে জানে। সাধারণত একজন মানুষের মুখের দিকে তাকালে সেই মানুষটি খুশি হয়। তার মনে হয় তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু এরা কী ভাবছে কে জানে। এদের ভাবনা দিয়ে আমি কী করব, আমার কাজ আমি করি, দেখতে থাকি।
বিমান যেখানে ল্যান্ড করল সেখান থেকে শাটল বাসে করে ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দরে নিয়ে যাচ্ছিল যাত্রীদের। তখন বুঝলাম জার্মানদের চুল কিছুটা সবুজাভ সোনালি। চোখ ঘোলা বাদামি। মুখের রং কিছুটা সবুজাভ সাদা। নাকটা সরু আর খাঁড়া। চোখের দৃষ্টি শীতল, শিয়ালের মতো। ছোটবেলায় গোঁফের বিশেষ ছাঁটের জন্য হিটলারকে অনেক পছন্দ ছিল। তখন জার্মানির মাত্র দুজন মানুষকে চিনতাম। একজন হিটলার আর অন্যজন আনা ফ্রাঙ্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে আনা ফ্রাঙ্ক ও তার পরিবার একটা গুদামঘরে লুকিয়ে ছিল। পরে জার্মানিতে তাদের ক্যাম্পে নির্যাতন করে মেরে ফেলে হিটলারের নাৎসি বাহিনী। আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ার পর খুব মন খারাপ হয়েছিল ছোটবেলায়। অনেক ছবি দেখেছি আনা ফ্রাঙ্কের। জার্মানিতে নেমে মনে হলো জার্মানির মেয়েগুলোর চেহারায় আনা ফ্রাঙ্কের চেহারার মিল আছে। তাই মেয়েগুলোর প্রতি কেমন যেন মায়া হলো।
হিথ্রো থেকে ডুসেলডর্ফে আসার সময় একবার টিকিট চেক করেছিলাম। তখন মোবাইলে দেখাচ্ছিল সাড়ে আটটা বাজে। ডুসেলডর্ফে নামব সাড়ে এগারোটায়। টরন্টো থেকে প্রায় ১২ ঘণ্টা জার্নি করে হিথ্রো এলাম আটলান্টিক পার হয়ে। ১২ ঘণ্টা অনেক বেশি সময়। এখন এই তিন ঘণ্টাকেও আরও অনেক বেশি সময় মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে কখন পৌঁছাব! প্লেনে এই অস্থিরতা নিয়ে বসে আছি। দেখি এক ঘণ্টা পর মানে সাড়ে নয়টায় প্লেন মাটিতে নামছে। প্লেন যখন ল্যান্ড করল মুহূর্তে আমার ঘড়ির সময় তড়াক করে সাড়ে এগারোটা হয়ে গেল! কী ব্যাপার, পরে বুঝলাম সময়ের পার্থক্য। যেখানে আগে সূর্য ওঠে সেখানে সময় আগে আসে। পৃথিবী গোল বলে সব জায়গায় সূর্য এক সময়ে আলো দিতে পারে না। তাই এমন হয়।
কানাড়ায় আমার এক জার্মান কলিগ আছে, কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট, প্রোগ্রামার, সোজাসাপ্টা কথা বলে। ভালো লোক, কাজের সূত্র আর তার এই সোজাসাপ্টা কথা বলার জন্য তিনি আমার বন্ধু হয়ে গেছেন। তার পূর্বপুরুষেরা জার্মান। আমেরিকান রেভ্যুলেশনের সময়ে তারা অভিবাসী হয়ে কানাডা আসে। তারা পূর্ব জার্মানের অধিবাসী ছিল। তাদের একটা ব্যাপার ছিল, তা হলো কানাডায় আসার পর তারা জার্মান ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলত না। তাই নিজ দেশিদের নিয়ে কলোনির মতো করেছিল। নিত্য প্রয়োজনীয় যা যা লাগত তা কলোনির ভেতর থেকে পূরণ করত। যাতে বাইরের লোকেদের সঙ্গে মিশতে না হয়, ইংরেজি বলতে না হয়। আমাকে সে বলল, সবকিছু ঠিকঠাক করে নিয়ে যেও। জার্মানদের এত ভদ্র ভেবো না। ভেবো না তুমি ফটাফট ইংরেজি বলবে, আর ওরা তোমাকে সাহায্য করতে আসবে।

default-image


সে যখন কথাগুলো বলেছে তখন আমি এই ব্যাপারগুলো আমলে নিইনি। মানুষ একটু বাড়িয়ে বলে এটা আমার অজানা নয়। তাই ভেবেছি, ও একটু বাড়িয়েই বলছে, হলেও এত খারাপ হবে না। কিন্তু ডুসেলডর্ফে এসে দেখলাম সে মোটেও বাড়িয়ে বলেনি। বন্ধুকে ফোন করে জানাতে হবে আমি জার্মানি পৌঁছেছি। কিন্তু রোমিং কাজ করছে না। ইনফরমেশনের লোকটা আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বললেন মনে হলো আমি তার কাছে কিছু জানতে চেয়ে অন্যায় করেছি, ইংরেজিতে কথা বলে ভুলে করেছি। ইংরেজি শুনলে লোকগুলোকে মনে হলো দৌড়ে পালাচ্ছে।
ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ফোন বুথ থেকে ফোন করতে গেলাম, নো সার্ভিস। কোন দুঃখে যে জার্মানি আসার আগে ক্রেডিট কার্ডে ফোন দিয়েছিলাম। বোকাটা ভেবেছে আমি বুঝি কার্ড বন্ধ করতে ফোন দিয়েছি! অথচ ব্যাপারটা উল্টো। কানাডার বাইরে কার্ড ব্যবহার করলে ওরা যাতে সন্দেহ না করে এই কারণে ফোন দিয়েছিলাম।
যা হোক চিন্তা করলাম, অন্তত ট্রলিটা তো নেই, ব্যাগগুলো তুলি। ট্রলি টানছি ট্রলি বের হচ্ছে না। এক ভদ্রমহিলা আমার পাশে এসে বললেন, এভাবে বের হবে না, তোমাকে পয়সা দিতে হবে। আমার কাছে পয়সা নেই, আছে কাগজের নোট। ভদ্রমহিলা নিজের পয়সা দিয়ে আমাকে একটা ট্রলি বের করে দিতে দিতে বললেন, আমি একজন কানাডীয়; আমিও কানাডা থেকে এসেছি। শোনো জার্মানিতে কিছু ফ্রি না, জার্মানরা এক গ্লাস পানিও তোমাকে পয়সা ছাড়া দেবে না। ভদ্রমহিলা চলে যেতে যেতে বললেন, এনজয় ইয়োর ট্রিপ! পরে দেখালাম ভদ্রমহিলার কথাই ঠিক। তিনি বলেছিলেন, রেস্টুরেন্টে গেলে পানির একটা বোতল তোমাকে ধরিয়ে দেবে। ভাবখানা এমন যে ইউরো ফেল পানি খাও। এমনকি শপিংমলগুলোতে বাথরুমে ঢুকতে যাওয়ার আগে পঁচাত্তর বা পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে ঢুকতে হবে। কোথাও কোথাও আবার শুধু পঞ্চাশ সেন্টের একটা কয়েন দিতে হবে, দুটা বিশ সেন্ট ও একটা দশ সেন্ট দিলে কাজ হবে না। অবশ্য পাশে একটা মেশিন আছে, ওখানে পঞ্চাশ সেন্টের কয়েন বানাও এরপর মেশিনে দাও, তারপর বাথরুমে যাও, তার আগে নয়।
হঠাৎ দেখি রোমিং কাজ করছে। বাঁচা গেল। বন্ধুদের বললাম আমাকে তাড়াতাড়ি গাড়িতে তোল, ভাবখানা যেন আমাকে বাঁচাও। কোথায় দাঁড়িয়ে আছি ঠিকমতো বলতে পারিনি বলে তাদের বিমানবন্দরের চারপাশ খুঁজে আমাকে বের করতে হয়েছে। গাড়িতে আসতে আসতে প্রশান্তিতে মন ভরে গেল, চারদিকে সবুজ আর সবুজ, গোছানো, ছবির মতো সুন্দর। বিমানবন্দরে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম, এই সুন্দর নিসর্গ দেখে সব ভুলে গেলাম। মনে হলো থেকে যাই আজীবন এখানে।
এডমন্টন থেকে যখন টরন্টো আসছিলাম, প্লেনে একজন প্রফেসরের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। খুব মিশুক তিনি। আমি জার্মানি যাচ্ছি শুনে বললেন, এক সপ্তাহ আগে তিনি মিউনিখে ছিলেন। ওখানে তার বোন থাকেন। প্রায় প্রতি বছর যান ওখানে।
নতুন সিটিতে গাড়ি চালানোর যে অ্যাডভেঞ্চার, ইদানীং প্রবলভাবে আমি অনুভব করছি। জার্মানি আসার আগে ভেবেছি আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে জার্মানি দেখব। কথায় কথায় তাকে বললাম, তুমি কি জান, আমি জার্মানিতে গাড়ি চালাতে পারব কিনা?
অবশ্যই পারবে। কানাডায় গাড়ি চালাতে পারলে জার্মানিতেও পারবে।

default-image


কিন্তু জার্মানিতে এসে রাস্তার যে অবস্থা দেখলাম, গাড়ি চালানোর ইচ্ছা মরে গেল। এখানে কেউ স্পিড লিমিট মানে না হাইওয়েতে। লেখা আছে এক শ কিলোমিটার পার আওয়ার। কিন্তু চালাচ্ছে আড়াই শ কিলোমিটার পার আওয়ার বেগে। রাস্তাগুলো এত সরু যে গাড়িগুলো লেনে ধরছে না এমন মনে হয়। মনে হচ্ছে রাস্তা ধরে বিপরীতে দিক থেকে গাড়ি এসে ধাক্কা দেবে। বাসগুলো ফুটপাথে ঠাসঠুস লাগিয়ে দেয়। ভাগ্যিস এসব ফুটপাথে পথচারীর খুব বেশি আনাগোনা নেই।
সেদিন রাতে বের হলাম আখেন শহর দেখতে। ছিমছাম গোছানো শহর। চার্লস দ্য গ্রেট এই শহরে থাকতেন। এই চার্লস দ্য গ্রেট হলেন ইউরোপের জনক। তাঁর প্রাসাদটি এখনো আছে আখেনে। আখেন ডোম এই চার্লস দ্য গ্রেটই বানিয়েছিলেন। হাজার বছরের বেশি বয়সী এই চার্চ দেখে মনে হয় না এত পুরোনো। এ শহরের রাস্তাগুলো অনেক দামি, কারণ রাস্তাগুলো পাথর দিয়ে গাঁথা। পথ দিয়ে হাঁটার সময় একটা জায়গায় দেখলাম শয়ে শয়ে সাইকেল পড়ে আছে। জার্মানরা সাইকেল চালাতে খুব ভালোবাসে। সাইকেল নিয়ে তারা স্কুলে যায়, বাজার করতে যায়, দৈনন্দিন কাজ করে। হাজার হাজার সাইকেল সাইকেলস্ট্যান্ডের সঙ্গে ঝুলে থাকে। দেখতে অদ্ভুত লাগে। শোনা গেল জার্মানরা সাইকেলের হাইওয়ে বানাবে। সেখানে শুধু সাইকেলই চলবে। স্পিড লিমিট থাকবে কিনা কে জানে।
জার্মানরা আবার বাগান করতে খুব পটু। এমন কোনো বাড়ি নেই যে ছোট খাটো একটা বাগান নেই। বাড়িতে একটা ছোট বারান্দা থাকা চাই যেখানে হরেক রকমের ফুলের গাছ বাহারি টবে লাগানো থাকবে। ইউরোপীয়রা নিসর্গের একনিষ্ঠ ভক্ত। বাংলাদেশে থাকতে পোস্টকার্ডে বিদেশের সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে মনে হতো, এগুলো আসল না নকল। কিন্তু এদের টবে ঝুলিয়ে রাখা রঙিন ফুল, ছোট ছোট দোচালা বাড়ি আর সাজানো প্রকৃতি দেখে বুঝতে পারলাম ওগুলো নকল ছিল না, আসল ছিল।আমি ঠিক যেন ছোটবেলার ওই ছবিগুলো দেখছি।
ছোটবেলায় আমার এক পরিচিত তার ছেলের নাম রেখেছিলেন রাইন। তখন জেনেছিলাম রাইন জার্মানির একটা বিখ্যাত নদী। পরে বড় হয়ে গল্পের বই, পত্রপত্রিকায় রাইনের কথা অনেক পড়েছি। দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক। অবশেষে রাইনের পাড় ধরে যখন মিউনিখ যাচ্ছিলাম তখন সে ইচ্ছা পূরণ হলো। রাইন দেখে মুগ্ধ হলাম। রাইনের পাড়ে পাহাড়ের ঢাল আর সবুজ প্রকৃতির মধ্যে মাঝে মাঝে ছোট ছোট দুর্গ চোখে পড়ে। মনে করিয়ে রোমান শাসনামলে রাইন ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখন সেই জৌলুশ না থাকলেও পাহাড়ের ঢালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গগুলো সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে। রাইনের পাশ দিয়ে সাদা রঙের ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। এই ট্রেন ধরে পর্যটকেরা রাইনের আশপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
পাড়ের ঢালু জমিতে বিস্তর এলাকা জুড়ে সবুজ আঙুর বন বিছিয়ে আছে, ইংরেজিতে যাকে বলে ভিনিয়ার্ড। জার্মান ওয়াইনের মূল উৎস রাইন পাড়ের এই আঙুর। সুন্দর যেন ফুরায় না! রাইন তুমি এত সুন্দর কেন! রাইনের পাড়ের সুন্দর সুন্দর বাড়ি, আঙুর বাগান, দুর্গ আর প্রকৃতি দেখে দেখে মুগ্ধ হয়ে মিউনিখ পৌঁছালাম।
মিউনিখ হলো বাভারিয়ার রাজধানী। বাভারিয়া জার্মানির দক্ষিণ পূর্ব পাশে অবস্থিত জার্মানির সবচেয়ে বড় স্টেট যা কিনা জার্মানির এক পঞ্চমাংশ জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে। শুনলাম বাভারিয়ার বিখ্যাত বিয়ার ফেস্টিভ্যাল অক্টোবরফেস্ট হচ্ছে। ছুটে গেলাম সেখানে। লাখ লাখ মানুষ এসেছেন সেখানে এই ফেস্টিভ্যাল দেখতে। বিশাল বিশাল রাইডে চড়ে চড়ে আনন্দ করছেন মানুষ। তাঁবুতে তাঁবুতে বসে মাসচ ভরে ভরে বিয়ার খাচ্ছেন, প্রেটজেল খাচ্ছেন, পর্ক আর বিফ খাচ্ছেন। মাসচ হচ্ছে এক লিটার আয়তনের বিয়ারের গ্লাস। প্রেটজেল হচ্ছে জার্মানির বিখ্যাত রুটি। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বিয়ার এই জার্মান বিয়ার, খেয়ে খেয়ে শয়ে শয়ে লোক মাতাল হয়ে পড়ে আছে। এই বিয়ার খেয়ে মাতাল হওয়ার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মানুষ অক্টোবরফেস্টে জড়ো হন।
শোনা গেল বাভারিয়াতেই ওয়াল্ট ডিজনির সিনড্রেলা ক্যাসেল রয়েছে। ক্যাসেল আবার মিউনিখ থেকে আড়াই ঘণ্টার ড্রাইভ। যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে বসে আল্পস পর্বতমালা দেখলাম। এই সেই আল্পস পর্বতমালা যা নিয়ে ছোটবেলায় ক্লাস ফাইভের বইয়ে পড়েছিলাম, এখন চোখের সামনে দেখছি, কেমন অদ্ভুত লাগছিল।
মিউনিখ থেকে ফিরে কোলন শহর দেখতে যাব। টিকিট কেটেছিলাম ইন্টারসিটি ট্রেনের। কিন্তু চড়ে বসলাম এক্সপ্রেস ট্রেনে। আমরা কোলন যাচ্ছি। গান গাইতে গাইতে আনন্দ করতে করতে, কফি খেতে খেতে। আমি, আমার বন্ধু বৃতি আর আমাদের একজন ইন্ডিয়ার বন্ধু ফেরদৌস। চেকার আসলেন। বললেন, টিকিট দেখাও।
টিকিট চেক করে চোখ উল্টিয়ে নারী চেকার বললেন, তোমাদের টিকিট তো এই ট্রেনের না। তোমরা সাধারণ ট্রেনের টিকিট কেটেছ আর উঠেছ এক্সপ্রেস ট্রেনে! সামনের স্টেশনে নেমে যাবে ঠিক আছে?
আমরা থতমত খেয়ে বললাম, ঠিক আছে।
নারী চেকার বুঝতে পারলেন আমরা তাঁর কথা বুঝিনি। তিনি দয়া করে আমাদের পরের স্টেশনে ট্রেন থেকে বের করে দিলেন। ভাগ্যিস সেই স্টেশনই কোলনের স্টেশন ছিল, তাই আমাদের আর ধকল পোহাতে হয়নি।

default-image


কোলনে নেমে প্রথমে গেলাম কোলন ডোমে। গোথিক আর্কিটেকচার দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কালচে রঙের এই ডোম সুনিপুণ হাতে বানানো হয়েছে শত শত বছর ধরে। জানালার রঙিন কাচের ভেতরে সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য ঝলমল করছে। পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে সেন্ট ক্রিশটফারের মূর্তি, সোনালি রঙের তিন ম্যাজাইয়ের বক্স দেখার মতো সুন্দর। ডোমের বাইরে বসে আপন মনে ছবি আঁকছেন কিছু প্রতিভাবান শিল্পী। রং আর কালি ঝুলিতে মাখা তাদের শরীর। অদ্ভুত তাদের নেশা।
সেখান থেকে একটু এগোলাম। এগিয়েই দেখলাম রাইন। কোলনের রাইন।
এখানে রাইন অন্যরকম সুন্দর। রাইনের এপাড় থেকে ওপাড় বেষ্টন করে আছে হোহেনযলের্ন ব্রিজ। অতীব সুন্দর এই ব্রিজটার আর একটা সৌন্দর্য হলো, এর গায়ে ঝোলানো অসংখ্য রঙিন তালা। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় লাভ প্যাডলক বা সুইটহার্টস লক। তার মধ্যে অনেকেই তালার ওপরে নিজেদের ভালোবাসার কথা লিখে, ভালোবাসার মানুষের নাম লিখে, চাবি দিয়ে তালা মেরে, চাবি রাইনের পানিতে ছুড়ে ফেলে, চাবিগুলো রাইনের বুকে হারিয়ে যায়। এভাবে তালা ঝুলিয়ে চাবি ফেলে দিয়ে প্রেমিক প্রেমিকারা মনে শান্তি পায়। তারা মনে মনে আশ্বস্ত হন যে তাদের ভালোবাসা অটুট থাকবে। প্রেমের অনুভূতির বাহ্যিক প্রকাশ অন্য সব অনুভূতির চেয়ে বেশি। জার্মানির এই ভালোবাসার তালা দেখে আমাদের দেশের প্রেমিক প্রেমিকাদের কথা মনে পড়ল। দেয়ালে দেয়ালে, গাছের গুঁড়িতে, পাথরে, হাতে বুকে তারা ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ খোদাই করে ফেলে। এই তালায় লেখাও একই রকমের বহিঃপ্রকাশ। একটা তালার ওপরে আবার ক্রিস্টিনা যোগ মার্ক লেখা দেখলাম।
আমাদের দেশের প্রেমিক প্রেমিকাদেরও সচরাচর এই যোগ চিহ্ন ব্যবহার করতে দেখা যায়। তার মানে প্রেমের ক্ষেত্রে গণিতের তথা যোগ চিহ্নের ব্যবহার সর্বজনীন। মনে হলো পৃথিবীর সব প্রেম এক, তাই বহিঃপ্রকাশও এক।
নদীর পাড়ে বসে ছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে এল, ট্রেন ধরে আবার আখেনে ফিরে এলাম। মনের ভেতরে রাইনের ছবি আটকে রইল। আমি আর একবার রাইনের পাড়ে যাবই যাব, এই ইচ্ছা জেগে রইল মনে। কাল আবার কানাডা আসতে হবে, সব গোছগাছ করে খুব ভোরে ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দরে চলে এলাম। মনের ভেতরে কষ্ট লেগে রইল, মনে হলো আর কটা দিন থেকে গেলেই হতো। মনের নিয়ম আর পৃথিবীর নিয়ম এক নয়। পৃথিবীর নিয়মে আমার ছুটি শেষ। সোমবার অফিসে হাজিরা দিতে হবে। তাই জার্মানিকে বিদায় জানাতে হলো।
বাই বাই জার্মানি, তোমার সৌন্দর্য দেখে মন ভরেনি, আমি আবার আসব।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0