বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’–এর জনপ্রিয় পরিচালক, উপস্থাপক ফজলে লোহানীকে চেনেন না এমন লোকের সংখ্যা কমই ছিল সেই সময়। যে সময়ের কথা বলছি তখন বিটিভি ছাড়া বাংলার মানুষ দেশের অন্য কোনো টিভি চ্যানেলের কথা শুনেছে বলে মনে হয় না। যে কারণে অল্প কিছু মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান মানুষ দেখেছে বলে কলাকুশলীদের কথা নামসহ মনে রেখেছে। তেমনিভাবে ফজলে লোহানীর নামটিও ছিল আমার মুখস্থ। এ কারণেই কামাল লোহানী নামের দীর্ঘ দেহের মানুষটির সামনে যাওয়ার পর যখন জানলাম তাঁর নাম কামাল লোহানী তখন প্রশ্ন করে বসলাম, আপনি কি ফজলে লোহানীর ভাই বা কোনো আত্মীয় হোন? উনি কোনো জবাব না দিলেও তাঁর মেয়ে বন্যা বলেছিল, ‘আমার চাচা হন ফজলে লোহানী।’

এরপরের কথায় আসছি। স্থান ছিল পুরানা পল্টন, রাশেদ খান মেননের বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি অফিস। সময়টা ছিল বাংলাদেশে তখনকার স্বৈরাচার সরকার এরশাদ শাসনের শেষ দিক। দেশে তখন স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিল মেহনতি জনতা। মিটিং, মিছিল, হরতাল, ঘেরাও, জ্বালাও, পোড়াও সবকিছুই চলছে তখন ঢাকা তথা দেশজুড়ে। আমি তখন থাকি ফার্মগেট মনিপুরীপাড়ায়।
পাড়ায় আমরা বেকার এবং ছাত্রদের একটি গ্রুপ গড়ে তুললাম। সময় পেলেই ওদের সবাই চলে আসত আমার বাসার সামনে একটি আমগাছ ছিল, সেই গাছের নিচে। কাঁঠালবাগান, তালতলা, মোহাম্মদপুর থেকেও আসত অনেকে। সেই বয়সে এমনিতেই টগবগে শরীর। কথায় কথায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে জলপাই রঙের পোশাকধারীদের যাত্রাপথে বাধার সৃষ্টি করতাম। কত দৌড়ানি খেয়েছি ফার্মগেট এলাকায় সেই স্বৈরশাসনের শুরু থেকে তার হিসাব নেই।

default-image

আমাদের কোনো নেতা ছিল না। নিজেদের মনের তাগিদেই রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে একাত্মতা ঘোষণা করে রাস্তায় বেরিয়ে আসতাম। সেই উত্তাল আন্দোলনের সময় তালতলার এক বন্ধু নাম মুরাদ, সে একদিন বলল চল পল্টন পার্টির অফিসে যাই। পার্টি বলতে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি হলে যাব না বললে, মুরাদ বলল আরে চলো, সেখানে রাজনীতি না, গানবাজনা হয়। পার্টি অফিসে গেলে সেখানে আমাদের নিয়ে নতুন একটা গোষ্ঠী গঠনের কথা বললে আমি আগ্রহ দেখালাম যেতে। প্রথম যেদিন যাই সেদিন গ্রুপের আরও কয়েকজনকে আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাই।

পল্টনের সেই অফিসে গিয়ে দেখি সেখানে সব সোভিয়েত–সম্পর্কিত বই আর ম্যাগাজিনের ছড়াছড়ি। বুঝে গেলাম, কাদের পার্টি অফিস সেটা। বসার কিছু সময় পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম ভাই এলেন তাঁর কয়েকজন শিল্পীবন্ধু নিয়ে। এরপর একে একে কামাল লোহানী তাঁর ছেলে সাগর, মেয়ে বন্যাকে নিয়ে, রাশেদ খান মেনন এলেন তাঁর মেয়ে সুবর্ণাকে নিয়ে। এরপর এলেন নাট্যশিল্পী আরিফুল হক, সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদসহ আরও অনেকে। সবার সঙ্গেই পরিচয় হলো, শুরু হলো চা চক্র।

লোহানী সাহেব (তখন ভাই সম্বোধন করতাম) এরশাদ সরকার সম্পর্কে ব্রিফ দিয়ে বললেন গণ শিল্পী সংস্থা নামে একটি সংগঠন করার কথা। এই সংগঠনের কাজ হবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলা। সেই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। আমার সঙ্গে ছিল তখনকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বপন, জোবায়ের, আমজাদসহ আরও কয়েকজন (কারও পুরো নাম এখন আমি মনে করতে পারছি না)।

default-image

শিল্পী আরিফুল হক আমাদের দিয়ে একটি পথনাটক করানোর চেষ্টা করেছিলেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে আমাদের কেউই অভিনয়ে পাকা ছিলাম না। নাটকের প্রতিও আন্তরিক ছিলাম না, যে কারণে শেষ পর্যন্ত নাটক আর করা হয়নি। প্রতি সপ্তাহে আমরা পল্টনের সেই অফিসে গেলে চলত চায়ের আড্ডা, দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা, এরপর রিহার্সাল। পাশে বসে দেখতেন কামাল লোহানী। সেই রিহার্সালের পূর্ণতা ঘটেছিল শহীদ মিনারের পাদদেশে গেয়েছিলাম দলীয় সংগীত। অনেকগুলো গানের মধ্যে একটি গানই মনে পড়ে, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা’ গানটির কথা। সেখানে আমাদের দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কামাল লোহানী সাহেব নিজে।

কামাল লোহানী সম্পর্কে বলার মতো তাঁর সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ বলতে এই অল্প সময়েই যেটুকু পেয়েছিলাম তার মধ্যে মনে হয়েছিল তিনি খুব রাগী। তবে, চেহারায় ভেসে ওঠা রাগের কোনো কিছুই মনে হয়নি তাঁর অন্তরে ধারণ করেন। কথায় এত বেশি আন্তরিক ছিলেন যে, যে কাউকেই তিনি সহজে কাছে টানার আলাদা এক শক্তি রাখেন। দেশে যখনই যাই, যাওয়ার পর কম বেশি আমি একবার হলেও জাতীয় প্রেসক্লাবে যাই। ক্লাবে গিয়ে চা–কফি খাই বা লাঞ্চ করি ক্লাবে পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ কারও সঙ্গে বসে।

default-image

মনে পড়ে একবার যাওয়ার পর গিয়ে দেখি অডিটরিয়ামে কোনো এক প্রোগ্রাম চলছিল, আগ্রহ নিয়ে সময় ছিল বলে ভেতরে গিয়ে বসে প্রোগ্রাম দেখি। অনুষ্ঠান শেষে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস (সাবেক), নাট্যকার আরিফুল হক, কামাল লোহানী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন হলের বারান্দায়। সামনে গিয়ে পরিচয় দিয়ে কথা বললাম। অনেক দিন পর দেখা হওয়ার কারণে অতটা মনে রাখতে না পারলেও সব মনে করিয়ে দিলে বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে খোঁজখবর নিলেন। সেবারই ওনার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

সম্প্রতি একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর এক মেয়ের সঙ্গে দেখা হলে খোঁজখবর নিয়েছি। দেশের বাইরে থাকার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সব সময় সবার সঙ্গে দেখা–সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ হয়ে ওঠে না। কামাল লোহানীর সঙ্গেও হয়নি।
ফেসবুকে যখন সংবাদ দেখেছি, কামাল লোহানী আর নেই। তখন ভেতরটা আমার মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো যেন কোনো আপন আত্মীয় মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সত্যিই দেশ একজন গুরুত্বপূর্ণ লোককে হারিয়ে অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।

কামাল লোহানী যেখানে যেভাবেই থাকুন, তাঁর আত্মার শান্তি ও বেহেশত নসিব কামনা করি। আমিন।

* জাপানপ্রবাসী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0