default-image

গত শুক্রবার (২৬ জুন) ছিল স্কুলের শেষদিন। আমাদের মা-মেয়ের দুজনেরই দুমাস বন্ধ—গ্রীষ্মকালীন ছুটি। আমার দুমাসের ছুটি আরও আনন্দময় মনে হয় এই দিনটিতে, কারণ শেষদিনে কোনো ক্লাস থাকে না। প্রতিবছরই আমরা সহকর্মীরা এক সাথে বাইরে কোথায়ও খাই। এবার ঠিক হলো মেনোসে লাঞ্চ করতে যাব। আমাদের রেস্তোরাঁ বুকিং দুপুর বারোটায়। হাতে সময় আছে আধঘণ্টা। রেস্তোরাঁয় যাওয়ার পথে ভাবলাম একটু কফি খাই। সবাই একমত হলো। টিমহর্টনে কফির অর্ডার দিলাম। গল্প, হাসি ও সেলফিতে মেতে আছি। আমার সহকর্মী হঠাৎ ফিসফিসিয়ে বলল, দেখো–দেখো রোদেলা। প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একঝাঁক টিনএজ ছেলেমেয়ে হাসতে হাসতে টিমহর্টনে ঢুকছে—তার মধ্যে শ্যামলা বরণ মেয়েটি আমার কন্যা। মনে মনে বলছি, তুমি টিমহর্টনে এসেছ, ঘটনা তাহলে এই। আমার অনুমতির দরকার নাই। দাঁড়াও-ইত্যাদি।
কানাডিয়ান সহকর্মীদের সঙ্গে আছি, তাই কোনোরকমে রাগ সামলিয়ে কঠিন চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। রোদেলা আমাকে দেখেনি। দেখলাম ক্যাপিচিনো অর্ডার দিচ্ছে। মনে মনে ভাবছি, পয়সা পেল কই। কদিন ধরে তার মাসিক বেতন বন্ধ। বলে রাখা ভালো, কানাডিয়ান বাচ্চারা প্রতি মাসে সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পঁচিশ-তিরিশ হাজার টাকা পায়। এটাকে বলে চাইল্ড ট্যাক্স। এই টাকা মায়ের নামে আসে। মা চাইলে এখান থেকে কিছু টাকা বাচ্চাকে হাত খরচ হিসেবে দেয়। আমি আবার কাজের বিনিময়ে পয়সা কর্মসূচি চালু করেছি। কাপড় ধোয়া-ঘর গোছানো—পাঁচ ডলার। এটা পরীক্ষার মাস তাই সে বাসার কাজে কোনো সাহায্যই করেনি। বাপের সঙ্গে তার গোপন আঁতাত। আবার না সে বাবাকে পটিয়ে হ্যাঁ করে ফেলে। হয়তো বাবাই সকালবেলা পয়সা ধরিয়ে দিয়েছে। এসব যখন ভাবছি, রোদেলা আমাকে হঠাৎ দেখতে পেল। আমার কঠিন চোখের পরোয়া না করে হাসতে হাসতে এসে জড়িয়ে ধরল।

আম্মু কি করো?
জবাব না দিয়ে বললাম, তুমি কি করো?
রোদেলা ইংরেজিতে জবাব দিল—আজকে স্কুলের শেষদিন। বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে এসেছে। আমার রাগকে সামান্যতম পাত্তা না দিয়ে সে বন্ধুদের সঙ্গে পাশের টেবিলে বসে চিল্লাচিল্লি করতে লাগল। লোকজন প্রশ্রয়দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। সবাই জানে আজ স্কুলের শেষদিন। বাচ্চারা তো একটু মজা করতেই পারে। সবাই কথা বলছে, কোনো জড়তা নেই, হাসছে সাবলীল। আমার মেয়েটা অতি দ্রুত কথা বলছে, সেই যেন বেশি কথা বলছে। আধখাওয়া কফি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বারোটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। সে হাত নেড়ে হাসি মুখে বলল, বাই আম্মু।
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পেলাম। আমি যেন আমাকেই প্রশ্ন করলাম। কেন কানাডায় এলাম? রোদেলাকে চমৎকার একটা জীবন দেওয়ার জন্য অবশ্যই। আমি আমার জীবনের মতো আমার মেয়েকে শুধু মেয়ে হিসেবে বড় করতে চাইনি বলে এতো দূরে কানাডায় থাকি। এখানে আঠারো বছর পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা শিশু হিসেবে বিবেচিত। বাবা-মা, রাষ্ট্র, স্কুল, সমাজ সবাই চেষ্টা করে বাচ্চাটাকে আনন্দময় শৈশব দিতে। ক্লাশ টেন পর্যন্ত তো শুধু স্কুলে হাজির থাকলেই পাস। সামারে দুই মাস সব অফিস-দোকানপাট ওদের জন্য সামার জব রেডি রাখে। এই বয়সে ওদের কত কি কিনতে ইচ্ছে করে, খেতে ইচ্ছে করে। আর আমার মতো চাইল্ড ট্যাক্স হজম করে ফেলার মতো মায়ের তো আর অভাব নাই। বাচ্চারা কাজ করতে গিয়ে জীবনের বাস্তবতাকেও চিনে নেয়। কীভাবে টাকা-পয়সা হিসাব করে নিজের প্রয়োজন মেটাতে হয় তাও রপ্ত করে নেয়।
রেস্তোরাঁয় যেতে যেতে হঠাৎ মনে পড়ল আমার শৈশব। ভাবছিলাম কঠোর অনুশাসন ও স্বাধীনতাহীনতা নিয়ে বড় হয়েছি। জড়তা, লজ্জা সবসময় আমাকে কুঁকড়ে রাখত। প্রতিটা নিশ্বাসের সঙ্গে আমাকে মনে রাখতে হতো আমি মেয়ে। আমার শরীরটা নিয়ে আমি জড়োসরো। পারলে এটাকে যেন গুহোয় লুকিয়ে রাখি। সালোয়ার-কামিজ ও ওড়না আমার একমাত্র পোশাক। কিন্তু ওই বয়সে কত ধরনের পোশাক-ই-না পরতে মন চাইত। মেকআপ দিতে ইচ্ছে হতো। ওই বয়সে আমার পৃথিবীটা হঠাৎই ছোট হয়ে গেল। বাসার বাইরে যাওয়া বন্ধ। এমনকি বাসার টেলিফোন ধরাটাও নিষিদ্ধ।
আমি যখন সবচেয়ে সুন্দর ছিলাম, যখন সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল ছিলাম, সবচেয়ে বেশি অ্যাকটিভ ছিলাম তখন আমার পায়ে সামাজিকতার বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হলো। আমি মেয়ে হয়ে জন্মানের অপরাধে কার্যত বন্দী জীবনযাপন করতে লাগলাম।
রেস্তোরাঁর জানলার স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে দুপুরের রোদ ঝলমল করছে। রোদের আলোয় আমি আমার কিশোরী মেয়ের হাসি মুখটা দেখতে পেলাম। কী আনন্দের মাঝেই না সে বড় হচ্ছে। আমি আমার মফস্বলের মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ দিয়ে তার শৈশবকে বিষময় করে তুলব? তাহলে আমায় সে মেনে নেবে, কিন্তু কতটুকু তার মন থেকে? আমার শৈশব তো আমাকে একটা ভালো মেয়ে হতে বলে বস্তুনিষ্ঠ হতে শিখিয়েছে—মানুষ নয়। এখনো লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে যায়। আমার ব্যক্তিত্ব হাবুডুবু হয়ে থাকে আমি কি চাই সেটা সবাইকে জানাতে। আমার মেয়ে আমার মতো ব্যক্তিত্ব নিয়ে বড় হচ্ছে না। সে না বলার সাহস নিয়ে বড় হচ্ছে। সে যেটা চায় সেটা সে যুক্তি দিয়ে পাওয়ার চেষ্টা করে। কোন পোশাক কখন পরতে হয়, কোন বিষয়ে তার কথা বলা উচিত, কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে সে বোঝে।
বন্ধুদের মাঝে মধ্যমণি হয়ে রোদেলার অনবরত কথা বলার চমৎকার দৃশ্যটি কল্পনা করতে গিয়ে আমার মনটা কেমন ভালো লাগায় ভরে উঠল। আমি পরিষ্কার দেখছি সে ক্যাপিচিনোর গ্লাসে ষ্ট্রয়ে মুখ ডুবিয়েছে, ওর কালো চোখের মণিতে আনন্দের দ্যুতি ঝলমল করছে। আমার কাছে মনে হলো, এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমার চোখেও আনন্দ, কিন্তু নোনতা পানিতে ভেজা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0